মন ভেঙেছে, অফিসে যাব না! ব্রেকআপের পর ছুটি চাইছে জেন-জি, তোলপাড় কর্পোরেট দুনিয়া

সম্পর্কের ভাঙন বা ব্রেকআপের মতো ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণার কারণে অফিস থেকে ছুটি নেওয়া—এই ধারণাটি কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু জেনারেশন জি (Gen-Z) বা জেন-জি (যারা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের…

Riddhi Datta

 

সম্পর্কের ভাঙন বা ব্রেকআপের মতো ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণার কারণে অফিস থেকে ছুটি নেওয়া—এই ধারণাটি কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু জেনারেশন জি (Gen-Z) বা জেন-জি (যারা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে) এই প্রথাগত ধারণাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। তারা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ব্রেকআপের মতো গভীর আবেগজনিত আঘাত কাটিয়ে উঠতে কর্মক্ষেত্র থেকে সক্রিয়ভাবে সময় চাইছে। এই নতুন প্রবণতা বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট পলিসি এবং এইচআর (HR) বিভাগগুলিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই বিষয়টিকে “ব্রেকআপ লিভ” (Break-up Leave) হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির একটি উদীয়মান পরিবর্তন। জেন-জি বিশ্বাস করে, মন খারাপ বা মানসিক অবসাদ নিয়ে কাজ করার চেয়ে, সাময়িক বিরতি নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফেরা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

ব্রেকআপ এবং মানসিক স্বাস্থ্য: কেন এটি একটি গুরুতর বিষয়?

ঐতিহ্যগতভাবে, কর্মক্ষেত্র ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনকে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি বেদনাদায়ক ব্রেকআপ কেবল মন খারাপের বিষয় নয়, এটি একজন ব্যক্তির জ্ঞানীয় (cognitive) এবং শারীরিক কার্যকারিতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

ব্রেকআপের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

মনোবিজ্ঞানীরা প্রায়শই একটি গুরুতর ব্রেকআপের পরের অবস্থাকে শোক (grief) বা প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার সাথে তুলনা করেন। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) দ্বারা প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানসিক যন্ত্রণা (যেমন ব্রেকআপের কারণে সৃষ্ট) মস্তিষ্কের সেই একই অংশগুলিকে সক্রিয় করে যা শারীরিক যন্ত্রণার সময় সক্রিয় হয়।

এর ফলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন:

  • অনিদ্রা (Insomnia): ঘুমের ধরণে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
  • মনোযোগে ঘাটতি: কোনও কিছুতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা কাজের গুণমানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
  • বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ: দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা এবং অ্যাংজাইটি অ্যাটাক দেখা দিতে পারে।
  • ক্ষুধামন্দা বা অতিরিক্ত ক্ষুধা: খাওয়ার অভ্যাসে চরম পরিবর্তন আসে।

এই সমস্ত উপসর্গগুলি একজন কর্মীর উৎপাদনশীলতা (productivity) এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। জেন-জি এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকেই সামনে আনছে। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, পা ভেঙে গেলে যদি ছুটি পাওয়া যায়, তবে মন ভেঙে গেলে কেন নয়?

৫ স্টার স্প্লিট এসি: ৩৩ হাজার টাকার অবিশ্বাস্য ছাড়ে AI ফিচার্সে ভরপুর এই এসি কিনুন!

“প্রেজেন্টিজম” (Presenteeism) বনাম অনুপস্থিতি

কর্মক্ষেত্রে একটি প্রচলিত সমস্যা হলো “প্রেজেন্টিজম” (Presenteeism)—অর্থাৎ, শারীরিকভাবে অফিসে উপস্থিত থেকেও অসুস্থতা বা মানসিক চাপের কারণে পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে না পারা। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ (Harvard Business Review) -এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রেজেন্টিজম সংস্থাগুলির জন্য সরাসরি অনুপস্থিতির (absenteeism) চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।

যখন একজন কর্মী ব্রেকআপের মতো মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যান, তখন তিনি অফিসে এলেও তার কাজে ভুলের পরিমাণ বাড়ে, সহকর্মীদের সাথে সমন্বয় ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়। জেন-জি এই অকার্যকর “উপস্থিতি” দেখানোর পরিবর্তে, কয়েক দিনের পরিকল্পিত ছুটি নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে পূর্ণ উদ্যমে কাজে ফেরার পক্ষে। এটি সংস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি লাভজনক।

জেন-জি কেন এই বিষয়ে এত সোচ্চার?

পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলি (যেমন বেবি বুমার বা জেন-এক্স) কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করাকে “অপেশাদার” (unprofessional) বলে মনে করত। কিন্তু জেন-জি-এর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এর পেছনে একাধিক সামাজিক, প্রযুক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ডি-স্টিগমাটাইজেশন (De-stigmatization)

জেন-জি হলো প্রথম প্রজন্ম যারা মানসিক স্বাস্থ্যকে ঘিরে থাকা সামাজিক ট্যাবু বা কলঙ্ক ভেঙে ফেলার জন্য সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। তারা এমন এক যুগে বড় হয়েছে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা স্বাভাবিক।

  • পরিসংখ্যান: ডেলয়েট (Deloitte) -এর ২০২২ সালের জেন-জি অ্যান্ড মিলেনিয়াল সার্ভে অনুসারে, প্রায় ৪৬% জেন-জি কর্মী জানিয়েছেন যে তারা প্রায়শই বা সব সময়ই মানসিক চাপ বা উদ্বেগে ভোগেন। এটি পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
  • স্বচ্ছতা: এই প্রজন্ম থেরাপি নেওয়া বা মানসিক অবসাদের কথা স্বীকার করাকে দুর্বলতা মনে করে না, বরং এটিকে আত্ম-সচেতনতা এবং সাহসিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখে। তাই, ব্রেকআপের মতো একটি বৈধ মানসিক চাপের কারণে ছুটি চাওয়া তাদের কাছে সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

স্যামসাং গ্যালাক্সি Z Flip6 5G: ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের নতুন যুগ

হাইপার-কানেক্টিভিটি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব

জেন-জি একটি “সর্বদা সংযুক্ত” (always-on) বিশ্বে বাস করে। তাদের সম্পর্কগুলি প্রায়শই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুরু, বিকাশ এবং শেষ হয়। এর ফলে, একটি ব্রেকআপ কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি একটি “পাবলিক” ইভেন্টেও পরিণত হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পরিচালনা করা—এইসব অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করে, যা কাটিয়ে উঠতে সময়ের প্রয়োজন হয়।

তারা দেখেছে যে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলছে, যা তাদেরও কর্মক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ হতে উৎসাহিত করেছে।

কাজের প্রতি পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি: “কাজই জীবন নয়”

জেন-জি-এর কাছে কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। তারা “ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স” (Work-Life Balance) -কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। গ্যালাপ (Gallup) -এর গবেষণা দেখায় যে, জেন-জি এমন নিয়োগকর্তাদের খোঁজ করে যারা তাদের সুস্থতাকে (well-being) গুরুত্ব দেয়।

তারা মনে করে, একটি সংস্থা যদি তাদের জীবনের কঠিন সময়ে (যেমন ব্রেকআপ) সহানুভূতি না দেখায়, তবে সেই সংস্থার প্রতি অনুগত থাকার কোনও কারণ নেই। তারা প্রয়োজনে ভালো মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য চাকরি পরিবর্তন করতেও দ্বিধা বোধ করে না। এই প্রজন্মের কাছে, বেতন এবং পদের চেয়ে মানসিক শান্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কর্পোরেট বিশ্ব কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে?

জেন-জি-এর এই নতুন চাহিদা কর্পোরেট বিশ্বের এইচআর নীতিগুলিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সংস্থাগুলি এখন দ্বিধাবিভক্ত: একদিকে কর্মীদের চাহিদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে নীতির অপব্যবহারের ভয়।

 “সহানুভূতিমূলক ছুটি” (Compassionate Leave) -এর বিবর্তন

ঐতিহ্যগতভাবে, “সহানুভূতিমূলক ছুটি” বা “ব রিভমেন্ট লিভ” (Bereavement Leave) শুধুমাত্র পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের (যেমন বাবা-মা, স্ত্রী/স্বামী, সন্তান) মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জেন-জি-এর চাপের ফলে, এই সংজ্ঞার পরিধি বাড়ছে।

কিছু প্রগতিশীল সংস্থা এখন এই নীতিগুলিকে আরও নমনীয় করছে। তারা বুঝতে পারছে যে একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের অবসানও মৃত্যুর শোকের মতোই বেদনাদায়ক হতে পারে। ফোর্বস (Forbes) -এ প্রকাশিত নিবন্ধগুলিও এই যুক্তিকে সমর্থন করে যে, ব্রেকআপ লিভকে শোক পালনের ছুটির মতোই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের কিছু সংস্থা ইতিমধ্যেই তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে, যেখানে পোষা প্রাণীর মৃত্যু বা সম্পর্কের ভাঙনের মতো বিষয়গুলিকেও সহানুভূতিমূলক ছুটির আওতায় আনা হচ্ছে। যদিও এটি এখনও বিশ্বব্যাপী প্রথায় পরিণত হয়নি, তবে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এইচআর (HR) বিভাগের দ্বিধা এবং চ্যালেঞ্জ

এইচআর ম্যানেজারদের জন্য এটি একটি জটিল পরিস্থিতি। তাদের প্রধান উদ্বেগগুলি হলো:

১. বৈধতা যাচাই: কে কীভাবে প্রমাণ করবে যে ব্রেকআপটি কতটা “গুরুতর”? একটি দুই মাসের সম্পর্ক আর একটি পাঁচ বছরের সম্পর্কের ভাঙনকে কি একই মানদণ্ডে দেখা হবে?

২. অপব্যবহারের সম্ভাবনা: এই ধরনের ছুটির অপব্যবহার হওয়ার একটি বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মীরা সাধারণ মন খারাপের জন্যও এই ছুটির আবেদন করতে পারেন, যা কর্মপ্রবাহকে ব্যাহত করবে।

৩. সমতার প্রশ্ন: যদি ব্রেকআপের জন্য ছুটি দেওয়া হয়, তবে অন্যান্য ব্যক্তিগত মানসিক চাপ (যেমন বন্ধুর সাথে ঝগড়া, আর্থিক উদ্বেগ) -এর জন্য কেন নয়? পলিসির সীমানা নির্ধারণ করা কঠিন।

এই চ্যালেঞ্জগুলির কারণে, বেশিরভাগ সংস্থাই সরাসরি “ব্রেকআপ লিভ” নামে কোনও নতুন নীতি চালু করতে দ্বিধা বোধ করছে।

 ছুটির বিকল্প: সংস্থাগুলি আর কী করতে পারে?

সরাসরি ছুটি মঞ্জুর না করেও সংস্থাগুলি কর্মীদের সহায়তা করতে পারে। জেন-জি কেবল ছুটিই চায় না, তারা চায় সহানুভূতির একটি পরিবেশ।

  • নমনীয় কাজের সময় (Flexible Work Hours): কর্মীদের কয়েক দিনের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার (Work From Home) অনুমতি দেওয়া বা কাজের সময়সূচি নমনীয় করা একটি বড় সহায়তা হতে পারে।
  • ইএপি (EAP – Employee Assistance Programs): অনেক আধুনিক সংস্থায় EAP থাকে, যা কর্মীদের বিনামূল্যে এবং গোপনীয় কাউন্সেলিং সেশন প্রদান করে। জেন-জি এই পরিষেবাগুলি ব্যবহারে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।
  • “মানসিক স্বাস্থ্য দিবস” (Mental Health Days): “সিক লিভ” (Sick Leave) -এর পাশাপাশি “মেন্টাল হেলথ ডে” চালু করা একটি জনপ্রিয় সমাধান হয়ে উঠছে। কর্মীরা তাদের কারণ ব্যাখ্যা না করেই এই ছুটি নিতে পারেন, যা ব্রেকআপ বা অন্য যে কোনও মানসিক চাপের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) নিজেও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়তার ওপর জোর দিয়েছে, যা এই ধরনের নীতিগুলিকে বৈধতা দেয়।

জেন-জি বনাম পূর্ববর্তী প্রজন্ম: একটি সাংস্কৃতিক সংঘাত

কর্মক্ষেত্রে বর্তমানে বেবি বুমার, জেন-এক্স, মিলেনিয়াল এবং জেন-জি—এই চারটি প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করছে। ব্রেকআপের জন্য ছুটি চাওয়ার এই প্রবণতা প্রায়শই আন্তঃ-প্রজন্মগত সংঘাত (intergenerational conflict) তৈরি করছে।

জেন-এক্স এবং বুমারদের দৃষ্টিভঙ্গি: “কঠোর হও”

পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলি, বিশেষ করে বেবি বুমার (Baby Boomers) এবং জেন-এক্স (Gen-X), একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে বড় হয়েছে। তাদের কাছে, কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার অর্থ হলো ব্যক্তিগত অনুভূতিকে চেপে রাখা এবং “কঠোর” হওয়া।

  • তাদের যুক্তি: তারা মনে করেন যে, জীবনের প্রত্যেকেরই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, কিন্তু কাজকে তার জায়গায় রাখতে হবে। তারা জেন-জি-এর এই দাবিকে প্রায়শই “অতিরিক্ত সংবেদনশীল” (overly sensitive) বা “এনটাইটেলড” (entitled) বলে মনে করেন।
  • অভিজ্ঞতার পার্থক্য: তারা এমন এক সময়ে কাজ করেছেন যখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাই ছিল লজ্জাজনক। তাদের কাছে, জেন-জি-এর এই খোলামেলা দাবি শৃঙ্খলার অভাব বলে মনে হতে পারে।

 মিলেনিয়ালস: মধ্যবর্তী প্রজন্ম

মিলেনিয়ালরা (Millennials) এই দুই চরমের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। তারাই প্রথম কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য এবং ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নিয়ে কথা বলা শুরু করেছিল। তবে তারা জেন-জি-এর মতো এতটা সরাসরি দাবি জানাতে অভ্যস্ত নয়। মিলেনিয়ালরা সাধারণত “বার্নআউট” (burnout) -এর কথা বলে ছুটি চাইলেও, ব্রেকআপের মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করতে দ্বিধা বোধ করে।

জেন-জি সেই দ্বিধার দেওয়ালটিই ভেঙে ফেলছে। তারা যা অনুভব করছে, তা সরাসরি এবং সততার সাথে প্রকাশ করছে।

এই প্রবণতার সমালোচনা এবং বিতর্ক

জেন-জি-এর ব্রেকআপ লিভের দাবি কেবল সমর্থনই পায়নি, এটি প্রচুর সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্কটি কর্মক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ প্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 “স্নোফ্লেক জেনারেশন” বিতর্ক

সমালোচকরা প্রায়শই জেন-জি-কে “স্নোফ্লেক জেনারেশন” (Snowflake Generation) বলে অভিহিত করেন—অর্থাৎ, তারা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ এবং সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে।

  • যুক্তি: সমালোচকদের মতে, এই ধরনের ছুটি মঞ্জুর করলে তা কর্মীদের মানসিক দৃঢ়তা (resilience) তৈরিতে বাধা দেবে। তারা জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করতে শিখবে না। তাদের মতে, কর্মক্ষেত্র হলো পেশাদারিত্বের জায়গা, থেরাপি সেন্টার নয়।
  • ভবিষ্যতের উদ্বেগ: অনেক ম্যানেজারের ভয়, আজ যদি ব্রেকআপের জন্য ছুটি দেওয়া হয়, কাল হয়তো পোষা প্রাণী অসুস্থ হলে বা সামাজিক মিডিয়াতে ট্রোলড হলেও ছুটির দাবি উঠবে। এটি একটি “পিচ্ছিল ঢাল” (slippery slope) তৈরি করতে পারে যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

পাল্টা যুক্তি: দৃঢ়তা বনাম বিষাক্ত উৎপাদনশীলতা (Toxic Productivity)

জেন-জি এবং তাদের সমর্থকরা এই সমালোচনার তীব্র বিরোধিতা করে।

  • দৃঢ়তার নতুন সংজ্ঞা: তাদের মতে, মানসিক যন্ত্রণা চেপে রেখে কাজ করাটা দৃঢ়তা নয়, ওটা হলো “টক্সিক প্রোডাক্টিভিটি” (Toxic Productivity)। প্রকৃত দৃঢ়তা হলো নিজের সমস্যাকে স্বীকার করা, তার সমাধান খোঁজা (প্রয়োজনে ছুটি নিয়ে) এবং তারপর সুস্থ হয়ে ফিরে আসা।
  • ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ: ম্যাককিনসি (McKinsey) -এর মতো সংস্থাগুলির গবেষণায় দেখা গেছে, যে সংস্থাগুলি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, সেখানে কর্মীদের আনুগত্য (loyalty) এবং ধরে রাখার হার (retention rate) অনেক বেশি। জেন-জি কর্মীদের আকর্ষণ করতে এবং ধরে রাখতে গেলে সংস্থাগুলিকে সহানুভূতিশীল হতেই হবে।

ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র: সহানুভূতিই কি নতুন মুদ্রা?

