সম্পর্ক ভাঙার আগেই জানুন! আপনার সঙ্গী কি একজন ‘মামা’স বয়’? ৫টি মারাত্মক লক্ষণ যা উপেক্ষা করছেন

আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার সম্পর্ক খুবই ভালো, কিন্তু আপনারা দু'জনের মধ্যে সব সময় যেন তৃতীয় আরেকজন উপস্থিত। সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তার মা। প্রতিটি পরিকল্পনা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, এমনকি…

Riddhi Datta

 

আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার সম্পর্ক খুবই ভালো, কিন্তু আপনারা দু’জনের মধ্যে সব সময় যেন তৃতীয় আরেকজন উপস্থিত। সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তার মা। প্রতিটি পরিকল্পনা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, এমনকি আপনাদের ব্যক্তিগত ঝগড়ার কথাও যদি তার মায়ের কানে পৌঁছায় এবং তার মতামত আপনাদের সম্পর্কের গতিপথ ঠিক করে দেয়, তবে আপনি সম্ভবত একজন ‘মামা’স বয়’ (Mama’s Boy) বা মায়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল একজন পুরুষের সাথে সম্পর্কে আছেন। এটি কেবল একটি মজার তকমা নয়; এটি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা যা একটি সুস্থ রোমান্টিক সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। এই ধরনের সম্পর্কে, পুরুষ সঙ্গীটি তার মায়ের থেকে মানসিক বা বাস্তবিকভাবে আলাদা হতে পারে না, যার ফলে তার প্রেমিকা বা স্ত্রী প্রায়শই নিজেকে অবহেলিত, গুরুত্বহীন এবং বহিরাগত মনে করেন।

এই নিবন্ধে, আমরা কেবল সাধারণ অভিযোগ নিয়ে কথা বলব না। আমরা মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, বিশেষজ্ঞের মতামত এবং বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করব যে ঠিক কোন লক্ষণগুলো একজন ‘ভালো ছেলে’ (যিনি মাকে ভালোবাসেন ও সম্মান করেন) এবং একজন ‘মামা’স বয়’ (যিনি মায়ের উপর অস্বাস্থ্যকরভাবে নির্ভরশীল) এর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। এই লক্ষণগুলি চেনা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি আপনার সম্পর্কের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

 ‘মামা’স বয়’ (Mama’s Boy) আসলে কে? একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: মাকে ভালোবাসা, সম্মান করা বা তার যত্ন নেওয়া কোনোভাবেই ‘মামা’স বয়’ হওয়ার লক্ষণ নয়। এটি একটি সুস্থ মানবিক গুণ। সমস্যাটি শুরু হয় যখন এই ভালোবাসা এবং সম্মান একটি অস্বাস্থ্যকর নির্ভরতা বা ‘এনমেশমেন্ট’ (Enmeshment)-এ পরিণত হয়।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘এনমেশমেন্ট’ হলো এমন একটি পারিবারিক গতিশীলতা যেখানে সীমানাগুলি অস্পষ্ট বা অস্তিত্বহীন। Psychology Today-এর মতে, একটি এনমেশড পরিবারে, সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যবোধ (sense of individuality) খুব কম থাকে। বিশেষত মা ও ছেলের মধ্যে এই ‘এনমেশমেন্ট’ ঘটলে, ছেলেটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও নিজেকে মায়ের একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে মনে করে। সে নিজের আলাদা পরিচয়, পছন্দ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ধরনের সম্পর্কে, মা প্রায়শই তার ছেলেকে তার “মানসিক স্বামী” (emotional spouse) হিসেবে ব্যবহার করেন। ছেলের জীবনের সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করা, তার সমস্ত মানসিক সমর্থনের প্রধান উৎস হওয়া—এই বিষয়গুলি তখন ছেলের পক্ষে অন্য কোনো মহিলার সাথে গভীর এবং স্বাধীন সম্পর্ক তৈরি করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

এই অস্বাস্থ্যকর গতিশীলতা বোঝার জন্য, আমাদের অবশ্যই লক্ষণগুলি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মেয়ে সন্তান হওয়ার লক্ষণ: জীবনের অন্যতম সুন্দর একটা অধ্যায়

