স্মার্টফোন এখন শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং জীবন রক্ষাকারী একটি শক্তিশালী যন্ত্র হয়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আপনার পকেটে থাকা স্মার্টফোনটি এখন আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে পারে। গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মানুষ এখন ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে এই সিস্টেম ৩৬ শতাংশ ব্যবহারকারীকে কম্পন শুরু হওয়ার আগেই সতর্ক করতে সক্ষম হয়েছে, যা মূল্যবান সময় দিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় নিতে সাহায্য করে।
স্মার্টফোনে ভূমিকম্প সতর্কীকরণ সিস্টেম কীভাবে কাজ করে
আপনার স্মার্টফোনের ভিতরে থাকা অ্যাক্সিলেরোমিটার সেন্সর, যা সাধারণত স্ক্রিন ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, এখন ভূমিকম্প সনাক্তকরণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। যখন একটি স্থির অবস্থায় রাখা ফোন ভূমিকম্পের প্রাথমিক P-তরঙ্গ শনাক্ত করে, তখন সেটি তাৎক্ষণিকভাবে সার্ভারে একটি সংকেত পাঠায় যেখানে কম্পনের অবস্থান এবং সময় রেকর্ড করা হয়।
গুগলের সিস্টেম হাজার হাজার ফোন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত নিশ্চিত করে যে সত্যিই একটি ভূমিকম্প ঘটছে কিনা। এরপর সিস্টেম ভূমিকম্পের উৎসস্থল এবং মাত্রা নির্ধারণ করে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন তাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠায়। গুগলের গবেষণা অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ২ বিলিয়নেরও বেশি অ্যান্ড্রয়েড ফোন এই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প সনাক্তকরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।
P-তরঙ্গ এবং S-তরঙ্গের মধ্যে পার্থক্য
ভূমিকম্প সনাক্তকরণ সিস্টেমের কার্যকারিতা বোঝার জন্য ভূমিকম্পের তরঙ্গ সম্পর্কে জানা জরুরি। ভূমিকম্প ঘটলে দুই ধরনের প্রধান তরঙ্গ তৈরি হয় – P-তরঙ্গ (প্রাইমারি ওয়েভ) এবং S-তরঙ্গ (সেকেন্ডারি ওয়েভ)। P-তরঙ্গ অনেক দ্রুত গতিতে চলে এবং তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর, যেখানে S-তরঙ্গ ধীরগতিতে চলে কিন্তু অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।
বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, P-তরঙ্গ S-তরঙ্গের চেয়ে প্রায় ১.৭ গুণ দ্রুত চলে। P-তরঙ্গের গতি ৫ থেকে ৮ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই সময়ের ব্যবধান, যা ভূমিকম্পের গভীরতার উপর নির্ভর করে ৬০ থেকে ৯০ সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে, মানুষকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সময় দেয়।
স্মার্টফোনে আগাম ভূমিকম্প সতর্কতা: জীবন বাঁচাতে নতুন প্রযুক্তি
অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমের বৈশ্বিক সাফল্য
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত একটি বৃহৎ গবেষণায় অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে।সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, এই সিস্টেম প্রতি মাসে গড়ে ৩১২টি ভূমিকম্প শনাক্ত করেছে এবং ৯৮টি দেশে প্রায় ৬০টি ভূমিকম্পের জন্য মাসিক ১.৮ কোটি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া থেকে জানা যায় যে ৮৫ শতাংশ মানুষ যারা সতর্কবার্তা পেয়েছেন তারা প্রকৃতপক্ষে কম্পন অনুভব করেছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩৬ শতাংশ ব্যবহারকারী কম্পন শুরু হওয়ার আগে, ২৮ শতাংশ কম্পনের সময় এবং ২৩ শতাংশ কম্পনের পরে সতর্কবার্তা পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সিস্টেমটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে সময়মতো সতর্ক করতে সক্ষম।
তুরস্কের ভূমিকম্পে সতর্কবার্তার কার্যকারিতা
