পাহাড় প্রেমীদের কাছে রঙিন পতাকার সারি বা ‘প্রেয়ার ফ্ল্যাগ’ (Prayer Flag) খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। বাতাস বইলেই পতপত করে উড়তে থাকে নীল, সাদা, লাল, সবুজ ও হলুদ রঙের এই পতাকাগুলো। পর্যটকদের কাছে এটি ছবির জন্য দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মনে হলেও, বৌদ্ধ ধর্মে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তিব্বতি ভাষায় একে বলা হয় ‘লুং তা’ (Lung Ta), যার অর্থ ‘বাতাসের ঘোড়া’ বা ‘Wind Horse’।
আসুন জেনে নেওয়া যাক এই পতাকার আসল রহস্য এবং এর রঙের বিন্যাসের অর্থ।
প্রেয়ার ফ্ল্যাগ বা লুং-তা আসলে কী?
বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পতাকাগুলো কোনো দেবতার কাছে প্রার্থনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য নয়, বরং বাতাসকে শুদ্ধ করার জন্য টাঙানো হয়। পতাকার গায়ে লেখা থাকে পবিত্র মন্ত্র এবং আঁকা থাকে বিভিন্ন পবিত্র চিহ্ন। বিশ্বাস করা হয়, যখন বাতাস এই পতাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন সেই বাতাস পবিত্র হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাতাস যেখানেই স্পর্শ করে, সেখানেই সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে শান্তি ও ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে দেওয়া।
৫টি রঙের গোপন রহস্য
আপনি কি লক্ষ্য করেছেন এই পতাকার রঙগুলো সবসময় একটি নির্দিষ্ট ক্রমে থাকে? বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে এর ক্রম হলো: নীল, সাদা, লাল, সবুজ এবং হলুদ। এই পাঁচটি রঙ প্রকৃতির পাঁচটি মৌলিক উপাদান বা ‘পঞ্চভূত’-এর প্রতীক।
১. নীল (Blue): সবার প্রথমে থাকে নীল পতাকা। এটি আকাশ বা মহাশূন্যের (Sky/Space) প্রতীক। এটি আমাদের মনের বিশালতা এবং মুক্তির বার্তা দেয়।
২. সাদা (White): এরপর আসে সাদা রঙ। এটি বায়ু বা বাতাসের (Air/Wind) প্রতীক। সাদা রঙ পবিত্রতা এবং দীর্ঘায়ু নির্দেশ করে।
৩. লাল (Red): লাল রঙ আগুনের (Fire) প্রতীক। এটি জীবনশক্তি এবং উষ্ণতার প্রতিনিধিত্ব করে।
৪. সবুজ (Green): সবুজ রঙ জলের (Water) প্রতীক। এটি প্রকৃতি এবং সজীবতাকে নির্দেশ করে।
৫. হলুদ (Yellow): সবশেষে থাকে হলুদ রঙ। এটি মাটি বা পৃথিবীর (Earth) প্রতীক। আমাদের স্থিতি এবং ভিত্তির প্রতিনিধিত্ব করে এই রঙ।
বৌদ্ধ দর্শন মতে, এই পাঁচটি উপাদানের ভারসাম্যই মানুষের শরীর ও মনের সুস্থতা বজায় রাখে।
পতাকা ফিকে হয়ে যাওয়ার অর্থ কী?
অনেকে ভাবেন পুরনো বা রঙ চটে যাওয়া পতাকা বোধহয় অশুভ। কিন্তু বিষয়টা ঠিক উল্টো। তিব্বতি বিশ্বাস অনুযায়ী, রোদ ও বাতাসে পতাকার রঙ যত ফিকে হবে, ততই মঙ্গল। এর অর্থ হলো, পতাকার গায়ে লেখা মন্ত্রগুলো বাতাসের মাধ্যমে সফলভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। রঙ ফিকে হওয়া মানেই আপনার প্রার্থনা প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে।
পতাকা টাঙানোর কিছু নিয়ম ও শিষ্টাচার
পর্যটক হিসেবে আমাদের এই পবিত্র বস্তুর প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি:
-
মাটিতে ফেলা নিষেধ: প্রেয়ার ফ্ল্যাগ কখনোই মাটিতে রাখতে নেই বা পায়ে ঠেকানো উচিত নয়। এটি ঘোর অসম্মানজনক।
-
গলায় বা শরীরে জড়ানো: ফ্যাশনের জন্য অনেকেই একে ওড়না বা স্কার্ফ হিসেবে ব্যবহার করেন, যা বৌদ্ধ ধর্মে নিষিদ্ধ। এটি পবিত্র বস্তু, কোনো পোশাক নয়।
-
ফেলে দেওয়া: পুরনো হয়ে গেলে এই পতাকা যত্রতত্র ডাস্টবিনে ফেলা যায় না। নিয়ম অনুযায়ী, পুরনো পতাকাকে সম্মানের সাথে পুড়িয়ে ফেলতে হয়, যাতে ধোঁয়ার মাধ্যমে এর পবিত্রতা আকাশে মিলিয়ে যায়।
উপসংহার
পরের বার পাহাড়ে গিয়ে যখন এই পতাকার সামনে ছবি তুলবেন, তখন কেবল এর সৌন্দর্যের প্রশংসা করবেন না, এর গভীর অর্থও অনুভব করার চেষ্টা করবেন। পাহাড়ের ঝোড়ো হাওয়ায় ওড়া এই পতাকাগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়— আমরা প্রকৃতিরই অংশ এবং সবার মঙ্গলের মধ্যেই আমাদের নিজেদের শান্তি নিহিত।











