এক দশক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এশিয়া কাপ হকির মঞ্চে আবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল ভারতীয় পুরুষ হকি দল। আজ রাজগীরে অনুষ্ঠিত রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-১ গোলের ব্যবধানে পর্যুদস্ত করে চতুর্থবারের মতো এশিয়া কাপের শিরোপা জিতল ভারত। এই জয়ের ফলে শুধু এশিয়া সেরা হওয়ার গৌরবই অর্জন করল না দল, বরং ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য হকি বিশ্বকাপেরও টিকিট নিশ্চিত করল তারা। দিলপ্রীত সিং-এর জোড়া গোল এবং দলের অনবদ্য পারফরম্যান্স দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো এক সন্ধ্যা উপহার দিল ভারতীয় হকিপ্রেমীদের।
ম্যাচের শুরু থেকেই ভারতের দাপট
ফাইনালের মঞ্চে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলা শুরু করে ভারতীয় দল। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং-এর নিখুঁত পাস থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড সুখজিৎ সিং। কোরিয়ান ডিফেন্স কিছু বুঝে ওঠার আগেই করা এই গোলটি ম্যাচের সুর বেঁধে দেয়। শুরুতেই গোল পেয়ে যাওয়ায় ভারতীয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বেড়ে যায়। প্রথম কোয়ার্টারে ভারত আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও কোরিয়ান গোলকিপার জায়েহান কিমের অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবধান বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়াও প্রতি-আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতের জমাট রক্ষণভাগ তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে দিলপ্রীতের ঝলক
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে দুই দলই কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলা শুরু করে। মাঝমাঠের দখল নেওয়ার জন্য দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলতে থাকে। তবে খেলার গতির বিপরীতে গিয়ে ২৮তম মিনিটে আবারও ভারতের উল্লাস। এবারও গোলের নেপথ্যে অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং। তার একটি দূরপাল্লার এরিয়াল বল অসাধারণ দক্ষতায় রিসিভ করেন সঞ্জয় এবং তিনি পাস বাড়ান দিলপ্রীত সিং-এর দিকে। গোলপোস্টের সামনে থাকা দিলপ্রীত ঠান্ডা মাথায় বলটি জালে জড়িয়ে ভারতের লিড ২-০ করেন। এই গোলের পর কোরিয়ান শিবির কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ার্ধের বাকি সময়টা ভারত বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে কোরিয়ার উপর চাপ বজায় রাখে।
তৃতীয় ও চতুর্থ কোয়ার্টারে নিশ্চিত হলো জয়
বিরতির পর কোরিয়া ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা বেশ কয়েকটি পেনাল্টি কর্নারও আদায় করে নেয়। কিন্তু ভারতের গোলরক্ষক কৃষাণ পাঠকের অনবদ্য কিছু সেভ এবং ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় কোরিয়ার সমস্ত আক্রমণ ভেস্তে যায়। তৃতীয় কোয়ার্টারের শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ৪৫তম মিনিটে, দিলপ্রীত সিং আবারও তার জাত চেনান। রাজ কুমার পালের একটি শট কোরিয়ান গোলরক্ষক বাঁচিয়ে দিলেও ফিরতি বলে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন দিলপ্রীত।
৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে চতুর্থ কোয়ার্টার শুরু করে কোরিয়া। তাদের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট হতাশার ছাপ ছিল। ম্যাচের ৫০তম মিনিটে ভারত একটি পেনাল্টি কর্নার অর্জন করে এবং অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার অমিত রোহিদাস কোনো ভুল না করে мощным ( शक्तिशाली ) ড্র্যাগফ্লিকে গোল করে ভারতের জয় কার্যত নিশ্চিত করে দেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০। এর ঠিক পরের মিনিটেই, ৫১তম মিনিটে, কোরিয়া একটি পেনাল্টি কর্নার থেকে কিছুটা সান্ত্বনার গোল পায়। সন দাইনের গোলে ব্যবধান কমলেও তা ভারতের বিশাল জয়ের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলের ব্যবধানে ফাইনাল জিতে এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।
পরিসংখ্যানের আলোয় ভারতের জয়
এটি ছিল ভারতের চতুর্থ এশিয়া কাপ শিরোপা। এর আগে ভারত ২০০৩, ২০০৭ এবং ২০১৭ সালে এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৭ সালের পর আবার ৮ বছরের মাথায় এই ট্রফি পুনরুদ্ধার করল দল। এই জয়ের ফলে ভারত সরাসরি ২০২৬ হকি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, যা দলের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। টুর্নামেন্টে ভারত অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে, যা দলের ধারাবাহিক এবং প্রভাবশালী পারফরম্যান্সের পরিচায়ক।
দিলপ্রীত সিং ফাইনালে দুটি গোল করে ম্যাচের নায়ক নির্বাচিত হন। এছাড়াও সুখজিৎ সিং, অমিত রোহিদাস এবং অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং-এর পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। রক্ষণভাগে সুরেন্দর কুমার এবং মনপ্রীত সিং প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়েছিলেন, এবং গোলরক্ষক কৃষাণ পাঠক বেশ কিছু নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্বকাপের পথে এক বড় পদক্ষেপ
এই জয় ভারতীয় হকির জন্য এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণে তৈরি এই দলটি আগামী দিনের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। এশিয়া কাপের মঞ্চে এই অনবদ্য পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে দলের আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে পৌঁছে দেবে। কোচ এবং খেলোয়াড়দের লক্ষ্য এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করা এবং দেশের জন্য আরও বড় সম্মান বয়ে আনা। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর ভারতীয় হকি ফেডারেশন দলের প্রত্যেক সদস্যের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্রীড়া জগতের বিভিন্ন মহল থেকে শুভেচ্ছার বন্যা বইছে। ৮ বছরের অপেক্ষার পর আসা এই শিরোপা জয় নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।











