ভারতের অর্থনীতিতে বিদেশ থেকে আসা টাকার প্রবাহ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বুলেটিনে জানানো হয়েছে, পাঁচটি মুসলিম দেশ—সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (ইউএই), সৌদি আরব, কাতার, ওমান এবং বাহরাইন—থেকে ভারতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ আসছে। এই টাকা প্রধানত প্রবাসী ভারতীয়দের পাঠানো রেমিট্যান্স বা অর্থ প্রেরণের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে, যা ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করছে। এই তথ্য সামনে আসার পর দেশের অর্থনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই পাঁচ দেশ থেকে আগত রেমিট্যান্স ভারতের মোট প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ দখল করেছে। এই দেশগুলিতে বসবাসকারী ভারতীয়রা তাদের কঠোর পরিশ্রমের টাকা নিয়মিত দেশে পাঠাচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে শহুরে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আরবিআই-এর বুলেটিনে বলা হয়েছে, এই প্রবাহ কেবল অর্থনীতিকে সচল রাখছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতেও সাহায্য করছে। এই পাঁচ দেশের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ আসছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রবাসী ইতিহাস এবং এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক। গত কয়েক দশকে লাখ লাখ ভারতীয় এই মুসলিম দেশগুলিতে কাজের সন্ধানে গেছেন। বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলিতে ভারতীয় শ্রমিকদের চাহিদা সবসময়ই বেশি। নির্মাণ শিল্প, তেল ও গ্যাস খাত, স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি—এই সব ক্ষেত্রে ভারতীয়রা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ফলে, এই দেশগুলি থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা ভারতে প্রবেশ করছে। আরবিআই-এর হিসেবে, ২০২৩ সালেই ভারত মোট ১১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পেয়েছে, যার একটি বড় অংশ এসেছে এই পাঁচ দেশ থেকে।
বিষয়টির গভীরতা বোঝার জন্য আরও কিছু তথ্য জানা দরকার। বিশ্বব্যাঙ্কের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত বহু বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রাপক দেশ। ২০২২ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-এ বেড়ে ১১১ বিলিয়ন হয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে উপসাগরীয় দেশগুলির অবদান অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে প্রায় ৩৫ লাখ ভারতীয় বাস করেন, যারা সেখানকার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে, সৌদি আরবে প্রায় ২৭ লাখ ভারতীয় শ্রমিক রয়েছেন। এই প্রবাসীরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ পরিবারের জন্য দেশে পাঠান, যা ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে।
এই অর্থ প্রবাহের প্রভাব শুধু পরিবার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আরবিআই-এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এই রিজার্ভ আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং টাকার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া, এই টাকা দেশের ভিতরে বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেরালার মতো রাজ্যে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি হয়ে উঠেছে।
এই পাঁচ দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক এবং কূটনৈতিকভাবেও গভীর। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলির বাণিজ্য শতাব্দীর পুরনো। আধুনিক কালে এই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একাধিক সফর এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে, শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ বেড়েছে, যা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়িয়েছে। তবে, এই প্রবাহ নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, তেলের দামের ওঠানামা বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এই অর্থ প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণ মানুষের কাছে এই তথ্য বোঝা সহজ করতে বলা যায়, এই টাকা এমন একটা স্রোতের মতো, যা বিদেশ থেকে এসে ভারতের অর্থনীতির চাকাকে ঘোরাচ্ছে। একজন শ্রমিক যখন দুবাই থেকে তার গ্রামে ৫০ হাজার টাকা পাঠান, সেই টাকা দিয়ে তার পরিবার বাড়ি তৈরি করে, ছেলেমেয়েদের পড়ায় বা ব্যবসা শুরু করে। এভাবে এক একজনের অবদান দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। আরবিআই-এর এই প্রকাশিত তথ্য থেকে এটাও স্পষ্ট, এই প্রবাহ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়।
শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, এই পাঁচ মুসলিম দেশ থেকে আসা টাকা ভারতের জন্য একটি বড় সম্পদ। এটি কেবল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, প্রবাসী ভারতীয়দের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতিও। তবে, এই প্রবাহ যাতে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে, তার জন্য ভারতকে এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে হবে। আরবিআই-এর এই তথ্য শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে লাখো মানুষের জীবন ও স্বপ্নের গল্প। (শব্দ সংখ্যা: ৮৮৪)