আমেরিকার ডলার আজ বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই প্রবল শক্তিশালী মুদ্রার জন্ম আমেরিকার মাটিতে হয়নি? এর শিকড় লুকিয়ে আছে ইউরোপের এক ছোট্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি শহরে, যার নাম সম্ভবত আপনি আগে কখনও শোনেননি। নিউ ইয়র্ক বা ওয়াশিংটন নয়—ডলারের সত্যিকারের জন্মস্থান হলো চেক প্রজাতন্ত্রের জোয়াকিমসথাল (Joachimsthal) বা বর্তমান নাম ইয়াকিমভ (Jáchymov)। ১৬শ শতাব্দীর এক রৌপ্য খনি থেকে শুরু করে আজকের বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার এই অবিশ্বাস্য যাত্রা হার মানাবে যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও।
এই প্রবন্ধে আমরা সেই অজানা ইতিহাস উন্মোচন করব, জানব কীভাবে এই শহরের মুদ্রা ‘থালার’ কালক্রমে ‘ডলারে’ রূপান্তরিত হলো এবং বর্তমানে এই ঐতিহাসিক শহরের অবস্থা কী। সাথে থাকছে ২০২৫ সালের সর্বশেষ অর্থনৈতিক তথ্য এবং পর্যটন পরিসংখ্যান।
ডলারের আঁতুড়ঘর: জোয়াকিমসথাল-এর উত্থান
১৬শ শতাব্দীর শুরুর দিক। ইউরোপ তখন মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। বোহেমিয়া রাজ্য (যা বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের অংশ) তখন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। এই অঞ্চলের ‘এরজগেবিরজ’ (Erzgebirge) বা ‘আকরিক পর্বতমালা’-তে হঠাৎ করেই এক বিপুল রৌপ্য ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়। সালটা ছিল ১৫১৬। এই আবিষ্কারের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
রৌপ্য জ্বর (Silver Rush)
আজকের সিলিকন ভ্যালিতে যেমন প্রযুক্তি নিয়ে উন্মাদনা, ১৫১৬ সালে জোয়াকিমসথালে শুরু হয়েছিল ‘সিলভার রাশ’। হাজার হাজার খনি শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং ভাগ্যান্বেষী মানুষ এই উপত্যকায় ভিড় জমাতে শুরু করেন। স্থানীয় অভিজাত কাউন্ট হিরোনিমাস শ্লিক (Count Hieronymus Schlick) এই সুযোগটি লুফে নেন। তিনি পবিত্র রোমান সম্রাটের কাছ থেকে মুদ্রা তৈরির বা মিন্টিং করার অনুমতি আদায় করেন।
১৫১৯-২০ সালের দিকে, কাউন্ট শ্লিক এবং তার পরিবার এই খনির রূপা দিয়ে এক বিশেষ ধরনের মুদ্রা তৈরি শুরু করেন। এই মুদ্রার নাম দেওয়া হয় ‘জোয়াকিমসথালার’ (Joachimsthaler), যার আক্ষরিক অর্থ ‘জোয়াকিমের উপত্যকা থেকে আগত’।
ডলারের দাপটে টাকার দামে ঐতিহাসিক পতন! আপনার জীবনে এর প্রভাব কী? জানুন বিশদে
মুদ্রার গঠন ও মান
সেই সময় ইউরোপে মুদ্রার ওজনে কোনো সমতা ছিল না। কিন্তু জোয়াকিমসথালার ছিল ব্যতিক্রম।
-
ওজন: প্রায় ২৯.২ গ্রাম (যা পরে সামান্য পরিবর্তিত হয়)।
-
বিশুদ্ধতা: অত্যন্ত উচ্চমানের রূপা দিয়ে তৈরি।
-
ডিজাইন: এক পিঠে বোহেমিয়ান সিংহ এবং অন্য পিঠে সেন্ট জোয়াকিমের ছবি।
এই মুদ্রার মান এবং ওজনের নিশ্চয়তা এতই প্রবল ছিল যে, এটি দ্রুতই ইউরোপের বণিকদের পছন্দের মুদ্রায় পরিণত হয়।
নামের বিবর্তন: থালার থেকে ডলার
ভাষার বিবর্তন এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। ‘জোয়াকিমসথালার’ নামটি উচ্চারণে বেশ কঠিন ও দীর্ঘ ছিল। তাই বণিকরা একে সংক্ষেপে ডাকতে শুরু করেন ‘থালার’ (Thaler) নামে। এখান থেকেই শুরু হয় ডলার শব্দের বিশ্বজয়ের পালা।
ইউরোপীয় ভ্রমণ
জার্মান ‘থালার’ শব্দটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে এর রূপ বদলাতে থাকে:
-
হাঙ্গেরি: টালার (Tallér)
-
নেদারল্যান্ডস: ডালডার (Daalder) বা ডালার
-
ইতালি: টালিরো (Tallero)
-
স্ক্যান্ডিনেভিয়া: ডালার (Daler)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটে যখন ডাচ বা ওলন্দাজরা তাদের মুদ্রাকে ‘লায়ন ডালডার’ (Lion Daalder) বা ‘লিওউইন্ডালডার’ নামে ডাকতে শুরু করে। এই ডাচরাই যখন উত্তর আমেরিকায় বাণিজ্য করতে যায় এবং ‘নিউ আমস্টারডাম’ (বর্তমান নিউ ইয়র্ক) প্রতিষ্ঠা করে, তখন তারা সাথে করে এই শব্দটি নিয়ে যায়।
ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ
১৬০০ সালের দিকে শেক্সপিয়রের নাটকেও (ম্যাকবেথ ও টেম্পেস্ট) ‘ডলার’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তখনো এটি আমেরিকার মুদ্রা হয়ে ওঠেনি। ইংরেজরা মূলত স্প্যানিশ মুদ্রা ‘পিস অফ এইট’ (Piece of Eight) বা ‘রিয়েল দে আ ওচো’-কে ‘স্প্যানিশ ডলার’ বলে ডাকত, কারণ ওজনে ও মানে এটি জার্মান থালারের মতোই ছিল।
আমেরিকা কেন ‘পাউন্ড’ ছেড়ে ‘ডলার’ বেছে নিল?
আমেরিকা যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন তাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছিল—নতুন দেশের মুদ্রা কী হবে? ব্রিটিশ ‘পাউন্ড’ ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া ছিল পরাধীনতার প্রতীক।
১৭৯২ সালের কয়েনেজ অ্যাক্ট (Coinage Act of 1792)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতারা, বিশেষ করে টমাস জেফারসন এবং আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, একটি নতুন ও স্বতন্ত্র মুদ্রাব্যবস্থা চেয়েছিলেন। সেই সময় আমেরিকায় স্প্যানিশ ডলারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাই তারা ‘ডলার’ নামটিকেই গ্রহণ করেন। ১৭৯২ সালের ২ এপ্রিল, মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডলার’কে যুক্তরাষ্ট্রের একক মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করে।
মজার তথ্য: আমেরিকা যদি পাউন্ড রাখত, তবে আজকের বিশ্ব অর্থনীতি হয়তো অন্যরকম হতো। ‘ডলার’ নামটি গ্রহণ করার মাধ্যমে তারা মূলত সেই চেক শহরের ঐতিহ্যকেই নিজেদের করে নিয়েছিল।
ইয়াকিমভ: ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় ও মেরি কুরি
জোয়াকিমসথাল বা ইয়াকিমভ কেবল ডলারের জন্মস্থান হিসেবেই বিখ্যাত নয়, এর ইতিহাসের পাতায় লেগে আছে তেজস্ক্রিয়তা এবং ত্যাগের গল্প। ডলারের উজ্জ্বল ইতিহাসের ঠিক নিচেই চাপা পড়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়।
ইউরেনিয়াম এবং মেরি কুরি
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রূপা তোলার পর, খনিগুলোতে পাওয়া যায় এক কালো পাথর, যা খনি শ্রমিকরা ‘পিচব্লেন্ড’ (Pitchblende) নামে ডাকত এবং আবর্জনা মনে করে ফেলে দিত। কিন্তু এই আবর্জনাই ছিল বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। এই কালো পাথরই আসলে ইউরেনিয়াম আকরিক।
নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মেরি কুরি এবং তার স্বামী পিয়েরে কুরি তাদের গবেষণার জন্য এই ইয়াকিমভ খনি থেকেই টন কে টন পিচব্লেন্ড আনিয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালে, এই বর্জ্য পাথর থেকেই তারা আবিষ্কার করেন নতুন দুই মৌল—পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম। মেরি কুরির হাতে তেজস্ক্রিয়তার যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার উৎস ছিল ডলারের এই জন্মশহর।
‘ইয়াকিমভ হেল’ (Jáchymov Hell)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই শহরটি এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে থাকা চেকোস্লোভাকিয়া সরকার এখানে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে জোর করে ইউরেনিয়াম খনিতে কাজ করতে বাধ্য করে। কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই তেজস্ক্রিয় খনিতে কাজ করার ফলে অগণিত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই সময়কালকে স্থানীয়রা ‘ইয়াকিমভ হেল’ বা নরক বলে অভিহিত করেন।
বর্তমান ইয়াকিমভ: পর্যটন এবং অর্থনীতি
