কার্তিক পূজা, যা মূলত সন্তান কামনায় এবং সন্তানের মঙ্গলার্থে পালন করা হয়, প্রতি বছর বাংলা কার্তিক মাসের শেষ দিনে (সংক্রান্তি)-তে অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা দেব সেনাপতি কার্তিকের আরাধনা, যিনি শৌর্য, বীর্য এবং বিজয়ের প্রতীক। বাড়িতে এই পূজা করা অত্যন্ত সহজ, তবে এর জন্য প্রয়োজন কিছু বিশেষ নিয়ম ও পদ্ধতির সঠিক অনুসরণ। এই প্রবন্ধে আমরা ২০২৫ সালের কার্তিক পূজার সঠিক সময়সূচী, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং বাড়িতে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ পূজা করার শাস্ত্রীয় পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব, যাতে আপনার পূজা সঠিক ও ফলপ্রসূ হয়।
কার্তিক পূজা ২০২৫: তারিখ ও শুভ সময়
হিন্দু ধর্মে যেকোনো পূজা বা মাঙ্গলিক কাজের জন্য সঠিক সময় বা তিথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্তিক পূজা সাধারণত কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে, অর্থাৎ মাসের শেষ দিনে পালন করা হয়।
দৃক সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে, ২০২৫ সালে কার্তিক সংক্রান্তি পড়েছে ১৭ই নভেম্বর, সোমবার (বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩০শে কার্তিক, ১৪৩২)।
- সংক্রান্তির সময়: ১৭ই নভেম্বর, ২০২৫।
- পূজার শুভ সময়: দিনের বেলা এবং সন্ধ্যায়। যেহেতু এটি সংক্রান্তির পূজা, তাই সূর্যাস্তের সময়টিকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
পূজার আয়োজন এই বিশেষ সময়টিকে মাথায় রেখেই করা উচিত।
কে এই দেবতা কার্তিক? (Who is this Deity Kartik?)
ভারতীয় পুরাণ, বিশেষ করে শিব পুরাণ এবং স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, কার্তিকের জন্মকাহিনী অত্যন্ত অলৌকিক। তারকাসুর নামক এক ভয়ঙ্কর অসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা বিপন্ন, তখন ভগবান শিব ও মা পার্বতীর এক বিশেষ শক্তির প্রয়োজন হয় সেই অসুরকে বধ করার জন্য।
- জন্মের প্রেক্ষাপট: তারকাসুর বর পেয়েছিলেন যে তাকে কেবল শিবের পুত্রই বধ করতে পারবে। ভগবান শিবের তপস্যা ভঙ্গ করে মা পার্বতীর সাথে তার বিবাহের পর, শিবের ঐশ্বরিক শক্তিপুঞ্জ (তেজ) নির্গত হয়।
- অগ্নি ও গঙ্গার ভূমিকা: সেই তেজ এতই প্রখর ছিল যে অগ্নিদেব পর্যন্ত তা ধারণ করতে অক্ষম হন। তিনি তা দেবী গঙ্গাকে অর্পণ করেন। গঙ্গাও সেই তেজ ধারণ করতে না পেরে অবশেষে তাকে শরবনের (কাশবনের) মধ্যে এক সরোবরে নিক্ষেপ করেন।
- ছয় কৃত্তিকার লালন-পালন: সেই তেজোময় শক্তিপুঞ্জ ছয়টি পৃথক অগ্নিপিণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছয়টি দিব্য শিশুর জন্ম দেয়। এই ছয় শিশুকে ছয় কৃত্তিকা (নক্ষত্রপুঞ্জের দেবী) খুঁজে পান এবং সন্তানস্নেহে লালন-পালন করেন।
- একীভূত রূপ: যখন মা পার্বতী তাদের দেখতে পান, তিনি মাতৃস্নেহে ছয় শিশুকে একত্রে আলিঙ্গন করেন। ফলস্বরূপ, ছয়টি শিশু একীভূত হয়ে ছয় মাথা (ষড়ানন) বিশিষ্ট এক দিব্য বালকে রূপান্তরিত হয়। কৃত্তিকাদের দ্বারা পালিত হয়েছিলেন বলে তার নাম হয় ‘কার্তিক’।
কার্তিকের প্রতীকী তাৎপর্য
কার্তিকের প্রতিটি রূপ এবং অস্ত্র গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে:
- ময়ূর (বাহন): ময়ূর অহংকার ও গর্বের প্রতীক। কার্তিক ময়ূরকে নিজের বাহন বানিয়ে অহংকারকে দমন করার শিক্ষা দেন।
- ভেল বা বর্শা: এটি তার প্রধান অস্ত্র, যা ‘শক্তি’ নামেও পরিচিত। এই বর্শা একাগ্রতা, জ্ঞান এবং লক্ষ্যভেদের প্রতীক। এটি অজ্ঞতার অন্ধকারকে ভেদ করে।
- দেব সেনাপতি: তিনি দেবতাদের সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই তিনি শৌর্য, শৃঙ্খলা, সঠিক নেতৃত্ব এবং বিজয়ের প্রতীক।
কেন কার্তিক পূজা করা হয়? (Why is Kartik Puja Performed?)
পশ্চিমবঙ্গে কার্তিক পূজার প্রচলন বিভিন্ন কারণে হলেও, এর মূল তাৎপর্য কয়েকটি বিষয়ের উপর কেন্দ্রীভূত।
সন্তান লাভের আশায়
পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে, কার্তিককে উর্বরতা এবং সন্তান উৎপাদনের দেবতা হিসেবে মানা হয়। অনেক নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভের আশায় এই ব্রত বা পূজা পালন করেন। বিশ্বাস করা হয়, ভক্তিতে তুষ্ট হলে তিনি “কোল আলো করে” সন্তান দেন। এই কারণে অনেক প্রাচীন বাড়ির পূজায় কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি নতুন সন্তানের প্রতীক হিসেবে আনা হতো।
সন্তানের মঙ্গল কামনায়
কেবল নতুন সন্তান নয়, বরং বিদ্যমান সন্তানের মঙ্গল, তাদের স্বাস্থ্য, শৌর্য এবং জীবনে সাফল্যের জন্যও মায়েরা কার্তিকের পূজা করেন। দেব সেনাপতি হিসেবে তিনি সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তাই মায়েরা তাদের সন্তানদের সুরক্ষার জন্য কার্তিকের কাছে প্রার্থনা জানান।
শৌর্য, বীর্য ও বিজয়ের প্রতীক
যেহেতু তিনি দেব সেনাপতি, তাই কার্তিক শক্তি, সাহস এবং বিজয়ের চূড়ান্ত প্রতীক। প্রাচীনকালে যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে তার পূজা করতেন। বর্তমানে, জীবনের যেকোনো প্রতিকূলতা, শত্রু (অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক) বা বাধাকে অতিক্রম করার জন্য মানসিক শক্তি অর্জনেও তার আরাধনা করা হয়।
বাড়িতে কার্তিক পূজার আয়োজন (Arranging Kartik Puja at Home)
বাড়িতে কার্তিক পূজা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। এর জন্য বিশাল আয়োজন বা আড়ম্বরের প্রয়োজন নেই, ভক্তিতেই মূল কাজ। নিচে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো।
পূজার আগের প্রস্তুতি (Pre-Puja Preparation)
১. উপবাস: পূজার দিন পরিবারের কর্তা বা যিনি পূজা করবেন, তাকে সারাদিন উপবাস থাকতে হয়। পূজা শেষ হওয়ার পর প্রসাদ গ্রহণ করে উপবাস ভঙ্গ করা হয়।
২. স্থান পরিষ্কার: বাড়িঘর, বিশেষ করে পূজার স্থানটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নিতে হবে। সাধারণত বাড়ির ঠাকুরঘর বা বসার ঘরের কোনো পবিত্র কোণ (বিশেষত ঈশান কোণ বা উত্তর-পূর্ব কোণ) বেছে নেওয়া হয়।
৩. আলপনা: পূজার স্থানে চালের গুঁড়ো দিয়ে সুন্দর আলপনা আঁকা হয়। কার্তিকের পূজায় ময়ূর, বর্শা বা পদ্মের আলপনা আঁকার প্রচলন রয়েছে।
৪. সামগ্রী সংগ্রহ: পূজার আগেই সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ গুছিয়ে রাখা উচিত।
প্রয়োজনীয় উপকরণের সম্পূর্ণ তালিকা (Complete List of Required Items)
পূজার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলি নিচে একটি সারণিতে দেওয়া হলো:
| বিভাগের নাম | প্রয়োজনীয় সামগ্রী |
| মূল উপকরণ | কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি বা ছবি, একটি ছোট ঘট (মাটি বা ধাতব), ঘট স্থাপনের জন্য মাটি বা বালি। |
| ফসল ও ফল | ধান, দূর্বা, আম্রপল্লব (৫টি), একটি গোটা নারকেল (সশীষ), টোপা কুল, কলা (অন্যান্য মরসুমী ফল যেমন আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি)। |
| পূজার বাসন | কোশাকুশি, তাম্রপাত্র, পঞ্চপ্রদীপ, ধূপদানি, আরতির থালা। |
| ভোগ/নৈবেদ্য | মিষ্টি (সন্দেশ, নাড়ু, মোয়া), বাতাসা, জল, দুগ্ধজাতীয় ভোগ (পায়েস বা ক্ষীর)। |
| ফুল ও পাতা | বিভিন্ন ধরনের মরসুমী ফুল, গাঁদা ফুলের মালা, বেলপাতা। |
| অন্যান্য সামগ্রী | ধূপ, ধুনো, কর্পূর, প্রদীপ, ঘি বা সরষের তেল, সলতে, সিঁদুর, চন্দন, একটি নতুন গামছা বা বস্ত্র, পান, সুপারি, এক টাকার মুদ্রা। |
পূজার মূল পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
বাড়িতে পূজা করার জন্য পুরোহিতের প্রয়োজন হতে পারে, তবে যদি শাস্ত্রীয় জ্ঞান থাকে বা সহজভাবে পূজা করতে চান, তবে এই পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করা যেতে পারে:
১. ঘট স্থাপন:
- প্রথমে পূজার স্থানে মাটি বা বালির একটি ছোট বেদী তৈরি করে তার উপর ঘটটি স্থাপন করুন।
- ঘটের মধ্যে গঙ্গাজল (বা শুদ্ধ জল) পূর্ণ করুন।
- এর মধ্যে একটি পান, সুপারি, দূর্বা, ফুল এবং একটি মুদ্রা দিন।
- ঘটের মুখে পাঁচটি আম্রপল্লব রাখুন।
- তার উপর একটি সশীষ নারকেল (সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে) স্থাপন করুন।
২. কার্তিক স্থাপন:
- কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি বা ছবিটি ঘটের পাশে একটি ছোট জলচৌকি বা পরিষ্কার আসনে স্থাপন করুন। মূর্তিকে নতুন বস্ত্র (যদি থাকে) পরান।
৩. সংকল্প (Sankalpa):
- পূজা শুরুর আগে যিনি পূজা করছেন, তিনি হাতে জল, ফুল, দূর্বা ও তিল নিয়ে সংকল্প মন্ত্র পাঠ করবেন।
- সংকল্পের মূল ভাব হলো: “আমি (নিজের নাম), (নিজের গোত্র) গোত্রীয়, আমার পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনায় (বা বিশেষ কোনো কামনা যেমন সন্তান লাভ) আজ কার্তিক সংক্রান্তির এই শুভ তিথিতে ভগবান কার্ত্তিকেয়ের পূজা করছি।”
- যদি সংস্কৃত মন্ত্র না জানা থাকে, তবে মনে মনে এই প্রার্থনা জানিয়ে জল, ফুল ঠাকুরের পায়ে নিবেদন করুন।
৪. দেবতার আবাহন (Invocation):
- “ওঁ কার্ত্তিকেয়, ইহাগচ্ছ ইহাগচ্ছ, ইহ তিষ্ঠ ইহ তিষ্ঠ…” মন্ত্রে বা মনে মনে দেবতাকে পূজার আসনে বসার জন্য আহ্বান জানান।
৫. পঞ্চোপচার বা ষোড়শোপচার পূজা:
শাস্ত্রীয় পূজায় ১৬টি ধাপে (ষোড়শোপচার) পূজা করা হয়। তবে বাড়িতে সহজভাবে ৫টি ধাপে (পঞ্চোপচার) পূজা করা যায়।
- গন্ধ (Gandha): চন্দনের ফোঁটা কার্তিকের মূর্তিতে বা পায়ে দিন। (মন্ত্র: এষ গন্ধঃ ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ)
- পুষ্প (Pushpa): ফুল ও বেলপাতা তার চরণে অর্পণ করুন। (মন্ত্র: এতৎ পুষ্পং ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ)
- ধূপ (Dhupa): ধূপকাঠি জ্বেলে দেবতাকে দেখান। (মন্ত্র: এষ ধূপঃ ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ)
- দীপ (Dipa): প্রদীপ জ্বেলে দেবতাকে দেখান। (মন্ত্র: এষ দীপঃ ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ)
- নৈবেদ্য (Naivedya): ফল, মিষ্টি, জল এবং মূল ভোগ নিবেদন করুন। (মন্ত্র: এতৎ নৈবেদ্যং ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কার্তিক পূজায় “টোপা কুল” বা গোটা বরই নিবেদন করা একটি বিশেষ প্রথা, যা উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬. ভোগ নিবেদন:
সমস্ত ভোগ সাজিয়ে ঠাকুরের সামনে নিবেদন করার পর, জল দিয়ে তিনবার উৎসর্গ করতে হয়।
৭. আরতি ও পূজা সমাপন:
- পূজা সম্পন্ন হলে, পঞ্চপ্রদীপ, ধূপ, কর্পূর এবং জলশঙ্খ দিয়ে কার্তিকের আরতি করুন।
- আরতির সময় শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনি করা মঙ্গলজনক।
- আরতি শেষে পরিবারের সকলে মিলে পুষ্পাঞ্জলি দিন।
সন্তান চান? এই ৭টি অভ্যাস বদলে ফেলুন আজই!
কার্তিক পূজার মন্ত্র ও পুষ্পাঞ্জলি (Mantras and Pushpanjali)
পূজার সময় সঠিক মন্ত্র উচ্চারণ করা বাঞ্ছনীয়। যদি সংস্কৃত মন্ত্র কঠিন মনে হয়, তবে সরল বাংলাতেও প্রার্থনা করা যায়।
মূল মন্ত্র (Main Mantra)
পূজার সময় বারবার এই সহজ মন্ত্রটি জপ করতে পারেন:
“ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ।”
কার্তিক ধ্যান মন্ত্র (Dhyan Mantra)
পূজার শুরুতে বা পুষ্পাঞ্জলির আগে এই ধ্যান মন্ত্র পাঠ করা হয়:
ওঁ কার্ত্তিকেয়ং মহাভাগং ময়ূরোপরিসংস্থিতম্।
তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভং শক্তিহস্তং বরপ্রদম্।।
দ্বিভুজং শত্রুহন্তারং নানালঙ্কারভূষিতম্।
প্রসন্নবদনং দেবং কুমারং পুত্রদায়কম্।।
সরল অর্থ: “আমি সেই মহাভাগ কার্তিকের ধ্যান করি, যিনি ময়ূরের উপর আসীন। তার গায়ের রঙ তপ্ত সোনার মতো উজ্জ্বল এবং তার হাতে বরপ্রদায়ী ‘শক্তি’ নামক অস্ত্র। তিনি দ্বিভুজ, শত্রু বিনাশকারী এবং বিভিন্ন অলঙ্কারে ভূষিত। সেই প্রসন্নমুখ, পুত্রদায়ক কুমার দেবকে আমি প্রণাম করি।”
পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র (Pushpanjali Mantra)
(তিনবার ফুল, বেলপাতা ও জল সহকারে নিবেদন করুন)
ওঁ কার্ত্তিকেয় মহাভাগ, দেব সেনাপতে প্রভো।
পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি, সর্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।।
ময়ূরবাহনং দেবং, সর্বশাস্ত্রবিশারদম্।
তারকাসুরসংহারং, কার্ত্তিকেয়ং নমাম্যহম্।।
(নিজের নাম ও গোত্র) এতৎ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি ওঁ কার্ত্তিকেয়ায় নমঃ।।
প্রণাম মন্ত্র (Pranam Mantra)
ওঁ দেব সেনাপতে স্কন্দ, কার্ত্তিকেয় অমোঘবিক্রম।
রিপুসংহারকর্ত্তশ্চ, রক্ষ মাং শরননাগতম্।।
পুত্রপৌত্রপ্রদাতারং, সর্বকামফলপ্রদম্।
প্রণমামি সদা ভক্ত্যা, কার্ত্তিকেয়ং সুরেশ্বরম্।।
কার্তিক পূজার সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
কার্তিক পূজা কেবল বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি বর্ণময় সামাজিক এবং লোকসাংস্কৃতিক দিকও রয়েছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে।
কাটোয়ার ‘কার্তিক লড়াই’
পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া (Katwa) শহরের কার্তিক পূজা বিশ্বখ্যাত। এখানে এই পূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্তরের চেয়ে অনেক বড়, এটি একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। একে “কার্তিক লড়াই” বলা হয়।
- ঐতিহ্য: এটি প্রায় ২৫০-৩০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য।
- বিশেষত্ব: বিভিন্ন পাড়া বা সমিতি (Club) বিশাল এবং শৈল্পিক কার্তিক মূর্তি তৈরি করে। সংক্রান্তির রাতে, সেই মূর্তিগুলি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে শহর পরিক্রমা করে।
- লড়াই: “লড়াই” শব্দটি আসলে শৈল্পিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বোঝায়। কোন পাড়ার মূর্তি এবং শোভাযাত্রা সবচেয়ে সুন্দর, তার একটি অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসে এবং এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন।
দক্ষিণ ভারত বনাম বাংলা
যুক্তিযুক্তভাবে বলা যায়, কার্তিকের আরাধনা দক্ষিণ ভারতে (বিশেষত তামিলনাড়ুতে) অনেক বেশি প্রাচীন এবং বিস্তৃত।
- তামিলনাড়ুতে: তিনি ‘মুরুগান’ (Murugan) বা ‘সুব্রহ্মণ্যম’ নামে পূজিত। তিনি তামিলদের প্রধান এবং প্রাচীনতম দেবতাদের একজন। সেখানে তিনি মূলত জ্ঞানের দেবতা এবং রক্ষাকর্তা। ‘স্কন্দ ষষ্ঠী’ হলো তার উদ্দেশ্যে পালিত প্রধান উৎসব।
- বাংলায়: বাংলায় তার রূপ কিছুটা ভিন্ন। এখানে তিনি ‘বাবু কার্তিক’ নামেও পরিচিত। তার মূর্তিতে একটি ধোপদুরস্ত, শৌখিন ভাব দেখা যায়। দেব সেনাপতির যোদ্ধৃরূপের চেয়ে তার সন্তানদাতার রূপটিই এখানে বেশি জনপ্রিয়।
মেয়ে সন্তান হওয়ার লক্ষণ: জীবনের অন্যতম সুন্দর একটা অধ্যায়
পূজা-পরবর্তী নিয়মাবলী এবং বিসর্জন
পূজার পরের দিন বা নির্দিষ্ট সময় পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
১. পূজা সমাপন: পূজার শেষে আরতি করে, দেবতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পূজা শেষ করতে হয়।
২. প্রসাদ বিতরণ: পূজা শেষ হলে প্রথমে উপবাস ভঙ্গকারী প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এরপর প্রতিবেশি এবং আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা আবশ্যক।
৩. বিসর্জন: সাধারণত পূজার পরের দিন মূর্তি বা ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়। কোনো নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে মন্ত্র পাঠ করে (“ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং…” অর্থাৎ, “হে দেবতা, এবার নিজের স্থানে গমন করুন”) বিসর্জন দেওয়া হয়। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ঘটের জল কোনো পবিত্র গাছের গোড়ায় (যেমন তুলসী গাছ) দেওয়া যেতে পারে।
কার্তিক পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সন্তান কামনার আর্তি থেকে শুরু করে জীবনের সমস্ত বাধাবিপত্তি জয়ের প্রার্থনা—এই সবকিছুই দেব সেনাপতি কার্তিকের আরাধনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বাড়িতে এই পূজার আয়োজন করা অত্যন্ত সহজ এবং এর জন্য আড়ম্বরের চেয়ে ভক্তি ও নিষ্ঠাই প্রধান। সঠিক পদ্ধতি, শুদ্ধ মন্ত্র এবং পবিত্র মন নিয়ে এই ব্রত পালন করলে তা অবশ্যই ফলপ্রসূ হয় এবং পরিবারের সার্বিক মঙ্গল সাধন করে।











