ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হলে কি ক্ষতি হয় – শরীর ভাঙে নাকি মিথ্যা ভয়? জানুন সত্যি তথ্য

স্বপ্নদোষ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা ও আতঙ্ক। ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হলে কি ক্ষতি হয় - এই প্রশ্নটি প্রতিদিন হাজারো যুবকের মনে ঘুরপাক খায়। কেউ ভাবেন শরীর…

Srijita Ghosh

 

স্বপ্নদোষ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা ও আতঙ্ক। ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হলে কি ক্ষতি হয় – এই প্রশ্নটি প্রতিদিন হাজারো যুবকের মনে ঘুরপাক খায়। কেউ ভাবেন শরীর দুর্বল হয়ে যাবে, কেউ মনে করেন যৌনক্ষমতা নষ্ট হবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তাসনিম জারাসহ বিশ্বের নামকরা চিকিৎসকরা কী বলছেন এ বিষয়ে? আজকের এই বিস্তারিত আলোচনায় জানুন বৈজ্ঞানিক সত্য, মিথ্যা ভয় ও সঠিক সমাধান।

স্বপ্নদোষ কী এবং কেন হয় – বুঝুন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া

স্বপ্নদোষ বা নৈশ নির্গমন (Nightfall) হলো ঘুমের সময় অনৈচ্ছিকভাবে বীর্যপাতের একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। এটি মূলত কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে।

শরীরে প্রতিদিন লাখো শুক্রাণু উৎপন্ন হয় এবং পুরাতন শুক্রাণু বের করে নতুনের জন্য জায়গা করে দেওয়াই স্বপ্নদোষের মূল কারণ। হরমোনাল পরিবর্তন, যৌন উত্তেজনা বা স্বপ্নের কারণেও এটি ঘটতে পারে।

ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হলে কি ক্ষতি হয় – মিথ বনাম বাস্তবতা

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে কোনো ক্ষতি নেই

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তাসনিম জারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “ঘনঘন স্বপ্নদোষ হলে শরীর দুর্বল হয়, শক্তি চলে যায়, শারীরিক বৃদ্ধি ভালো হয় না – এই সব ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই”। তিনি আরও বলেছেন যে এর জন্য শরীর দুর্বল হয় না বা ভেঙে পড়ে না।

২০২৫ সালের সর্বশেষ চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্নদোষ একটি সুস্থ প্রজনন ব্যবস্থার লক্ষণ এবং এটি শারীরিক দুর্বলতা, বন্ধ্যাত্ব বা যৌন অক্ষমতার কারণ নয়।

যে ক্ষতির ধারণাগুলো ভুল প্রমাণিত

শারীরিক দুর্বলতা: বীর্যপাতের সময় যে সামান্য খনিজ (জিঙ্ক, প্রোটিন) ক্ষয় হয়, তা শরীর দ্রুত পূরণ করে ফেলে।

যৌন অক্ষমতা: স্বপ্নদোষের সাথে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের কোনো সম্পর্ক নেই।

বন্ধ্যাত্ব: স্বপ্নদোষ শুক্রাণুর গুণগত মান বা সংখ্যায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।

তবুও কেন কিছু মানুষ সমস্যা অনুভব করেন

যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞান স্বপ্নদোষকে ক্ষতিকর বলে মনে করে না, তবুও অতিরিক্ত ঘন ঘন হলে কিছু সাময়িক অসুবিধা হতে পারে:

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ

অনেকেই স্বপ্নদোষকে রোগ মনে করে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এই মানসিক চাপই আসল সমস্যা, স্বপ্নদোষ নয়। সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল তথ্যের কারণে তরুণরা অবসাদ ও হতাশায় ভোগেন।

ঘুমের ব্যাঘাত

রাতে স্বপ্নদোষ হলে ঘুম ভেঙে যেতে পারে, যা পরোক্ষভাবে দিনের কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি স্বপ্নদোষের কারণে নয়, বরং ঘুম ভাঙার কারণে।

কখন স্বপ্নদোষ নিয়ে চিন্তিত হবেন

স্বাভাবিক ফ্রিকোয়েন্সি

চিকিৎসকদের মতে, সপ্তাহে ১-২ বার বা মাসে ২-৪ বার স্বপ্নদোষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কারো সারাজীবনে একবারও না হওয়া বা কারো প্রতি সপ্তাহে হওয়া – দুটোই স্বাভাবিক।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

  • প্রতি রাতে বা সপ্তাহে ৪-৫ বারের বেশি হলে

  • শারীরিক ব্যথা বা প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া থাকলে

  • মানসিক অস্থিরতা বা বিষণ্নতা দেখা দিলে

স্বপ্নদোষ নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক উপায়

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

নিয়মিত ব্যায়াম: দিনে কমপক্ষে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম স্বপ্নদোষের হার কমায়। নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনকারীরা বেশি স্বপ্নদোষের শিকার হন।

মেডিটেশন ও যোগব্যায়াম: মানসিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করে এবং চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণে রাখে।

পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম হরমোনাল ভারসাম্য বজায় রাখে।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত মশলাদার খাবার, চর্বিজাতীয় খাবার
বেশি খান: প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম
বিশেষ খাবার: বটল লাউয়ের রস, তুলসি পাতার চা, অশ্বগন্ধা

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে

এড়িয়ে চলুন: পর্নোগ্রাফি, উত্তেজক কন্টেন্ট, বিশেষ করে রাতে
অনুশীলন করুন: গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস, ঠান্ডা সংগীত শোনা, হালকা গরম পানিতে গোসল

২০২৫ সালের সর্বশেষ গবেষণা ও তথ্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ নির্দেশিকায় স্বপ্নদোষকে পুরুষদের স্বাভাবিক যৌন স্বাস্থ্যের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্নদোষ নিয়ে দুশ্চিন্তা কমাতে শিক্ষা ও সঠিক তথ্য প্রদানই সবচেয়ে কার্যকর।

নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যোগব্যায়াম ও মেডিটেশনের মাধ্যমে ৮০% ক্ষেত্রে স্বপ্নদোষের হার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মেয়েদের ক্ষেত্রেও স্বপ্নদোষ হয়

অনেকেই জানেন না যে মেয়েদেরও স্বপ্নদোষ হতে পারে। ডা. তাসনিম জারার মতে, “স্বপ্নদোষ ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের হতে পারে। কিশোর বয়সেই তা বেশি হয়। মেয়েদের স্বপ্নদোষ হলে তার যোনিপথ ভিজে ভিজে মনে হতে পারে”।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন

যদি স্বপ্নদোষ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থাকে, ডা. তাসনিম জারা একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারবেন এবং দুর্বলতা দূর করার বিভিন্ন উপকারী টেকনিক শিখিয়ে দিতে পারবেন।”

ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হলে কি ক্ষতি হয় – এই প্রশ্নের উত্তর হলো, বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো ক্ষতি নেই। আসল সমস্যা হলো ভুল ধারণা ও অজ্ঞতাজনিত মানসিক চাপ। সঠিক তথ্য জানুন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। স্বপ্নদোষ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া – এটি নিয়ে লজ্জা বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

About Author