কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুর কাছেই বিদাদি এলাকায় গড়ে উঠতে চলেছে ভারতের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শহর। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি দেশের প্রযুক্তি খাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং হাজার হাজার চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশ্বমানের এই এআই শহরটি ভারতকে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মানচিত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বিদাদিতে অবস্থিত এই এআই শহর প্রকল্পটি কর্ণাটক সরকারের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেঙ্গালুরুর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোকে প্রযুক্তি হাবে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই শহরে থাকবে অত্যাধুনিক গবেষণাগার, প্রযুক্তি কোম্পানির অফিস, স্টার্টআপ ইনকিউবেটর এবং আবাসিক এলাকা।
প্রস্তাবিত এআই শহরটি প্রায় কয়েক হাজার একর জমি জুড়ে বিস্তৃত হবে। এখানে দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের এআই গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবে। শহরটির পরিকল্পনায় রয়েছে স্মার্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যেখানে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিচালিত হবে।
কর্মসংস্থানের দিক থেকে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই এআই শহরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এআই ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সাইন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সহায়ক সেবার চাকরি পাওয়া যাবে এখানে।
এই প্রকল্পের একটি বিশেষ দিক হলো শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব। এআই শহরে তৈরি হবে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থাকবে। দেশের তরুণদের জন্য এটি এক অভূতপূর্ব সুযোগ হয়ে উঠবে।
বিদাদি এলাকা বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে কৌশলগত কারণ। বেঙ্গালুরু থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকাটি ইতিমধ্যেই শিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বেঙ্গালুরুর আইটি হাবের সাথে সংযোগ এই প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এনে দেবে।
অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে এই প্রকল্পটি কর্ণাটকের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। প্রযুক্তি খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্শণ এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এছাড়াও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতের প্রসার ঘটবে।
শিয়ালদা-বনগাঁ লাইনে AC লোকাল ট্রেন চলাচল শুরু হচ্ছে, জেনে নিন স্টপেজ ও ভাড়ার বিস্তারিত তথ্য
পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও এই প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এআই শহরটি হবে কার্বন নিউট্রাল এবং সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার করে গড়ে তোলা হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে, চেন্নাইয়ের মতো শহরগুলো ইতিমধ্যেই আইটি সেবার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিদাদির এআই শহর ভারতের প্রযুক্তি নেতৃত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
স্মার্ট সিটি প্রোগ্রামের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই এআই শহর তৈরি করা হচ্ছে। শহরের সব ধরনের সেবা – যাতায়াত, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি সরবরাহ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা – সবকিছুই হবে এআই চালিত। এর ফলে নাগরিকরা পাবেন অভূতপূর্ব সুবিধা ও সেবার মান।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জাপান, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, আমেরিকার মতো দেশের সাথে এআই গবেষণা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদরা বিশ্বমানের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
প্রকল্পের বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে মূল অবকাঠামো, গবেষণা কেন্দ্র এবং কিছু আবাসিক এলাকা তৈরি হবে। পরবর্তী পর্যায়ে শিল্প এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিনোদন সুবিধা যুক্ত হবে। এভাবে ১০-১৫ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ এআই শহরটি গড়ে উঠবে।
যুব সমাজের জন্য এই প্রকল্প এক সুবর্ণ সুযোগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা সাইন্স, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটির মতো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তারা বিশ্বমানের পেশাদার হয়ে উঠতে পারবেন। স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, ইন্টার্নশিপ এবং এন্ট্রিপ্রেনারশিপ সাপোর্টের ব্যবস্থাও থাকবে।
এই এআই শহর প্রকল্প ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া স্বপ্নের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা অর্জন এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদাদির এআই শহর হতে পারে এক নতুন দিগন্তের সূচনা।