আজকের ইয়াকিমভ আর সেই মধ্যযুগীয় খনি শহর নেই, তবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৯ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) এই অঞ্চলটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা করে, যা এর পর্যটন গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
র্যাডন স্পা এবং সুস্থতা
বর্তমানে ইয়াকিমভ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন র্যাডন স্পা (Radon Spa) রিসোর্ট হিসেবে পরিচিত। খনি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় জল নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহার করে বিভিন্ন বাত ও স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা করা হয়। এটি এখন চেক প্রজাতন্ত্রের কার্লোভি ভ্যারি (Karlovy Vary) অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
পর্যটন পরিসংখ্যান (২০২৪-২০২৫)
চেক পরিসংখ্যান অফিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কার্লোভি ভ্যারি অঞ্চল (যেখানে ইয়াকিমভ অবস্থিত) পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
-
২০২৪ সালে পর্যটক সংখ্যা: প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক এই অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন।
-
গড় অবস্থান: পর্যটকরা গড়ে ৪.৯ দিন এই অঞ্চলে অবস্থান করেন, যা চেক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।
-
আকর্ষণ: পর্যটকরা এখন ‘রয়্যাল মিন্ট’ বা রাজকীয় টাকশাল জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারেন, যেখানে ডলারের পূর্বপুরুষ সেই ‘জোয়াকিমসথালার’ মুদ্রা সংরক্ষিত আছে।
এক টাকা বানাতে সরকারের কত টাকা খরচ? ভারতীয় মুদ্রা উৎপাদনের চমকপ্রদ তথ্য
বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের বর্তমান আধিপত্য (২০২৫)
ইয়াকিমভের সেই ছোট্ট রূপার মুদ্রা আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রিজার্ভ কারেন্সি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সর্বশেষ COFER (Currency Composition of Official Foreign Exchange Reserves) ডাটা (২০২৫ সালের রিপোর্ট) অনুযায়ী:
| মুদ্রার নাম | বৈশ্বিক রিজার্ভের অংশ (২০২৫) |
|---|---|
| মার্কিন ডলার (USD) | ৫৭.৭% – ৫৭.৮% |
| ইউরো (Euro) | ১৯.৮% – ২০.১% |
| অন্যান্য | বাকি অংশ |
যদিও ইউরো এবং অন্যান্য মুদ্রার উত্থান ঘটেছে, তবুও ডলার এখনো একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ৫০০ বছর আগে, চেক প্রজাতন্ত্রের এক পাহাড়ি উপত্যকায়।
রৌপ্য বাজার এবং মুদ্রার মান
ডলারের আদি পিতা ছিল রূপা। আজও রৌপ্য বা সিলভার বিশ্ব বাজারে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাতু। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিশ্ব বাজারে রূপার দাম প্রতি আউন্স প্রায় ৪৭ থেকে ৫১ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। যদিও ডলার এখন আর ‘গোল্ড’ বা ‘সিলভার’ স্ট্যান্ডার্ডে নেই (১৯৭১ সালে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বাতিল হয়), তবুও রূপার সাথে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত। চেক প্রজাতন্ত্রের এক নিভৃত পল্লী ‘জোয়াকিমসথাল’, যার নাম উচ্চার করতেই অনেকের দাঁত ভেঙে যায়, আজ সেই শহরের অপভ্রংশ নামেই পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মুদ্রা। খনি থেকে উঠে আসা রূপা, মেরি কুরির বিজ্ঞান সাধনা, স্নায়ুযুদ্ধের নির্মমতা এবং আজকের বিলাসবহুল স্পা—সবই মিলেমিশে আছে এই শহরে। পকেটে থাকা ডলার নোটটির দিকে তাকালে হয়তো জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি দেখা যায়, কিন্তু এর ডিএনএ-তে মিশে আছে মধ্যযুগীয় ইউরোপের সেই ‘থালার’ এবং কাউন্ট শ্লিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়, এটি ৫০০ বছরের এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের ধারক।











