আপনি কি জানেন যে আপনার কিডনিতে নীরবে জমছে জল? প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভুগছেন এমন একটি রোগে যার নাম হাইড্রোনেফ্রোসিস বা hydronephrosis meaning in bengali হচ্ছে কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার কারণে কিডনি ফুলে যাওয়া। এই সমস্যাটি যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে সম্পূর্ণ কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে ১-২ জনের শিশুর এই সমস্যা ধরা পড়ে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত জানব হাইড্রোনেফ্রোসিস রোগের লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে।
হাইড্রোনেফ্রোসিস কী এবং কেন হয়?
হাইড্রোনেফ্রোসিস হল এমন একটি চিকিৎসা অবস্থা যেখানে কিডনির ভেতর প্রস্রাব জমে গিয়ে কিডনি ফুলে যায়। সাধারণত আমাদের কিডনি থেকে প্রস্রাব মূত্রনালী দিয়ে মূত্রথলিতে যায় এবং তারপর শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি হয়, তখনই হাইড্রোনেফ্রোসিসের মতো জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এই রোগের বাজার ২০২৪ সালে ৩.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩২ সাল নাগাদ তা ৭.৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে এই রোগটি কত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত এবং কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
হাইড্রোনেফ্রোসিসের প্রকারভেদ
চিকিৎসা বিজ্ঞানে হাইড্রোনেফ্রোসিসকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হয়েছে:
অবস্থান অনুযায়ী:
-
একতরফা হাইড্রোনেফ্রোসিস (একটি কিডনি আক্রান্ত)
-
দ্বিপাক্ষিক হাইড্রোনেফ্রোসিস (দুটি কিডনিই আক্রান্ত)
সময় অনুযায়ী:
-
প্রসবপূর্ব হাইড্রোনেফ্রোসিস (জন্মের আগে আল্ট্রাসাউন্ডে ধরা পড়ে)
-
প্রসবোত্তর হাইড্রোনেফ্রোসিস (জন্মের পরে লক্ষণের ভিত্তিতে)
তীব্রতা অনুযায়ী:
গবেষণা অনুযায়ী হাইড্রোনেফ্রোসিস চারটি গ্রেডে ভাগ করা হয়:
-
গ্রেড-১ (হালকা): কেবল রেনাল পেলভিস ফোলা
-
গ্রেড-২ (মধ্যম): গ্রেড-১ + প্রধান ক্যালাইসিস ফোলা
-
গ্রেড-৩ (মাঝারি): গ্রেড-২ + সমস্ত ক্যালাইসিস ফোলা
-
গ্রেড-৪ (গুরুতর): গ্রেড-৩ + কিডনির মূল অংশ পাতলা হয়ে যাওয়া
হাইড্রোনেফ্রোসিসের লক্ষণসমূহ
হাইড্রোনেফ্রোসিসের লক্ষণগুলো বয়স এবং রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তবে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:
প্রাথমিক লক্ষণসমূহ:
-
পেটে বা পার্শ্বদেশে ফোলাভাব
-
প্রস্রাব করার সময় ব্যথা
-
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া
-
প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া
-
তলপেটে অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভব
গুরুতর লক্ষণসমূহ:
-
উচ্চ জ্বর (মূত্রনালীর সংক্রমণের কারণে)
-
তীব্র পেট ব্যথা
-
বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
-
প্রস্রাবে দুর্গন্ধ
-
কিডনির অংশে তীব্র ব্যথা
হাইড্রোনেফ্রোসিসের কারণসমূহ
হাইড্রোনেফ্রোসিস হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, কিডনি বা মূত্রনালীর পাথর হাইড্রোনেফ্রোসিসের সবচেয়ে প্রধান কারণ, যা ৫৪.১% ক্ষেত্রে দেখা যায়।
প্রধান কারণসমূহ:
-
কিডনি বা মূত্রনালীর পাথর (৫৪.১% ক্ষেত্রে)
-
মূত্রনালীতে বাধা বা সংকীর্ণতা
-
জন্মগত ত্রুটি (পেলভিউরেটেরিক জাংশন স্টেনোসিস – ৩.৯% ক্ষেত্রে)
-
মূত্রথলি থেকে কিডনিতে প্রস্রাব ফিরে যাওয়া (রিফ্লাক্স – ৭.৩% ক্ষেত্রে)
-
প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া
-
টিউমার বা ক্যান্সার
ঝুঁকির কারণসমূহ:
-
পুরুষদের মধ্যে এই রোগ মহিলাদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি দেখা যায়
-
কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস
-
পূর্বে পেট বা পেলভিক অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
-
বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ
রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
হাইড্রোনেফ্রোসিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন:
প্রাথমিক পরীক্ষাসমূহ:
-
প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড (গর্ভাবস্থায়)
-
প্রসবোত্তর আল্ট্রাসাউন্ড (জন্মের পরে)
-
কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT)
-
প্রস্রাব পরীক্ষা
বিশেষ পরীক্ষাসমূহ:
-
রেডিওনিউক্লাইড রেনাল স্ক্যান (কিডনির কার্যক্ষমতা দেখার জন্য)
-
মিকচুরেটিং সিস্টোইউরেথ্রোগ্রাম (MCUG) – রিফ্লাক্স পরীক্ষার জন্য
-
সিটি স্ক্যান (জটিল ক্ষেত্রে)
-
এমআরআই (বিশেষ প্রয়োজনে)
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
হাইড্রোনেফ্রোসিসের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের তীব্রতা, কারণ এবং রোগীর বয়সের উপর। ২০২৫ সালে চিকিৎসা বাজারে শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি পদ্ধতি প্রায় ৪০.৫% অংশ দখল করে আছে।
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা:
-
ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যথানাশক ওষুধ
-
সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক
-
শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক
অস্ত্রোপচার পদ্ধতিসমূহ:
-
পাইলোপ্লাস্টি: বাধাপ্রাপ্ত অংশ সরিয়ে কিডনির সাথে মূত্রনালী পুনঃসংযোগ
-
ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি: কম কাটা-ছেঁড়ার মাধ্যমে অস্ত্রোপচার
-
রোবোটিক সার্জারি: দ্রুত আরোগ্য এবং কম দাগের জন্য
-
শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি: পাথর ভাঙার জন্য (৪০.৫% ক্ষেত্রে ব্যবহৃত)
-
ডি-জে স্টেন্ট: প্রস্রাব নিষ্কাশনের জন্য অস্থায়ী সাহায্য
গর্ভাবস্থায় হাইড্রোনেফ্রোসিস
সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় হাইড্রোনেফ্রোসিসের জন্য স্টেন্ট বসানোর নির্দেশনা হলো: প্যারেনকাইমাল পুরুত্ব ≤২০ মিমি, রেনাল ডাইলেশন >৩০ মিমি, প্রাথমিক লক্ষণ এবং সংক্রমণ। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা নিরাপদে রক্ষণশীল চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।
জটিলতা ও পরবর্তী প্রভাব
চিকিৎসা না করালে হাইড্রোনেফ্রোসিস থেকে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে:
-
কিডনির কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে হ্রাস
-
দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগ
-
বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ
-
কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়া
-
চরম ক্ষেত্রে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়া
প্রতিরোধের উপায়
হাইড্রোনেফ্রোসিস প্রতিরোধের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
জীবনযাত্রার পরিবর্তন:
-
প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা
-
খাবারে লবণ, চিনি ও তেলের ব্যবহার কমানো
-
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা
-
মূত্রনালীর সংক্রমণের সময়মতো চিকিৎসা
চিকিৎসা সংক্রান্ত:
-
বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করানো
-
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড করানো
-
পারিবারিক ইতিহাস থাকলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন
বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্বব্যাপী হাইড্রোনেফ্রোসিসের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকা প্রায় ৪২.৬% বাজার দখল করে আছে, অন্যদিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ৩০.৩% হারে। ভারত এই বাজারে সর্বোচ্চ ৪.১% বৃদ্ধির হার নিয়ে এগিয়ে আছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৬০ মিনিটের মধ্যে ৪৬.৬% সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে হাইড্রোনেফ্রোসিসের লক্ষণ দেখা যায়, যা ৯০ মিনিটে বেড়ে ৪৮.২% হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে এই সমস্যাটি কতটা সাধারণ।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
-
পেট বা পার্শ্বদেশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব
-
প্রস্রাবে রক্ত বা দুর্গন্ধ
-
তীব্র পেট ব্যথা বা জ্বর
-
কয়েক দিনের বেশি প্রস্রাবে সমস্যা
-
শিশুর ক্ষেত্রে বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ
বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি, কারণ প্রতি ১০০টি গর্ভধারণের মধ্যে ১-২টিতে এই সমস্যা দেখা দেয়।
হাইড্রোনেফ্রোসিস একটি গুরুতর কিডনি সমস্যা যা সময়মতো চিকিৎসা না করালে স্থায়ী কিডনি বিকলতার কারণ হতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই রোগের সফল চিকিৎসা সম্ভব। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া যায়। মনে রাখবেন, আপনার কিডনির স্বাস্থ্যই আপনার সামগ্রিক সুস্থতার চাবিকাঠি।











