বাজারে যখন ১ ভরি সোনার দাম ২০ টাকা, তখন তিনি এক গানে নিতেন ৩০০০ টাকা! কে এই গওহর জান?

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে মহিলাদের প্রকাশ্যে গান গাওয়া বা মঞ্চে পারফর্ম করা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, তখন এক নারী একাই এই প্রথাগত ধারণার মূলে কুঠারাঘাত…

Sangita Chowdhury

 

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে মহিলাদের প্রকাশ্যে গান গাওয়া বা মঞ্চে পারফর্ম করা ছিল প্রায় অকল্পনীয়, তখন এক নারী একাই এই প্রথাগত ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি গওহর জান। তাঁর কণ্ঠস্বর শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুগ্ধই করেনি, বরং ভারতের সঙ্গীত শিল্পে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিল। ভাবুন, এমন এক সময় যখন বাজারে এক ভরি সোনার দাম মাত্র ২০ টাকা, তখন তিনি একটি মাত্র গান গাওয়ার জন্য পারিশ্রমিক নিতেন ৩,০০০ টাকা! হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। আজকের হিসাবে যা প্রায় ১৫০ ভরি সোনার সমতুল্য। এই অবিশ্বাস্য পারিশ্রমিকই প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ‘সুপারস্টার’। তাঁর প্রতিটি রেকর্ডের শেষে সেই সিগনেচার ঘোষণা, “মাই নেম ইজ গওহর জান!”, আজও ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তি হয়ে আছে।

এই নিবন্ধে, আমরা সেই অসামান্যা নারী, গওহর জানের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় উন্মোচন করব। তাঁর শৈশবের সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ, তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপন, সঙ্গীতে তাঁর যুগান্তকারী অবদান এবং তাঁর জীবনের করুণ পরিনতি—সবকিছুই আমরা বিস্তারিতভাবে জানব। আমরা দেখব কীভাবে তিনি সামাজিক বাধা-বিপত্তিকে তুচ্ছ করে একাই একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন এবং ভারতীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

গওহর জান: এক তারকার উত্থান

গওহর জানের জীবন কাহিনী যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। তাঁর উত্থানের গল্প বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে তাঁর পারিবারিক পটভূমিতে, যা ছিল এক জটিল এবং নাটকীয় অধ্যায়ে পূর্ণ।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: অ্যাঞ্জেলিনা থেকে গওহর

গওহর জানের জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৬ জুন, উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে। তাঁর জন্মগত নাম ছিল অ্যাঞ্জেলিনা ইওওয়ার্ড (Angelina Yeoward)। তাঁর বাবা, উইলিয়াম রবার্ট ইওওয়ার্ড, ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান ইহুদি ইঞ্জিনিয়ার এবং মা, ভিক্টোরিয়া হেমিংস, ছিলেন একজন ভারতীয়, যিনি সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। ভিক্টোরিয়ার মা অর্থাৎ গওহরের দিদিমা ছিলেন সম্ভবত ব্রিটিশ।

গওহরের শৈশব সুখের ছিল না। তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যেকার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে এবং ১৮৭৯ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এটি সেই সময়ের সমাজে একটি বড় ঘটনা ছিল। স্বামী পরিত্যক্তা ভিক্টোরিয়া, শিশু অ্যাঞ্জেলিনাকে নিয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। Google Arts & Culture-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, এই বিবাহবিচ্ছেদের পর ভিক্টোরিয়া এবং অ্যাঞ্জেলিনা প্রথমে বেনারসে (বারাণসী) চলে আসেন। সেখানেই তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

বেনারসে এসে ভিক্টোরিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় ‘বড়ি মালকা জান’। তাঁর কন্যা অ্যাঞ্জেলিনার নাম হয় ‘গওহর জান’। বড়ি মালকা জান নিজেও একজন প্রতিভাময়ী গায়িকা, কত্থক নৃত্যশিল্পী এবং কবি ছিলেন। তিনি বেনারসের অভিজাত মহলে ‘বাইজি’ বা ‘কোর্ট সিঙ্গার’ হিসেবে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। এই ‘বাইজি’ সংস্কৃতিকে প্রায়শই ভুল বোঝা হয়, কিন্তু আদতে তাঁরা ছিলেন উচ্চ প্রশিক্ষিত শিল্পী, যাঁরা সঙ্গীত, নৃত্য এবং সাহিত্যের ধারক ও বাহক ছিলেন।