 ৫টি প্রধান লক্ষণ যা আপনাকে চিনিয়ে দেবে

সম্পর্কের শুরুতে এই লক্ষণগুলি সূক্ষ্ম হতে পারে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে ৫টি প্রধান লক্ষণ রয়েছে যা নির্দেশ করে যে আপনার সঙ্গী হয়তো একজন ‘মামা’স বয়’।

১. প্রতিটি সিদ্ধান্তে তার মায়ের অনুমোদন প্রয়োজন

এটি সবচেয়ে বড় এবং স্পষ্ট লক্ষণ। ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই যদি তার মায়ের মতামত চূড়ান্ত হয়, তবে এটি একটি লাল সংকেত।

গভীর বিশ্লেষণ:

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার মায়ের সাথে পরামর্শ করতে পারেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ‘পরামর্শ’ আর ‘অনুমোদন’ এক জিনিস নয়।

  • পার্থক্যটি কোথায়? একজন স্বাধীন পুরুষ বিভিন্ন জনের (বন্ধু, সঙ্গী, পিতামাতা) মতামত নেবেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তিনি তার সঙ্গী বা স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে নিজে নেবেন। একজন নির্ভরশীল পুরুষ তার মায়ের কাছে সিদ্ধান্তের জন্য যাবেন। যদি মা ‘না’ বলেন, তবে তিনি সেই কাজটি করবেন না, তা তার সঙ্গীর জন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন।

  • উদাহরণ:

    • ছোট সিদ্ধান্ত: আপনারা ডিনারে কোথায় যাবেন বা কী রঙের শার্ট তিনি পরবেন, সেটাও যদি তিনি মাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন।

    • বড় সিদ্ধান্ত: আপনারা কোথায় বেড়াতে যাবেন, কোন অ্যাপার্টমেন্টে থাকবেন, গাড়ি কিনবেন কি না, বা এমনকি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা—এই সব বিষয়ে যদি তার মায়ের কথাই শেষ কথা হয়।

  • সম্পর্কের উপর প্রভাব: এটি আপনাকে এই বার্তা দেয় যে, আপনার মতামত বা প্রয়োজন তার মায়ের মতামতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার আত্মসম্মানবোধে আঘাত হানে এবং আপনাকে সম্পর্কের একজন ‘অংশীদার’ না, বরং একজন ‘দর্শক’ বানিয়ে রাখে।

২. তিনি আপনার চেয়ে তার মায়ের কাছেই মানসিক আশ্রয় খোঁজেন

একটি সুস্থ সম্পর্কে, সঙ্গীরা একে অপরের প্রধান মানসিক অবলম্বন (primary emotional support) হন। আপনারা ভালো খবর, খারাপ খবর, চাপ বা উদ্বেগের কথা একে অপরের সাথে ভাগ করে নেন। কিন্তু একজন ‘মামা’স বয়’-এর ক্ষেত্রে, এই ভূমিকাটি তার মা পালন করেন।

গভীর বিশ্লেষণ:

তিনি যখন কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়েন, বা কোনো বিষয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন তিনি কি প্রথম আপনার কাছে আসেন, নাকি তার মায়ের কাছে?

  • অস্বাস্থ্যকর প্যাটার্ন: যদি তিনি আপনাদের সম্পর্কের ব্যক্তিগত সমস্যা বা ঝগড়ার কথাও বিস্তারিতভাবে তার মায়ের সাথে আলোচনা করেন, তবে এটি একটি মারাত্মক সীমানা লঙ্ঘন। এটি আপনাদের সম্পর্কের গোপনীয়তা (privacy) নষ্ট করে।

  • ফলাফল: আপনি অনুভব করতে শুরু করেন যে আপনি তার জীবনে “দ্বিতীয় মহিলা”। মনোবিজ্ঞানীরা একে ‘ট্রায়াঙ্গুলেশন’ (Triangulation) বলেন, যেখানে মা আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় কোণ হিসেবে কাজ করেন। এটি আপনার এবং আপনার সঙ্গীর মধ্যে একটি সুস্থ মানসিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে বাধা দেয়। Healthline অনুযায়ী, এই ধরনের মানসিক নির্ভরতা রোমান্টিক সঙ্গীর সাথে একটি সুরক্ষিত বন্ধন (secure attachment) তৈরি করা কঠিন করে তোলে।

৩. তিনি ক্রমাগত আপনার সাথে তার মায়ের তুলনা করেন

এটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং ধ্বংসাত্মক আচরণ। এই তুলনা প্রায়শই সূক্ষ্মভাবে শুরু হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তা আপনার আত্মবিশ্বাসকে কুরে কুরে খায়।

গভীর বিশ্লেষণ:

এই তুলনার উদ্দেশ্য আপনাকে ‘উন্নতি’ করতে সাহায্য করা নয়, বরং আপনাকে বোঝানো যে আপনি তার মায়ের তৈরি করা ‘আদর্শ’ মানের থেকে কতটা পিছিয়ে আছেন।

  • সাধারণ উদাহরণ:

    • “আমার মা তোমার চেয়ে ভালো রান্না করেন।”

    • “মা ঠিকই বলেছিল, এই চাকরিটা তোমার জন্য নয়।”

    • “মা বাড়িটা অনেক গুছিয়ে রাখে, তুমি এভাবে অগোছালো করে রাখো কেন?”

  • মনস্তাত্ত্বিক কারণ: তিনি তার মাকে একটি অলঙ্ঘনীয় মানদণ্ডে (pedestal) বসিয়ে রেখেছেন। তিনি অবচেতনভাবে এমন একজন সঙ্গী খোঁজেন যিনি তার মায়ের প্রতিরূপ হবেন, যা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব।

  • সম্পর্কের উপর প্রভাব: প্রখ্যাত সম্পর্ক গবেষক ডঃ জন গটম্যান (Dr. John Gottman)-এর মতে, ক্রমাগত ‘সমালোচনা’ (Criticism) হলো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার চারটি প্রধান কারণের মধ্যে একটি (‘Four Horsemen of the Apocalypse’)। এই ধরনের তুলনা এক ধরনের সমালোচনা, যা আপনার মধ্যে গভীর অসন্তোষ এবং দূরত্ব তৈরি করে।

৪. মায়ের সাথে কোনো বিবাদেই তিনি যান না (এবং আপনাকেও করতে দেন না)

একজন ‘মামা’স বয়’-এর সবচেয়ে বড় ভয় হলো তার মাকে অসন্তুষ্ট করা। তিনি মায়ের সাথে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা মতবিরোধ এড়াতে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারেন, এমনকি যদি তার মা অন্যায় করেন বা আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।

গভীর বিশ্লেষণ:

ধরুন, আপনার শাশুড়ি আপনার রান্না, পোশাক বা সন্তান পালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্যে আপনার সমালোচনা করলেন।

  • সুস্থ প্রতিক্রিয়া: একজন ভারসাম্যপূর্ণ সঙ্গী হয়তো মায়ের সাথে সরাসরি সংঘাতে যাবেন না, কিন্তু তিনি অবশ্যই পরে ব্যক্তিগতভাবে মাকে বলবেন যে এই আচরণটি ঠিক নয় এবং তিনি তার সঙ্গীর পাশে আছেন। তিনি আপনার কাছে এসেও আপনাকে সমর্থন জানাবেন।

  • ‘মামা’স বয়’-এর প্রতিক্রিয়া: তিনি হয় চুপ করে থাকবেন, নয়তো পরিস্থিতি শান্ত করতে আপনাকে বলবেন “মায়ের কথা গায়ে মেখো না” বা আরও খারাপ, “তুমিই হয়তো কিছু ভুল করেছ।” তিনি আপনাকে রক্ষা করার বা আপনার পক্ষে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তার মায়ের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেবেন।

  • পরিসংখ্যানিক তথ্য: এই ধরনের শ্বশুর-শাশুড়ির হস্তক্ষেপ (in-law interference) সম্পর্কের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডঃ টেরি অ্যাপ্টার (Dr. Terri Apter)-এর একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রায় ৬০% মহিলা তাদের শাশুড়ির সাথে দীর্ঘমেয়াদী চাপ এবং উত্তেজনার কথা জানিয়েছেন। যখন স্বামী এই উত্তেজনায় মধ্যস্থতা করতে বা স্ত্রীকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হন, তখন তা সম্পর্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

৫. অর্থনৈতিক ও বাস্তবিকভাবে তিনি এখনও নির্ভরশীল

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অর্থ কেবল আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াই নয়, বরং নিজের জীবনের দায়িত্ব নেওয়া। একজন ‘মামা’স বয়’ হয়তো ভালো বেতনের চাকরি করতে পারেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের অনেক ছোটখাটো কাজের জন্য তিনি এখনও মায়ের উপর নির্ভরশীল।

গভীর বিশ্লেষণ:

এই নির্ভরতা বিভিন্ন রূপে আসতে পারে:

  • অর্থনৈতিক নির্ভরতা: তিনি হয়তো এখনও তার মায়ের সাথে একটি জয়েন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (joint bank account) ব্যবহার করেন। তার মা হয়তো তার বিল পরিশোধ করেন, তার বিনিয়োগ পরিচালনা করেন বা তার খরচের উপর নজর রাখেন। যখন আপনারা বিয়ে করেন বা একসাথে থাকতে শুরু করেন, তখন এই আর্থিক জট (financial enmeshment) আপনাদের নিজস্ব আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করতে বাধা দেয়।

  • বাস্তবিক নির্ভরতা: তিনি কি এখনও নিজের জামাকাপড় কাচার জন্য মায়ের বাড়িতে পাঠান? তার মা কি এখনও তার জন্য ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করেন বা তার ইনস্যুরেন্সের কাগজপত্র সামলান? এই কাজগুলি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজের করা উচিত।

  • তথ্য: যদিও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কারণে মাল্টি-জেনারেশনাল হাউসহোল্ড (multi-generational households) বা একাধিক প্রজন্মের একসাথে বাস করার প্রবণতা বাড়ছে, Pew Research Center-এর বিশ্লেষণ (যদিও এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা) দেখায় যে তরুণ পুরুষদের মধ্যে পিতামাতার সাথে থাকার প্রবণতা তরুণীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সাংস্কৃতিক কারণ বাদ দিলেও, যদি এই একসাথে থাকাটা পারস্পরিক সুবিধার পরিবর্তে কেবল ছেলের স্বাচ্ছন্দ্য এবং মায়ের নিয়ন্ত্রণের জন্য হয়, তবে তা একটি সমস্যা।

এই ধরনের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

যদি এই লক্ষণগুলি আপনার সম্পর্কের সাথে মিলে যায়, তবে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর গতিশীলতার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব

  • একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা: আপনি ক্রমাগত অনুভব করবেন যে আপনি এই সম্পর্কের একজন বহিরাগত।

  • নিম্ন আত্মসম্মান (Low Self-Esteem): ক্রমাগত তুলনা এবং আপনার মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে আপনার নিজের যোগ্যতার উপর সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

  • উদ্বেগ এবং হতাশা: শাশুড়ির সাথে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব এবং সঙ্গীর সমর্থনের অভাব আপনার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা তৈরি করতে পারে।

সম্পর্কের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব

  • ঘনিষ্ঠতার অভাব: যখন আপনাদের মধ্যে সর্বদা একজন “তৃতীয় ব্যক্তি” (মা) থাকেন, তখন প্রকৃত মানসিক এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা কঠিন।

  • অসন্তোষ এবং বিরক্তি: আপনার চাহিদাগুলি পূরণ না হওয়ায় আপনার মধ্যে সঙ্গীর প্রতি গভীর বিরক্তি এবং অসন্তোষ জমা হতে থাকবে।

  • বিবাহবিচ্ছেদ: এটি চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে। ডঃ টেরি অ্যাপ্টারের সেই ২৬ বছরের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে সমস্ত দম্পতি মনে করতেন যে তাদের শ্বশুর-শাশুড়ি অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছেন, তাদের বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি অন্যান্য দম্পতির তুলনায় ২০% বেশি ছিল।

আপনার সঙ্গী কি বদলাতে পারে? (সমাধানের পথ)

এই অন্ধকার চিত্র দেখার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: এর কি কোনো সমাধান আছে? উত্তরটি হলো: হ্যাঁ, কিন্তু এটি কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। পরিবর্তনটি আপনার সঙ্গীর নিজের মধ্য থেকে আসতে হবে। তিনি যদি সমস্যাটি স্বীকার না করেন, তবে আপনার একার পক্ষে এই গতিশীলতা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।

যদি তিনি পরিবর্তনের ইচ্ছুক হন, তবে এখানে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

১. খোলামেলা কিন্তু সহানুভূতিশীল আলোচনা

সঠিক সময় এবং স্থান বেছে নিয়ে তার সাথে কথা বলুন। অভিযোগের সুরে নয়, বরং আপনার কেমন লাগছে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলুন।

  • কী বলবেন না: “তুমি একটা মায়ের ছেলে! তুমি শুধু তোমার মায়ের কথা শোনো!” (এটি আক্রমণাত্মক)

  • কী বলবেন: “আমি যখন দেখি যে আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলি তোমার মা ঠিক করে দিচ্ছেন, তখন আমার মনে হয় যে আমার মতামতের কোনো মূল্য নেই। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।” (এটি আপনার অনুভূতি প্রকাশ করে)

২. সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ (Setting Boundaries)

সীমানা হলো একটি সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এটি কেবল আপনার শাশুড়ির জন্য নয়, আপনার সঙ্গীর জন্যও।

  • উদাহরণের সীমানা:

    • গোপনীয়তা: “আমি চাই আমাদের ঝগড়া বা আর্থিক পরিকল্পনা যেন আমাদের মধ্যেই থাকে। এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

    • সিদ্ধান্ত গ্রহণ: “আমি চাই বড় সিদ্ধান্তগুলো আমরা দুজনে মিলে নিই। আমরা অবশ্যই তোমার মায়ের মতামত শুনতে পারি, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমাদের হবে।”

    • তুলনা: “যখন তুমি আমাকে তোমার মায়ের সাথে তুলনা করো, তখন আমি খুব অপমানিত বোধ করি। দয়া করে এটা বন্ধ করো।”

ছেলে সন্তান হওয়ার লক্ষণ: গর্ভাবস্থায় কী কী ইঙ্গিত পাওয়া যায়?

৩. পেশাদার সাহায্য (Professional Help)

অনেক সময় এই ‘এনমেশমেন্ট’-এর শিকড় এত গভীরে থাকে যে তা থেকে বের হওয়ার জন্য পেশাদার সাহায্যের প্রয়োজন হয়।

  • স্বতন্ত্র থেরাপি (Individual Therapy): এটি আপনার সঙ্গীকে তার নির্ভরতার মূল কারণ খুঁজে বের করতে এবং একজন স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

  • কাপলস থেরাপি (Couples Therapy): একজন থেরাপিস্ট আপনাদের দুজনকে স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের পদ্ধতি শিখতে এবং একসাথে সীমানা নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে পারেন। American Association for Marriage and Family Therapy (AAMFT)-এর মতো সংস্থাগুলি এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার সুপারিশ করে।

৪. কখন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা উচিত?

সবচেয়ে কঠিন সত্যটি হলো, কিছু মানুষ বদলাতে চায় না। যদি আপনার সঙ্গী সমস্যাটি দেখতে অস্বীকার করেন, যদি তিনি থেরাপিতে যেতে অস্বীকার করেন এবং যদি তিনি ক্রমাগত তার মায়ের পক্ষ নেন ও আপনার মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করেন, তবে আপনাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। আপনার নিজের মানসিক শান্তি এবং আত্মসম্মান রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব।

 ভালোবাসা বনাম নির্ভরতা

মাকে ভালোবাসা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা একটি মহৎ গুণ। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হিসেবে, তার জীবনের প্রধান আনুগত্য (primary loyalty) তার স্ত্রী বা সঙ্গীর প্রতি হওয়া উচিত। এর অর্থ এই নয় যে তাকে তার মাকে ত্যাগ করতে হবে, বরং এর অর্থ হলো তাকে তার নতুন পরিবারকে (যা আপনাকে নিয়ে গঠিত) অগ্রাধিকার দিতে শিখতে হবে।

যদি আপনি উপরের লক্ষণগুলির সাথে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারেন, তবে ভয় পাবেন না। প্রথমে সমস্যাটি স্বীকার করুন। আপনার অনুভূতিগুলি বৈধ। একটি সুস্থ এবং ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য খোলামেলা আলোচনা এবং সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণের কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখবেন, আপনি এমন একটি সম্পর্কের যোগ্য যেখানে আপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, অবহেলা নয়।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।