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক-সিরিয়ায় সংঘটিত বিধ্বংসী ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে স্মার্টফোন ভিত্তিক সতর্কবার্তা সিস্টেমের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। <a href=”https://www.nature.com/articles/s41598-024-55279-z”>নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা</a> অনুযায়ী, Earthquake Network (EQN) সিস্টেম ব্যবহারকারীরা সর্বোচ্চ ৫৮ সেকেন্ড আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। গবেষকরা অনুমান করেন যে প্রায় ২৭ লক্ষ তুর্কি এবং সিরিয়ান নাগরিক যারা মারাত্মক কম্পনের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তারা যদি এই সতর্কবার্তা পেতেন তাহলে ৩০ থেকে ৬৬ সেকেন্ড সময় পেতেন নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে।
স্মার্টফোনে ভূমিকম্প সতর্কবার্তা চালু করার পদ্ধতি
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সতর্কবার্তা সক্রিয় করুন
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ভূমিকম্প সতর্কবার্তা সক্রিয় করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ। প্রথমে আপনার ফোনের সেটিংস অ্যাপ খুলুন। এরপর “Safety & emergency” বা “নিরাপত্তা ও জরুরি অবস্থা” অপশনে যান। সেখানে “Earthquake alerts” বা “ভূমিকম্প সতর্কবার্তা” খুঁজে বের করুন এবং টগল বাটন চালু করুন। যদি এই অপশন সরাসরি না পান, তাহলে Location সেটিংসে গিয়ে Advanced অপশনে চেক করুন।
সাম্প্রতিক অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণে এই ফিচার ডিফল্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ স্মার্টফোন যা অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহার করে, তাতে এই সুবিধা পাওয়া যায়। আপনি ডেমো অপশন ব্যবহার করে দেখতে পারবেন কীভাবে সতর্কবার্তা দেখা যাবে এবং শব্দ শোনা যাবে।
আইফোনে সতর্কবার্তা সেটআপ
আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্যও ভূমিকম্প সতর্কবার্তা সক্রিয় করার প্রক্রিয়া সহজ। প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আপনার ফোনে সর্বশেষ iOS সংস্করণ ইনস্টল করা আছে। সেটিংস অ্যাপে যান এবং “Notifications” বা “বিজ্ঞপ্তি” অপশনে ক্লিক করুন। নিচে স্ক্রল করে “Government Alerts” বা “সরকারি সতর্কবার্তা” খুঁজুন। সেখানে “Emergency Alerts” এবং “Public Safety Alerts” দুটি অপশনই চালু করুন।
আইফোনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে এটি মূলত সরকারি সতর্কীকরণ সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল এবং কিছু অঞ্চলে ShakeAlert সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত থাকে। আপনার অবস্থান সেবা (Location Services) চালু রাখতে হবে যাতে সতর্কবার্তা সঠিকভাবে কাজ করে।
ভূমিকম্প সনাক্তকরণ অ্যাপস
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাপস
স্মার্টফোনের বিল্ট-ইন সিস্টেম ছাড়াও বিভিন্ন বিশেষায়িত অ্যাপ ব্যবহার করে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। ভারতে <a href=”https://seismo.gov.in”>ভারতীয় ভূকম্পন কেন্দ্র</a> (National Center for Seismology) কর্তৃক তৈরি “ভূকম্প” (BhooKamp) অ্যাপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অ্যাপটি ভূমিকম্পের অবস্থান, সময় এবং মাত্রা সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য প্রদান করে।
MyShake অ্যাপটি মূলত ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তৈরি হলেও এখন বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অ্যাপ শুধু সতর্কবার্তাই দেয় না, বরং আপনার ফোনকে একটি সিসমিক সেন্সর হিসেবেও ব্যবহার করে যা বৈশ্বিক ভূমিকম্প নেটওয়ার্কে অবদান রাখে। My Earthquake Alerts অ্যাপটি পুশ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রদান করে এবং লাইভ ম্যাপে বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের তথ্য দেখায়।
দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ অ্যাপস
দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার জন্য বেশ কিছু বিশেষায়িত অ্যাপ উপলব্ধ রয়েছে। IIT রুড়কি এবং উত্তরাখণ্ড সরকারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি “ভূদেব” (BhuDev) অ্যাপটি বিশেষভাবে উত্তরাখণ্ড এবং হিমালয় অঞ্চলের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই অ্যাপটি স্থানীয় পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে তৈরি সতর্কবার্তা প্রদান করে।