সঙ্গীতের প্রাঙ্গনে প্রবেশ ও তালিম

মা বড়ি মালকা জানের তত্ত্বাবধানেই গওহরের শৈল্পিক জীবনের সূচনা হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর কন্যার মধ্যে এক অসামান্য প্রতিভা লুকিয়ে আছে। তাই তিনি গওহরের জন্য সেরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

  • সঙ্গীত শিক্ষা: গওহর জান বেনারসের কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞদের কাছে তালিম নেন। তিনি ওস্তাদ কালে খান (পাতিয়ালা ঘরানা), ওস্তাদ ওয়াজির খান (রামপুর ঘরানা) এবং ওস্তাদ আল্লু খান (লখনউ ঘরানা)-এর মতো গুরুদের কাছে খেয়াল, ধ্রুপদ এবং ঠুমরির শিক্ষা লাভ করেন।
  • নৃত্য শিক্ষা: তিনি বিখ্যাত কত্থক গুরু বৃন্দাদিন মহারাজের (কত্থক সম্রাট পণ্ডিত বিরজু মহারাজের দাদু) কাছে কত্থক নৃত্যের তালিম নেন।
  • অন্যান্য শৈলী: শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতই নয়, তিনি দাদরা, কাজরি, চৈতি, হোরি, ভজন এবং গজল গায়িতেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

১৮৮৭ সালে, গওহর জানের পরিবার বেনারস থেকে কলকাতায় (তৎকালীন কলকাতা) চলে আসে, যা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং প্রাচ্যের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কলকাতার এই ঐতিহাসিক পরিমণ্ডল গওহরের প্রতিভাকে বিকশিত হওয়ার জন্য এক নতুন মঞ্চ প্রদান করে।

১৮৮৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে, গওহর জান বিহারের দ্বারভাঙার মহারাজার রাজদরবারে প্রথম জনসমক্ষে পারফর্ম করেন। তাঁর এই প্রথম পরিবেশনাই সঙ্গীত জগতের দিকপালদের মুগ্ধ করে এবং তিনি দ্বারভাঙা রাজদরবারের ‘কোর্ট মিউজিশিয়ান’ বা সভাগায়িকা হিসেবে নিযুক্ত হন। এটিই ছিল তাঁর পেশাদার জীবনের আনুষ্ঠানিক শুরু।

ভারতীয় সঙ্গীতের প্রথম ‘রেকর্ডিং সুপারস্টার’

গওহর জানের জীবনের সবচেয়ে যুগান্তকারী অধ্যায়টি শুরু হয় ১৯০২ সালে, কলকাতায়। এটি এমন একটি ঘটনা যা কেবল গওহরের জীবনই নয়, সমগ্র ভারতীয় সঙ্গীত জগতের ইতিহাসকে বদলে দেয়।

গ্রামোফোন কোম্পানির সেই ঐতিহাসিক দিন

১৯০২ সালের নভেম্বর মাস। ব্রিটিশ রেকর্ডিং সংস্থা ‘গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড’ (GTL)-এর প্রথম ভারতীয় রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার ফ্রেডরিক উইলিয়াম গেইসবার্গ (Frederick William Gaisberg) ভারতে আসেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে তা বাণিজ্যিক ডিস্ক হিসেবে বাজারে ছাড়া।

সেই সময়কার তথাকথিত ‘অভিজাত’ শিল্পীরা কেউই এই নতুন প্রযুক্তিকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁরা মনে করতেন, একটি ছোট মেশিনে তাঁদের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করা হলে তা তাঁদের আধ্যাত্মিক শক্তি বা ‘কণ্ঠের তেজ’ কেড়ে নেবে। অনেকে একে ‘কালা জাদু’ বলেও মনে করতেন।

