ভারতের সংসদীয় বিষয়ক বহিরাগত কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা জারি করেছে যে বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ লোকসভায় “Future of India-Bangladesh Relationship” শীর্ষক নবম প্রতিবেদন পেশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইসলামী র্যাডিক্যাল শক্তির উত্থান এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের পতন ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে ১৯৭১ সালে যেখানে চ্যালেঞ্জটি ছিল অস্তিত্বমূলক এবং মানবিক সংকট, আজকের হুমকি আরও সূক্ষ্ম কিন্তু সম্ভাব্য আরও গুরুতর।
১৯৭১ বনাম ২০২৫: দুই যুগের দুই চ্যালেঞ্জ
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন স্পষ্ট করে বলেছে যে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি এবং ২০২৫ সালের বর্তমান সংকটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭১ সালে ভারতের সামনে ছিল একটি মানবিক সংকট, লাখো শরণার্থীর আগমন এবং একটি নতুন জাতির জন্মদানের দায়িত্ব। সেই সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল এবং তেরো দিনের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে কোনো সরাসরি সামরিক হুমকি নেই, কিন্তু রয়েছে একটি জটিল কৌশলগত পুনর্বিন্যাস যা ভারতের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ। কমিটি উল্লেখ করেছে যে বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো “একটি প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ভারত থেকে দূরে একটি সম্ভাব্য কৌশলগত পুনর্বিন্যাস”। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে যদি ভারত এই মুহূর্তে সঠিকভাবে পুনর্ক্যালিব্রেট করতে ব্যর্থ হয়, তবে ঢাকায় তার কৌশলগত স্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে—যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি
সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে একটি প্রধান কৌশলগত উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চীন গত দশকে বাংলাদেশে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০১৬ সালে চীন বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা দেশটির সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ অঙ্গীকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (BRI) বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রবেশের সূচনা করেছিল।
পাকিস্তানও বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনার পতনের পর পাকিস্তান দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে এই আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস ঢাকায় ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাব দুর্বল করতে পারে এবং নয়াদিল্লির প্রতিবেশী নিরাপত্তা কৌশলকে জটিল করে তুলতে পারে।
চীনের অবকাঠামো প্রকল্পগুলি—বিশেষ করে বন্দর, প্রতিরক্ষা এবং সিলিগুড়ি করিডোর ও বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি এলাকায়—ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। কমিটি সরকারকে বিদেশি কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে যা ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মুজিব-ইন্দিরা বন্ধুত্ব: স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এক অনন্য সম্পর্ক
চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরিসংখ্যান
| বিষয় | পরিসংখ্যান | সূত্র |
|---|---|---|
| চীনের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি (২০১৬) | ২৪ বিলিয়ন ডলার | China Daily, অক্টোবর ২০২৫ |
| ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য (২০২৪-২৫) | ১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার | IBEF, নভেম্বর ২০২৪ |
| ভারত থেকে রপ্তানি (২০২৪-২৫) | ১১.৪৬ বিলিয়ন ডলার | ভারত সরকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় |
| বাংলাদেশ থেকে আমদানি (২০২৪-২৫) | ২.০৫ বিলিয়ন ডলার | IBEF রিপোর্ট |
| বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি (২০২৩-২৪) | ৯.২ বিলিয়ন ডলার | Fortune India, আগস্ট ২০২৪ |
শেখ হাসিনার পতন: একটি টার্নিং পয়েন্ট
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের প্রতিবাদে ৩০০ থেকে ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট “যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি” খুঁজে পেয়েছে যে হাসিনা সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী সহিংস দমন-পীড়ন পরিচালনা করে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে প্রত্যর্পণের জন্য বারবার অনুরোধ করেছে, কিন্তু ভারত মানবিক কারণে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কমিটি নিশ্চিত করেছে যে ভারতীয় মাটি থেকে কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং সরকারকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ সম্পর্কে সংসদকে অবহিত রাখতে বলেছে।
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। ইউনূস ঘোষণা করেছেন যে এপ্রিল ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ভারত-বিরোধী বক্তব্য এবং চীন-পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা নয়াদিল্লিকে উদ্বিগ্ন করেছে।
ইসলামী শক্তির পুনরুত্থান এবং সংখ্যালঘু আক্রমণ
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে ইসলামী র্যাডিক্যাল শক্তির পুনরুত্থানকে একটি প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু—বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের—উপর আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ রিপোর্ট করেছে যে ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট ২০২৪—এই মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে—সংখ্যালঘুদের উপর মোট ২,০১০টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৬৯টি মন্দিরও রয়েছে। ১৫৭টি পরিবারের বাড়িতে আক্রমণ, লুটপাট, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
ভারতীয় বৈদেশিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লোকসভায় জানিয়েছেন যে ২৬ নভেম্বর ২০২৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত—মাত্র দুই মাসে—হিন্দুদের লক্ষ্য করে ৭৬টি আক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। আগস্ট ২০২৪ থেকে মোট ২৩ জন হিন্দু প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৫২টি মন্দির আক্রমণের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ঘোষণা করেছে যে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ সংক্রান্ত ৮৮টি মামলায় ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ১,২৫৪টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা চিহ্নিত করেছে।
সংখ্যালঘু আক্রমণের পরিসংখ্যান (আগস্ট ২০২৪ – জানুয়ারি ২০২৫)
| সময়কাল | ঘটনা | মৃত্যু | মন্দির আক্রমণ | সূত্র |
|---|---|---|---|---|
| ৪-২০ আগস্ট ২০২৪ | ২,০১০টি আক্রমণ | তথ্য নেই | ৬৯টি মন্দির | Bangladesh Hindu Buddhist Christian Unity Council |
| আগস্ট ২০২৪ – জানুয়ারি ২০২৫ | তথ্য নেই | ২৩ জন হিন্দু | ১৫২টি মন্দির | ভারতীয় সংসদ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫ |
| ২৬ নভেম্বর – ২৫ জানুয়ারি | ৭৬টি আক্রমণ | তথ্য নেই | তথ্য নেই | India Today, ফেব্রুয়ারি ২০২৫ |
| সর্বমোট চিহ্নিত ঘটনা | ১,২৫৪টি | তথ্য নেই | তথ্য নেই | বাংলাদেশ সরকার, ডিসেম্বর ২০২৪ |
বর্তমান কূটনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ
ডিসেম্বর ২০২৫-এ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের নিরাপত্তা পরিবেশের অবনতির বিষয়ে ভারত বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশি ছাত্র নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ভারতীয় হাই কমিশনের দিকে মিছিলের হুমকি দিয়েছিলেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রাখেন। তিনি এমনকি বলেছিলেন যে বাংলাদেশ “চীনা অর্থনীতির একটি সম্প্রসারণ” হিসেবে কাজ করতে পারে এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির জন্য “সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক” হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত ঢাকায় ভিসা সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ সরকারও ভারতীয় মাটি থেকে শেখ হাসিনার “উস্কানিমূলক বক্তব্য” নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে, যা আসন্ন নির্বাচনকে ব্যাহত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভারত এই দাবি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বৃদ্ধি: ভারতের কূটনৈতিক চাল
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিহ্নিত চ্যালেঞ্জসমূহ
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি চিহ্নিত করেছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে:
অবৈধ অভিবাসন: বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসন একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা যা সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে।
র্যাডিকালাইজেশন এবং উগ্রবাদ: বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলির উত্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতের কৌশলগত স্বার্থকে প্রভাবিত করে।
ভারতের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে উগ্রবাদী বক্তৃতা: বাংলাদেশের কিছু নেতা এবং গোষ্ঠী ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং হুমকিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে এই চ্যালেঞ্জগুলি “বাংলাদেশ সরকারের সাথে সহযোগিতা এবং তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।” ভারত সরকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে এবং এটি বিভিন্ন স্তরে উত্থাপন করেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্য
অর্থনৈতিক সম্পর্ক সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বাংলাদেশ উপমহাদেশে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি অংশীদার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি ১১.৪৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল ২.০৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৯.২ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের ১০.১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমেছে।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে উভয় দেশ পারস্পরিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এপ্রিল ২০২৫ সালে ভারত বাংলাদেশের জন্য তার ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে। এর প্রতিক্রিয়ায়, বাংলাদেশ স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা এবং চাল আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। ভারতও স্থল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে, বাংলাদেশ একটি ভারতীয় রাষ্ট্রীয় জাহাজ নির্মাণ সংস্থা Garden Reach Shipbuilders and Engineers Ltd (GRSE)-এর সাথে ২১ মিলিয়ন ডলারের একটি অত্যাধুনিক সমুদ্রগামী টাগ চুক্তি হঠাৎ করে বাতিল করেছে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।
সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং কমিটির সুপারিশ
ভারত সরকার জানিয়েছে যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অগ্রাধিকার পর্যবেক্ষণের অধীনে রয়েছে এবং ক্রমাগত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সংসদীয় কমিটি সরকারকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করেছে:
কূটনৈতিক সংযুক্তি: ভারতকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, একই সাথে বাংলাদেশি জনগণের সাথে বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের কাজ করতে হবে।
নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ: চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি—বিশেষ করে অবকাঠামো, বন্দর এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পে—নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
সংখ্যালঘু সুরক্ষা: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
শেখ হাসিনার আশ্রয়: ভারত মানবিক কারণে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ভারতীয় মাটি থেকে কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সরকারকে প্রত্যর্পণ অনুরোধ সম্পর্কে সংসদকে অবহিত রাখতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী কৌশল: কমিটি সতর্ক করেছে যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ এবং ক্রমবর্ধমান বহিরাগত নির্ভরতা ভারতের ক্রমাগত মনোযোগ দাবি করবে।
ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাবনা
সংসদীয় কমিটি স্পষ্ট করেছে যে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি “বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্যে নেমে যাবে না” বলে মনে করা হলেও, ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এটি পরিচালনা করতে হবে।
এপ্রিল ২০২৬-এ নির্ধারিত নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হবে। যদি বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো পাকিস্তান ও চীনপন্থী দলগুলি ক্ষমতায় আসে, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। বিপরীতে, যদি আওয়ামী লীগ বা মধ্যপন্থী শক্তি কোনোভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে পারে, তাহলে সম্পর্ক উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক, যা একসময় পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সম্মানের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছিল, এখন পারস্পরিক সন্দেহ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির জন্য স্থান কার্যকরভাবে সংকুচিত করে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে মূল্যায়ন করতে হবে যে তারা ভারতের সাথে কূটনৈতিক ঘর্ষণ তৈরি করতে বা বিচ্ছিন্ন হতে পারে কিনা—এমন একটি দেশ যার সাথে তারা তাদের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নেয়—এমন সময়ে যখন তার অভ্যন্তরীণ বৈধতা অস্থির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
শেষ কথা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে—এই সত্যটি শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইসলামী র্যাডিক্যাল শক্তির উত্থান, সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমাগত আক্রমণ এবং ভারত-বিরোধী বক্তৃতার বৃদ্ধি একটি জটিল এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভারতের জন্য উদ্বেগ এখন আর যুদ্ধ নিয়ে নয়, বরং প্রভাব, মতাদর্শ এবং আঞ্চলিক সারিবদ্ধতা নিয়ে। ঢাকার কেন্দ্রীয় ভূমিকা বিবেচনা করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায়, কমিটি সতর্ক করেছে যে আত্মতুষ্টি ব্যয়বহুল প্রমাণিত হতে পারে। ভারতকে বাংলাদেশি জনগণের সাথে বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করতে হবে, ঐতিহাসিকভাবে লালিত জনগণ-থেকে-জনগণ সম্পর্ক বিপর্যস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে, একই সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আগামী মাস এবং বছরগুলি নির্ধারণ করবে ভারত এই জটিল কূটনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারে কিনা এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সাথে তার ঐতিহাসিক বন্ধন সংরক্ষণ করতে পারে কিনা।











