গঙ্গাসাগর মেলা ২০২৬: আকাশে ড্রোন, জলে ‘ওয়াটার ড্রোন’! নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রেকর্ড পুণ্যার্থীদের স্বাগত

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সাগর দ্বীপে আগামী ১০ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হতে চলেছে গঙ্গাসাগর মেলা, যেখানে এবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। গঙ্গা ও…

Srijita Chattopadhay

 

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সাগর দ্বীপে আগামী ১০ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হতে চলেছে গঙ্গাসাগর মেলা, যেখানে এবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের সংগমস্থলে মকর সংক্রান্তির পবিত্র স্নানের জন্য এবার রেকর্ড সংখ্যক পুণ্যার্থীদের আগমন প্রত্যাশিত, কারণ চলতি বছর কুম্ভ মেলা না থাকায় সাগরতটে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন। এই বিপুল জনপ্লাবন সামাল দিতে এবং তীর্থযাত্রীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক ওয়াটার রেসকিউ ড্রোন, আকাশে এরিয়াল নজরদারি, ১২০০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা বিশেষ ফগ লাইট এবং ইসরোর প্রযুক্তি সহায়তা।

ওয়াটার ড্রোন: জলে উদ্ধারের নতুন বিপ্লব

গঙ্গাসাগর মেলার ইতিহাসে প্রথমবার ব্যবহার করা হচ্ছে রিমোট-কন্ট্রোল্ড লাইফবয় ওয়াটার ড্রোন, যা জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সংযোজন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের জেলাশাসক অরবিন্দ কুমার মীনা জানিয়েছেন, এই ড্রোন জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেমের সাহায্যে দ্রুত বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং উদ্ধার কাজে সহায়তা করে। ওয়াটার ড্রোনের রেঞ্জ প্রায় ১ কিলোমিটার এবং এটি জলের মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৭ মিটার গতিবেগে ছুটতে পারে, যা একজন অলিম্পিক সাঁতারুর তিনগুণ বেশি গতিসম্পন্ন।

ওয়াটার ড্রোনের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

এই অত্যাধুনিক উদ্ধার যন্ত্রটি উচ্চ-ঘনত্বের এলএলডিপিই পলিমার দিয়ে তৈরি, যা পাথুরে তীর বা ধ্বংসাবশেষের বিরুদ্ধে প্রায় অবিনাশী। ড্রোনটির বহন ক্ষমতাও অসাধারণ—এটি জলে প্রায় ১০০০ কেজি (এক টন) ওজন টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে, যার ফলে এটি একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে বা সম্পূর্ণ লাইফ রাফট উদ্ধার করতে সক্ষম। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে যদি এটি উল্টেও যায়, তবে মাত্র ২ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় সোজা হয়ে কাজের উপযোগী হতে পারে।

গঙ্গাসাগর মেলা বনাম কুম্ভ মেলা: ভিড়ের মিটারে কে এগিয়ে?

ড্রোনের রিমোট কন্ট্রোলারে রয়েছে একটি এইচডি স্ক্রিন, যার মাধ্যমে ১০৮০ পিক্সেলের রিয়েল-টাইম ভিডিও ফিড দেখা যায়। এর ফলে উদ্ধারকারী দল অনেক দূর থেকেই জলের ভিতরের পরিস্থিতি দেখতে পাবেন এবং সঠিকভাবে নেভিগেট করতে পারবেন। ড্রোনটিতে রয়েছে ইন্টেলিজেন্ট জিপিএস অটো-রিটার্ন সিস্টেম, যার ফলে ব্যাটারি ১৫ শতাংশের নীচে নামলে বা সিগন্যাল হারিয়ে গেলে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার লঞ্চ পয়েন্টে ফিরে আসতে পারে। ড্রোনের চারপাশে আবদ্ধ প্রপেলার থাকায় বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিরা আঘাতের ভয় ছাড়াই এটি ধরতে পারবেন।