কিন্তু গওহর জান ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি ছিলেন সাহসী, দূরদর্শী এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী। তিনি গেইসবার্গের প্রস্তাবে রাজি হন। ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাউন্ড আর্কাইভের তথ্যমতে, ১৯০২ সালের ১১ নভেম্বর, গওহর জান কলকাতার একটি হোটেলের অস্থায়ী স্টুডিওতে প্রথম গান রেকর্ড করেন।

এটি ছিল এক অসাধ্য সাধন। সেই সময়ে একটি মোমের ডিস্কে মাত্র তিন মিনিট সময় রেকর্ড করা যেত। অন্যদিকে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি রাগের পরিবেশনা সাধারণত কয়েক ঘন্টা ধরে চলত। গওহর জান অসামান্য দক্ষতার সাথে সেই দীর্ঘ রাগকে মাত্র তিন মিনিটের ছাঁচে ফেলে পরিবেশন করেন, অথচ তার শৈল্পিক গুণমান বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। তিনি সেদিন ভৈরবী রাগে একটি খেয়াল রেকর্ড করেন।

“মাই নেম ইজ গওহর জান!”

রেকর্ডিংয়ের শেষে গওহর জান যা করেছিলেন, তা রেকর্ডিং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। প্রতিটি তিন মিনিটের রেকর্ডিং শেষ করার পর, তিনি উচ্চস্বরে, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ইংরেজিতে ঘোষণা করতেন— “My name is Gauhar Jaan!” (মাই নেম ইজ গওহর জান!)

এই ঘোষণাটি কেবল তাঁর স্বাক্ষর বা পরিচয় ছিল না; এটি ছিল এক যুগান্তকারী বিপণন কৌশল। সেই সময়ে, রেকর্ডে লেবেল ছাপানোর ব্যবস্থা থাকলেও, ভারতের বহু মানুষই নিরক্ষর ছিলেন। গওহর জান বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর এই কণ্ঠস্বরের ঘোষণাই সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দেবে যে এটি তাঁর গান, তাঁর রেকর্ড। এই একটি ঘোষণাই তাঁকে রেকর্ডের খোলস থেকে বের করে এনে সরাসরি শ্রোতার ঘরে পৌঁছে দেয়। তিনি আক্ষরিক অর্থেই ‘হাউসহোল্ড নেম’ বা ঘরে ঘরে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন।

১৯০২ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে, গওহর জান প্রায় ৬০০-এরও বেশি গান রেকর্ড করেন। তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, ফরাসি, মারাঠি, তামিল এবং পশতু সহ দশটিরও বেশি ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন। তাঁর রেকর্ডগুলো ‘মেড ইন হ্যানোভার, জার্মানি’ ছাপ নিয়ে বাজারে আসত এবং অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে বিক্রি হয়ে যেত। তিনি হয়ে ওঠেন HMV (His Master’s Voice)-এর পোস্টার গার্ল, তাঁর ছবি দেশলাই বাক্স থেকে শুরু করে শাড়ির ডিজাইনে পর্যন্ত ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম সেলিব্রিটি, প্রথম রেকর্ডিং সুপারস্টার।

গওহর জানের পারিশ্রমিক: ১৫০ ভরি সোনার সমান

গওহর জানের খ্যাতি কেবল তাঁর শৈল্পিক দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁর পারিশ্রমিক এবং জীবনযাপনের গল্পগুলোও ছিল কিংবদন্তীতুল্য। তিনি ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে ধনী শিল্পীদের মধ্যে একজন।

প্রবন্ধের শুরুতেই যে তথ্যটি দেওয়া হয়েছে, তা কোনো অতিরঞ্জন নয়। সেই যুগে যখন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মাসিক বেতন হয়ত ১০০-১৫০ টাকা ছিল, তখন গওহর জান একটি মাত্র গানের আসরে (Baithak) বা একটি রেকর্ডিং সেশনের জন্য ৩,০০০ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করতেন এবং পেতেন।

আসুন, এই অর্থের মূল্য বোঝার চেষ্টা করি:

