Ideal Weight of Pregnant Mother: গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের অন্যতম সুন্দর ও সংবেদনশীল একটি সময়। এই সময়ে মায়ের শরীরের ভেতরে একটু একটু করে একটি নতুন প্রাণের বিকাশ ঘটে। সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই মায়েদের মনে নানা রকম প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, গর্ভাবস্থায় ঠিক কতটা ওজন বাড়া স্বাভাবিক? অনেকেই মনে করেন, গর্ভে সন্তান থাকা মানেই মায়ের ডাবল খাওয়া উচিত এবং ইচ্ছেমতো ওজন বাড়ানো উচিত। আবার অনেকেই ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে ঠিকমতো খাবার খান না। কিন্তু এই দুটো ধারণাই সম্পূর্ণ ভুল। মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন (Ideal weight of pregnant mother) সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আপনার শরীরের গঠন ও আগের ওজনের ওপর ভিত্তি করে গর্ভাবস্থায় কতটা ওজন বাড়ানো নিরাপদ, তা জানলে অনেক ধরনের শারীরিক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। চলুন, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসকদের গাইডলাইন অনুযায়ী বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
কেন গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন জানা জরুরি?
গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া । এই বাড়তি ওজন শুধুমাত্র মায়ের শরীরে জমে থাকা চর্বি নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে গর্ভস্থ শিশুর ওজন, প্লাসেন্টা বা অমরা, অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড, জরায়ুর বৃদ্ধি পাওয়া আকার এবং মায়ের শরীরে বেড়ে যাওয়া রক্তের পরিমাণ। তবে এই ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওজনের প্রভাব
সঠিক মাত্রায় ওজন বাড়লে গর্ভের শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় এবং তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঠিকমতো হয় । অন্যদিকে, মায়ের শরীরও সন্তান জন্মদানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। গর্ভাবস্থায় সঠিক ওজন বজায় রাখলে নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা বাড়ে এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে মায়ের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা সহজ হয়।
অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজনের ঝুঁকি
প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ওজন বেড়ে গেলে গর্ভাবস্থায় নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে জেসটেশনাল ডায়াবেটিস (গর্ভকালীন ডায়াবেটিস), উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া এবং প্রিম্যাচিউর প্রসবের ঝুঁকি অন্যতম । আবার প্রসবের সময় সিজারিয়ান বা অপারেশনের প্রয়োজন হওয়ার আশঙ্কাও অনেকটা বেড়ে যায়। উল্টোদিকে, মায়ের ওজন যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম বাড়ে, তবে গর্ভস্থ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে (Low birth weight), যা জন্মের পর শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় ।
গর্ভাবস্থার আগে বিএমআই (BMI) এবং ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক
গর্ভাবস্থায় ঠিক কতটা ওজন বাড়বে, তার কোনো একক মাপকাঠি নেই যা সবার জন্য প্রযোজ্য। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে গর্ভধারণের ঠিক আগে মায়ের ওজন ও উচ্চতার অনুপাত বা বডি মাস ইনডেক্স (BMI)-এর ওপর ।
বিএমআই (BMI) কীভাবে হিসাব করবেন?
বিএমআই বা বডি মাস ইনডেক্স হলো শরীরের উচ্চতা ও ওজনের একটি আনুপাতিক হিসাব । কিলোগ্রাম এককে আপনার ওজনকে মিটার এককে আপনার উচ্চতার বর্গফল দিয়ে ভাগ করলেই বিএমআই পাওয়া যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাভাবিক বিএমআই হলো ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ এর মধ্যে । আপনার বিএমআই কত, তার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক নির্ধারণ করে দেবেন পুরো গর্ভাবস্থায় আপনার ঠিক কতটা ওজন বাড়ানো নিরাপদ।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ওজন বৃদ্ধির হার
গর্ভকালীন পুরো নয় মাস বা ৪০ সপ্তাহকে তিনটি ত্রৈমাসিকে (Trimester) ভাগ করা হয়। ওজন বৃদ্ধির হার সব ত্রৈমাসিকে সমান থাকে না। প্রথম তিন মাসে (First Trimester) সাধারণত মায়েদের বমি ভাব বা খাবারে অরুচি থাকে, তাই এই সময়ে ওজন খুব একটা বাড়ে না। চিকিৎসকদের মতে, প্রথম ত্রৈমাসিকে সামগ্রিকভাবে ০.৫ থেকে ২.৫ কেজি ওজন বাড়াই স্বাভাবিক । কিন্তু দ্বিতীয় (Second Trimester) ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (Third Trimester) শিশুর বৃদ্ধি দ্রুত হয় বলে মায়ের ওজনও দ্রুত বাড়তে থাকে। এই সময়ে স্বাভাবিক ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম (০.৪ – ০.৫ কেজি) করে ওজন বাড়া আদর্শ ।
গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন কত হওয়া উচিত?
আপনার গর্ভধারণের আগের বিএমআই অনুযায়ী পুরো গর্ভাবস্থায় আপনার কতটুকু ওজন বাড়া উচিত, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG) এবং ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (IOM)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন (Ideal weight of pregnant mother) বৃদ্ধির একটি চার্ট নিচে দেওয়া হলো ।
(তথ্যসূত্র: IOM ও ACOG গাইডলাইন )
আন্ডারওয়েট বা কম ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে
যাঁদের বিএমআই ১৮.৫ এর নিচে, তাঁদের আন্ডারওয়েট বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের অধিকারী ধরা হয় । এই মায়েদের শরীরে পুষ্টির কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় তাঁদের তুলনামূলক বেশি ওজন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই ক্যাটাগরির মায়েদের পুরো গর্ভাবস্থায় ১২.৫ থেকে ১৮ কেজি পর্যন্ত ওজন বাড়ানো উচিত ।
স্বাভাবিক ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে
যাঁদের বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ এর মধ্যে, তাঁরা স্বাভাবিক ওজনের অধিকারী । স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থার জন্য এই মায়েদের মোট ১১.৫ থেকে ১৬ কেজি ওজন বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক ও নিরাপদ । প্রথম তিন মাসের পর থেকে সপ্তাহে প্রায় ৪০০ গ্রাম করে ওজন বাড়লে তা মা ও শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো ।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূল মায়েদের ক্ষেত্রে
গর্ভধারণের আগেই যাঁদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, গর্ভাবস্থায় তাঁদের খুব সাবধানে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। বিএমআই ২৫ থেকে ২৯.৯ এর মধ্যে থাকলে তাঁদের ৭ থেকে ১১.৫ কেজি এবং বিএমআই ৩০ এর বেশি হলে মাত্র ৫ থেকে ৯ কেজি ওজন বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয় । অতিরিক্ত ওজন বাড়লে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায় ।
যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন
মায়ের গর্ভে যদি যমজ (Twins) বা তার বেশি সন্তান থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই মায়ের ক্যালরির চাহিদা এবং ওজন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তন হয়ে যায় । যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে সাধারণ গাইডলাইন কাজ করে না।
যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে ওজন বৃদ্ধির গাইডলাইন
(তথ্যসূত্র: ACOG গাইডলাইন )
যমজ সন্তান ধারণে বাড়তি সতর্কতা
যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে মায়েদের প্রোটিন, আয়রন এবং ক্যালসিয়ামের চাহিদা অনেক গুণ বেড়ে যায়। ওজন বেশি বাড়ার কারণে মায়েদের হাঁটাচলা করতে কষ্ট হতে পারে এবং প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির ঝুঁকি থাকে। তাই যমজ সন্তান থাকলে প্রথম থেকেই একজন বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা এবং নিয়মিত ওজন চেক করা ভীষণ জরুরি ।
গর্ভাবস্থায় সঠিক ওজন বজায় রাখার উপায়
গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন (Ideal weight of pregnant mother) ধরে রাখা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। সঠিক জীবনযাপন এবং কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই ওজন সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব।
পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ও ডায়েট
গর্ভাবস্থায় “দুজনের সমান খেতে হবে”—এই প্রচলিত ধারণাটি একদমই বৈজ্ঞানিক নয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে মায়ের শরীরে প্রতিদিন মাত্র ৩০০ থেকে ৪৫০ বাড়তি ক্যালরির প্রয়োজন হয়। তাই অতিরিক্ত ভাত, মিষ্টি বা ফাস্টফুড না খেয়ে পুষ্টিকর খাবারের দিকে নজর দিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি, প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম, ডাল) এবং পর্যাপ্ত পানি রাখুন। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে দিনে ৫-৬ বার খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন।
হালকা ব্যায়াম ও শারীরিক সক্রিয়তা
গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ বেডরেস্টে থাকার প্রয়োজন নেই, যদি না চিকিৎসক বিশেষভাবে পরামর্শ দেন। সুস্থ থাকতে এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি এড়াতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হালকা হাঁটাচলা করা ভালো। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রেগন্যান্সি যোগব্যায়াম বা পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ করতে পারেন। এতে শরীর ঝরঝরে থাকে এবং নরমাল ডেলিভারির পথ সুগম হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপে গিয়ে ওজন মাপা একটি রুটিন কাজ। তবে ওজনের ক্ষেত্রে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন
যদি দেখেন যে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আপনার ওজন হঠাৎ করে অনেক বেশি (যেমন ১-২ কেজি) বেড়ে গেছে, তবে তা বিপদের লক্ষণ হতে পারে। এটি প্রি-একলাম্পসিয়া বা শরীরে পানি জমার (Edema) পূর্বাভাস হতে পারে। আবার যদি দেখেন দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে আপনার ওজন একদমই বাড়ছে না বা উল্টে কমে যাচ্ছে, তাহলেও দ্রুত চিকিৎসকের সাথে কথা বলা উচিত, কারণ এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে ।
শেষ কথা
গর্ভাবস্থা কোনো অসুস্থতা নয়, এটি একটি সুন্দর মাতৃত্বকালীন সফর। এই সফরে মা ও সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করতে গর্ভবতী মায়ের আদর্শ ওজন (Ideal weight of pregnant mother) সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব। অন্য কারও সাথে নিজের ওজনের তুলনা করবেন না, কারণ প্রতিটি মায়ের শরীর আলাদা। আপনার বিএমআই অনুযায়ী চিকিৎসকের দেওয়া ডায়েট ও গাইডলাইন মেনে চলুন। হাসিখুশি থাকুন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে নিজেকে ও অনাগত সন্তানকে সুরক্ষিত রাখুন।