আকাশে ড্রোন নজরদারি এবং সিসিটিভি নেটওয়ার্ক

মেলা প্রাঙ্গণে এরিয়াল সার্ভিল্যান্সের জন্য মোতায়েন করা হবে ২০টি উন্নত ড্রোন, যার মধ্যে থাকবে থার্মাল ইমেজিং এবং নাইট-ভিশন ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন। এই ড্রোনগুলি সম্পূর্ণ মেলা এলাকা এবং মুড়িগঙ্গা নদীর উপর দিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করবে এবং ভিড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে। লট নং ৮ থেকে মেলা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত প্রায় ১২০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা নির্ভুল ভিড়ের ঘনত্ব ডেটা প্রদান করবে। এই ক্যামেরাগুলি বাবুঘাট, লক গেট এবং মেলা প্রাঙ্গণের প্রতিটি কোণে স্থাপিত, যা ২৪/৭ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

সাগর মেগা কন্ট্রোল রুম থেকে সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ৬২টি মনিটর রয়েছে যা লাইভ ভিডিও ফিডের মাধ্যমে রাউন্ড-দ্য-ক্লক নজরদারি বজায় রাখছে। জেলাশাসক নিজে কন্ট্রোল রুম থেকে অপারেশন তদারকি করছেন। এই সিস্টেম নিশ্চিত করবে যে ঘন কুয়াশার পরিস্থিতিতেও জাহাজ এবং বার্জগুলি দিক হারাবে না।

অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ফগ লাইট এবং আলো ব্যবস্থা

গঙ্গাসাগর মেলায় কুয়াশা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষত রাতের সময়ে এবং ভোরবেলায় যখন হাজার হাজার পুণ্যার্থী পবিত্র স্নানের জন্য সাগরতটে যান। এই সমস্যা মোকাবিলায় ২০২৬ সালের মেলায় অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা বিশেষায়িত অ্যান্টি-ফগ লাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। মোট পাঁচ ধরনের বিশেষায়িত আলো ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ফগ লাইট, লেজার লাইট এবং ইলেকট্রিক টাওয়ারে প্রায় ৬০০টি ফগ লাইট।

মুড়িগঙ্গা নদী চ্যানেলে পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন নিগম দ্বারা ফগ লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং টাওয়ারগুলিকে আলোকিত করছে পশ্চিমবঙ্গ স্টেট ইলেকট্রিসিটি ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড। লট ৮ থেকে কচুবেড়িয়া পর্যন্ত মুড়িগঙ্গা নদীর প্রসারিত অংশে হাই-ইনটেনসিটি লাইট স্থাপন করা হয়েছে, যা ঘন কুয়াশার মধ্যেও দৃশ্যমানতা এবং ভিড় সুরক্ষা উন্নত করবে। বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ দ্বারা অতিরিক্ত ফগ লাইট বসানো হচ্ছে।

ইসরোর প্রযুক্তি সহায়তা এবং ট্রান্সপোর্ট ট্র্যাকিং সিস্টেম

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৬ গঙ্গাসাগর মেলার জন্য ইসরো (ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা)-র প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছে। পুণ্যার্থীরা যে সব ভেসেল এবং বার্জে চেপে মুড়িগঙ্গা পারাপার করবেন, তাতে ইসরোর আবিষ্কৃত বিশেষ ডিভাইস বসানো থাকবে। পিলগ্রিম ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (পিটিএমএস) এলাকায় চলমান সমস্ত বাস, অ্যাম্বুলেন্স, জাহাজ, বার্জ এবং লঞ্চের লাইভ লোকেশন ট্র্যাক করবে।

যদি কোনও জলবাহী পরিবহন তার নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে অ্যালার্ট তৈরি হবে এবং অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেলায় ফেরি সেবার জন্য মোট ২১টি জেটি চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি স্থায়ী জেটি রয়েছে লট নং ৮ এবং নামখানায়, এবং ১১টি অস্থায়ী জেটি। নদী পরিবহন বহরে রয়েছে ১৩টি বার্জ, ৪৫টি জাহাজ এবং ১০০টি কাঠের লঞ্চ। পুণ্যার্থীদের গতিবিধি সহজ করতে সাগরে একটি নতুন বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনী এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া দল

মেলায় প্রায় ১৫,০০০ পুলিশ অফিসার এবং ২,৫০০ সিভিল ডিফেন্স স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হবে, যারা “মৃদু উপস্থিতি” এবং সেবা-কেন্দ্রিক পদ্ধতিতে ভিড় পরিচালনা করবেন। দুর্যোগ প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রায় ২,৫০০ সিভিল ডিফেন্স স্বেচ্ছাসেবক, কুইক রেসপন্স টিম, ডিপ ডাইভার, ভারতীয় নৌবাহিনী, এসডিআরএফ, এনডিআরএফ এবং কোস্ট গার্ড মোতায়েন থাকবে। চিকিৎসা জরুরি অবস্থার জন্য বায়ু এবং জল অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।

