বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: জেনে নিন ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ নিয়ম ও আইনি অধিকার

বাংলাদেশে বাবার সম্পত্তি বন্টন একটি জটিল এবং সংবেদনশীল বিষয় যা পারিবারিক শান্তি ও আইনি অধিকার উভয়ের সাথে জড়িত। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুসারে, বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই নির্দিষ্ট অংশ…

Riddhi Datta

 

বাংলাদেশে বাবার সম্পত্তি বন্টন একটি জটিল এবং সংবেদনশীল বিষয় যা পারিবারিক শান্তি ও আইনি অধিকার উভয়ের সাথে জড়িত। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুসারে, বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে, যেখানে ছেলেরা ২ ভাগ এবং মেয়েরা ১ ভাগ পায় অর্থাৎ ২:১ অনুপাতে সম্পত্তি বিতরণ হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৭৮% পরিবার ইসলামিক উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করে সম্পত্তি বন্টন করে থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক জ্ঞানের অভাবে মেয়েদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই নিবন্ধে বাবার সম্পত্তি ভাগের সম্পূর্ণ নিয়ম, আইনি ভিত্তি, এবং বিভিন্ন ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

বাবার সম্পত্তি বন্টনের মূল নিয়ম

বাংলাদেশে বাবার সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম মূলত ধর্মীয় আইনের উপর নির্ভরশীল। মুসলিম পরিবারের ক্ষেত্রে হানাফি আইন অনুসরণ করা হয়, যেখানে বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ হয়। মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অনুপাত ২:১ নির্ধারিত আছে, যার অর্থ একজন ছেলে যা পাবে একজন মেয়ে তার অর্ধেক পাবে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি বাবার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৬ লক্ষ টাকা হয় এবং তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি ছেলে পাবে ২ লক্ষ টাকা করে এবং প্রতিটি মেয়ে পাবে ১ লক্ষ টাকা করে। এই বন্টন পদ্ধতি কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে এবং শরিয়া আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম ভিন্ন। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬ এবং দায়ভাগ স্কুল অনুসারে, পুত্র ও কন্যা সমান অধিকার পায়। বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৯% এবং তাদের সম্পত্তি বন্টনে যৌথ পরিবার ব্যবস্থার প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের বিস্তারিত বিধান

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ১৯৬১ অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি তিন শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিতরণ হয়। প্রথম শ্রেণি হচ্ছে শেয়ারার্স (Sharers), যারা নির্দিষ্ট অংশ পায়। দ্বিতীয় শ্রেণি হচ্ছে রেসিজুয়ারিজ (Residuaries), যারা শেয়ারার্সদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি পায়। তৃতীয় শ্রেণি হচ্ছে দূরবর্তী আত্মীয়রা (Distant Kindred), যারা প্রথম দুই শ্রেণি না থাকলে সম্পত্তি পায়।

৭০+ বয়সের বাবার নিরাপদ স্বাস্থ্য: অত্যাবশ্যক মেডিকেল চেকআপ গাইড

স্ত্রীর অংশ

যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে, তাহলে তার স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন। আর যদি সন্তান না থাকে, তাহলে স্ত্রী ১/৪ অংশ পাবেন। স্ত্রীকে কখনো সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না এবং তার অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত।

পুত্র ও কন্যার অংশ

স্ত্রী এবং বাবা-মায়ের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি পুত্র ও কন্যাদের মধ্যে ভাগ হয়। ছেলেদের সাথে মেয়ে থাকলে প্রতিটি মেয়ে প্রতিটি ছেলের অর্ধেক অংশ পাবে। যদি মৃত ব্যক্তির শুধুমাত্র একটি কন্যা থাকে এবং কোনো পুত্র না থাকে, তাহলে সেই কন্যা মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ পাবে। দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে এবং কোনো পুত্র না থাকলে, তারা মোট সম্পত্তির ২/৩ অংশ পাবে।

পিতা-মাতার অংশ

মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা পাবেন ১/৬ অংশ এবং মাতাও পাবেন ১/৬ অংশ। যদি সন্তান না থাকে, তাহলে মাতা পাবেন ১/৩ অংশ। পিতা-মাতাকে কখনো সম্পূর্ণভাবে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বন্টন

