নতুন মায়ের কোলে সদ্যোজাত সন্তান—এই দৃশ্য পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও মায়েদের শরীরে নানা রকম অস্বস্তি দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা সিজার বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের অনেকেই একটি সাধারণ সমস্যায় ভোগেন। সেটি হলো পা ফুলে যাওয়া। গর্ভাবস্থায় শরীরে বাড়তি তরল জমে যাওয়া এবং অপারেশনের সময় দেওয়া স্যালাইনের কারণে এই সমস্যা প্রকট হয়। তাই সঠিক সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় জানাটা প্রত্যেক নতুন মায়ের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
পা ভারী লাগা, গোড়ালি ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া বা পায়ে ব্যথা অনুভব করা প্রসব পরবর্তী সময়ের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পোস্টপার্টাম এডিমা’ (Postpartum Edema) বলা হয় । অনেকে ঘাবড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু করেন, যা নতুন মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে ভয়ের কিছু নেই। সঠিক যত্ন, কিছু ঘরোয়া টোটকা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মেনে চললে খুব দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এই লেখায় আমরা সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। কীভাবে আপনি নিজের যত্ন নেবেন, কোন ব্যায়ামগুলো করবেন এবং কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি—সবকিছুই ধাপে ধাপে জেনে নেব।
সিজারের পর পা ফুলে যাওয়ার মূল কারণগুলো কী কী?
পা ফোলার সমস্যাটি কেন হয়, তা বোঝা গেলে এর সমাধান করা অনেক সহজ হয়ে যায়। গর্ভাবস্থায় এবং সিজারিয়ান ডেলিভারির সময় শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে, যা সরাসরি পায়ের ফোলাভাবের জন্য দায়ী । প্রতিটি কারণের পেছনে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি রয়েছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. গর্ভাবস্থার হরমোনাল পরিবর্তন
গর্ভাবস্থায় মায়েদের শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো শরীরে অতিরিক্ত জল ধরে রাখতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে শরীরে সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০% বেশি রক্ত এবং তরল উৎপন্ন হয়, যা পেলভিক জয়েন্ট এবং টিস্যুগুলোকে নরম করে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করে। বাচ্চা হওয়ার পর এই বাড়তি তরল একদিনে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না, যার ফলে তা পায়ের দিকে জমা হতে থাকে।
২. আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইনের প্রভাব
সিজার অপারেশনের সময় মায়েদের শরীরে আইভি ফ্লুইড (IV Fluid) বা স্যালাইন দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের সময় যেন শরীরে জলের ঘাটতি না হয় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে, সেই কারণে স্যালাইন দেওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু এই অতিরিক্ত তরল শরীরের কোষে গিয়ে জমা হয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে এই তরল স্বাভাবিকভাবেই পায়ের পাতা এবং গোড়ালির দিকে নেমে আসে এবং পা ফুলে যায়।
৩. রক্ত সঞ্চালনে ধীরগতি বা বাধা
সিজারের পর মায়েদের টানা কয়েকদিন বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতে হয়। অস্ত্রোপচারের কাটা জায়গায় ব্যথার কারণে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করা সম্ভব হয় না। একটানা শুয়ে থাকার কারণে পায়ের দিকের রক্ত সঞ্চালন (Blood Circulation) কমে যায় । শিরাগুলো সঠিকভাবে তরল ওপরের দিকে বা হার্টের দিকে পাম্প করে পাঠাতে পারে না। ফলে পায়ে জল জমে ফোলাভাব দেখা দেয়।
৪. জরায়ুর আকার বৃদ্ধি ও শিরার ওপর চাপ
গর্ভাবস্থায় জরায়ু বা ইউটেরাস অনেক বড় হয়ে যায়। বড় জরায়ু শরীরের নিচের দিকের একটি প্রধান শিরা বা ‘ইনফিরিয়র ভেনাকাভা’-র ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করে। এই শিরাটি পায়ের দিক থেকে রক্ত হার্টে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। চাপের কারণে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পায়ে তরল জমতে শুরু করে। প্রসবের পর জরায়ু সাথে সাথেই আগের আকারে ফিরে যায় না, তাই শিরার ওপর চাপ বেশ কয়েকদিন থেকেই যায়।
সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায়: দ্রুত আরাম পাওয়ার ১০টি কার্যকরী পদ্ধতি
নতুন মায়েদের শরীরের যত্ন নেওয়া এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার। আপনি যদি সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় খুঁজছেন, তবে নিচের পদ্ধতিগুলো আপনার জন্য জাদুর মতো কাজ করতে পারে। এগুলো ঘরে বসেই সহজে করা যায় এবং বেশ নিরাপদ ।
১. পা উঁচু করে বিশ্রাম নেওয়া (Leg Elevation)
পা ফোলা কমানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো পা হার্টের স্তরের চেয়ে উঁচুতে রাখা । মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পায়ে যে তরল জমে থাকে, পা উঁচু করলে তা সহজে আবার রক্তপ্রবাহে ফিরে আসতে পারে।
বিছানায় শোয়ার সময় পায়ের নিচে দুই থেকে তিনটি বালিশ দিয়ে রাখুন । চেষ্টা করুন দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ বার, ২০-৩০ মিনিটের জন্য এইভাবে শুয়ে থাকতে। তবে খেয়াল রাখবেন, বালিশ যেন নরম হয় এবং হাঁটুর নিচে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। চেয়ারে বসার সময়ও পায়ের নিচে একটি ছোট টুল বা মোড়া ব্যবহার করতে পারেন।
২. সঠিক পরিমাণে জল পান করা
অনেকের মনে হতে পারে, শরীরে যখন অতিরিক্ত জল জমে পা ফুলেছে, তখন বেশি জল খেলে হয়তো আরও ফুলে যাবে! এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং পর্যাপ্ত পরিমাণ জল খেলে কিডনি ভালোভাবে কাজ করে এবং শরীরের জমে থাকা সোডিয়াম বা লবণ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয় ।
প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস (প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লিটার) জল পান করার চেষ্টা করুন । এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং শরীরের টক্সিন সহজে বেরিয়ে যায়। সাধারণ জলের পাশাপাশি ডাবের জল, লেবুর শরবত বা আদা-লেবু দেওয়া হালকা গরম জলও খেতে পারেন ।
৩. কম্প্রেশন মোজা (Compression Stockings) ব্যবহার করা
ডাক্তাররা অনেক সময় সিজারের পর মায়েদের কম্প্রেশন মোজা পরার পরামর্শ দেন । এগুলো বিশেষ ধরনের ইলাস্টিক মোজা, যা পায়ে হালকা চাপ সৃষ্টি করে। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসবের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা কম্প্রেশন মোজা পরলে তা পা ফোলা কমাতে দারুণ সাহায্য করে ।
এই মোজা রক্তকে পায়ের নিচে জমতে বাধা দেয় এবং হার্টের দিকে ঠেলে পাঠাতে সাহায্য করে। তবে এগুলো খুব বেশি টাইট হওয়া উচিত নয়। মোজা পরার আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক মাপের মোজা কিনবেন।
৪. পায়ের গোড়ালি পাম্পিং বা হালকা ব্যায়াম
সিজারের পর ভারী ব্যায়াম করা সম্পূর্ণ নিষেধ, তবে শুয়ে শুয়ে পায়ের কিছু হালকা ব্যায়াম বা ‘অ্যাঙ্কেল পাম্প’ (Ankle Pumps) করা খুবই উপকারী ।
পিঠ সোজা করে শুয়ে বা বসে পায়ের পাতা সামনের দিকে টানটান করুন এবং আবার নিজের দিকে টেনে আনুন। এভাবে ১০ থেকে ১৫ বার করুন। এরপর পায়ের পাতা ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং উল্টোদিকে গোল করে ঘোরান । এই সাধারণ ব্যায়ামটি পায়ের কাফ মাসলকে সচল রাখে এবং জমে থাকা তরলকে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। দিনে বেশ কয়েকবার এটি করতে পারেন।
৫. ইপসম সল্ট বাথ (Epsom Salt Bath)
ইপসম লবণ বা ম্যাগনেসিয়াম সালফেট পেশির ব্যথা এবং ফোলাভাব কমাতে বেশ পরিচিত। হালকা গরম জলে আধা কাপ ইপসম সল্ট মিশিয়ে তাতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখুন ।
গরম জল রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং ম্যাগনেসিয়াম ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হয়ে প্রদাহ (Inflammation) কমায়। এই পদ্ধতিটি শুধু ফোলাই কমায় না, বরং সিজারের পর মানসিক ক্লান্তি দূর করে দারুণ আরাম দেয়।
৬. কোল্ড কমপ্রেস বা বরফ সেঁক
যদি আপনার পায়ে ফোলার সাথে হালকা ব্যথা বা গরম ভাব থাকে, তবে কোল্ড কমপ্রেস ব্যবহার করতে পারেন । একটি পরিষ্কার সুতির কাপড়ে কয়েকটি বরফের টুকরো পেঁচিয়ে ফুলে যাওয়া জায়গায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট আলতো করে চেপে ধরুন ।
বরফের ঠান্ডা ভাব রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে, ফলে টিস্যুতে নতুন করে তরল জমা হওয়া কমে যায়। দিনে ৩ থেকে ৪ বার এই সেঁক নিতে পারেন। তবে সরাসরি ত্বকে বরফ লাগাবেন না, এতে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে ।
৭. হালকা হাঁটাচলা করা
অপারেশনের পর টানা শুয়ে থাকলে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ডাক্তাররা সিজারের পর যত দ্রুত সম্ভব হালকা হাঁটাচলার পরামর্শ দেন।
একটানা বসে বা শুয়ে না থেকে ঘরের ভেতরেই ধীরে ধীরে ৫ থেকে ১০ মিনিট হাঁটুন । হাঁটার সময় পায়ের পেশিগুলো পাম্পের মতো কাজ করে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে । তবে জোর করে বা কষ্ট করে হাঁটবেন না। হাঁটতে গিয়ে পেটে বা কাটা জায়গায় যেন কোনো চাপ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
৮. আলতো করে ম্যাসাজ নেওয়া
পা ম্যাসাজ করলে পায়ের দিকে জমে থাকা ফ্লুইড বা তরল লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে শরীরের মূল অংশে ফিরে আসতে পারে । তবে এই ম্যাসাজ হতে হবে খুবই আলতো।
পা থেকে শুরু করে ওপরের দিকে অর্থাৎ হার্টের দিকে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য বা প্রফেশনাল কারও সাহায্য নিতে পারেন। ম্যাসাজের সময় হালকা গরম অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল ব্যবহার করলে ঘর্ষণ কম হবে এবং আরাম লাগবে। তবে পায়ে যদি খুব ব্যথা থাকে, তবে জোরে চাপ দেবেন না।
৯. আরামদায়ক এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরা
সিজারের পর খুব টাইট পোশাক, বিশেষ করে টাইট প্যান্ট বা অন্তর্বাস পরলে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়।
সব সময় সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরার চেষ্টা করুন । টাইট ইলাস্টিক দেওয়া পাজামা পায়ের শিরায় চাপ ফেলে, ফলে ফোলাভাব আরও বেড়ে যায়। এমন পোশাক বাছুন যা পরতে এবং খুলতে পেটের কাটা জায়গায় কোনো চাপ পড়ে না।
১০. বাঁ পাশ ফিরে ঘুমানো
গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের পর বাঁ পাশ ফিরে ঘুমানো স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়। জরায়ু শরীরের ডান দিকের বড় শিরাগুলোর (ইনফিরিয়র ভেনাকাভা) ওপর বেশি চাপ দেয়।
বাঁ পাশ ফিরে শুলে এই শিরার ওপর থেকে চাপ কমে যায়, যার ফলে পায়ের দিক থেকে রক্ত এবং তরল খুব সহজেই হার্টে ফিরে আসতে পারে। ঘুমানোর সময় পায়ের মাঝে একটি বালিশ রাখলে আরও বেশি আরাম পাওয়া যায়।
খাবার ও ডায়েট: পা ফোলা কমাতে যা খাবেন এবং যা এড়িয়ে চলবেন
সিজারের পর আপনার দৈনন্দিন ডায়েট পায়ের ফোলাভাব কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। সঠিক পুষ্টি যেমন শরীরকে তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলে, তেমনি ভুল খাবার ফোলাভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। নিচে একটি স্পষ্ট ছকের মাধ্যমে কী খাবেন এবং কী খাবেন না তা তুলে ধরা হলো:
| কী খাবেন (উপকারী খাবার) | কী এড়িয়ে চলবেন (ক্ষতিকর খাবার) |
| পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: কলা, পালং শাক, মিষ্টি আলু, অ্যাভোকাডো। পটাশিয়াম শরীরের অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেয়। | প্রক্রিয়াজাত খাবার: চিপস, প্যাকেটজাত স্যুপ, সসেজ, বিস্কুট। এগুলোতে প্রচুর লবণ থাকে। |
| ভিটামিন সি যুক্ত ফল: লেবু, কমলালেবু, পেঁপে, স্ট্রবেরি। এগুলো কোলাজেন তৈরিতে এবং টিস্যু নিরাময়ে সাহায্য করে। | অতিরিক্ত ক্যাফেইন: চা, কফি বা কোল্ড ড্রিঙ্কস। অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীরকে ডিহাইড্রেট করে দেয়। |
| প্রোটিন জাতীয় খাবার: ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল। প্রোটিন টিস্যুর ক্ষত সারাতে এবং তরলের ভারসাম্য রাখতে জরুরি। | চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার: অতিরিক্ত মিষ্টি বা রিফাইন্ড সুগার শরীরের প্রদাহ (Inflammation) বাড়ায়। |
| আদা এবং রসুন: এগুলো প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি হিসেবে কাজ করে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় । | ফাস্ট ফুড ও ভাজাপোড়া: পিৎজা, বার্গার বা ডিপ ফ্রাই করা খাবারে ক্ষতিকর ফ্যাট ও সোডিয়াম থাকে, যা জল ধরে রাখে। |
আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাজা ফলমূল এবং শাকসবজি রাখুন । ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার খেলে প্রসবের পর কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও কম হয়, যা সিজারের রোগীদের জন্য আরেকটি সাধারণ সমস্যা।
সিজারের পর পা ফোলার সাথে কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
সাধারণত প্রসবের পর এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে পায়ের ফোলাভাব নিজে থেকেই কমে যায়। উপরের সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় গুলো অনুসরণ করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে মোটেও দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
১. শুধু এক পা ফুলে যাওয়া এবং লাল হয়ে থাকা
যদি দেখেন আপনার দুটি পায়ের বদলে শুধু ডান বা বাঁ পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে এবং জায়গাটা লাল হয়ে গরম হয়ে আছে, তবে সাবধান হোন। এটি ‘ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস’ (Deep Vein Thrombosis – DVT) নামক রোগের লক্ষণ হতে পারে। সিজারের পর দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকার কারণে অনেক সময় পায়ের ভেতরের শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
২. হঠাৎ করে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া
পায়ের শিরায় জমাট বাঁধা রক্ত যদি কোনোভাবে ভেঙে গিয়ে ফুসফুসের দিকে চলে যায়, তবে পালমোনারি এম্বোলিজম (Pulmonary Embolism) হতে পারে। এর ফলে হঠাৎ করে তীব্র বুকে ব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা কাশির সাথে রক্ত আসতে পারে। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, তাই সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে হবে।
৩. ফোলাভাব কমার বদলে দ্রুত বাড়তে থাকা
যদি ঘরোয়া উপায়গুলো মেনে চলার পরও কয়েকদিন ধরে ফোলা না কমে, বরং পায়ের ওপরের দিকে (উরু পর্যন্ত) ছড়িয়ে পড়ে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৪. মাথা ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা বা উচ্চ রক্তচাপ
পায়ের ফোলার পাশাপাশি যদি তীব্র মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব বা দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে, তবে এটি ‘পিপিই’ বা প্রসব পরবর্তী প্রি-এক্লাম্পসিয়ার (Postpartum Preeclampsia) লক্ষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে রক্তচাপ হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যায়, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
বিপজ্জনক লক্ষণের একটি তালিকা:
| সাধারণ লক্ষণ (ভয়ের কিছু নেই) | বিপজ্জনক লক্ষণ (ডাক্তার দেখানো জরুরি) |
| দুটি পা সমানভাবে ফোলা | শুধু একটি পা অস্বাভাবিক ফোলা |
| ব্যথাহীন বা খুব সামান্য ব্যথা | প্রচণ্ড ব্যথা, লালভাব এবং জায়গাটা গরম থাকা |
| সকালে ফোলা কম থাকে, হাঁটার পর বাড়ে | সারাক্ষণ পা ফুলে ঢোল হয়ে থাকা |
| ২ সপ্তাহের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে যাওয়া | ২ সপ্তাহ পার হলেও না কমা বা বুকে ব্যথা হওয়া |
প্রসব পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও ফোলাভাব নিয়ে দুশ্চিন্তা
সিজারের পর শারীরিক ব্যথার পাশাপাশি মায়েদের মানসিক অবস্থারও বড় পরিবর্তন হয়। হরমোনের ওঠানামার কারণে ‘বেবি ব্লুজ’ বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। পা ফুলে যাওয়ার কারণে যখন মায়েরা নিজেদের পছন্দের জুতো পরতে পারেন না বা স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারেন না, তখন তাদের মধ্যে এক ধরণের হতাশা কাজ করে।
মনে রাখবেন, আপনার শরীর সবেমাত্র একটি বড় অস্ত্রোপচার এবং একটি নতুন জীবন সৃষ্টির প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেছে। নিজেকে সময় দিন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবর্তনগুলো নিয়ে হতাশ না হয়ে, আপনার শরীর কতটা শক্তিশালী তা নিয়ে গর্ব করুন। পরিবার এবং স্বামীর উচিত এই সময়ে নতুন মায়ের পাশে থাকা। তাকে মানসিকভাবে ভরসা দেওয়া এবং ছোটখাটো কাজে সাহায্য করা। মানসিক চাপ কম থাকলে শরীরের যেকোনো ক্ষত বা প্রদাহ অনেক দ্রুত সেরে ওঠে।
সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে গর্ভাবস্থা এবং প্রসব নিয়ে অনেক ধরনের কুসংস্কার বা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। পা ফোলা কমানোর ক্ষেত্রেও এমন কিছু ভুল ধারণা রয়েছে, যা থেকে সাবধান থাকা উচিত।
ভুল ধারণা ১: জল কম খেলে ফোলা কমবে
অনেকেই ভাবেন যে শরীরে তো জল জমেই আছে, তাহলে বেশি জল খেলে পা আরও ফুলবে। এটি একেবারেই অবৈজ্ঞানিক । শরীর যখন বুঝতে পারে যে আপনি পর্যাপ্ত জল খাচ্ছেন না, তখন সে ডিহাইড্রেশন থেকে বাঁচতে আরও বেশি করে জল জমিয়ে রাখতে শুরু করে। তাই বেশি করে জল পান করাটাই সঠিক কাজ।
ভুল ধারণা ২: সিজারের পর একেবারেই হাঁটাচলা করা যাবে না
গ্রামাঞ্চলে বা অনেক পরিবারে বলা হয়, সিজার মানেই মাসের পর মাস সম্পূর্ণ বেড রেস্ট। কিন্তু ডাক্তাররা বলেন উল্টো কথা। অস্ত্রোপচারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডাক্তাররা রোগীকে বিছানা থেকে উঠে কয়েক পা হাঁটার পরামর্শ দেন । একটানা শুয়ে থাকলে রক্ত জমাট বাঁধার ভয় থাকে এবং পা ফোলা বাড়ে ।
ভুল ধারণা ৩: পায়ের পাতা শক্ত করে বেঁধে রাখলে ফোলা কমবে
অনেকে কাপড় দিয়ে পায়ের পাতা খুব শক্ত করে বেঁধে রাখেন। এটি করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। খুব শক্ত করে বাঁধলে রক্ত চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা শিরাগুলোকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর বদলে ডাক্তার অনুমোদিত কম্প্রেশন মোজা ব্যবহার করা নিরাপদ ।
শেষ কথা
সিজারিয়ান ডেলিভারির পর পা ফোলা একটি খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা নিয়ে খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আপনার শরীরের জমে থাকা বাড়তি তরল ধীরে ধীরে ঘাম, প্রস্রাব এবং অন্যান্য উপায়ে বেরিয়ে যাবে। এই আর্টিকেলে উল্লেখিত সিজারের পর পা ফোলা কমানোর উপায় গুলো নিয়মিত মেনে চললে আপনি খুব দ্রুত আরাম পাবেন।
পা উঁচু করে রাখা, সঠিক ডায়েট মেনে চলা, প্রচুর জল পান করা এবং হালকা হাঁটাচলা—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই আপনার সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। তবে সবকিছুর পরেও যদি আপনার অস্বস্তি বাড়ে বা বিপজ্জনক কোনো লক্ষণ চোখে পড়ে, তবে দেরি না করে অবশ্যই আপনার গাইনোকোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করবেন। নতুন মাতৃত্বের এই সুন্দর যাত্রায় নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াটা সন্তানের যত্ন নেওয়ার মতোই জরুরি। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।











