ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নতুন এমডি ও সিইও: মো. আহতেশামুল হক খান – ব্যাংকিং জগতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

Dutch Bangla Bank New CEO: ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার জন্য মো. আহতেশামুল হক খানকে তাদের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)…

Avatar

 

Dutch Bangla Bank New CEO: ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার জন্য মো. আহতেশামুল হক খানকে তাদের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিযুক্ত করেছে । দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নেতৃত্বে এই পরিবর্তন আসছে এমন সময়ে যখন ব্যাংকটি তার ডিজিটাল রূপান্তর এবং আর্থিক কর্মক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদর্শন করছে । ব্যাংকিং খাতে ৩০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন খান তার দক্ষতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে ডিবিবিএল-এর ভবিষ্যৎ পথচলায় নতুন মাত্রা যোগ করবেন বলে প্রত্যাশা রয়েছে ।

নতুন এমডি ও সিইও: মো. আহতেশামুল হক খানের পরিচিতি

মো. আহতেশামুল হক খান ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সাথে ২০০৩ সাল থেকেই যুক্ত রয়েছেন, যা প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক । ব্যাংকে যোগদানের পর থেকে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ ও পরিচালনা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন । এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং চিফ বিজনেস অফিসার (সিবিও) হিসেবে কাজ করেছেন । এর পাশাপাশি তিনি চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্থানীয় অফিসসহ ব্যাংকের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শাখার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন ।

খানের ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে বেসিক ব্যাংকে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রবেশনারি) হিসেবে । সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি ডাচ-বাংলা ব্যাংকে যোগদান করেন এবং ধীরে ধীরে সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছান। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএসসি (সম্মান) এবং এমএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন । এছাড়াও, তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ (EMBA) ডিগ্রি অর্জন করেছেন । দেশে এবং বিদেশে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সেমিনার এবং কর্মশালায় তিনি অংশগ্রহণ করেছেন, যা তার পেশাদারী দক্ষতা এবং জ্ঞানভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে ।

পূর্ববর্তী নেতৃত্ব: আবুল কাশেম মো. শিরীনের অবদান

মো. আহতেশামুল হক খান দায়িত্ব গ্রহণের আগে, আবুল কাশেম মো. শিরীন ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন । তিনি ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে এই পদে ছিলেন এবং ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাধ্যতামূলক অবসরের বয়সসীমা (৬৫ বছর) পূর্ণ হওয়ায় অবসর গ্রহণ করেন । শিরীনের নেতৃত্বকালে ডাচ-বাংলা ব্যাংক ডিজিটাল রূপান্তর উদ্যোগের অগ্রভাগে ছিল এবং এটিএম সেবা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে । তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি প্রযুক্তিতে ১,২০০ করোড় টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং গ্রাহক তথ্য সুরক্ষিত রাখতে দুটি ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে ।

শিরীন ২০০৩ সাল থেকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সাথে যুক্ত ছিলেন, প্রথমে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে এমডি ও সিইও হিসেবে পদোন্নতি পান । তার অবসরের আগে, ২০২৬ সালের ২৪-২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ম্যানেজার্স কনফারেন্স-২০২৬-এ তিনি সভাপতিত্ব করেন, যেখানে ব্যাংকের ২৪৩টি শাখার সকল ব্রাঞ্চ ম্যানেজাররা উপস্থিত ছিলেন । এটি ছিল তার নেতৃত্বাধীন একটি শেষ বড় কর্পোরেট ইভেন্ট যেখানে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান ও কর্মক্ষমতা

ডাচ-বাংলা ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত, বিশেষত ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচিতে । ব্যাংকটি বর্তমানে ২৪৩টি শাখার মাধ্যমে দেশব্যাপী সেবা প্রদান করছে এবং দেশের বৃহত্তম এটিএম নেটওয়ার্কের মালিক । ২০২৫ সালের আর্থিক কর্মক্ষমতা ব্যাংকটির শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে।

২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নিট মুনাফা বছর-দর-বছর ৩৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৫০ করোড় টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৩৩ করোড় টাকা । ব্যাংকটি এই তীব্র বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উন্নত পরিচালনা দক্ষতা এবং মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে বর্ধিত আয়কে চিহ্নিত করেছে । ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৫৫.৬৯ করোড় টাকা এবং প্রতি শেয়ার আয় (EPS) পৌঁছেছে ২.৬৫ টাকায় ।

২০২৫ সালে ডিবিবিএল ২,৭০৪ করোড় টাকা পরিচালনা মুনাফা অর্জন করেছে, যা চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিবেশেও স্থিতিস্থাপক বৃদ্ধি প্রতিফলিত করে । তবে, ২০২৫ সালের প্রথম অর্ধবছরের (জুন ৩০, ২০২৫ পর্যন্ত) আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কিছু চ্যালেঞ্জও দৃশ্যমান ছিল। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ব্যাংকের নিট আয় ছিল ১৬৮.৬২ মিলিয়ন টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৭৫৪.৮ মিলিয়ন টাকা । তথাপি, ব্যাংকটির সামগ্রিক কর্মক্ষমতা এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার ইঙ্গিত দেয় যে ডিবিবিএল সঠিক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগ

ডাচ-বাংলা ব্যাংক বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি প্রবর্তনে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে । প্রযুক্তি-সচেতন তরুণদের এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের উভয়ের জন্য আর্থিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ব্যাংকটি বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম চালু করেছে। মোবাইল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে, ২০১১ সালে শাখাবিহীন এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং মডেল গ্রহণ করে ডিবিবিএল একটি অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান ।

এজেন্ট ব্যাংকিং খাতেও ব্যাংকটি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে । ডিবিবিএল, যা আড়াই বছর আগে ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিচালনা শুরু করেছিল, ব্যাংকিং মডিউলের লাইভ অপারেশন শুরু করা দ্বিতীয় ব্যাংক । প্রযুক্তিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ এখন তার সুফল দিচ্ছে। ২০০৪ সাল থেকে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শুরু করে ডিবিবিএল দেশের বৃহত্তম এটিএম নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং ডেবিট কার্ড চালু করেছে । প্রায় ২০ বছর পর, এই বিনিয়োগ ব্যাংকটিকে উচ্চ রিটার্ন প্রদান করছে এবং তিন বছরের সংকট — মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ — এর মধ্যেও চমৎকার কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে ।

নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক ছাড়াও মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করছে, কারণ তাদের বর্তমান এমডিরা অবসরের কাছাকাছি পৌঁছেছেন । এই নেতৃত্ব পরিবর্তনগুলি মূলত এমডিদের জন্য বাধ্যতামূলক অবসরের বয়স ৬৫ বছর, মেয়াদ সমাপ্তি এবং পদত্যাগের কারণে চালিত হচ্ছে, যা সেক্টর জুড়ে শূন্যপদ সৃষ্টি করেছে ।

বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন যে এই পরিবর্তনের মধ্যে দক্ষ এবং সৎ এমডি খুঁজে পাওয়া ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে । এমন পরিস্থিতিতে, মো. আহতেশামুল হক খানের মতো অভিজ্ঞ এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সাথে পরিচিত একজন পেশাদারের নিয়োগ ডিবিবিএল-এর জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তার ২০ বছরেরও বেশি সময়ের ডিবিবিএল-এ কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস তাকে এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রাখে।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নিয়োগের মধ্যে রয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, যার মেয়াদ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত হবে, এবং মেঘনা ব্যাংক, সাউথ বাংলা এবং সাউথইস্ট ব্যাংকে নতুন এমডিরা, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং শিল্পে নেতৃত্ব নবায়নের একটি বৃহত্তর প্রবণতা প্রতিফলিত করে ।

নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মো. আহতেশামুল হক খানের নেতৃত্বে ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে নতুন উচ্চতা অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ব্যাংকের ভেতর থেকে উঠে আসার কারণে, তিনি ডিবিবিএল-এর সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং পরিচালনা পদ্ধতির সাথে গভীরভাবে পরিচিত। এই পরিচিতি তাকে ব্যাংকের বর্তমান শক্তিগুলিকে কাজে লাগাতে এবং চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলায় কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করতে সাহায্য করবে।

ডিজিটাল রূপান্তর অব্যাহত রাখা এবং আরও উন্নত করা সম্ভবত খানের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ক্রমশ প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠছে এবং গ্রাহকরা দ্রুত, সুবিধাজনক এবং নিরাপদ ডিজিটাল সেবা প্রত্যাশা করছেন। ডিবিবিএল ইতিমধ্যে এই ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে এবং খানের নেতৃত্বে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। ডিবিবিএল-এর এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম এই লক্ষ্য অর্জনে ইতিমধ্যে অবদান রেখেছে, এবং নতুন নেতৃত্বের অধীনে এই প্রচেষ্টা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের গুণমান উন্নয়ন সম্ভবত আরেকটি প্রধান ফোকাস এলাকা হবে। ২০২৫ সালের আর্থিক বিবৃতি অনুযায়ী, ঋণ ক্ষতির জন্য প্রভিশন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্দেশ করে যে সম্পদের গুণমান ব্যবস্থাপনা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ । খানের অপারেশনাল এবং ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা এই ক্ষেত্রে কার্যকর কৌশল প্রণয়নে সহায়ক হবে।

গ্রাহক সেবার মান উন্নত করা এবং ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বা পুনর্গঠন করা অন্যান্য সম্ভাব্য উদ্যোগ হতে পারে। ২৪৩টি শাখা সহ, ডিবিবিএল-এর ইতিমধ্যে একটি শক্তিশালী শারীরিক উপস্থিতি রয়েছে, তবে ডিজিটাল এবং ফিজিক্যাল ব্যাংকিং এর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ব্যাংকিং খাতে বৈশ্বিক প্রবণতা ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট

বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন এবং গ্রাহক প্রত্যাশার বিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং ওপেন ব্যাংকিং এই খাতের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলিও ধীরে ধীরে এই প্রবণতাগুলি গ্রহণ করছে, যদিও স্থানীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলি এখনও কিছু বাধা সৃষ্টি করে।

সাইবার নিরাপত্তা ডিজিটাল ব্যাংকিং বৃদ্ধির সাথে সাথে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ডিবিবিএল দুটি ডেটা সেন্টার স্থাপন করে গ্রাহক তথ্য সুরক্ষায় ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে নতুন এবং উদীয়মান হুমকি মোকাবেলার জন্য নিরন্তর বিনিয়োগ এবং সচেতনতা প্রয়োজন।

টেকসই ব্যাংকিং এবং পরিবেশ, সামাজিক এবং শাসন (ESG) বিবেচনা বৈশ্বিকভাবে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ব্যাংক, সবুজ ব্যাংকিং এবং টেকসই অর্থায়ন উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন নীতি প্রবর্তন করেছে। ডিবিবিএল-এর মতো ব্যাংকগুলির জন্য এই এজেন্ডাকে তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে সংযুক্ত করা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

মূল পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ

সূচক তথ্য উৎস
নতুন এমডি ও সিইও নিয়োগের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ৩০+ বছর
ডিবিবিএল-এ যোগদান ২০০৩ সাল
ডেপুটি এমডি ও সিবিও হিসেবে দায়িত্ব ৬ বছর
শাখার সংখ্যা ২৪৩টি
Q3 2025 নিট মুনাফা বৃদ্ধি ৩৪৭% (YoY)
Q3 2025 নিট মুনাফা ১৫০ করোড় টাকা
২০২৫ সালের পরিচালনা মুনাফা ২,৭০৪ করোড় টাকা
প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ১,২০০ করোড় টাকা
ডেটা সেন্টার ২টি
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পটভূমি

মো. আহতেশামুল হক খানের শিক্ষাগত পটভূমি তার পেশাদারী যাত্রায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, থেকে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন । অর্থনীতিতে শক্তিশালী একাডেমিক পটভূমি তাকে সামষ্টিক এবং ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রবণতা বোঝার এবং ব্যাংকিং সিদ্ধান্তে প্রয়োগ করার ক্ষমতা দিয়েছে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ (EMBA) ডিগ্রি অর্জন তার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শাণিত করেছে । EMBA প্রোগ্রামগুলি সাধারণত অভিজ্ঞ পেশাদারদের জন্য ডিজাইন করা হয় এবং বাস্তব-বিশ্বের ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ব্যবহারিক জ্ঞান এবং কৌশল প্রদান করে।

দেশে এবং বিদেশে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সেমিনার এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণ তার পেশাদারী উন্নয়নে নিরন্তর অবদান রেখেছে । এই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নতুন ব্যাংকিং পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সর্বোত্তম অনুশীলন সম্পর্কে জ্ঞান আপডেট করতে সাহায্য করে।

ডিবিবিএল-এর বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়

ডাচ-বাংলা ব্যাংক ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে। ব্যাংকটি তার প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্ভাবনী সেবা প্রদানের জন্য পরিচিত। দেশের বৃহত্তম এটিএম নেটওয়ার্ক স্থাপন করে ডিবিবিএল গ্রাহকদের সারাদেশে সহজে নগদ অর্থ উত্তোলনের সুবিধা প্রদান করেছে।

ব্যাংকটি বিশেষভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে তার অগ্রগামী ভূমিকার জন্য স্বীকৃত । এই সেবাগুলি গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের আর্থিক সেবার আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শাখাবিহীন ব্যাংকিং মডেল গ্রহণ করে, ডিবিবিএল ঐতিহ্যগত ব্যাংকিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।

ডিবিবিএল-এর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ ত্রাণ সহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিতে অবদান রেখে চলেছে।

শেয়ারবাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগকারী দৃষ্টিভঙ্গি

ডাচ-বাংলা ব্যাংক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তার একটি শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ব্যাংকের নিট মুনাফায় ৩৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত । এই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার ডিবিবিএল-এর মূলধনী বৃদ্ধির গতি এবং চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক ও সুদের হার পরিবেশে ক্রমবর্ধমান লাভজনকতা তুলে ধরে ।

২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় (AGM), যা জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সাদিয়া রাইয়ান আহমেদের সভাপতিত্বে মিলিত হন । AGM-এ ২০২৫ সালের জন্য বহিরাগত নিরীক্ষক হিসেবে PKF Aziz Halim Khair Choudhury, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং কর্পোরেট গভর্নেন্স কমপ্লায়েন্স অডিটর হিসেবে Hoda Vasi Chowdhury & Co, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস নিয়োগ অনুমোদিত হয় ।

নতুন এমডি ও সিইও নিয়োগ সম্ভবত বিনিয়োগকারীদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, বিশেষত যেহেতু মো. আহতেশামুল হক খান একজন অভ্যন্তরীণ প্রার্থী যিনি ব্যাংকের কাজকর্ম এবং কৌশলের সাথে ভালভাবে পরিচিত। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতা সাধারণত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়।

প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও বাজার অবস্থান

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, যেখানে অসংখ্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বেসরকারি এবং বিদেশী ব্যাংক কাজ করছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রযুক্তির উত্থান এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করেছে। Mutual Trust Bank (MTB) সম্প্রতি পরপর দ্বিতীয় বছরের জন্য Euromoney দ্বারা বাংলাদেশের সেরা ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা নির্দেশ করে যে ডিজিটাল রূপান্তরে শীর্ষস্থানীয় থাকার জন্য ডিবিবিএল-এর মতো ব্যাংকগুলিকে নিরন্তর উদ্ভাবন করতে হবে।

তথাপি, ডিবিবিএল-এর বৃহত্তম এটিএম নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং প্রমাণিত এজেন্ট ব্যাংকিং মডেল তার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করে। ব্যাংকটির দীর্ঘ ইতিহাস এবং গ্রাহক বেস এটিকে বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান দেয়। নতুন নেতৃত্বের অধীনে, এই শক্তিগুলিকে লিভারেজ করা এবং নতুন সুযোগ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, ডিবিবিএল তার পরিচালনা দক্ষতা এবং মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে আয় বৃদ্ধি করে শক্তিশালী আর্থিক কর্মক্ষমতা প্রদর্শন করেছে । এটি ইঙ্গিত করে যে ব্যাংকটির ব্যবসায়িক মডেল এবং পরিচালনা কৌশল কার্যকর এবং টেকসই।

মো. আহতেশামুল হক খানকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিন দশকের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং ডিবিবিএল-এ দুই দশকের অভ্যন্তরীণ কাজের অভিজ্ঞতার সাথে, খান এই নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের জন্য অনন্যভাবে যোগ্য। তার নিয়োগ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে এবং ব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত কৌশল ও মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে। ডিজিটাল রূপান্তর, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিচালনা উৎকর্ষতায় ডিবিবিএল-এর শক্তিশালী ভিত্তির উপর নির্মাণ করে, খানের নেতৃত্ব ব্যাংকটিকে নতুন সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে। চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং তীব্র প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও, ডিবিবিএল-এর সাম্প্রতিক আর্থিক কর্মক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। খানের দূরদর্শী নেতৃত্বে, ব্যাংকটি তার গ্রাহকদের সেবা উন্নত করতে, তার বাজার অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত।

About Author
Avatar

বাংলাদেশ প্রতিনিধি থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য খবর পেতে আমাদের সংবাদ ওয়েবসাইট দেখুন। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত জানুন।

আরও পড়ুন