Earthquake Network অ্যাপটিও অ্যান্ড্রয়েড এবং iOS উভয় প্ল্যাটফর্মে উপলব্ধ এবং রিয়েল-টাইমে ভূমিকম্প ট্র্যাক করার সুবিধা দেয়। এই অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে যা ভূমিকম্পের প্রভাব মূল্যায়নে সাহায্য করে।
প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা এবং চ্যালেঞ্জ
সিস্টেমের নির্ভুলতা
অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম ম্যাগনিচুড ৪.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সনাক্ত করতে সক্ষম, যদিও আঞ্চলিক পার্থক্য রয়েছে। উত্তর আমেরিকায় সিস্টেমটি ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্পও শনাক্ত করতে পারে যেখানে স্মার্টফোনের ঘনত্ব বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সিস্টেমগুলো ৯৮.২ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলতা অর্জন করেছে যা ঐতিহ্যবাহী সিসমিক নেটওয়ার্কের সাথে তুলনীয়।
তবে সিস্টেমটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিন বছরে মাত্র তিনটি মিথ্যা সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে – দুটি বজ্রপাতের কারণে এবং একটি ব্যাপক বিজ্ঞপ্তির কারণে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে ক্রমাগত মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম উন্নত করা হচ্ছে যাতে শহুরে এলাকার শব্দ এবং কম্পন থেকে প্রকৃত ভূমিকম্প আলাদা করা যায়।
সতর্কবার্তার ধরন
গুগলের সিস্টেম দুই ধরনের সতর্কবার্তা পাঠায়। “BeAware” সতর্কবার্তা হালকা কম্পনের জন্য যা একটি সাধারণ নোটিফিকেশন হিসেবে আসে। অন্যদিকে “TakeAction” সতর্কবার্তা শক্তিশালী কম্পনের জন্য যা ফোনের সম্পূর্ণ স্ক্রিন দখল করে এবং জোরে শব্দ করে মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই দ্বি-স্তরের সতর্কীকরণ পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে মানুষ বিপদের মাত্রা অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে।
ShakeAlert এবং USGS সিস্টেম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) পরিচালিত ShakeAlert সিস্টেম একটি অত্যাধুনিক ভূমিকম্প সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এই সিস্টেম ১,৬৭৫টি সিসমিক সেন্সর ব্যবহার করে ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন এবং ওয়াশিংটন রাজ্যে সেবা প্রদান করে। প্রতিটি সেন্সর জুতার বাক্সের আকারের এবং ভূমিকম্পের P-তরঙ্গ শনাক্ত করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ডেটা কেন্দ্রে তথ্য পাঠায়।
২০১৪ সালের নাপা ভূমিকম্পের সময় ShakeAlert সিস্টেম S-তরঙ্গ পৌঁছানোর ৫ সেকেন্ড আগে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। সান ফ্রান্সিসকো শহর ৮ সেকেন্ড সতর্কবার্তা পেয়েছিল যা মানুষকে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে যথেষ্ট সময় দিয়েছিল। ২০২৪ সালে সিস্টেমটিতে GPS ডেটা যুক্ত করা হয়েছে যা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের চরিত্র আরও ভালোভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
ভূমিকম্প সতর্কবার্তার গুরুত্ব এবং প্রভাব
জীবন রক্ষায় অবদান
ভূমিকম্পের সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পাওয়াও জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে তুরস্কে তীব্রতা ৯ বা তার বেশি এলাকায় প্রতি ৩৮ জনে একজন এবং তীব্রতা ৮ এলাকায় প্রতি ১,০০০ জনে একজন মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। যদি মানুষ ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড আগে সতর্ক হতে পারে, তাহলে তারা টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে পারে, গ্যাস বন্ধ করতে পারে, লিফট থেকে বের হতে পারে বা নিরাপদ খোলা জায়গায় যেতে পারে।