ভিড়ের উপর নজর রাখতে বসানো হচ্ছে ৩১টি ওয়াচ টাওয়ার এবং মোটরসাইকেল টহল, ড্রপ গেট, প্লেইনক্লোথড পার্সোনেল, অ্যান্টি-ক্রাইম টিম এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া মোবাইল ইউনিট মোতায়েন করা হবে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ধাতব এবং অস্থায়ী ব্যারিকেড স্থাপন করা হচ্ছে, পাশাপাশি প্রধান রাস্তা, মেলা পয়েন্ট এবং পুণ্যার্থী সুবিধার সাথে দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে।

কিউআর-কোডেড রিস্টব্যান্ড এবং ডিজিটাল সুরক্ষা

লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে প্রিয়জনদের হারিয়ে যাওয়ার উদ্বেগ দূর করতে, ২০২৬ মেলায় উন্নত ডিজিটাল সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হচ্ছে। দুর্বল গোষ্ঠী, যার মধ্যে শিশু এবং বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্করা রয়েছে, তারা কিউআর-কোডেড রিস্টব্যান্ড পাবেন। কর্মকর্তা বা স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা দ্রুত স্ক্যান করা হলে তাৎক্ষণিক সনাক্তকরণ এবং পরিবারের সাথে পুনর্মিলন সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যে কোনও পুণ্যার্থী বিচ্ছিন্ন হলে দ্রুত তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।

বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা

নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মেলা প্রাঙ্গণ এবং সংলগ্ন এলাকায় তৈরি করা হচ্ছে ২২০টি সাবস্টেশন। পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য থাকছে পর্যাপ্ত শৌচাগার, পানীয় জল সরবরাহ এবং স্যানিটেশন সুবিধা। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের টিম, পরিচ্ছন্নতা দল এবং কুইক রেসপন্স টিম চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করবে। চিকিৎসা সুবিধা শক্তিশালী করা হয়েছে, যেখানে মেডিকেল ক্যাম্প এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা উপলব্ধ থাকবে।

পরিবেশ বান্ধব উদ্যোগ এবং অতিরিক্ত সুবিধা

২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নয়, বরং পরিবেশ বান্ধবও। মেলায় ইকো-ফ্রেন্ডলি স্যানিটেশন ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে এবং প্লাস্টিক মুক্ত মেলা নিশ্চিত করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য অতিরিক্ত যাত্রীনিবাস এবং বাফার জোন তৈরি করা হচ্ছে। মেলায় ডিজিটাল বুকিং কাউন্টার, এটিএম সুবিধা এবং Wi-Fi জোন স্থাপন করা হয়েছে। আটটি অবস্থানে শক্তিশালী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে ওয়াই-ফাই জোন তৈরি করা হচ্ছে।

Kumbh Mela 2025: ইতিহাস, তাৎপর্য এবং আসন্ন কুম্ভ মেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

গঙ্গাসাগর মেলা ২০২৬: মূল পরিসংখ্যান

সুবিধা সংখ্যা/বিবরণ
সিসিটিভি ক্যামেরা ১,২০০+
এরিয়াল ড্রোন ২০টি
ওয়াটার রেসকিউ ড্রোন জিপিএস-সক্ষম, ১ কিমি রেঞ্জ, ৭ মি/সেকেন্ড গতি
পুলিশ অফিসার ১৫,০০০
সিভিল ডিফেন্স স্বেচ্ছাসেবক ২,৫০০
ওয়াচ টাওয়ার ৩১টি
ইলেকট্রিক টাওয়ার লাইট ৬০০টি
ফেরি জেটি ২১টি (১০ স্থায়ী + ১১ অস্থায়ী)
জাহাজ ও বার্জ ১৩ বার্জ, ৪৫ জাহাজ, ১০০ লঞ্চ
সাবস্টেশন ২২০টি
মেলার তারিখ ১০-১৭ জানুয়ারি ২০২৬
মকর সংক্রান্তি স্নান ১৪-১৫ জানুয়ারি ২০২৬

