মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে অবস্থিত সমাধিটি সরানোর দাবি নিয়ে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সক্রিয় কর্মী কেতন টিরোদকার বোম্বে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন, যাতে আওরঙ্গজেবের সমাধি ভেঙে ফেলার এবং এটিকে জাতীয় স্মারক তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীর যুক্তি অনুসারে, এই সমাধিটি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) আইন, ১৯৫৮-এর ৩ ধারা অনুযায়ী “জাতীয় গুরুত্ব” সংজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবেদনে বলা হয়েছে, “আওরঙ্গজেবের সমাধিকে জাতীয় স্মারক হিসেবে বিবেচনা করা, যা জাতীয় গুরুত্ব ইঙ্গিত করে, তা নিজেদের উপর একটি আত্ম-অপমান”।
এই বিতর্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এক সত্য হল – খুলদাবাদে অবস্থিত আওরঙ্গজেবের সমাধির দেখভাল একটিই পরিবার ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে করে আসছে। আহমেদ পরিবার সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই এই কাজ বংশপরম্পরায় করে আসছে। পরিবারের সদস্য পারভেজ আহমেদ জানিয়েছেন, তাদের পরিবার “বংশানুক্রমিক সেবক” হিসেবে সমাধির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হল, এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের সমাধি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার বা ওয়াকফ বোর্ড থেকে কোনো ভাতা বা সাহায্য পায়নি এই পরিবার।
সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দল সমাধিটি অপসারণের দাবি জানিয়েছে। তারা আওরঙ্গজেবের অতীত কার্যকলাপ, বিশেষত মরাঠা রাজা ছত্রপতি সম্ভাজী মহারাজের হত্যা এবং হিন্দু মন্দির ভাঙার অভিযোগে এই দাবি তুলেছে11। এই সংগঠনগুলি মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে সমাধি অপসারণের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং দাবি পূরণ না হলে ‘কারসেবা’ ও রাজ্যব্যাপী বিক্ষোভের হুমকি দিয়েছে।
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক বলিউড চলচ্চিত্র ‘ছাবা’-র প্রকাশের পর, যেখানে ১৭শ শতাব্দীর মুঘল শাসকের চিত্রায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নাগপুরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে, যার ফলে শহরের বিভিন্ন অংশে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস এই প্রসঙ্গে বলেছেন, যদিও তিনি অনুভূতির সাথে একমত, তবুও সমাধিটি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) এর সুরক্ষিত স্মারক এবং এর বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ আইনি প্রক্রিয়া মেনে করতে হবে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আথাওয়ালে সমাধি ধ্বংসের দাবির বিরোধিতা করেছেন, বলে যে এর অপসারণ কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে না। তিনি আরও বলেছেন যে এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আওরঙ্গজেবের সমাধি ‘দ্য অ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্টস অ্যান্ড আর্কিওলজিক্যাল সাইটস অ্যান্ড রিমেইনস অ্যাক্ট, ১৯৫৮’ অনুসারে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। আইনের ১৬, ২০এ, এবং ২০বি ধারাগুলি স্থানটির ধর্মীয় প্রকৃতি রক্ষা করে এবং এর চরিত্রের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো পরিবর্তন নিষিদ্ধ করে। প্রজেক্ট মিশকাতের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. নিজামুদ্দিন আহমদ সিদ্দিকীর মতে, ১৯৯১ সালের পূজাস্থল আইন আরও সমাধির অবস্থানকে সুরক্ষিত করে।
বর্তমানে সমাধির নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ধাতব ব্যারিকেড স্থাপন করেছে, যানবাহন চলাচল সীমিত করেছে এবং ভাঙচুর বা সহিংসতা রোধে অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করেছে। দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং তাদের পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। এটি প্রথমবার নয় যে সমাধিটি হুমকির মুখে পড়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে, একটি ডানপন্থী গোষ্ঠী সাইটটি ভাঙচুর করার চেষ্টা করেছিল, যার ফলে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) অস্থায়ীভাবে এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। সরকার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরই স্থানটি পুনরায় খোলা হয়েছিল।
আওরঙ্গজেবের সমাধি নিয়ে এই রাজনৈতিক বিতর্ক শীঘ্রই শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও বিজেপি সরকার আইনি ও ঐতিহাসিক কারণে অফিসিয়ালভাবে সমাধি ধ্বংস নাও করতে পারে, তবে আওরঙ্গজেবের কোনো আরও মহিমান্বিতকরণ রোধে কঠোরতর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
এই বিতর্ক মহারাষ্ট্রের মরাঠা ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত ভারত শাসন করেছিলেন এবং ভারতীয় ইতিহাসে তিনি একজন সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর আমলে মরাঠাদের সাথে সংঘর্ষ এবং শিবাজী মহারাজের পুত্র সম্ভাজীকে বন্দি, নির্যাতন ও হত্যা করার ইতিহাস আজও মহারাষ্ট্রে তীব্র অনুভূতি সৃষ্টি করে।
আপাতত, এই বিষয়টি গভীরভাবে আবেগপূর্ণ, রাজনৈতিক এবং মহারাষ্ট্রের মরাঠা ঐতিহ্যের সাথে জড়িত রয়েছে। ‘ছাবা’ চলচ্চিত্রের সাফল্য মরাঠা গর্বকে উদ্দীপিত করছে এবং বর্ধমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে, আওরঙ্গজেবের সমাধি নিয়ে বিতর্ক আগামী মাসগুলিতে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে থাকবে।