স্মার্টফোন ভিত্তিক সতর্কীকরণ সিস্টেম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেইসব দেশ এবং অঞ্চলের জন্য যেখানে ঐতিহ্যবাহী সিসমিক নেটওয়ার্ক নেই বা সীমিত। অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম ৯৮টি দেশে সেবা প্রদান করে যা মোট সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা ১০ গুণ বৃদ্ধি করে ২.৫ বিলিয়নে পৌঁছেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
স্মার্টফোন ভিত্তিক ভূমিকম্প সনাক্তকরণ প্রযুক্তি ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সিস্টেমগুলো আরও নির্ভুল এবং দ্রুত হয়ে উঠছে। প্রতিটি ভূমিকম্পের পর সিস্টেম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম উন্নত করা হচ্ছে যাতে পরবর্তীতে আরও ভালো সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হয়।
ভবিষ্যতে আরও বেশি দেশ এবং অঞ্চলে এই সেবা সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে হিমালয় পর্বতমালার কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি, সেখানে এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে পারে। স্থানীয় ভাষায় সতর্কবার্তা এবং আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে সিস্টেমকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
ভূমিকম্পের অদৃশ্য সতর্কবাহক: কুনো ব্যাঙের অসাধারণ ক্ষমতা
জরুরি তথ্য এবং প্রস্তুতি
সতর্কবার্তা পেলে করণীয়
ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, “ড্রপ, কভার এবং হোল্ড অন” পদ্ধতি অনুসরণ করুন – মাটিতে শুয়ে পড়ুন, একটি শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন এবং শক্ত করে ধরে রাখুন। যদি আপনি বাইরে থাকেন, তাহলে বিল্ডিং, গাছ এবং বিদ্যুৎ লাইন থেকে দূরে খোলা জায়গায় চলে যান।
যদি আপনি রান্নাঘরে থাকেন, তাহলে গ্যাসের চুলা বন্ধ করার চেষ্টা করুন। লিফটে থাকলে নিকটতম তলায় নেমে যান। গাড়ি চালালে রাস্তার পাশে থামিয়ে দিন কিন্তু সেতু বা ওভারপাসের নিচে নয়। এই সমস্ত পদক্ষেপ মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিতে হবে, তাই আগে থেকে প্রস্তুতি এবং অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা
আপনার স্মার্টফোনে জরুরি যোগাযোগের তালিকা এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করুন যা লক স্ক্রিনেও দেখা যায়। নিকটবর্তী নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের তালিকা জানুন এবং জরুরি সংস্থার নম্বর সেভ করে রাখুন। পরিবারের সদস্যদের সাথে একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং নিয়মিত অনুশীলন করুন। ঘরে জরুরি সরঞ্জাম যেমন টর্চলাইট, প্রাথমিক চিকিৎসা বাক্স, পানি এবং খাবার মজুদ রাখুন।
আপনার ফোনের ব্যাটারি সবসময় চার্জ রাখার চেষ্টা করুন এবং একটি পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখুন। মনে রাখবেন যে ভূমিকম্পের পর টেলিফোন লাইন এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত হতে পারে, তাই অফলাইন ম্যাপ এবং জরুরি তথ্য ডাউনলোড করে রাখুন।
স্মার্টফোন প্রযুক্তি ভূমিকম্প সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে যা বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। আপনার পকেটে থাকা সাধারণ ফোনটি এখন একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সেন্সর এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে প্রাণঘাতী বিপদ থেকে বাঁচার সুযোগ দিতে পারে। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে এই সিস্টেম ৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে কম্পন শুরুর আগেই সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম, যা হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে পারে। সঠিক সেটিংস নিশ্চিত করা, উপযুক্ত অ্যাপ ইনস্টল করা এবং জরুরি পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন থাকার মাধ্যমে আমরা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারি। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি বিশেষত সেইসব অঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ যেখানে ঐতিহ্যবাহী সিসমিক নেটওয়ার্ক সীমিত বা অনুপস্থিত, এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরও উন্নতির সাথে এই সিস্টেম আরও নির্ভুল ও কার্যকর হয়ে উঠবে।











