দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সার বা জিঞ্জিভাল ক্যান্সার হলো মুখের ক্যান্সারের একটি বিশেষ ধরন যা মাড়ির টিস্যুতে শুরু হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত হলে চিকিৎসায় সুফল পাওয়া সম্ভব. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে আনুমানিক ৫৯,৬৬০টি নতুন মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ঘটনা এবং ১২,৭৭০ জন মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে. যদিও এই ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বিরল, প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারলে জীবন বাঁচানো সম্ভব হয় কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণে ৮৪% পর্যন্ত বেঁচে থাকার হার রয়েছে, যেখানে দেরিতে সনাক্ত হলে তা মাত্র ৩৮%-এ নেমে আসে.
দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের প্রধান লক্ষণসমূহ
মাড়ি থেকে রক্তপাত এবং ব্যথা
মাড়ি থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষণ. সাধারণ মাড়ির রোগের সাথে পার্থক্য হলো এই রক্তপাত নিয়মিত ব্রাশ বা ডেন্টাল কেয়ারের পরও কমে না এবং ব্যথা ক্রমাগত থাকে. খাওয়া বা দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়িতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে যা স্বাভাবিক মাড়ির সমস্যা থেকে আলাদা.
মাড়িতে ফোলা বা চাকা
মাড়িতে শক্ত বা অস্বাভাবিক অনুভূতির চাকা বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে. এই চাকাগুলো আশেপাশের টিস্যুর তুলনায় ভিন্ন অনুভূতি দেয় এবং দাঁতের কাছাকাছি বা মাড়ির যেকোনো অংশে দেখা দিতে পারে. মাড়ির কিছু অংশ স্বাভাবিকের চেয়ে মোটা বা শক্ত মনে হতে পারে, যা নিয়মিত পরীক্ষা করে বুঝতে হয়.
দাঁতের ফাঁকে মাংস আটকায় কেন? জানুন কারণ, সমাধান ও দাঁতের সুস্থতার চাবিকাঠি!
সাদা বা লাল ছোপ
মাড়ির লাইন বরাবর সাদা বা লাল রঙের ছোপ দেখা দিতে পারে. এই রঙের পরিবর্তন স্থায়ী হয় এবং দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও চলে যায় না. মাড়ির রঙের এই ধরনের পরিবর্তন প্রাক-ক্যান্সারাস অবস্থা বা প্রাথমিক ক্যান্সারের ইঙ্গিত হতে পারে.
না সারা ঘা এবং আলসার
মুখের ভেতরে এমন ঘা বা আলসার যা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে এবং স্বাভাবিক চিকিৎসায় সেরে যায় না. এই ঘাগুলো মাড়িতে, দাঁতের আশেপাশে বা মুখের যেকোনো অংশে হতে পারে এবং প্রায়শই ব্যথাহীন হয় বলে উপেক্ষিত হয়.
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ
দাঁতের সমস্যা
দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া বা নড়াচড়া করা ক্যান্সারের একটি লক্ষণ হতে পারে. অনেক সময় এটি পেরিওডন্টাল ডিজিজ মনে হতে পারে, কারণ মাড়ির ক্যান্সার হাড়ের ক্ষয় ঘটিয়ে দাঁতের গোড়া দুর্বল করে দেয়. ডেনচার বা কৃত্রিম দাঁত যদি আগের মতো ফিট না হয়, তাহলে সেটিও মাড়ির ফোলা বা পরিবর্তনের সংকেত হতে পারে.
কান এবং গলার ব্যথা
মাড়ির ক্যান্সার ছড়িয়ে গেলে কানে ব্যথা অনুভূত হতে পারে. গলার পাশে বা ঘাড়ে ব্যথা এবং লসিকা গ্রন্থি (lymph nodes) ফুলে যাওয়াও দেখা দিতে পারে. এই লক্ষণগুলো নির্দেশ করে যে ক্যান্সার আশেপাশের অঞ্চলে ছড়াতে শুরু করেছে.
মুখে অসাড়তা বা ঝিনঝিন
মাড়ি, ঠোঁট, জিহ্বা বা মুখের অন্যান্য অংশে অসাড়তা বা ঝিনঝিন অনুভূতি হতে পারে. এই অনুভূতি স্নায়ুতে ক্যান্সারের চাপের কারণে হয় এবং প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে.
উন্নত পর্যায়ের লক্ষণ
ক্যান্সার উন্নত পর্যায়ে পৌঁছলে সাধারণ অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন ক্লান্তি, দুর্বলতা, খাবারে অনীহা এবং ওজন কমে যাওয়া. এই উপসর্গ গুলো নির্দেশ করে যে রোগ শরীরের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলছে.
দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণসমূহ
| ঝুঁকির কারণ | বিবরণ | পরিসংখ্যান |
|---|---|---|
| তামাক ব্যবহার | ধূমপান এবং চিবানো তামাক মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ | মুখের ক্যান্সারে আক্রান্তদের ৮০% তামাক ব্যবহার করেন |
| অ্যালকোহল | অতিরিক্ত মদ্যপান ঝুঁকি বাড়ায় | তামাক ও অ্যালকোহল একসাথে ব্যবহারে ঝুঁকি ৩০ গুণ বেড়ে যায় |
| এইচপিভি সংক্রমণ | হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস মুখের ক্যান্সারের সাথে যুক্ত | প্রতি বছর ১৬,০০০ অরোফ্যারিনজিয়াল ক্যান্সার এইচপিভি-র কারণে হয় |
| বয়স | ৬০ বছরের উপরে ঝুঁকি বেশি | গড় বয়স ৭৪.২ বছর |
| পুষ্টিহীনতা | ফল ও সবজি কম খেলে ঝুঁকি বাড়ে | ভিটামিন এ, সি, ই এর ঘাটতি ঝুঁকি বাড়ায় |
বংশগত এবং অন্যান্য কারণ
পারিবারিক ইতিহাস এবং জিনগত প্রবণতা মাড়ির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে. প্রথম-ডিগ্রি আত্মীয়দের মধ্যে মুখ বা গলার ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি ২৯.৫% বৃদ্ধি পায়. দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির সংস্পর্শ (ঠোঁটের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে) অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ.
রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া
প্রাথমিক পরীক্ষা
দন্তচিকিৎসক বা চিকিৎসক মুখের ভেতরে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করে কোনো অস্বাভাবিক চাকা, ফোলা, রঙের পরিবর্তন বা ঘা আছে কি না তা দেখবেন. গলা এবং ঘাড়ের লসিকা গ্রন্থি স্পর্শ করে পরীক্ষা করা হয়. যদি কোনো সন্দেহজনক অঞ্চল পাওয়া যায়, তাহলে বায়োপসির জন্য টিস্যুর নমুনা নেওয়া হয়.
উন্নত পরীক্ষা
বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার নিশ্চিত হলে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পিইটি স্ক্যান করা হয় ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তা বুঝতে. এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করে.
চিকিৎসার বিকল্পসমূহ
অস্ত্রোপচার
প্রাথমিক পর্যায়ে মাড়ির ক্যান্সারের প্রধান চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার. ওয়াইড লোকাল এক্সিশন পদ্ধতিতে ক্যান্সারযুক্ত টিস্যু এবং আশেপাশের কিছু সুস্থ টিস্যু কেটে ফেলা হয়. যদি ক্যান্সার হাড়ে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে চোয়ালের কিছু অংশ অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে.
রেডিয়েশন এবং কেমোথেরাপি
রেডিয়েশন থেরাপি একাকী বা অস্ত্রোপচারের পরে ব্যবহার করা হয়. উন্নত পর্যায়ের ক্যান্সারে কেমোথেরাপি রেডিয়েশনের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়. চিকিৎসার পছন্দ ক্যান্সারের স্টেজ, অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করে.
বেঁচে থাকার হার এবং পূর্বাভাস
প্রাথমিক সনাক্তকরণ মাড়ির ক্যান্সারের পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে. স্টেজ ১ এবং ২-তে সনাক্ত হলে পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার ৭০-৯০%. স্টেজ ৩-তে এটি প্রায় ৫০%-এ নেমে আসে এবং স্টেজ ৪-এ মাত্র ২০-৩০%. সামগ্রিকভাবে, স্থানীয় মুখের ক্যান্সারের পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার প্রায় ৮৪%, কিন্তু মেটাস্ট্যাসিস হলে তা ৩৮%-এ কমে যায়.
প্রতিরোধের উপায়
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
সব ধরনের তামাক পরিহার করা মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ. অ্যালকোহল পান সীমিত করুন – মহিলাদের দিনে একটি এবং পুরুষদের দিনে দুটি ড্রিংক পর্যন্ত. ফল ও সবজি সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার খান, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে এবং কোষের ক্ষতি প্রতিরোধে সাহায্য করে.
এইচপিভি টিকা
এইচপিভি টিকা মুখ এবং গলার ক্যান্সারের সাথে যুক্ত এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর. এই টিকা প্রি-টিনদের জন্য সুপারিশ করা হয়, কিন্তু ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে.
নিয়মিত পরীক্ষা
প্রতি ছয় মাসে দন্তচিকিৎসকের কাছে যান নিয়মিত ওরাল ক্যান্সার স্ক্রীনিং-এর জন্য. প্রতি মাসে নিজে নিজে মুখের পরীক্ষা করুন কোনো পরিবর্তন আছে কি না তা দেখার জন্য. প্রাক-ক্যান্সারাস অবস্থা বা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষত শনাক্তকরণের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ.
ক্যান্সার প্রতিরোধে ৭টি জীবনধারা পরিবর্তন: আপনার স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি
সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা
ঠোঁট এসপিএফ যুক্ত লিপ বাম দিয়ে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে রক্ষা করুন. এটি বিশেষভাবে ঠোঁটের ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে.
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
যদি মুখের কোনো ঘা, চাকা, ফোলা, বা ব্যথা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তাহলে অবিলম্বে দন্তচিকিৎসক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন. মাড়ি থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত, দাঁত আলগা হওয়া, মাড়ির রঙের পরিবর্তন, বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার ক্ষেত্রেও চিকিৎসা প্রয়োজন. প্রাথমিক সনাক্তকরণ চিকিৎসার সাফল্য এবং বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়.
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
তামাক ব্যবহারকারী, ভারী মদ্যপায়ী, বা ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রতি তিন মাসে একবার ওরাল ক্যান্সার স্ক্রীনিং করানো উচিত. যদি পারিবারিক ইতিহাস থাকে বা এইচপিভি পজিটিভ হন, তাহলে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন. রোগ নির্ণয়ের পরে তামাক এবং অ্যালকোহল ব্যবহার চালিয়ে গেলে বেঁচে থাকার হার ২০-৩০% কমে যায়, যেখানে ছেড়ে দিলে ২৫% বৃদ্ধি পায়.
দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সার একটি গুরুতর কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য রোগ, যা প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত হলে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব. প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন, কিন্তু সচেতনতা এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এটি এড়ানো যায়. তামাক ও অ্যালকোহল পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এইচপিভি টিকা গ্রহণ এবং নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা এই রোগ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি. মনে রাখবেন, যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন – প্রাথমিক সনাক্তকরণই জীবন বাঁচাতে পারে. সুস্থ জীবনযাপন এবং সতর্কতাই এই মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র.











