প্রলয়ংকরী বন্যা মুছে দিল ভারত-পাক সীমান্ত! ৩০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে তছনছ, অরক্ষিত রইল চেকপোস্ট

রবি নদীর ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে গেছে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রকৃতির এই তাণ্ডবে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া। জলের তলায় তলিয়ে গেছে ৯০টিরও বেশি…

Srijita Ghosh

 

রবি নদীর ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে গেছে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রকৃতির এই তাণ্ডবে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া। জলের তলায় তলিয়ে গেছে ৯০টিরও বেশি বিএসএফ চৌকি। গত কয়েক দিনে পাঞ্জাবের গুরদাসপুর, অমৃতসর ও পাঠানকোটের মতো সীমান্ত জেলাগুলিতে এমন ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে, যা গত ৩৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বলে চিহ্নিত হয়েছে। এর ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, যার সুযোগ নিতে চেষ্টা করছে মাদক পাচারকারীরা।

বিএসএফের পাঞ্জাব ফ্রন্টিয়ারের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল একে বিদার্থী জানিয়েছেন, “শুধুমাত্র গুরদাসপুরেই আমাদের ৩০ থেকে ৪০টি সীমান্ত চৌকি জলমগ্ন হয়ে গেছে। তবে সময়মতো সব জওয়ান ও সরঞ্জাম নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।” তিনি আরো জানান, গুরদাসপুর, অমৃতসর ও ফিরোজপুর সেক্টরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেড়া ভেসে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিখ্যাত করতারপুর সাহিব করিডোরের কাছের বিএসএফ পোস্টও জলমগ্ন হয়ে গেছে। নিরাপত্তারক্ষীরা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ডেরা বাবা নানকের গুরুদ্বারা দরবার সাহিবে। আধিকারিক সূত্রে জানা গেছে, এমনকি পাকিস্তানি রেঞ্জার্সরাও তাদের সীমান্তবর্তী চৌকিগুলি খালি করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

গুরদাসপুর ড্রেনেজ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রবি নদীর ২৮টিরও বেশি বাঁধ ভেঙে গেছে। অমৃতসরে ১২টি বাঁধ ভেঙেছে, আর পাঠানকোটে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সম্পূর্ণ বাঁধ ভেসে গেছে। ডেরা বাবা নানকের কাছে প্রায় ৫০০ মিটার কাঁটাতারের বেড়া উপড়ে গিয়েছে।

বন্যা-পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে এই তথ্য থেকে যে, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ৩৮ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৮ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। রবি, শতদ্রু ও চন্দ্রভাগা নদী অভূতপূর্ব জলস্তরে পৌঁছেছে, যার ফলে ১,৪০০টিরও বেশি গ্রাম তলিয়ে গেছে।

ভারতেও পরিস্থিতি কম গুরুতর নয়। পাঞ্জাবের ১,৪০০টি গ্রামে বন্যার জল ঢুকেছে এবং ৩.৫ লাখ বাসিন্দা প্রভাবিত হয়েছে। ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৫ একর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ১৯৮৮ সালের পর পাঞ্জাবের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।

অপরাধীদের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে বিএসএফ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, মাদক পাচারকারীরা এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সতর্ক বিএসএফ জওয়ানরা তাদের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। একজন অনুপ্রবেশকারীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে যে এই পরিস্থিতির অপব্যবহার করার চেষ্টা করছিল।

বিএসএফের একাধিক চৌকি খালি থাকার কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ করতে বাহিনী বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। ড্রোন নজরদারি, বড় সার্চলাইট, নৌকায় টহল এবং ইলেকট্রনিক মনিটরিং ব্যবহার করে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। রাতের বেলায় নাইট ভিশন ডিভাইস ব্যবহার করে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে, যাতে কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে।

এই বন্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে। গত এপ্রিল মাসে পাহালগাম সন্ত্রাসবাদী হমলার পর ভারত সরকার সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, মানবিক বিবেচনায় ভারত পাকিস্তানকে কূটনৈতিক মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস পাঠাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রন্ধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, “আমরা ইসলামাবাদে আমাদের হাই কমিশনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে বন্যার তথ্য ভাগাভাগি করছি। এটি মানবিক বিবেচনায় করা হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বন্যার অন্যতম কারণ হলো অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। হিমাচল প্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের উজানে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে পং, ভাকরা এবং রঞ্জিত সাগর বাঁধগুলি থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়তে হয়েছে। এর ফলে ভাটির এলাকায় বন্যার মাত্রা আরও বেড়েছে।

করতারপুর করিডোরেও বন্যার প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। এই ঐতিহাসিক গুরুদ্বারা কমপ্লেক্সে ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত জল ঢুকেছে, যার ফলে ১৫০ জন শিখ যাত্রী ও কর্মকর্তা আটকা পড়েছিলেন। তাদের হেলিকপ্টার ও নৌকার মাধ্যমে উদ্ধার করতে হয়েছে। পাকিস্তানের সেনা প্রধান আসিম মুনির এলাকা পরিদর্শন করে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন।

বন্যার অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। পাকিস্তানে ধান, ইক্ষু, ভুট্টা, সবজি ও তুলার বিস্তীর্ণ আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। রপ্তানিকারকরা সতর্ক করেছেন যে, এর ফলে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং টেক্সটাইল খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে, যা পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি।

বিএসএফ সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যে ভাঙা বেড়া মেরামত করা হবে। তবে ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, বড় ভাঙনগুলো পূরণ করতেই চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগবে। সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ আরও বেশি সময়ের ব্যাপার।

এদিকে, উদ্ধার ও ত্রাণকাজ অব্যাহত রয়েছে। বিএসএফ এ পর্যন্ত ১,২০০-এর বেশি গ্রামবাসীকে উদ্ধার করেছে। তারা ভারতীয় বিমানবাহিনী ও এনডিআরএফের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। ফিরোজপুরে ১,৫০০ জন এবং আবোহারে ১,০০০-এর বেশি গ্রামবাসী ও তাদের গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। মেডিকেল ও ভেটেরিনারি ক্যাম্প চালু করা হয়েছে রোগব্যাধি প্রতিরোধের জন্য।

আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিন নতুন বৃষ্টি না হলে জলস্তর কমে আসবে। তবে নিম্নভূমি এলাকাগুলি আরও কিছুদিন জলমগ্ন থাকবে। ড্রেনেজ আধিকারিকরা আশাবাদী যে অবস্থার উন্নতি হবে।

এই ঘটনা পুনরায় প্রমাণ করল যে, প্রকৃতির কাছে মানুষের তৈরি সীমানা কতটা অসহায়। দশকের পর দশক ধরে যে বেড়া ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজন রেখা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল, বন্যার জল তাকে মিনিটের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুই দেশের মানুষের কষ্ট একই – সীমানা মুছে গেলেও মানবিকতার বন্ধন অটুট রইল।

About Author
আরও পড়ুন