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৬ এবং বাংলাদেশে প্রযোজ্য দায়ভাগ স্কুল অনুসারে, বাবার সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম মুসলিম আইনের থেকে ভিন্ন। হিন্দু আইনে পুত্র ও কন্যা সমান অধিকার পায়, যা নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে একটি প্রগতিশীল পদক্ষেপ।

সমান অধিকার নীতি

বাবার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি পুত্র, কন্যা, স্ত্রী এবং মাতার মধ্যে সমান ভাগে বিতরণ হয়। যদি বাবার দুই পুত্র ও দুই কন্যা থাকে, তাহলে চারজনই সম্পত্তির সমান অংশ পাবে। এই ব্যবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্য নেই এবং সকল সন্তান সমান মর্যাদা পায়।

স্ত্রীর অংশ

হিন্দু আইনে বিধবা স্ত্রী একজন পুত্রের সমান অংশ পায়। যদি একাধিক বিধবা থাকে (যেমন পিতা পুনর্বিবাহ করে থাকলে), তাহলে তারা একজন পুত্রের অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। তবে হিন্দু আইনে নারীদের সম্পত্তিতে সীমিত স্বত্ব (Limited Interest) থাকে, যার অর্থ তারা সম্পত্তি ভোগ করতে পারবে কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে পারবে না।

উত্তরাধিকারের ক্রম

হিন্দু আইনে চার ধাপের উত্তরাধিকারী রয়েছে। প্রথম ধাপে রয়েছে পুত্র, কন্যা, বিধবা স্ত্রী। দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে পিতা, মাতা। তৃতীয় ধাপে ভাই-বোন এবং চতুর্থ ধাপে অন্যান্য নিকটাত্মীয়। যদি কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে সম্পত্তি সরকারের কাছে চলে যায়।

সিয়ারাম বাবা: ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত নর্মদা তীরের সাধু

বাবার সম্পত্তি বন্টনে মেয়েদের অধিকার

বাংলাদেশের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে বাবার সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনো অংশ নেই বা খুবই কম। কিন্তু মুসলিম আইন অনুসারে মেয়েরা স্পষ্টভাবে ছেলেদের অর্ধেক অংশ পাওয়ার অধিকারী। এই অধিকার কুরআনে উল্লেখিত এবং কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না।

দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশী মুসলিম নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের পুরুষ সমকক্ষদের অর্ধেক অংশ পায়, তবে বাস্তবে অনেক পরিবারে মেয়েদের তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশে প্রায় ৩২% মানুষ ইসলামিক উত্তরাধিকার আইন মেনে চলে না, যা পারিবারিক বিবাদ ও বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মেয়েদের অংশ থেকে বঞ্চিত করার পরিণতি

মুসলিম আইন অনুসারে, মেয়েদের তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শরিয়া আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। যদি কোনো পরিবার ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে মেয়েরা আইনি পথে তাদের অধিকার দাবি করতে পারে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং নিম্ন আদালতে এ ধরনের মামলা দায়ের করা যায়।

সামাজিক সচেতনতার গুরুত্ব

ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনের সঠিক জ্ঞান না থাকাই মেয়েদের বঞ্চিত করার প্রধান কারণ। একটি জরিপে দেখা গেছে যে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ৮৩% এবং সাক্ষরদের মধ্যে ৮০% ইসলামিক উত্তরাধিকার আইন মেনে চলে, কিন্তু নিরক্ষরদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬৫%। তাই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

ডিজিটাল উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরের ব্যবহার

বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালে একটি অনলাইন উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর চালু করেছে যা uttoradhikar.gov.bd ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। এছাড়াও গুগল প্লে-স্টোরে “উত্তরাধিকার” নামে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে যা দিয়ে খুব সহজেই সম্পত্তি বন্টনের হিসাব করা যায়।

অ্যাপ ব্যবহারের পদ্ধতি

প্রথমে গুগল প্লে-স্টোর থেকে “উত্তরাধিকার” অ্যাপটি ডাউনলোড এবং ইনস্টল করতে হবে। অ্যাপটি খোলার পর মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের তথ্য প্রদান করতে হবে, যেমন কতজন ছেলে, কতজন মেয়ে, স্ত্রী আছে কিনা ইত্যাদি। এরপর মোট সম্পত্তির পরিমাণ টাকা বা জমির শতাংশে লিখতে হবে। “ফলাফল দেখুন” বাটনে ক্লিক করলে প্রতিটি উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হয়ে প্রদর্শিত হবে।