এই বিতর্ক একটি বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দেয়: ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র কেমন হওয়া উচিত? জেন-জি-এর এই দাবিগুলি কেবল ব্রেকআপের ছুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি কর্মক্ষেত্রের মৌলিক কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে।

“সাইকোলজিক্যাল সেফটি” (Psychological Safety) -এর গুরুত্ব

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে “সাইকোলজিক্যাল সেফটি” বা মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে কর্মীরা কোনওরকম ভয় বা লজ্জা ছাড়াই তাদের ভুল স্বীকার করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং তাদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সৎ থাকতে পারে।

যখন একজন জেন-জি কর্মী ব্রেকআপের কথা বলে ছুটি চান, তখন তিনি আসলে সেই মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার পরীক্ষাই নিচ্ছেন। যদি সংস্থা তাকে সমর্থন করে, তবে ওই কর্মী সংস্থার প্রতি আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ওঠেন।

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য চমকপ্রদ সুবিধা: জেনে নিন বিস্তারিত!

পলিসির ভবিষ্যৎ: নমনীয়তা এবং বিশ্বাস

ভবিষ্যতের এইচআর পলিসি সম্ভবত কঠোর নিয়মকানুনের পরিবর্তে নমনীয়তা (flexibility) এবং বিশ্বাসের (trust) ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।

  • সীমিত “ব্যক্তিগত দিবস” (Personal Days): অনেক সংস্থা নির্দিষ্ট কারণভিত্তিক ছুটির পরিবর্তে কর্মীদের বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক “পার্সোনাল ডে” বা “ওয়েলনেস ডে” অফার করছে। কর্মীরা এই দিনগুলি যে কোনও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন—তা ব্রেকআপ হোক, মানসিক অবসাদ হোক বা ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট হোক। এর ফলে কর্মীর গোপনীয়তাও বজায় থাকে এবং সংস্থারও হিসাব রাখতে সুবিধা হয়।

নিম্নলিখিত টেবিলটি বিভিন্ন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরে:

প্রজন্ম মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ব্রেকআপ লিভ নিয়ে মতামত কর্মক্ষেত্রের অগ্রাধিকার
বেবি বুমার ব্যক্তিগত বিষয়, কর্মক্ষেত্রে আলোচনা করা উচিত নয়। অপ্রয়োজনীয়, অপেশাদার। “কঠোর” হওয়া উচিত। স্থিতিশীলতা, বেতন।
জেন-এক্স (Gen-X) ব্যক্তিগত বিষয়, তবে প্রয়োজনে ছুটি নেওয়া যেতে পারে (কারণ উল্লেখ না করে)। দ্বিধান্বিত, তবে সাধারণত সমর্থন করে না। ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স (স্বাধীনভাবে)।
মিলেনিয়াল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আলোচনা শুরু করেছে। “বার্নআউট” একটি বৈধ কারণ। সহানুভূতিশীল, তবে সরাসরি চাইতে দ্বিধা বোধ করে। উদ্দেশ্য (Purpose), ফিডব্যাক, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স।
জেন-জি (Gen-Z) শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। খোলামেলা আলোচনায় বিশ্বাসী। এটি একটি বৈধ এবং প্রয়োজনীয় ছুটি। মানসিক স্বাস্থ্য, নমনীয়তা, মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা।


জেন-জি-এর ব্রেকআপের পর ছুটি চাওয়ার প্রবণতা কোনও বিচ্ছিন্ন বা খামখেয়ালি দাবি নয়। এটি কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এবং পরিবর্তিত মূল্যবোধের একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। এই প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের মতো ব্যক্তিগত যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখে “কাজ চালিয়ে যেতে” রাজি নয়। তারা এমন একটি কর্মসংস্কৃতি চায় যা তাদের সম্পূর্ণ সত্তাকে—আবেগসহ—স্বীকৃতি দেয়।

সংস্থাগুলি হয় এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করে আরও সহানুভূতিশীল এবং নমনীয় নীতি তৈরি করতে পারে, অথবা তারা এই প্রতিভাবান প্রজন্মকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে। এই প্রবণতা সংস্থাগুলিকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে, উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি সহানুভূতিরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।