২০২৬-এ জিডিপি বৃদ্ধির ঝলক থাকলেও কর্মসংস্থান সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির দোলাচলে ভারতের অর্থনীতি – আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?

ভারতের অর্থনীতি ২০২৬ সালে সবল জিডিপি বৃদ্ধির পথে এগিয়ে চললেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) চলতি অর্থবর্ষে জিডিপি…

Chanchal Sen

 

ভারতের অর্থনীতি ২০২৬ সালে সবল জিডিপি বৃদ্ধির পথে এগিয়ে চললেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) চলতি অর্থবর্ষে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে ক্রিসিল এবং ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা ৭-৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে। কিন্তু এই চকচকে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগ – বিশেষত যুব বেকারত্ব যা ১৪.৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং শহুরে এলাকায় বেকারত্বের হার ৬.৯ শতাংশ, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক কল্যাণের জন্য বড় হুমকি।

ভারতীয় অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি: জিডিপি বৃদ্ধি কি যথেষ্ট?

ভারতের অর্থনীতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে। RBI সেপ্টেম্বর ২০২৫ কোয়ার্টারে ৮.২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি রেকর্ড করার পর পুরো বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৩ শতাংশ করেছে। ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চ আরও আশাবাদী, যারা FY২৬-এর জন্য ৭.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে। এই বৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকা শক্তি হল ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, GST হার যৌক্তিকীকরণ এবং আয়কর ছাড়ের সুবিধা।

ক্রিসিল তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে FY২৬-এর জন্য ৭ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগের বছরের ৬.৫ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা মুদ্রাস্ফীতির হ্রাস, GST পুনর্গঠন এবং আয়কর ত্রাণের কথা উল্লেখ করেছে। তবে বিশ্বব্যাঙ্ক এবং মর্গান স্ট্যানলির পূর্বাভাস কিছুটা ভিন্ন – তারা ৬.৪ থেকে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং আর্থিক কঠোরতার প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত।

কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কি প্রকৃত অর্থে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে এর প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

IMF Update:ভারত ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে

কর্মসংস্থান সংকট: জিডিপি বৃদ্ধির পরও চাকরির অভাব কেন?

সাম্প্রতিক পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS) এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ কোয়ার্টারে ভারতের বেকারত্বের হার ৫.২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের কোয়ার্টারে ছিল ৫.৪ শতাংশ। এই হ্রাস মূলত গ্রামীণ এলাকায় বেকারত্ব কমার ফলে হয়েছে, যেখানে হার ৪.৮ শতাংশ থেকে কমে ৪.৪ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু শহুরে এলাকায় বরং পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে, যেখানে বেকারত্বের হার ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৯ শতাংশ হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল যুব বেকারত্ব (১৫-২৯ বছর বয়সী), যা Q২ FY২৬-এ ১৪.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা Q১-তে ছিল ১৪.৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে শিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। গোয়া এবং কেরালায় মহিলা যুব বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৪১.৩ এবং ৪৩.৮ শতাংশ, যা দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে বিরাট ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বব্যাঙ্কের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম জনসংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় ৩০ কোটি বৃদ্ধি পাবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, এই জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ বোঝায় পরিণত হতে পারে।

foundit প্ল্যাটফর্মের এক রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৬ সালে ভারতে প্রায় ১.২৮ কোটি (১২.৮ মিলিয়ন) নতুন চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই চাকরি মূলত AI-সক্ষম দক্ষতা, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং মধ্য-ক্যারিয়ার ডিজিটাল প্রতিভার উপর নির্ভরশীল হবে। এর অর্থ হল যেসব যুবক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের জন্য চাকরির বাজারে প্রবেশ করা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে।

মুদ্রাস্ফীতি: সাময়িক স্বস্তি নাকি নতুন চিন্তার কারণ?

ভারতের মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে অভূতপূর্ব নিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। অক্টোবর ২০২৫-এ CPI মুদ্রাস্ফীতি মাত্র ০.৩ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা বর্তমান সিরিজে সর্বনিম্ন। নভেম্বরে এটি সামান্য বেড়ে ০.৭১ শতাংশ হয়েছে। RBI তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে FY২৬-এর জন্য CPI মুদ্রাস্ফীতি ২.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করেছে। ক্রিসিল অনুমান করছে যে এই অর্থবর্ষে মুদ্রাস্ফীতি ২.৫ শতাংশে থাকবে, যা আগের বছরের ৪.৬ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য হ্রাস।

এই মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের পেছনে রয়েছে খাদ্য মূল্য হ্রাস, সুষম কৃষি উৎপাদন, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীল থাকা এবং GST হার কমানোর সুবিধা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে ২০২৬ সালে মুদ্রাস্ফীতি আবার ৪-৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর কারণগুলি হল – দুর্বল রুপি, মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা, অনিয়মিত বর্ষা এবং খাদ্যশস্যের দামে ওঠানামা।

ব্যাঙ্ক অফ বরোদার প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিস মন্তব্য করেছেন যে ২০২৬ সালে মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে নতুন CPI সূচক এবং এর গঠন, যা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ চালু হওয়ার কথা। তিনি আশা করছেন যে স্বাভাবিক বর্ষা হলে ২০২৬ সালে মুদ্রাস্ফীতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ৪-৪.৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

যদিও কম মুদ্রাস্ফীতি ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির, তবে এটি অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে। অত্যন্ত কম মুদ্রাস্ফীতি বা ডিফ্লেশন ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হ্রাস এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হতে পারে। তাই RBI-কে মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

RBI-র মুদ্রানীতি: সুদের হার কমানো কি যথেষ্ট?

RBI ২০২৫ সালে মোট ১২৫ বেসিস পয়েন্ট (১.২৫ শতাংশ) সুদের হার কমিয়েছে। সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০২৫-এ রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৫.২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে মনিটারি পলিসি কমিটি (MPC) গ্রহণ করেছে অর্থনীতিতে গতি আনার জন্য। নতুন RBI গভর্নর সঞ্জয় মাল্হোত্রার মতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবং প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘকাল ধরে সুদের হার কম রাখা হবে।

ING ব্যাঙ্কের বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন যে ২০২৬ সালের প্রথম কোয়ার্টারে আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমানো হতে পারে। তারা আরও বলেছেন যে মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকা এবং প্রবৃদ্ধিতে মন্থরতার সম্ভাবনার কারণে এই পদক্ষেপ যুক্তিযুক্ত। তবে তারা সতর্ক করেছেন যে ২০২৬ সালে GDP বৃদ্ধি ৭.৬ শতাংশ থেকে কমে ৬.৫ শতাংশ হতে পারে, কারণ তৃতীয় কোয়ার্টারে দেখা শিখর গতি ধীরে ধীরে কমতে পারে।

RBI লিকুইডিটি বাড়ানোর জন্য ওপেন মার্কেট বন্ড ক্রয় এবং ফরেক্স সোয়াপের মতো ব্যবস্থাও ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপগুলি ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে অর্থ প্রবাহ বাড়াবে এবং ঋণ প্রদান সহজ করবে। তবে এই সুদের হার কমানোর সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাঙ্কগুলি কতটা দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে এই হার কমানো গ্রাহকদের কাছে স্থানান্তরিত করবে, তার উপর নির্ভর করবে এর প্রকৃত প্রভাব।

দশ বছরে দ্বিগুণ হল ভারতের জিডিপি, জাপান-জার্মানিকে পেছনে ফেলার পথে

রাজকোষীয় ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়: চ্যালেঞ্জ বনাম সুযোগ

ভারত সরকার FY২৬-এর জন্য রাজকোষীয় ঘাটতি GDP-র ৪.৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের ৪.৮ শতাংশ থেকে উন্নতি। তবে ICRA-র প্রধান অর্থনীতিবিদ অদিতি নায়ারের মতে, এপ্রিল-নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সরকার ইতিমধ্যে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার ৬২.৩ শতাংশ ব্যয় করে ফেলেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫২.৫ শতাংশ। এই দ্রুত ব্যয় মূলত পুঁজিগত ব্যয় (capex) ২৮ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে হয়েছে।

এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, কারণ নিট কর রাজস্ব এই সময়ে ৩.৪ শতাংশ কমেছে, যদিও কর-বহির্ভূত রাজস্ব ২০.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আশাবাদী যে চতুর্থ কোয়ার্টারে শক্তিশালী রাজস্ব সংগ্রহ এবং কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। তবে GST হার কমানো এবং বিভিন্ন কর ছাড়ের কারণে রাজস্ব চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে সরকারের চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু একই সাথে রাজকোষীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ: বাণিজ্য যুদ্ধ এবং শুল্কের হুমকি

ভারতের অর্থনীতিতে ২০২৬ সালে বড় বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর মার্কিন বাণিজ্য নীতিতে কঠোরতা আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভারতের টেক্সটাইল এবং ফার্মাসিউটিক্যালস রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে। IMF-র মতে, এই ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি ভারতের কর-বহির্ভূত আমদানি খরচ ১০-১৫ শতাংশ বাড়াতে পারে।

রুপির দুর্বলতাও একটি বড় উদ্বেগ। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে, যা আমদানি খরচ বৃদ্ধি করছে, বিশেষত অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামে যেকোনো বৃদ্ধির প্রভাব অনুভব করে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে ২০২৬ সালে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৫-৮০ ডলার থাকবে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা OPEC-এর উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত এই দাম আরও বাড়াতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতিতে ০.৫-১ শতাংশ যোগ করতে পারে।

তবে আশার কথা হল, ভারত বাণিজ্য বহুমুখীকরণের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ওমান এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে নতুন বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে, যা রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। এছাড়া, ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতিকে বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।

কর্মসংস্থান বনাম প্রবৃদ্ধি: ডিসকানেক্টের সমাধান কোথায়?

ভারতের অর্থনীতিতে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হল উচ্চ GDP বৃদ্ধি এবং অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে ব্যবধান। এই ‘jobless growth’-এর ঘটনা কেন ঘটছে? ভারত কর্মসংস্থান রিপোর্ট ২০২৪ অনুসারে, ভারতের কর্মীবাহিনীর প্রায় ৩০-৪০ শতাংশের দক্ষতার ব্যবধান রয়েছে, অর্থাৎ তাদের চাকরির প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।

শিক্ষিত বেকারত্ব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জম্মু ও কাশ্মীরে ডিগ্রিধারী মহিলাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৯.৫ শতাংশ এবং রাজস্থানে ৩২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে শুধুমাত্র দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি যথেষ্ট নয়; শ্রম বাজার কীভাবে কাজ করে তা বোঝা এবং সেই অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং রোবোটিক্সের উত্থান কর্মসংস্থানের ধরন পরিবর্তন করছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩ অনুযায়ী, ESG (পরিবেশ, সামাজিক এবং প্রশাসন) লক্ষ্যের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে, কিন্তু একই সাথে অনেক ঐতিহ্যবাহী চাকরি হারিয়ে যাবে। ভারত এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে কতটা ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে এবং কর্মীবাহিনীকে পিছনে না ফেলে এগিয়ে নিতে পারবে, তার উপর নির্ভর করবে দেশের ভবিষ্যৎ।

আশার আলো: সুযোগ এবং সম্ভাবনা

চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতির জন্য অনেক সুযোগও রয়েছে। টায়ার-২ এবং টায়ার-৩ শহরগুলি কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। foundit-এর রিপোর্ট অনুসারে, প্রযুক্তি, BFSI (ব্যাঙ্কিং, আর্থিক সেবা এবং বীমা), লজিস্টিক্স এবং খুচরা ক্ষেত্রে এই শহরগুলিতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিকেন্দ্রীকরণ শুধুমাত্র মেট্রো শহরের চাপ কমাচ্ছে না, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমান উন্নয়নেও সহায়তা করছে।

সরকারের সম্প্রতি ঘোষিত “মিশন ১০০ মিলিয়ন জবস” উদ্যোগ বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই উদ্যোগের বিস্তারিত এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে এটি দেশের কর্মসংস্থান সংকটের সমাধানে সরকারের গুরুতর প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।

GST যৌক্তিকীকরণ এবং আয়কর ত্রাণ ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি করছে, যা অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত করবে। RBI-র সুদের হার কমানো ব্যবসায়িক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগকে সহজ করবে। ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ, বিশেষত ফিনটেক এবং ই-কমার্স ক্ষেত্রে, নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

নীতিগত অগ্রাধিকার: এখন কী করা উচিত?

ভারতের অর্থনীতিকে ২০২৬ সালে সঠিক পথে রাখতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু নীতিগত অগ্রাধিকারের সুপারিশ করছেন। প্রথমত, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন নিয়ন্ত্রক পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, রাজকোষীয় স্বাস্থ্য শক্তিশালী করা প্রয়োজন, বিশেষত উন্নত কর সংগ্রহ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, শ্রম বাজারের নমনীয়তা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি যাতে ক্রমবর্ধমান কর্মীবাহিনীকে শোষণ করা যায়। চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিল্পের চাহিদার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন যাতে স্নাতকরা বাজারের উপযোগী দক্ষতা নিয়ে বের হয়।

পঞ্চমত, স্টার্টআপ এবং MSME (ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং মাঝারি উদ্যোগ) ক্ষেত্রকে সহায়তা প্রদান করা দরকার, কারণ এই ক্ষেত্রগুলি সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। ষষ্ঠত, কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী মানে দাঁড়ায়?

এই সমস্ত ম্যাক্রো-ইকোনমিক পরিসংখ্যান এবং নীতিগত আলোচনার পেছনে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রকৃত প্রভাব কী? কম মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার কমানো মানে হল ঋণ সস্তা হবে, বিশেষত গৃহঋণ এবং ব্যক্তিগত ঋণ। কিন্তু যদি চাকরির নিরাপত্তা না থাকে বা আয় বৃদ্ধি না হয়, তাহলে এই সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে।

শিক্ষিত যুবকদের জন্য বার্তা স্পষ্ট – ঐতিহ্যবাহী ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। AI, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং অন্যান্য নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তোলা এবং চাকরি খোঁজার পরিবর্তে চাকরি সৃষ্টির দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ীদের জন্য, অনিশ্চয়তা নেভিগেট করার প্রস্তুতি প্রয়োজন। মুদ্রার ঝুঁকি হেজিং করা, সাবধানী বাজেটিং এবং নমনীয় ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা এই সময়ে সফলতার চাবিকাঠি। সরকারি নীতির পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাজারের গতিবিধির উপর নজর রাখা জরুরি।

ভবিষ্যতের পথ: ভারসাম্যমূলক বৃদ্ধির দিকে

ভারতের অর্থনীতি ২০২৬ সালে একটি জটিল পথে রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী GDP বৃদ্ধি, কম মুদ্রাস্ফীতি এবং সহায়ক মুদ্রানীতি আশাব্যঞ্জক। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সংকট, বিশেষত যুব বেকারত্ব, দক্ষতার ব্যবধান এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা গভীর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সফলতা নির্ভর করবে সরকার, ব্যবসা এবং সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার উপর।

শুধুমাত্র GDP বৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; এই বৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কর্মসংস্থান-সৃষ্টিকারী করতে হবে। প্রতিটি শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি যাতে লক্ষ লক্ষ নতুন চাকরি সৃষ্টি করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে, সেই লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বাজেট ২০২৬ এই দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, যেখানে সরকারকে দেখাতে হবে কীভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করা হবে।

ভারতের জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ একটি সীমিত সময়ের জন্য সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে না পারলে, তা বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই এখনই সময় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার – শিক্ষা সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রম আইন সংস্কার এবং উদ্যোক্তা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য বজায় রেখে টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি অর্জন করাই হবে ২০২৬ সালে ভারতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ভারতের অর্থনীতি ২০২৬ সালে অভূতপূর্ব সুযোগ এবং জটিল চ্যালেঞ্জের সংমিশ্রণের মধ্যে রয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধির ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীর গতি এবং যুব বেকারত্বের ১৪.৮ শতাংশ হার দেশের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। RBI-র আর্থিক নীতির শিথিলকরণ এবং সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু শিক্ষা-দক্ষতা-কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা মোকাবিলা করা এখনও বড় কাজ। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই বৃদ্ধিকে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই করা যায় তার উপর। বাজেট ২০২৬ এবং আগামী মাসের নীতিগত সিদ্ধান্ত ভারতের অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আরও পড়ুন