  • তৎকালীন মূল্য: ১৯০০-এর দশকের শুরুতে, ১ ভরি (বা প্রায় ১১.৬৬ গ্রাম) সোনার দাম ছিল প্রায় ২০ টাকা।
  • হিসাব: ৩,০০০ টাকাকে ২০ টাকা দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় ১৫০।
  • ফলাফল: অর্থাৎ, গওহর জানের একটি গানের পারিশ্রমিক ছিল ১৫০ ভরি সোনার মূল্যের সমান।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা তাঁকে এক অকল্পনীয় বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছিল। তিনি ভালোভাবেই জানতেন নিজের মূল্য। তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী যিনি নিজের প্রতিভাকে কীভাবে বাজারজাত করতে হয় তা বুঝতেন। তিনি জানতেন যে তাঁর নামেই রেকর্ড বিক্রি হয়, তাঁর নামেই আসর জমে। তাই তিনি নিজের শর্তে কাজ করতেন এবং নিজের পারিশ্রমিক ঠিক করতেন।

কিংবদন্তীর জীবনযাপন ও বিলাসিতা

গওহর জানের জীবন ছিল খোলা বইয়ের মতো, তবে সেই বইয়ের প্রতিটি পাতা ছিল সোনা-জহরত আর সাহসিকতার গল্পে মোড়া। তিনি তাঁর সম্পদ প্রদর্শন করতে দ্বিধা বোধ করতেন না এবং তাঁর জীবনযাপন তৎকালীন সমাজের কাছে এক বিস্ময় ছিল।

ছয় ঘোড়ার ফিটন ও ১০০০ টাকার জরিমানা

গওহর জানের ব্যক্তিগত শান-শওকতের একটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো তাঁর ছয় ঘোড়ায় টানা ফিটন বা জুড়ি গাড়ি। তিনি যখন সাফল্যের শিখরে, তখন তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় রেশমি পোশাকে সেজে, এই ছয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলকাতার ময়দানে হাওয়া খেতে বের হতেন।

সেই সময়কার এক অলিখিত নিয়ম ছিল যে, একমাত্র ভাইসরয় বা বড়লাট ছাড়া আর কেউ ছয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে পারবেন না। গওহরের এই ‘স্পর্ধা’ জনৈক উচ্চপদস্থ ইংরেজ রাজপুরুষের নজরে আসে। কিংবদন্তি অনুসারে, সেই ব্রিটিশ কর্মকর্তা গওহর জানকে এই ‘ঔদ্ধত্য’-এর জন্য ১,০০০ টাকা জরিমানা করেন।

১,০০০ টাকা সেই সময়ে এক বিশাল অঙ্ক ছিল। কিন্তু গওহর জান বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তৎক্ষণাৎ সেই জরিমানা পরিশোধ করেন। পরের দিন, তিনি আবারও একই ঠাঁটে, একই ছয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ময়দানে হাজির হন। এই ঘটনাটি কেবল তাঁর বিপুল ঐশ্বর্যই প্রমাণ করে না, বরং তাঁর অদম্য জেদ, সাহস এবং ব্রিটিশ রাজের প্রতি তাঁর প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জেরও পরিচয় দেয়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, তিনি কোনো সাধারণ ‘বাইজি’ নন, তিনি ‘দ্য গওহর জান’।

বিড়ালের বিয়েতে ২০,০০০ টাকা খরচ!

গওহর জানের বিলাসিতা এবং খামখেয়ালিপনার আরও এক চরম নিদর্শন হলো তাঁর পোষা বিড়ালের বিয়ে। কথিত আছে, তাঁর একটি পোষা বিড়াল ছিল, যার প্রতি তাঁর ছিল অগাধ স্নেহ। তিনি সেই বিড়ালের বিয়েতে তৎকালীন মুদ্রায় ২০,০০০ টাকা (মতান্তরে ১২,০০০ টাকা) খরচ করেছিলেন!