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: সাগর দ্বীপ সেতু

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাগর দ্বীপ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই সেতু ভবিষ্যতে গঙ্গাসাগর মেলায় পুণ্যার্থীদের যাতায়াত আরও সহজ করে তুলবে এবং সাগর দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করবে। এই মেগা প্রজেক্ট সম্পূর্ণ হলে মেলায় পুণ্যার্থীদের আগমন আরও নিরাপদ এবং সুবিধাজনক হবে।

মেলায় প্রত্যাশিত জনসংখ্যা এবং তাৎপর্য

২০২৫ সালে গঙ্গাসাগর মেলায় ৫০ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী এসেছিলেন এবং ২০২৬ সালে সংখ্যাটি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি বছর কুম্ভ মেলা না থাকায় সাগরতটে রেকর্ড সংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হতে পারে বলে মনে করছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন। গঙ্গা এবং বঙ্গোপসাগরের সংগমস্থলে মকর সংক্রান্তির দিন পবিত্র স্নান করলে পাপমুক্তি এবং মোক্ষ লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই পবিত্র তীর্থে আসেন।

“সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার”—এই ঐতিহ্যবাহী মন্ত্রকে সামনে রেখে প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হলো পুণ্যার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সুব্যবস্থিত মেলা উপহার দেওয়া। এবারের গঙ্গাসাগর মেলা প্রযুক্তি এবং ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক মান

ওয়াটার ড্রোন প্রযুক্তি অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ইতিমধ্যে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে এটি হাঙর সনাক্ত করতে এবং সাঁতারুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়। গঙ্গাসাগর মেলায় এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উন্নত প্রযুক্তি জরুরি অবস্থায় প্রতিক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে এবং জীবন রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর হবে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাশাসক অরবিন্দ কুমার মীনা বলেছেন, “বিশাল জনসমাগম প্রত্যাশিত, পুণ্যার্থীরা চার থেকে পাঁচটি ঘাটে পবিত্র স্নান করবেন। যেকোনো দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে, উদ্ধার কাজের জন্য ওয়াটার ড্রোন মোতায়েন করা হবে।” সুন্দরবন পুলিশ জেলা সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডক্টর কোটেশ্বর রাও জানিয়েছেন যে পুণ্যার্থীদের গতিবিধি সহজতর করার জন্য সাগরে একটি নতুন বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে।

প্রশাসন নিশ্চিত করতে চায় যে ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সমাবেশই নয়, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সেবা-কেন্দ্রিক পরিচালনার একটি নিদর্শন হবে। “ম্যান ম্যানেজমেন্ট” বা ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না প্রশাসন। প্রযুক্তি এবং পরিকল্পনার সমন্বয়ে পুণ্যার্থীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন স্নান নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।

২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলা ভারতের ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের এক নতুন অধ্যায় চিহ্নিত করছে। ওয়াটার রেসকিউ ড্রোন, এরিয়াল সার্ভিল্যান্স, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ফগ লাইট, ইসরোর প্রযুক্তি সহায়তা এবং হাজারেরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা সহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে যে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী নিরাপদে এবং আরামদায়কভাবে তাদের পবিত্র স্নান সম্পন্ন করতে পারবেন। এই সমস্ত উদ্যোগ প্রমাণ করে যে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতা একসাথে চলতে পারে, এবং প্রযুক্তি মানুষের সেবায় কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলা শুধুমাত্র ভারতে নয়, বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সমাবেশের জন্য একটি মান নির্ধারণ করবে। “সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার” এই পবিত্র যাত্রা এখন আরও নিরাপদ, আরও সুরক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত।

About Author
Srijita Chattopadhay

সৃজিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি তার লেখা দ্বারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি তুলে ধরতে সদা উদ্যমী। সৃজিতার লেখার ধারা মূলত সাহিত্য, সমাজ এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে ঘিরে আবর্তিত হয়, যেখানে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেন। তাঁর নিবন্ধ ও প্রতিবেদনগুলি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা তার বস্তুনিষ্ঠতা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় বহন করে। সৃজিতা তার কর্মজীবনে ক্রমাগত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর, যা তাকে বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন