গৃহকর্মী নিয়োগে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মাথায় রাখা অপরিহার্য: সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় পরিবার ও কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে একজন নির্ভরযোগ্য গৃহকর্মীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ভারতে প্রায় ৫ কোটি গৃহকর্মী কর্মরত রয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই মহিলা এবং তারা…

Ishita Ganguly

 

আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় পরিবার ও কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে একজন নির্ভরযোগ্য গৃহকর্মীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ভারতে প্রায় ৫ কোটি গৃহকর্মী কর্মরত রয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই মহিলা এবং তারা মূলত আসাম, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্য থেকে আসেন । সরকারি ই-শ্রম পোর্টালে নিবন্ধিত ৮.৫৬ কোটি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৮.৮ শতাংশ গৃহকর্মী, যা তাদের কৃষি ও নির্মাণ খাতের পর তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমিক শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করে । তবে সঠিক যাচাইবাচাই ছাড়া গৃহকর্মী নিয়োগ পরিবারের নিরাপত্তায় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নিয়োগের পূর্বে পরিচয় যাচাইকরণ: প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ

জাতীয় পরিচয়পত্র ও নথিপত্র সংগ্রহ

গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সঠিক পরিচয় না জেনে কাজে রাখা । আপনার ঘর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই নিয়োগকৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, আধার কার্ড এবং জন্ম নিবন্ধনের মূল কপি যাচাই করা অত্যাবশ্যক । পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ভোটার আইডি, রেশন কার্ড বা ইউটিলিটি বিল দিয়ে ঠিকানা নিশ্চিত করুন । শুধুমাত্র মৌখিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাউকে ঘরে ঠাঁই দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও চেহারার সাথে মিল

চাকরিক্ষেত্রে যেমন ছবি জমা দিতে হয়, তেমনি গৃহকর্মীকে কাজে রাখার আগে তার সম্প্রতি তোলা দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি সংগ্রহ করুন । ছবির সাথে সরাসরি তার চেহারার মিল আছে কি না তা ভালো করে যাচাই করা জরুরি । এই ছবি পরবর্তীতে থানায় জমা দেওয়া এবং নিজের রেকর্ডে রাখার জন্য প্রয়োজন হবে ।

বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিতকরণ

গৃহকর্মীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা বিস্তারিতভাবে লিখে রাখুন এবং তার পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করুন । সম্ভব হলে পরিচিত কাউকে দিয়ে সেই ঠিকানা সরাসরি নিশ্চিত করুন বা গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে ঠিকানার সত্যতা যাচাই করুন । ঠিকানা যাচাইকরণ পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্যও অপরিহার্য।

শনাক্তকারী ও রেফারেন্স যাচাই

গ্যারান্টরের তথ্য সংগ্রহ

গৃহকর্মীকে ভালোভাবে চেনে এমন অন্তত দুজন শনাক্তকারীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করুন । এই শনাক্তকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করা উচিত এবং প্রয়োজনে সেই নম্বরগুলোতে ফোন দিয়ে তথ্য যাচাই করে নিন । শনাক্তকারীরা গৃহকর্মীর চরিত্র ও আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারেন।

পূর্ববর্তী কর্মস্থলের রেফারেন্স

পূর্ববর্তী নিয়োগকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে গৃহকর্মীর কাজের মান, আচরণ এবং বিশ্বস্ততা সম্পর্কে জানুন । তিনি আগে কোথায় কাজ করেছেন, কতদিন করেছেন এবং কেন ছেড়েছেন – এসব প্রশ্নের উত্তর সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয় । যদি গৃহকর্মী রেফারেন্স দিতে অনিচ্ছুক হন বা তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

পরিচিত সূত্র ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা

অপরিচিত লোকের চেয়ে পরিচিত মানুষের সুপারিশের ওপর নির্ভর করা সবচেয়ে নিরাপদ । আপনার বিল্ডিং বা আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন কাউকে অগ্রাধিকার দিন । নতুন এলাকায় গেলে বাড়ির মালিক বা কেয়ারটেকারের সুপারিশ নিতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রেও ছবি ও পরিচয়পত্র সংগ্রহের নিয়মটি এড়িয়ে যাবেন না ।

পুলিশ ভেরিফিকেশন: আইনি বাধ্যবাধকতা ও নিরাপত্তা

থানায় তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া

নিয়োগের পরপরই গৃহকর্মীর নাম, ছবি, স্থায়ী ঠিকানা এবং তার পরিবারের সদস্যদের তথ্য নিকটস্থ থানায় জমা দিন । ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্ধারিত গৃহকর্মী তথ্য ফরম পূরণ করা এখন সময়ের দাবি । পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরম স্থানীয় পুলিশ স্টেশন থেকে সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ জমা দিতে হবে ।

অপরাধমূলক পটভূমি যাচাই

পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে গৃহকর্মীর স্থানীয় পুলিশ স্টেশন চেক, অপরাধমূলক পটভূমি যাচাই এবং কোনো মামলা আছে কিনা তা নিশ্চিত করা যায় । চরিত্র সনদপত্র এবং কোর্ট রেকর্ড চেক করলে আরও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় । ভারতে গৃহকর্মী সংক্রান্ত প্রায় ৭০০টি অপরাধ ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে, যা পটভূমি যাচাইয়ের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয় ।

ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার সময়সীমা

পুলিশ কর্তৃক ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হতে সাধারণত ২-৩ দিন সময় লাগে । এই সময়ের মধ্যে পুলিশ গৃহকর্মীর অতীত, অপরাধমূলক ইতিহাস এবং আধার কার্ড যাচাই করে থাকে । ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর অনুমোদিত ও স্ট্যাম্পযুক্ত ফরম সংগ্রহ করে নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন ।

কাজের বিবরণী ও প্রত্যাশা স্পষ্ট করা

কাজের পরিধি নির্ধারণ

নিয়োগের আগে গৃহকর্মীর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করুন – রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিশু দেখাশোনা, কাপড় ধোয়া বা অন্যান্য কাজ । Domestic Workers (Registration, Social Security, and Welfare) Act, 2008 এর Section 2(f) অনুযায়ী কাজের বিবরণী লিখিতভাবে উল্লেখ করা আইনি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ । কাজের পরিধি স্পষ্ট থাকলে পরবর্তীতে কোনো বিভ্রান্তি বা মতবিরোধ হয় না।

কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের সময়

লিভ-ইন গৃহকর্মীদের জন্য দৈনিক অন্তত ১০ ঘণ্টা বিশ্রামের সময় নিশ্চিত করতে হবে এবং সপ্তাহে একদিন ছুটি দিতে হবে । কর্মঘণ্টা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা উচিত । ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গৃহকর্মীদের জন্য ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিধান রয়েছে ।

লিখিত চুক্তিপত্র

উভয় পক্ষের মধ্যে লিখিত চুক্তিপত্র তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই চুক্তিতে বেতন, কর্মঘণ্টা, কাজের দায়িত্ব, ছুটির নীতি এবং চাকরি শেষ করার শর্তাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত । লিখিত চুক্তি ভবিষ্যতে যেকোনো বিরোধ এড়াতে সাহায্য করে এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করে ।

বেতন ও আর্থিক বিষয়

ন্যূনতম মজুরি মেনে চলা

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে । কর্ণাটকে ২০২৫-২৬ সালের জন্য Zone I এলাকায় রান্না ও পরিষ্কারের কাজের জন্য মাসিক ন্যূনতম মজুরি ₹২০,১১২.৭৫ এবং কাপড় ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য ₹১৮,২০৯.৪২ নির্ধারিত । Code on Wages (2019) অনুযায়ী গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি প্রদান করা নিয়োগকর্তার আইনি দায়িত্ব ।

সময়মতো বেতন প্রদান

মাসের নির্দিষ্ট তারিখে নিয়মিত বেতন প্রদান করুন এবং সম্ভব হলে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে দিন । বেতন প্রদানে বিলম্ব হলে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে এবং আলাদা মামলার সম্মুখীন হতে হতে পারে । কর্ণাটক ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স বিল ২০২৫ অনুযায়ী বেতন না দেওয়া বা কম দেওয়ার জন্য ₹৫০,০০০ পর্যন্ত জরিমানা এবং ৩-৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে ।

সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা

নিবন্ধিত গৃহকর্মীরা স্বাস্থ্য বীমা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং পেনশনের মতো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার অধিকারী । Domestic Workers Welfare Fund থেকে এই সুবিধাগুলি প্রদান করা হয় । নিয়োগকর্তাদের উচিত গৃহকর্মীদের ই-শ্রম পোর্টালে নিবন্ধন করতে সহায়তা করা ।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির ব্যবহার

সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন

ঘরোয়া নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা এখন অত্যাবশ্যক । প্রধান কক্ষ, রান্নাঘর এবং প্রবেশপথে ক্যামেরা লাগালে গৃহকর্মীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয় এবং যেকোনো অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শনাক্ত করা যায় । তবে ব্যক্তিগত কক্ষ যেমন বাথরুম বা শোবার ঘরে ক্যামেরা লাগানো গোপনীয়তা লঙ্ঘন হতে পারে।

মূল্যবান জিনিসপত্র সুরক্ষিত রাখা

বাসার মূল্যবান জিনিসপত্র, গহনা, নগদ টাকা এবং আলমারির চাবি সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন । অতিরিক্ত বিশ্বাস কখনো কখনো বিপদের কারণ হতে পারে, তাই প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ । লকারের কোড বা চাবি গৃহকর্মীর নাগালের বাইরে রাখুন।

পারিবারিক তথ্যের গোপনীয়তা

আপনার পারিবারিক যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আলাপ গৃহকর্মীর সামনে না বলার চেষ্টা করুন । ট্যুরের পরিকল্পনা, বড় অঙ্কের টাকা আদান-প্রদান বা মূল্যবান কেনাকাটার বিষয়ে আগেভাগে তাদের জানাবেন না । এই তথ্যগুলো অপরাধীদের কাছে পৌঁছে গেলে আপনার বাড়ি চুরি বা ডাকাতির লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

শিশু শ্রম নিষিদ্ধকরণ

আইনি বিধান

ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি Child Labour Act এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ । Domestic Workers Act এর Section 14 এই বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে । শিশু শ্রম নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩ বছর থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ₹৫০,০০০ জরিমানার বিধান রয়েছে ।

বয়স যাচাইকরণ

গৃহকর্মী নিয়োগের সময় জন্ম নিবন্ধন, আধার কার্ড বা স্কুল সার্টিফিকেটের মাধ্যমে বয়স যাচাই করুন । অনানুষ্ঠানিক খাতে আনুমানিক ১.২৬ কোটি নাবালক কাজ করছে, যাদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ মেয়ে । শিশু শ্রম নিয়োগ না করে তাদের শিক্ষা ও বিকাশে সহায়তা করা সামাজিক দায়িত্ব।

অধিকার ও কর্তব্য: উভয় পক্ষের দায়িত্ব

নিয়োগকর্তার দায়িত্ব

নিয়োগকর্তাদের অবশ্যই নিয়োগের এক মাসের মধ্যে District Board এ গৃহকর্মী নিবন্ধন করতে হবে । নিরাপদ ও শোষণমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা নিয়োগকর্তার আইনি বাধ্যবাধকতা । কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা প্রদান POSH Act অনুযায়ী করতে হবে ।

গৃহকর্মীর অধিকার

সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালের Ajay Malik মামলায় গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামোর জরুরি প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে । গৃহকর্মীরা ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্য সেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকারী । তাদের কাজের সময় নির্ধারিত, সাপ্তাহিক ছুটি এবং কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার রয়েছে ।

বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা

যেকোনো সমস্যা বা বিরোধের ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের কল্যাণ বোর্ড ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ফোরামে যোগাযোগ করা যেতে পারে । কর্ণাটক ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স বিল অনুযায়ী লেবার কাম সোশ্যাল সিকিউরিটি অফিসার নিয়োগ করা হবে যারা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করতে পারবেন । পরিদর্শককে বাধা দেওয়া তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ₹২০,০০০ জরিমানার কারণ হতে পারে ।

প্রশিক্ষণ ও অভিযোজন

প্রথম দিনের প্রস্তুতি

নতুন গৃহকর্মী যোগদানের পর তাকে পরিবারের সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন এবং ঘরের নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করুন । বিশেষ নির্দেশনা যেমন খাবারের পছন্দ-অপছন্দ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিন । একটি সুষ্ঠু অভিযোজন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে তারা প্রথম দিন থেকেই আপনার প্রত্যাশা বুঝতে পারে ।

দক্ষতা উন্নয়ন

গৃহকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করলে তাদের কাজের মান বৃদ্ধি পায় । রান্নার বিশেষ পদ্ধতি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার বা শিশু যত্নের আধুনিক পদ্ধতি শেখানো উপকারী । অনেক সংস্থা গৃহকর্মীদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে।

সম্মানজনক আচরণ ও কর্মপরিবেশ

মানবিক ব্যবহার

সুপ্রিম কোর্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে শুধু আইন যথেষ্ট নয়, গৃহকর্মীদের অন্যান্য শ্রমিকদের মতো সম্মান ও অধিকারসহ আচরণ করা প্রয়োজন । তাদের সাথে সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করুন এবং কোনোভাবেই অপমানজনক আচরণ করবেন না । মনে রাখবেন, তারাও মানুষ এবং তাদের আত্মসম্মান রয়েছে।

পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রাম

লিভ-ইন গৃহকর্মীদের জন্য পুষ্টিকর খাবার এবং উপযুক্ত থাকার ব্যবস্থা করুন । অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং জরুরি অবস্থায় সাহায্য করা মানবিকতার দাবি । তাদের ব্যক্তিগত স্থান এবং গোপনীয়তা সম্মান করুন।

আইনি সচেতনতা ও বর্তমান উন্নয়ন

নতুন আইনি কাঠামো

কর্ণাটক রাজ্য ২০২৫ সালে Domestic Workers Bill পাস করেছে যা বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পেনশন প্রদান করে । দিল্লিরও Domestic Workers Regulation of Work and Social Security Bill, 2022 খসড়া পর্যায়ে রয়েছে । এই আইনগুলো গৃহকর্মীদের মর্যাদা এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে ।

ই-শ্রম পোর্টাল নিবন্ধন

ভারত সরকারের ই-শ্রম পোর্টাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের নিবন্ধনের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ যেখানে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২.৮১ কোটি গৃহকর্মী নিবন্ধিত হয়েছে । নিয়োগকর্তাদের উচিত তাদের গৃহকর্মীদের এই পোর্টালে নিবন্ধন করতে সহায়তা করা যাতে তারা সরকারি সুবিধা পেতে পারে ।

সচেতনতা ও সতর্কতা

সন্দেহজনক আচরণ শনাক্তকরণ

গৃহকর্মীর গতিবিধি নিয়মিত লক্ষ রাখুন । অস্বাভাবিক ফোন কল, অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ, ঘন ঘন অনুপস্থিতি বা মূল্যবান জিনিসপত্রের প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ সন্দেহজনক লক্ষণ হতে পারে । তবে অযথা সন্দেহ বা অবিশ্বাসও কর্মপরিবেশ নষ্ট করে, তাই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

নিয়মিত যোগাযোগ

গৃহকর্মীর সাথে নিয়মিত কথা বলুন এবং তাদের সমস্যা শুনুন । খোলামেলা যোগাযোগ বিশ্বাস তৈরি করে এবং যেকোনো সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে সমাধান করতে সাহায্য করে । মাসে অন্তত একবার কাজের মান পর্যালোচনা করুন এবং প্রয়োজনীয় ফিডব্যাক দিন।

পরিবর্তন ও সমাপ্তি

চাকরি ছাড়ার নোটিস পিরিয়ড

চুক্তিপত্রে নোটিস পিরিয়ড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন । সাধারণত ১৫-৩০ দিনের নোটিস যুক্তিসংগত বলে বিবেচিত হয় । আকস্মিক প্রস্থান এড়াতে এই নিয়ম উভয় পক্ষের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

চাকরি শেষে প্রাপ্য অধিকার

চাকরি শেষ হওয়ার সময় সকল বকেয়া বেতন, বোনাস বা অন্যান্য প্রাপ্য পরিশোধ করুন এবং অভিজ্ঞতা সনদ প্রদান করুন । ভালো কাজের জন্য ইতিবাচক রেফারেন্স দেওয়া তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানে সহায়ক হয় । থানায় জমা দেওয়া তথ্য আপডেট করতে ভুলবেন না।

গৃহকর্মী নিয়োগ একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত যা পরিবারের নিরাপত্তা ও সুবিধা উভয়কেই প্রভাবিত করে। সঠিক পরিচয় যাচাইকরণ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, লিখিত চুক্তিপত্র এবং ন্যায্য মজুরি প্রদান করে আপনি একদিকে যেমন পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন, অন্যদিকে গৃহকর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করতে পারেন । ভারতে প্রায় ৫ কোটি গৃহকর্মী কর্মরত রয়েছেন যারা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাদের সাথে মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব । সুপ্রিম কোর্ট ও নতুন আইনি কাঠামো গৃহকর্মীদের সুরক্ষার উপর জোর দিচ্ছে, যা নিয়োগকর্তাদেরও অনুসরণ করা উচিত । সঠিক প্রক্রিয়া মেনে, আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করে এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে গৃহকর্মী নিয়োগ করলে একটি নিরাপদ, সুষ্ঠু ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ তৈরি হয় যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন