বাংলা সিনেমার জগতে যখনই পুরস্কারের কথা ওঠে, তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসের সেই চিরচেনা কালো মেয়ের মূর্তি। ২০২৫ সালের ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা আয়োজিত হল গত ১৮ মার্চ, কলকাতার জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলে। এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ‘বহুরূপী’ সিনেমাটি, যেটি একাধিক বিভাগে পুরস্কার জিতে নিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছে। সেরা অভিনেতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার গেছে সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে। কিন্তু এই রাতের গল্প শুধু এখানেই শেষ নয়। এই ব্লগে আমরা জানবো, কীভাবে ‘বহুরূপী’ এবারের ফিল্মফেয়ার বাংলায় ঝড় তুলল, কারা কী পেলেন, আর এই আয়োজন কেন এতটা বিশেষ হয়ে উঠল। তাই চলুন, একটু ডুব দিয়ে আসি এই জমকালো রাতের গল্পে।
২০২৫ সালের ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতিভার এক জমকালো উদযাপন। এবারের আসরে ‘বহুরূপী’ সিনেমাটি ৭টি পুরস্কার জিতে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়ের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবি শুধু সেরা ফিল্মের পুরস্কারই নয়, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ‘ববলি’ ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন। এই রাতে জাতীয় পুরস্কারজয়ী বলিউড অভিনেতা রাজকুমার রাও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, যিনি এই আয়োজনের গ্ল্যামারকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এবারের ফিল্মফেয়ার বাংলা ছিল শুধু পুরস্কারের রাত নয়, বাংলা সিনেমার শিল্পীদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার এক অসাধারণ প্রদর্শনী।
১৮ মার্চ, ২০২৫। কলকাতার জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলে আলো ঝলমলে এক রাতের শুরু হয় ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলার অষ্টম সংস্করণ দিয়ে। এই আয়োজনের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, পূজা ব্যানার্জি এবং রাজ চক্রবর্তী। রাতের শুরুতেই রেড কার্পেটে হাঁটতে দেখা গেল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় তারকাদের। সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, বর্খা বিষ্ট, পূজা ব্যানার্জির মতো তারকারা তাদের নাচের পারফরম্যান্স দিয়ে মঞ্চ মাতিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এই রাতের আসল আকর্ষণ ছিল পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তগুলো।
‘বহুরূপী’ এবার মোট ১৬টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল, যা ছিল এবারের সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৭টি বিভাগে পুরস্কার জিতে এই ছবি প্রমাণ করেছে যে গল্প, অভিনয় এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় কতটা শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে, ‘পদাতিক’ ১৪টি মনোনয়ন পেয়েছিল, আর ‘চালচিত্র: দ্য ফ্রেম ফ্যাটাল’ এবং ‘খাদান’ পেয়েছিল ১২টি করে মনোনয়ন। কিন্তু ‘বহুরূপী’র জয়যাত্রার কাছে অন্য ছবিগুলো একটু পিছিয়ে পড়েছে।
রাতের অন্যতম হাইলাইট ছিল শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয়। ‘বহুরূপী’তে তার অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল, আর সেই কৃতিত্বের স্বীকৃতি এসেছে এই পুরস্কারের মাধ্যমে। একইভাবে, সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ‘ববলি’ ছবিতে তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া, সেরা গায়ক হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন ননীচোরা দাস বাউল এবং বনি চক্রবর্তী, ‘শিমুল পলাশ’ গানের জন্য।
‘বহুরূপী’ ছবিটি শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আবেগের প্রকাশ। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়ের যৌথ পরিচালনায় এই ছবি দর্শকদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। গল্পের গভীরতা, চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থাপনা এবং দারুণ সংগীত—সব মিলিয়ে ‘বহুরূপী’ হয়ে উঠেছে একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ। এই ছবি সেরা ফিল্ম, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা সহ মোট ৭টি পুরস্কার জিতেছে।
ছবিটির সাফল্যের পিছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী টিম। শিবপ্রসাদের অভিনয় ছাড়াও, পরিচালনায় নন্দিতা রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। এই জুটি আগেও বাংলা সিনেমায় অনেক হিট ছবি উপহার দিয়েছেন, আর ‘বহুরূপী’ তাদের সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই ছবির গল্প এমন একটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। তাই দর্শকরা এটিকে এতটা ভালোবেসেছেন।
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলা সিনেমার একটি পরিচিত নাম। তিনি শুধু একজন অভিনেতাই নন, একজন সফল পরিচালক এবং প্রযোজকও। ‘বহুরূপী’তে তার অভিনয় ছিল এতটাই স্বাভাবিক এবং গভীর যে, দর্শকরা তার চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তার অভিনয়ে ছিল আবেগ, শক্তি এবং একটি অদ্ভুত সরলতা, যা তাকে এই পুরস্কারের যোগ্য করে তুলেছে।
তিনি এই রাতে শুধু সেরা অভিনেতার পুরস্কারই জেতেননি, পরিচালক হিসেবেও নন্দিতা রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন। এই দ্বৈত সাফল্য তার বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ। শিবপ্রসাদের এই জয় বাংলা সিনেমার ভক্তদের কাছে একটি উদযাপনের মুহূর্ত।
সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সিনেমার একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘ববলি’ ছবিতে তার অভিনয় ছিল এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন থাকবে। এই ছবিতে তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তা ছিল জটিল এবং আবেগপূর্ণ। তার স্বাভাবিক অভিনয় দক্ষতা এবং মঞ্চে উপস্থিতি তাকে এই পুরস্কারের জন্য নিখুঁত পছন্দ করে তুলেছে।
সুভাষ্রী এই রাতে শুধু পুরস্কারই জেতেননি, মঞ্চে তার নাচের পারফরম্যান্স দিয়েও দর্শকদের মাতিয়ে তুলেছিলেন। তার এই জয় প্রমাণ করে যে, তিনি বাংলা সিনেমার একজন শক্তিশালী অভিনেত্রী, যিনি প্রতিটি চরিত্রে নিজের সেরাটা দিতে পারেন।
‘বহুরূপী’র জয়ের পাশাপাশি আরও অনেকে এই রাতে তাদের কাজের জন্য সম্মানিত হয়েছেন। চলুন দেখে নিই কারা কী পেয়েছেন:
এছাড়াও, প্রযুক্তিগত বিভাগে ‘বহুরূপী’র টিম আরও কয়েকটি পুরস্কার জিতেছে, যেমন সেরা সিনেমাটোগ্রাফি এবং সেরা প্রোডাকশন ডিজাইন। এই তালিকা দেখেই বোঝা যায়, এবারের ফিল্মফেয়ার বাংলা কতটা বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছিল।
ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা শুধু একটি পুরস্কারের আয়োজন নয়, এটি বাংলা সিনেমার শিল্পীদের জন্য একটি স্বপ্নের মঞ্চ। এই আয়োজন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রতিভা এবং সৃজনশীলতাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে। প্রতি বছর এই মঞ্চে যারা পুরস্কৃত হন, তারা শুধু সম্মানই পান না, তাদের কাজের জন্য একটি স্বীকৃতি পান, যা তাদের আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে।
এবারের আয়োজনে ‘বহুরূপী’র এত বড় জয় দেখায় যে, বাংলা সিনেমা এখন গল্প বলার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। এই পুরস্কারগুলো শিল্পীদের কাছে একটি প্রেরণা, যা তাদের আরও নতুন এবং সৃজনশীল কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা ২০২৫ ছিল বাংলা সিনেমার একটি অবিস্মরণীয় রাত। ‘বহুরূপী’র ঝুলিতে ৭টি পুরস্কার, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেরা অভিনেতা এবং সুভাষ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার—এই সবকিছুই এই রাতকে বিশেষ করে তুলেছে। এই আয়োজন শুধু পুরস্কার বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বাংলা সিনেমার শক্তি, সৌন্দর্য এবং সম্ভাবনার একটি উৎসব।
আপনি কি এই রাতের কোনো মুহূর্ত দেখেছেন? কিংবা আপনার প্রিয় তারকা কে পুরস্কার পেয়েছেন, সেটা নিয়ে কী ভাবছেন? আমাদের সঙ্গে আপনার মতামত শেয়ার করুন। আর বাংলা সিনেমার এই জয়যাত্রা যেন এভাবেই এগিয়ে যায়, এই কামনা করি। ফিল্মফেয়ার বাংলা আমাদের গর্ব, আমাদের উৎসব—এটি আরও অনেক দিন আমাদের মনে থাকবে।