মুখে ভারত-বিরোধিতার ঢেউ, বাস্তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাগাম দিল্লির হাতেই?

 বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত। যে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল একাংশের ভারত-বিরোধিতার সুর। কিন্তু ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার…

Avatar

 

 বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত। যে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল একাংশের ভারত-বিরোধিতার সুর। কিন্তু ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি সত্যিই ভারতের উপর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে পেরেছে? নাকি রাজনৈতিক বুলির আড়ালে বাস্তবে এই নির্ভরতা আরও গভীর ও কাঠামোগত হয়ে উঠেছে? সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান এক জটিল এবং অপ্রত্যাশিত চিত্র তুলে ধরছে, যা থেকে বোঝা যায় যে, হাসিনা আমলের চেয়েও ইউনূস জমানায় বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে ভারতের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আগস্ট ২০২৪-এর গণজাগরণের পর নতুন সরকারের কাছ থেকে অনেকেই আশা করেছিলেন যে ভারতের সঙ্গে করা বিতর্কিত চুক্তিগুলো পুনঃপরীক্ষা করা হবে এবং অর্থনৈতিক পরাবলম্বন কমানোর চেষ্টা করা হবে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চলমান বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক মঞ্চে দূরত্বের বার্তা দেওয়া হলেও, বাণিজ্যিক খেরোখাতায় চিত্রটা ঠিক তার উল্টো।

মুখ্য বিষয় (Key Facts)

  • বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি: ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৪৩ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে রপ্তানি করতে পেরেছে মাত্র ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য। (সূত্র: প্রথম আলো, ১৮ মে, ২০২৫)
  • আমদানি নির্ভরতা অপরিবর্তিত: পেঁয়াজ, চাল, গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে তুলা এবং যন্ত্রাংশের মতো শিল্প-কাঁচামালের জন্য ভারতের উপর নির্ভরতা এখনও আগের মতোই প্রবল। ইউনূস সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করলেও স্বল্প সময়ে এই কাঠামো পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।
  • জ্বালানি খাতে গভীর সংযুক্তি: ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে বিদ্যুৎ কেনা সংক্রান্ত চুক্তি এখনও বহাল। যদিও বকেয়া পরিশোধ নিয়ে কিছু টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশকে তার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশের জন্য এই সরবরাহের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
  • ভারতীয় ঋণের ধীরগতি কিন্তু কৌশলগত গুরুত্ব: শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রতিশ্রুত প্রায় ৭৩৬ কোটি ডলারের ভারতীয় ঋণের (Line of Credit) সিংহভাগই ছাড় হয়নি। কিন্তু যে প্রকল্পগুলো চালু রয়েছে (যেমন – খুলনা-মোংলা রেললাইন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকাঠামো), সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ভারতীয় প্রযুক্তি ও সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছেই।

প্রেক্ষাপট: পালাবদল ও নতুন সমীকরণ

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র-আন্দোলনের গভীরে তাকালে দেখা যেত, এর অন্যতম একটি স্রোত ছিল ভারতের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা। অনেকেই মনে করতেন, হাসিনা সরকার ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। বিশেষ করে, তিস্তা জলবণ্টন চুক্তির অচলাবস্থা, সীমান্ত সমস্যা এবং আদানি বিদ্যুৎ চুক্তির মতো বিষয়গুলো জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।

ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর আশা করা হয়েছিল, তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি নতুন, সমতার ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংযত এবং সতর্কতামূলক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা যে কোনও রাজনৈতিক ইচ্ছার চেয়েও শক্তিশালী, তা বিগত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট।

সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান: নির্ভরতার গভীরতা

অর্থনৈতিক নির্ভরতাকে বুঝতে হলে কয়েকটি প্রধান সূচকের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

১. বাণিজ্য ঘাটতির ধারা:

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য लगातार ভারতের পক্ষেই ঝুঁকে রয়েছে।

  • ২০২২-২৩ অর্থবর্ষ: ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যেখানে ভারত থেকে আমদানি ছিল প্রায় ১,৩৬৩ কোটি ডলার। ঘাটতি ছিল প্রায় ১,১৬৩ কোটি ডলার।
  • ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ: রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ডলারে, এবং আমদানি কমে হয়েছে ৯০০ কোটি ডলার। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪৩ কোটি ডলার। (সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)

বিশ্লেষণ: আপাতদৃষ্টিতে ঘাটতি কমলেও, এটি মূলত বাংলাদেশের ডলার সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফল। এর অর্থ এই নয় যে নির্ভরতা কমেছে; বরং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পণ্য আনতে না পারায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

২. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি:

বাংলাদেশের বাজার ভারতের সরবরাহের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষত:

  • পেঁয়াজ: ভারতে উৎপাদন বা রপ্তানি নীতিতে সামান্য পরিবর্তন হলেই বাংলাদেশের বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
  • চাল ও গম: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে প্রায়শই ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।
  • তুলা: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত, তৈরি পোশাক শিল্পের, প্রধান কাঁচামাল তুলার প্রায় ৪০-৫০% আসে ভারত থেকে। এই নির্ভরতা রাতারাতি কমানো সম্ভব নয়।

৩. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত:

ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিটি হাসিনা সরকারের অন্যতম বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ ছিল। ইউনূস সরকার এই চুক্তিটি পর্যালোচনা করার কথা বললেও, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় এই সরবরাহ বন্ধ করার ঝুঁকি নিতে পারেনি।

  • আদানি চুক্তি: এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশকে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বকেয়া পরিশোধ নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হলেও, বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত অর্থ ছাড় করতে বাধ্য হয়েছে, যা জ্বালানি খাতে ভারতের উপর কৌশলগত নির্ভরতারই প্রমাণ।

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ভারতের সঙ্গে একটি সার্বভৌম এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আমরা চেষ্টা করছি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের কারণে ভারতকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে, ভারতের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ORF) দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ডঃ এস. জয়রামের মতে, “বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা। তাদের একদিকে জনগণের প্রত্যাশার চাপ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভারতের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। India-Bangladesh সম্পর্কটি এখন অনেক বেশি লেনদেনভিত্তিক (transactional) এবং বাস্তববাদী হয়ে উঠেছে।” (সূত্র: ORF বিশেষ প্রতিবেদন)

অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) গবেষক ডঃ মুস্তাফিজুর রহমান একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলেন:

“এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা কয়েক দশকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবহণ খরচ এবং পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে ভারতের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। সরকারের উচিত হবে ভারতের সাথে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) নিয়ে আলোচনা শুরু করা, যাতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায় এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়।”

সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব

বেনাপোল স্থলবন্দরের একজন সাধারণ আমদানিকারক, আব্দুল করিম শেখ, তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “সরকার বদলালেও আমাদের ব্যবসা তো বদলায়নি। ভারত থেকে পণ্য না আনলে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে, আর ঢাকার বাজারে জিনিসের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। রাজনীতির কথা আমরা বুঝি না, কিন্তু পেট তো চালাতে হবে।” এই সহজ কথাই প্রমাণ করে, মাঠের বাস্তবতা কতটা জটিল।

ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে?

ডঃ ইউনূসের সরকারের সামনে কয়েকটি কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে:

  • তিস্তা চুক্তি: ভারত সরকারের উপর তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের জন্য নতুন করে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা।
  • CEPA চুক্তি: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা।
  • বিকল্প উৎসের সন্ধান: খাদ্যশস্য ও শিল্প-কাঁচামাল আমদানির জন্য তুরস্ক, ব্রাজিল বা আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করা।

তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, রাজনৈতিকভাবে ভারত-বিরোধিতার বাতাবরণ থাকলেও, অর্থনৈতিকভাবে ইউনূস সরকার পূর্বসূরীর মতোই ভারতের উপর নির্ভরশীল। বরং, ডলার সংকট এবং একটি অনভিজ্ঞ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হওয়ার কারণে দর কষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। মুখে বড় বুলি থাকলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতির নাটাই যে এখনও অনেকটাই দিল্লির হাতে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়েই ডঃ ইউনূসের সরকারকে আগামী দিনের পথ চলতে হবে।

 

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম