হুয়াওয়ে (Huawei) তাদের ট্যাবলেট গেম পুরোপুরি বদলে দিতে চলেছে। আগামী ২৫ নভেম্বর, ২০২৫-এ চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মেগা ইভেন্টে উন্মোচিত হতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত Huawei MatePad Edge। এটি কেবল একটি সাধারণ ট্যাবলেট নয়; এটি একটি হাইব্রিড 2-in-1 ডিভাইস যা সরাসরি ল্যাপটপের বিকল্প হিসেবে কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
টেক গুরু এবং লিকারদের মতে, MatePad Edge হতে যাচ্ছে হুয়াওয়ের প্রথম ট্যাবলেট যা সত্যিকারের “PC-Level” অভিজ্ঞতা দেবে। ১৪.২ ইঞ্চির বিশাল OLED স্ক্রিন, শক্তিশালী Kirin 9 সিরিজের প্রসেসর এবং ট্যাবলেটের ইতিহাসে বিরল অ্যাক্টিভ কুলিং ফ্যান টেকনোলজি নিয়ে এই ডিভাইসটি অ্যাপল (Apple) আইপ্যাড প্রো এবং স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব এস সিরিজের রাতের ঘুম হারাম করতে পারে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা Huawei MatePad Edge-এর প্রতিটি খুঁটিনাটি, লিক হওয়া স্পেসিফিকেশন, হার্ডওয়্যার ক্ষমতা এবং এর ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি ২০২৫ সালের শেষ দিকে একটি পাওয়ারফুল গ্যাজেট কেনার কথা ভাবছেন, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
Huawei MatePad Edge: এক নজরে মূল স্পেসিফিকেশন (Expected Specs)
লঞ্চের ঠিক আগ মুহূর্তে, নির্ভরযোগ্য সোর্স যেমন Digital Chat Station এবং Huawei Central থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিচে এর সম্ভাব্য স্পেসিফিকেশন তুলে ধরা হলো:
| ফিচার | বিস্তারিত বিবরণ (সম্ভাব্য) |
| ডিসপ্লে | ১৪.২ ইঞ্চি OLED, PaperMatte এডিশন (অপশনাল), 120Hz রিফ্রেশ রেট |
| প্রসেসর | Kirin 9 সিরিজ (PC-Level আর্কিটেকচার) |
| র্যাম | ১৬ জিবি / ২৪ জিবি / ৩২ জিবি (সর্বোচ্চ) |
| স্টোরেজ | ৫১২ জিবি / ১ টিবি / ২ টিবি |
| অপারেটিং সিস্টেম | HarmonyOS (সম্ভাব্য ভার্সন ৬.০ বা পিসি মোড যুক্ত) |
| কুলিং সিস্টেম | ডুয়াল ফ্যান অ্যাক্টিভ কুলিং (Dual-Fan Active Cooling) |
| কানেক্টিভিটি | NearLink টেকনোলজি (কীবোর্ড ও স্টাইলাসের জন্য) |
| কীবোর্ড | ডিটাচেবল ম্যাগনেটিক কীবোর্ড, ১.৮ মিমি কী ট্রাভেল |
| লঞ্চ ডেট | ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ |
Motorola Edge 60 Fusion: নতুন প্রযুক্তির মোবাইলের এক ধাপ এগিয়ে
ডিজাইন ও ডিসপ্লে: বড় এবং প্রিমিয়াম
Huawei MatePad Edge-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বিশাল ১৪.২ ইঞ্চির ডিসপ্লে। সাধারণ ১০ বা ১১ ইঞ্চির ট্যাবলেটের তুলনায় এটি অনেক বড়, যা মাল্টিটাস্কিং এবং প্রফেশনাল কাজের জন্য উপযুক্ত।
১. ১৪.২ ইঞ্চি OLED প্যানেল
শোনা যাচ্ছে, এতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত উন্নতমানের OLED প্যানেল। OLED হওয়ার কারণে এর কালার রিপ্রোডাকশন হবে একদম জীবন্ত, আর কালো রঙ হবে কুচকুচে কালো (True Black)। ভিডিও এডিটিং বা গ্রাফিক্স ডিজাইনিংয়ের জন্য এই ডিসপ্লে হবে আদর্শ।
২. PaperMatte টেকনোলজি
হুয়াওয়ে তাদের সাম্প্রতিক ট্যাবলেটগুলোতে PaperMatte ডিসপ্লে ব্যবহার করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। MatePad Edge-এও এই প্রযুক্তির দেখা মিলবে। এটি সাধারণ গ্লাস স্ক্রিনের মতো চকচকে নয়, বরং কিছুটা কাগজের মতো টেক্সচার দেয়। এর সুবিধা হলো:
-
চোখের আরাম: দীর্ঘক্ষণ কাজ করলেও চোখে চাপ পড়ে না।
-
অ্যান্টি-গ্লেয়ার (Anti-Glare): উজ্জ্বল আলোতে বা রোদে স্ক্রিনে রিফলেকশন হয় না, ফলে কাজ করতে সুবিধা হয়।
-
লেখার অভিজ্ঞতা: স্টাইলাস বা M-Pencil দিয়ে লেখার সময় মনে হবে আপনি আসল কাগজেই লিখছেন।
৩. 2-in-1 হাইব্রিড ডিজাইন
নামেই বোঝা যাচ্ছে “Edge” – এটি ট্যাবলেট এবং ল্যাপটপের ঠিক মাঝখানের একটি ডিভাইস। এর সাথে আসা ম্যাগনেটিক কীবোর্ডটি যুক্ত করলেই এটি একটি পুরোদস্তুর ল্যাপটপে পরিণত হবে। কীবোর্ডে ১.৮ মিমি কী ট্রাভেল (Key Travel) থাকবে বলে জানা গেছে, যা টাইপ করার সময় প্রিমিয়াম ল্যাপটপের অনুভূতি দেবে।
পারফরম্যান্স: ট্যাবলেটে পিসির শক্তি?
বেশিরভাগ ট্যাবলেটের প্রধান সমস্যা হলো, হার্ডওয়্যার শক্তিশালী হলেও প্রসেসরগুলো বেশিক্ষণ ভারী কাজ করতে পারে না এবং গরম হয়ে যায়। Huawei MatePad Edge এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
১. Kirin 9 সিরিজের নতুন চিপসেট
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ডিভাইসে হুয়াওয়ের নিজস্ব Kirin 9 সিরিজের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসর ব্যবহার করা হবে। তবে চমক হলো, এটি সাধারণ মোবাইল প্রসেসর নয়। লিক হওয়া তথ্য মতে, এটি একটি “PC-Level” চিপসেট যা ভারী কাজের চাপ সামলাতে সক্ষম। গিকবেঞ্চ (Geekbench) বা অন্যান্য বেঞ্চমার্ক স্কোর প্রকাশ না হলেও, ধারণা করা হচ্ছে এটি মাল্টি-কোর পারফরম্যান্সে অ্যাপলের M-সিরিজ চিপের সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
২. অ্যাক্টিভ কুলিং ফ্যান (Active Cooling Fan)
ট্যাবলেটের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। MatePad Edge-এ ডুয়াল ফ্যান কুলিং সিস্টেম থাকছে। সাধারণত ল্যাপটপে ফ্যান থাকে প্রসেসর ঠান্ডা রাখার জন্য। ট্যাবলেটে ফ্যান যুক্ত করার মানেই হলো, হুয়াওয়ে চায় ব্যবহারকারীরা এতে ভারী ভিডিও এডিটিং, হাই-এন্ড গেমিং এবং কোডিংয়ের মতো কাজগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা করুক, কোনো রকম থার্মাল থ্রটলিং (Thermal Throttling) ছাড়াই।
৩. বিশাল র্যাম ও স্টোরেজ
২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে ১৬ জিবি র্যাম এখন স্ট্যান্ডার্ড হয়ে যাচ্ছে হাই-এন্ড ডিভাইসে। কিন্তু MatePad Edge আরও এক ধাপ এগিয়ে ২৪ জিবি এবং ৩২ জিবি র্যামের ভেরিয়েন্ট নিয়ে আসতে পারে। সাথে থাকছে ২ টিবি পর্যন্ত স্টোরেজ সুবিধা। এত বিশাল মেমোরি থাকার ফলে একসাথে ডজনখানেক অ্যাপ চালানো বা ৪কে (4K) ভিডিও এডিট করা হবে পানির মতো সহজ।
সফটওয়্যার: HarmonyOS-এর জাদুকরী ক্ষমতা
হার্ডওয়্যার যতই শক্তিশালী হোক, সফটওয়্যার ভালো না হলে তা কোনো কাজেই আসে না। হুয়াওয়ে এখানে তাদের তুরুপের তাস HarmonyOS ব্যবহার করছে।
PC-Level ইন্টারফেস
MatePad Edge-এ HarmonyOS-এর এমন একটি ভার্সন থাকবে যা দেখতে এবং ব্যবহারে অনেকটা ডেস্কটপ পিসির মতো।
-
ফ্লোটিং উইন্ডো: আপনি পিসির মতোই একাধিক উইন্ডো পাশাপাশি খুলে কাজ করতে পারবেন।
-
ফাইল ম্যানেজমেন্ট: পিসির মতো ড্র্যাগ-এন্ড-ড্রপ (Drag and Drop) করে ফাইল ট্রান্সফার করা যাবে।
-
সুপার ডিভাইস (Super Device): আপনার যদি হুয়াওয়ে ফোন বা ল্যাপটপ থাকে, তবে এই ট্যাবলেটটি সেগুলোর সাথে নিমিষেই কানেক্ট হবে। ফোনের স্ক্রিন ট্যাবলেটে এবং ট্যাবলেটের স্ক্রিন বড় মনিটরে শেয়ার করা যাবে তারবিহীন ভাবেই।
এক্সেসরিজ: NearLink প্রযুক্তির ব্যবহার
Huawei MatePad Edge-এর সাথে নতুন প্রজন্মের NearLink প্রযুক্তির কীবোর্ড এবং স্টাইলাস (M-Pencil 3rd Gen) সাপোর্ট করবে। ব্লুটুথের তুলনায় NearLink অনেক বেশি দ্রুত এবং রেসপন্সিভ।
-
M-Pencil: ছবি আঁকা বা নোট নেওয়ার সময় লেটেন্সি (Latency) বা দেরি হবে না বললেই চলে। ১০,০০০-এর বেশি প্রেশার সেনসিটিভিটি লেভেল থাকার কারণে নিখুঁত ড্রইং করা সম্ভব হবে।
-
ম্যাগনেটিক কীবোর্ড: কীবোর্ডে একটি বড় ট্র্যাকপ্যাড থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা জেশ্চার কন্ট্রোল সাপোর্ট করবে।
Motorola Edge 60 Fusion: আপনার পরবর্তী স্মার্টফোনের অপেক্ষায় থাকা উচিত কেন?
Pros & Cons: কেন কিনবেন, কেন কিনবেন না?
যেকোনো গ্যাজেট কেনার আগে তার ভালো ও খারাপ দিকগুলো বিবেচনা করা জরুরি।
✅ সুবিধা (Pros)
১. হাইব্রিড পাওয়ারহাউজ: ট্যাবলেট এবং ল্যাপটপ উভয়ের কাজ একটি ডিভাইসেই করা সম্ভব।
২. অ্যাক্টিভ কুলিং: ফ্যান থাকার কারণে দীর্ঘক্ষণ ভারী কাজ করলেও পারফরম্যান্স ড্রপ করবে না।
৩. অসাধারণ ডিসপ্লে: ১৪.২ ইঞ্চি OLED এবং PaperMatte অপশন চোখের জন্য আরামদায়ক এবং ক্রিয়েটরদের জন্য সেরা।
৪. HarmonyOS ইকোসিস্টেম: মাল্টিটাস্কিং এবং অন্যান্য হুয়াওয়ে ডিভাইসের সাথে কানেক্টিভিটি চমৎকার।
৫. NearLink কানেক্টিভিটি: অতি দ্রুত এক্সেসরিজ রেসপন্স।
❌ অসুবিধা (Cons)
১. Google Play Store নেই: হুয়াওয়ের সব ডিভাইসের মতো এতেও সরাসরি গুগল প্লে স্টোর বা গুগল সার্ভিস (GMS) নেই। যদিও ‘GBox’ বা অন্যান্য উপায়ে অ্যাপ চালানো যায়, তবুও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা।
২. উচ্চ মূল্য: এর স্পেসিফিকেশন এবং প্রিমিয়াম ফিচারের কারণে দাম বেশ চড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. ওজন: ১৪.২ ইঞ্চি সাইজ এবং কুলিং ফ্যান থাকার কারণে এটি সাধারণ ট্যাবলেটের চেয়ে কিছুটা ভারী হতে পারে, যা এক হাতে ধরে রাখা কঠিন হবে।
৪. লিমিটেড গ্লোবাল অ্যাভেলেবিলিটি: প্রাথমিক অবস্থায় এটি শুধু চীনে লঞ্চ হতে পারে। গ্লোবাল মার্কেটে আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
কাদের জন্য এই Huawei MatePad Edge?
১. ডিজিটাল আর্টিস্ট ও ডিজাইনার: যারা বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য PaperMatte ডিসপ্লে এবং M-Pencil একটি স্বপ্নের কম্বিনেশন।
২. ভিডিও এডিটর ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর: শক্তিশালী প্রসেসর এবং কুলিং সিস্টেম থাকায় অন-দ্য-গো (On-the-go) এডিটিংয়ের জন্য এটি ল্যাপটপের চেয়ে বেশি পোর্টেবল।
৩. অফিস এক্সিকিউটিভ: যারা মিটিং, প্রেজেন্টেশন এবং ইমেইলের জন্য হালকা কিন্তু শক্তিশালী ডিভাইস খুঁজছেন।
৪. টেক উৎসাহী: যারা নতুন টেকনোলজি এবং HarmonyOS-এর পিসি মোড অভিজ্ঞতা নিতে চান।
বাজার বিশ্লেষণ ও প্রতিযোগিতা
২০২৫ সালের শেষ ভাগে এসে ট্যাবলেটের বাজার বেশ গরম। অ্যাপল তাদের iPad Pro M4 দিয়ে বাজারের শীর্ষে অবস্থান করছে, আর স্যামসাং তাদের Galaxy Tab S10 Ultra দিয়ে এন্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের ধরে রেখেছে।
Huawei MatePad Edge এই দুই জায়ান্টের মাঝখানে নিজের জায়গা করে নিতে চাইছে। যেখানে আইপ্যাডের OS এখনও কিছুটা সীমাবদ্ধ (ল্যাপটপের মতো পূর্ণাঙ্গ নয়), সেখানে হুয়াওয়ে HarmonyOS দিয়ে পিসির অভাব পূরণ করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, স্যামসাংয়ের ডিসপ্লে সেরা হলেও তাদের প্রসেসর অপটিমাইজেশন এবং ইকোসিস্টেম ফিচারে হুয়াওয়ে কড়া টক্কর দিচ্ছে।
বিশেষ করে চীনে, যেখানে গুগল সার্ভিস কোনো ফ্যাক্টর নয়, সেখানে MatePad Edge ল্যাপটপ রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপেক্ষা কি সার্থক হবে?
সব মিলিয়ে, Huawei MatePad Edge ট্যাবলেট দুনিয়ায় একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি কেবল বিনোদনের যন্ত্র নয়, বরং একটি প্রোডাক্টিভিটি মেশিন। আপনি যদি গুগল সার্ভিসের অনুপস্থিতি মেনে নিয়ে একটি প্রিমিয়াম, শক্তিশালী এবং ফিউচারিস্টিক ডিভাইসের মালিক হতে চান, তবে MatePad Edge আপনার তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত।
আগামী ২৫ নভেম্বর এর অফিসিয়াল লঞ্চের পর আমরা এর দাম এবং আরও বিস্তারিত ফিচার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারব। তবে এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বলতেই হয়—হুয়াওয়ে আবারও প্রমাণ করতে চলেছে যে ইনোভেশনে তারা কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই।
আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত?
আপনি কি জানতে চান লঞ্চের পর এই ট্যাবলেটটি আন্তর্জাতিক বাজারে বা বাংলাদেশে কবে নাগাদ পাওয়া যেতে পারে এবং এর সম্ভাব্য দাম কত হতে পারে? অথবা আপনি কি বর্তমানের MatePad Pro 13.2-এর সাথে এর একটি বিস্তারিত তুলনা চান? কমেন্ট করে আমাদের জানান, আমরা আপনার জন্য পরবর্তী আপডেটে সেই তথ্য নিয়ে আসব!