এই ডিজিটাল সমাধান সম্পত্তি বন্টনে জটিলতা কমায় এবং সকল উত্তরাধিকারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। বিশেষত যেসব পরিবারে একাধিক স্ত্রী, অনেক সন্তান বা জটিল পারিবারিক কাঠামো রয়েছে, সেখানে এই ক্যালকুলেটর অত্যন্ত কার্যকর।

ওয়াসিয়ত বা উইলের গুরুত্ব

মুসলিম আইনে একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির ১/৩ অংশ উইলের মাধ্যমে যে কাউকে দিতে পারে, এমনকি যারা উত্তরাধিকারী নয় তাদেরও। এটিকে ওয়াসিয়ত বলা হয়। বাকি ২/৩ অংশ অবশ্যই শরিয়া আইন অনুসারে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

উইল তৈরি করার সময় কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, উইল অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং দুই জন সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, উইল যেকোনো সময় পরিবর্তন বা বাতিল করা যায়। তৃতীয়ত, মৃত্যুর আগের উইলটিই কার্যকর হবে।

হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের সম্পূর্ণ সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারে। The Succession Act, 1925 অনুসারে, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের উইল সংক্রান্ত বিধান পরিচালিত হয়।

সম্পত্তি বন্টনে আইনি প্রক্রিয়া

বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তি বন্টনের জন্য কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করতে হবে যা ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন থেকে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার সনদ বা ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করতে হবে যেখানে মৃত ব্যক্তির সকল আইনি উত্তরাধিকারীর নাম থাকবে।

দলিল রেজিস্ট্রেশন

সম্পত্তি বন্টনের পর বন্টননামা দলিল তৈরি করে রেজিস্ট্রি করাতে হবে। এজন্য উপ-নিবন্ধক অফিসে যেতে হবে এবং নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হবে। দলিলে সকল উত্তরাধিকারীর স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংযুক্ত করতে হবে।

জমিজমা নামজারি

ভূমি অফিসে নামজারি করাতে হবে যাতে ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকদের নাম উঠে। এজন্য তহসিল অফিসে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। নামজারি প্রক্রিয়া সাধারণত ৩০-৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়।

সম্পত্তি বিরোধ এবং সমাধান

সম্পত্তি বন্টন নিয়ে পারিবারিক বিরোধ খুবই সাধারণ ঘটনা। কখনো কখনো কোনো উত্তরাধিকারী তার প্রাপ্য অংশ না পেলে বা অন্যায়ভাবে সম্পত্তি দখল করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা দেওয়ানী আদালতে দায়ের করা হয়।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি

আদালতে মামলা দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই পারিবারিক সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা উত্তম। এক্ষেত্রে পরিবারের সম্মানিত সদস্য বা ধর্মীয় নেতাদের সাহায্য নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ইমাম বা পুরোহিতরা সম্পত্তি বন্টনে সহায়তা করে থাকেন।

আইনি সহায়তা

যদি বিরোধ জটিল হয় বা সমাধান না হয়, তাহলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অধীনে সকল জেলায় আইনি সহায়তা পাওয়া যায়। দরিদ্র এবং অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বাবার জীবদ্দশায় সম্পত্তি বন্টন

অনেক পরিবারে বাবা তার জীবদ্দশায় সম্পত্তি বন্টন করে দেন যা হেবা বা দানপত্র হিসেবে পরিচিত। এটি মৃত্যুর পর বিরোধ এড়াতে একটি কার্যকর উপায়। তবে হেবার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।

হেবা বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। প্রথমত, দাতার দান করার ইচ্ছা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রহীতার গ্রহণ করার সম্মতি থাকতে হবে। তৃতীয়ত, সম্পত্তি দখল হস্তান্তর করতে হবে। হেবা রেজিস্ট্রি করা আবশ্যক নয়, তবে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে রেজিস্ট্রি করা উত্তম।

বাবা যদি সকল সন্তানকে সমান বা ন্যায্য অনুপাতে সম্পত্তি দান করেন, তাহলে তা বৈধ। তবে মুসলিম আইনে পুত্র ও কন্যার অনুপাত ২:১ মেনে চলা উত্তম যদিও জীবদ্দশায় দানের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে প্রযোজ্য নয়।

মুসলিম ও হিন্দু আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বিষয় মুসলিম আইন হিন্দু আইন
পুত্র-কন্যার অনুপাত ২:১ (ছেলে দ্বিগুণ পায়) ১:১ (সমান অধিকার)
স্ত্রীর অংশ সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪ একজন পুত্রের সমান
উইলের সীমা মোট সম্পত্তির ১/৩ সম্পূর্ণ সম্পত্তি
পিতা-মাতার অংশ সন্তান থাকলে প্রত্যেকে ১/৬ পুত্র-কন্যার সমান
নারীর সম্পত্তি স্বত্ব সম্পূর্ণ অধিকার সীমিত স্বত্ব

আধুনিক চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান

বর্তমান যুগে সম্পত্তি বন্টন আরো জটিল হয়ে উঠেছে কারণ সম্পত্তির ধরন বৈচিত্র্যময় হয়েছে। জমিজমা ছাড়াও ব্যাংক একাউন্ট, শেয়ার, বন্ড, ব্যবসায়িক মালিকানা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি ইত্যাদি বন্টন করতে হয়। এক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং হিসাবরক্ষকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রবাসীদের সম্পত্তি বন্টন। অনেক বাংলাদেশী বিদেশে বসবাস করেন এবং তাদের সম্পত্তি বাংলাদেশে রয়েছে। এক্ষেত্রে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বা ভোক্তাপত্রের মাধ্যমে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিয়ে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা করা যায়।

ডিজিটাল সম্পত্তি যেমন অনলাইন একাউন্ট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডোমেইন নেম ইত্যাদিও এখন উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে উঠেছে। এগুলোর বন্টন সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা উইলে উল্লেখ করা উচিত।

সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব

সম্পত্তি বন্টন শুধুমাত্র একটি আইনি বিষয় নয়, এটি একটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বও। ইসলাম ধর্মে ন্যায্য সম্পত্তি বন্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আল্লাহর নির্দেশ। কুরআনে সূরা নিসায় স্পষ্টভাবে উত্তরাধিকার আইন বর্ণিত আছে এবং এটি লঙ্ঘন করা গুনাহের কাজ।

হিন্দু ধর্মেও ধর্মশাস্ত্র অনুসারে সম্পত্তি বন্টন করা পিতা-মাতার কর্তব্য। সনাতন ধর্মে সকল সন্তানের প্রতি সমান মমতা ও অধিকার প্রদান করা পুণ্যের কাজ বলে বিবেচিত। পরিবারে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে ন্যায্য সম্পত্তি বন্টন অপরিহার্য।

পরিবারের সকল সদস্যকে সম্পত্তি বন্টন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে স্বচ্ছতা থাকে এবং কেউ বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে না করে। খোলামেলা আলোচনা এবং পারস্পরিক সম্মান পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত রাখে।

সরকারি উদ্যোগ ও ভূমি সংস্কার

বাংলাদেশ সরকার সম্পত্তি বন্টন সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪ সালে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে যেখানে অনলাইনে জমির রেকর্ড দেখা এবং নামজারি আবেদন করা যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে land.gov.bd গিয়ে এই সেবা নেওয়া সম্ভব।

উত্তরাধিকার সনদ অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে আবেদন করলে দ্রুত সনদ পাওয়া যায়। সরকার ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২১ পাস করেছে যা সম্পত্তি সংক্রান্ত ২২ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করেছে।

নারীর সম্পত্তি অধিকার সুরক্ষায় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। জাতীয় আইনি সহায়তা সংস্থা দরিদ্র নারীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করছে।

বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম সঠিকভাবে বোঝা এবং প্রয়োগ করা পারিবারিক শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম আইনে ২:১ অনুপাত এবং হিন্দু আইনে সমান অধিকার নীতি মেনে চলা ধর্মীয় ও আইনি দায়িত্ব। বর্তমানে ডিজিটাল উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর এবং সরকারি অনলাইন সেবার মাধ্যমে সম্পত্তি বন্টন অনেক সহজ হয়েছে। সমাজে নারীর সম্পত্তি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, ধর্মীয় মূল্যবোধের অনুসরণ এবং আইনি পরামর্শ নিয়ে সম্পত্তি বন্টন করলে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়ানো সম্ভব এবং সকল উত্তরাধিকারী তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন