১ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে কার্যকর হয়েছে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫’, যাতে জাল বা ভুয়া পাসপোর্ট এবং ভিসা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এই কঠোর আইনের মাধ্যমে ভারত তার অভিবাসন নীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, “যে বা যারা জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন বা সরবরাহ করছেন বা যারা ভিসা জালিয়াতি করে ভারতে এসেছেন বা ভারতে থাকছেন, তাদের অন্তত ২ বছরের জেলের সাজা হবে। সেই সাজা ৭ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে। এর পাশাপাশি কমপক্ষে ১ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা করা হবে। সেই অঙ্ক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে”।
গৃহ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নীতেশ কুমার ব্যাস স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫-এর অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখটিকে এই আইনের বিধানাবলী কার্যকরের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছে”। আইনটি গত ২৭ মার্চ সংসদে পাস হয় এবং ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এতে সম্মতি দেন।
বৈধ নথিপত্র ছাড়া অনুপ্রবেশেও রয়েছে কড়া শাস্তির বিধান। যেকোনো বিদেশি বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। একইভাবে, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেউ ভারতে থেকে গেলে ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
নতুন আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশিদের তথ্য প্রদানের বাধ্যতামূলক বিধান। হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমকে বাধ্যতামূলকভাবে বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য জানাতে হবে প্রশাসনকে। মেয়াদ উত্তীর্ণ ভিসায় কেউ ভারতে বাস করছেন কি না, তার উপর নজর রাখার জন্য এই পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক বিমান ও জাহাজ সংস্থাগুলোকেও যাত্রী এবং ক্রুদের তথ্য আগেভাগেই জমা দিতে হবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বিদেশিদের পরিবহনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং যানবাহন জব্দের বিধানও রয়েছে।
নতুন আইনটি পুরনো চারটি আইনের বিকল্প হিসেবে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) অ্যাক্ট ১৯২০, রেজিস্ট্রেশন অব ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৩৯, ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬ এবং ইমিগ্রেশন (ক্যারিয়ারস লায়াবিলিটি) অ্যাক্ট ২০০০। সরকারের দাবি, বর্তমানের চারটি আইনকে আরও সরল করতে এবং প্রতিটির মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতেই চারটির বদলে একটি আইন আনা হয়েছে।
এই আইনের আওতায় ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়েছে, যা দেশের অভিবাসন সংক্রান্ত যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা এখন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে কেন্দ্র, রাজ্য ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় করে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত, আটক ও বহিষ্কারে কাজ করবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু সংসদে জানিয়েছিলেন যে ভারতে আনুমানিক দুই কোটিরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনটিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে এমন সব জায়গার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেগুলি “বিদেশিদের দ্বারা নিয়মিতভাবে পরিদর্শিত”। প্রয়োজনে সেই জায়গা বন্ধ করে দেওয়া, নির্দিষ্ট শর্তে পরিচালনার অনুমতি বা নির্দিষ্ট শ্রেণির বিদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারিরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে নতুন আইনে কিছু বিশেষ ছাড়ও রয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসা ছয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা—হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং পারসি—যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তারা এই আইনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে অব্যাহতি পাবেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে এই বিলের বিতর্কে জানান, “ভারত সরকার পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে আগতদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, তবে ভারতকে কেউ যেন ‘ধর্মশালা’ ভাবে, তা বরদাস্ত করা হবে না”। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাইও স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ভারতে বিদেশিদের আগমন নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং অভিবাসন আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে বলেন, “একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার গঠন পাল্টানোর চেষ্টা চলছে, একটি নতুন সংকটের বীজ বপন করা হচ্ছে। সেই কারণেই আমরা একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি”।
বিরোধী দলগুলো অবশ্য এই আইনের সমালোচনা করেছে। কংগ্রেসের মণীশ তিওয়ারির দাবি, অপছন্দের বিদেশিদের যাতে দেশে প্রবেশমাত্র ফেরত পাঠানো যায়, সরকার নতুন বিলে তা নিশ্চিত করতে চাইছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়ের দাবি, এই আইন কার্যকর হলে প্রতিভাবান বিদেশিরা এ দেশে আসবেন না, তাতে মেধা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত কয়েক মাসে একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের তীব্রতা বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনও বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা শুরু করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বাদ দেওয়া।
সরকারের মতে, অবৈধ অভিবাসন কেবলমাত্র নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং তা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদের উপর বিরাট বোঝা তৈরি করে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার এই সমস্যার মোকাবিলায় অনেক বেশি প্রস্তুত ও শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে।