এই বিয়ে উপলক্ষে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। কলকাতার সমস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তি, এমনকি অন্যান্য বাইজিদেরও তাঁদের পোষা বিড়ালসহ নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বিড়ালের ‘বরযাত্রী’ এসেছিল সোনার পালকিতে চড়ে এবং সমস্ত নিমন্ত্রিতদের জন্য ছিল বহুমূল্য উপহারের ব্যবস্থা। এই ঘটনাটি গওহর জানের অর্থবিত্ত এবং তাঁর খামখেয়ালী স্বভাবের প্রতীক হয়ে আছে।

অন্যান্য বিলাসিতা

  • পোশাক ও গহনা: গওহর জান তাঁর জমকালো পোশাক এবং অসামান্য গহনার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি নাকি একবারও পরা পোশাক বা গহনা দ্বিতীয়বার পরতেন না। তাঁর প্রতিটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য আলাদা আলাদা ডিজাইনার পোশাক তৈরি হতো।
  • দানশীলতা: তিনি কেবল বিলাসীই ছিলেন না, দানশীলও ছিলেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অর্থ সাহায্য করেছেন বলে জানা যায়। কথিত আছে, মহাত্মা গান্ধী যখন স্বরাজ তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে আসেন, তখন গওহর জান তাঁকে একটি বড় অঙ্কের অর্থ দান করার প্রতিশ্রুতি দেন, এই শর্তে যে গান্ধীজি নিজে তাঁর গান শুনতে আসবেন। যদিও সেই সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

গাওহর জানের এই জীবনধারা, যা ছিল তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রাজা রামমোহন রায়ের মতো সমাজ সংস্কারকদের সময়ের থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তা অনেককেই অবাক করেছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে একজন নারী, শুধুমাত্র নিজের প্রতিভার জোরে, পুরুষদের থেকেও বেশি সম্পদ এবং খ্যাতি অর্জন করতে পারেন।

সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অবদান: এক নজরে

গওহর জানের জীবন কেবল বিলাসিতা বা বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর মূল পরিচয় তিনি একজন অসামান্য শিল্পী। ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর অবদান বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী।

রেকর্ডিং শিল্পের পথপ্রদর্শক

গওহর জানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি ভারতীয় সঙ্গীতকে ‘বৈঠক’ বা রাজদরবারের সীমিত গণ্ডি থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের ড্রয়িং রুমে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর রেকর্ডিংয়ের সাফল্যই গ্রামোফোন কোম্পানিকে ভারতে ব্যবসা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর দেখাদেখি, জানকি বাই, মালকা জান (আগরাওয়ালি) এবং অন্যান্য সমসাময়িক ‘বাইজি’-রা, যাঁরা আগে রেকর্ডিং করতে দ্বিধা বোধ করতেন, তাঁরাও এগিয়ে আসেন। তিনি একাই ভারতে বাণিজ্যিক রেকর্ডিং শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন।

সঙ্গীতের বৈচিত্র্য

তিনি ছিলেন এক অবিশ্বাস্য প্রতিভাধর শিল্পী। তাঁর গায়কীর পরিসর ছিল বিশাল। নিম্নে একটি সারণিতে তাঁর শৈল্পিক দক্ষতার কিছু দিক তুলে ধরা হলো:

বিষয় গওহর জানের অবদান
ভাষা ১০টিরও বেশি ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন (বাংলা, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি, পশতু, ইংরেজি ইত্যাদি)।
শৈলী (Genre) ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, কাজরি, চৈতি, হোরি, ভজন, গজল—সবকিছুতেই সমান পারদর্শী।
রচয়িতা তিনি নিজে ‘হামদম’ ছদ্মনামে গজল ও কবিতা লিখতেন।
প্রযুক্তি ৩ মিনিটের রেকর্ডিংয়ের ফর্ম্যাটটি আয়ত্ত করেছিলেন, যা ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
বাংলা গান তিনি বেশ কিছু বাংলা গানও রেকর্ড করেছিলেন, যা তাঁকে বাঙালি শ্রোতাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।

পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

গওহর জান ছিলেন তথাকথিত ‘তওয়াইফ’ বা ‘বাইজি’ সম্প্রদায়ের শিল্পী। সেই সময়ে এই শিল্পীদের প্রতি সমাজের একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু গওহর জান তাঁর প্রতিভা, আত্মসম্মান এবং ব্যক্তিত্বের জোরে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি দেখিয়ে দেন যে একজন ‘বাইজি’-ও একজন ‘শিল্পী’ হতে পারেন, একজন ‘সুপারস্টার’ হতে পারেন। তিনি বেগম রোকেয়ার মতো নারীবাদী পথিকৃতদের সমসাময়িক ছিলেন এবং নিজের মতো করে নারী স্বাধীনতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন।

জীবনের শেষ অধ্যায়: বিতর্ক ও একাকীত্ব

গওহর জানের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং তাঁর খ্যাতির সম্পূর্ণ বিপরীত। যে নারী একদিন লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেছেন, তাঁকেই জীবনের শেষ দিনগুলোতে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়তে হয়।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কখনোই সুখের ছিল না। তিনি তাঁর সেক্রেটারি, আব্বাস সায়েকে বিশ্বাস করে বিয়ে করেছিলেন, যিনি তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন। কিন্তু এই সম্পর্ক তাঁর জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। আব্বাস তাঁর সম্পত্তির লোভে তাঁকে প্রতারিত করেন।

গওহর জান তাঁর মা, বড়ি মালকা জানের মৃত্যুর পর এক বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। কিন্তু তাঁর পালক-পিতার পরিবারের সদস্যরা সেই সম্পত্তির দাবি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা শুরু করে। এই দীর্ঘ আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে তাঁর সঞ্চয়ের এক বড় অংশ শেষ হয়ে যায়।

কলকাতায় তাঁর সেই রমরমা দিন আর ছিল না। শেষ জীবনে তিনি কলকাতা ছেড়ে প্রথমে রামপুর এবং পরে মহীশূর রাজদরবারে আশ্রয় নেন। মহীশূরের মহারাজা চতুর্থ কৃষ্ণ রাজা ওয়াদিয়ারের দরবারে তিনি ‘প্রাসাদ গায়িকা’ (Palace Musician) হিসেবে নিযুক্ত হন।

কিন্তু ততদিনে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। যে গলার স্বরে একদিন গোটা উপমহাদেশ মুগ্ধ হতো, তা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছিল। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি প্রায় একাকীত্ব এবং চরম অর্থকষ্টের মধ্যে কাটান। ১৯৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি, মহীশূরের একটি হাসপাতালে, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে, ভারতের প্রথম রেকর্ডিং সুপারস্টার, গওহর জান, প্রায় অগোচরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

গওহর জান: আজকের প্রেক্ষাপটে

গওহর জানের মৃত্যু হলেও তাঁর উত্তরাধিকার বেঁচে আছে। তিনি কেবল একজন গায়িকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ‘ফেমিনিস্ট আইকন’ (Feminist Icon) যিনি নিজের শর্তে বেঁচেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে প্রতিভাকে সম্পদে পরিণত করতে হয় এবং কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে হয়।

তাঁর রেকর্ডিংগুলো আজ ব্রিটিশ লাইব্রেরি সহ বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামী আর্কাইভের অমূল্য সম্পদ। তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা হয়েছে, বই লেখা হয়েছে (বিক্রম সম্পথের “My Name is Gauhar Jaan” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য), তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

২০১৮ সালের ২৬ জুন, Google তাঁর ১৪৫ তম জন্মবার্ষিকীতে একটি বিশেষ ডুডল (Google Doodle) উৎসর্গ করে। এটি প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরেও, গওহর জানের প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি।

গওহর জানের গল্প আমাদের শেখায় যে, প্রতিভা, সাহস এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো সামাজিক বাধাকেই অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি ছিলেন এক অদম্য নারী, যিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁর সেই সিগনেচার ঘোষণা “মাই নেম ইজ গওহর জান!” আজও আমাদের কানে বাজে—কেবল একজন গায়িকার পরিচয় হিসেবে নয়, বরং একজন বিজয়ীর আত্মঘোষণা হিসেবে।

About Author
আরও পড়ুন