জগদ্ধাত্রী পূজা, যা মূলত কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবলমাত্র একটি দিনের উপাসনা নয়। এটি দেবী দুর্গার এক সাত্ত্বিক রূপের আরাধনা, যিনি এই জগৎকে ধারণ করে আছেন। শাস্ত্র ও ঐতিহ্য অনুসারে, এই পূজার বিশেষত্ব হলো দেবীর তিন ভিন্ন রূপের উপাসনা, যা দিনের তিনটি ভিন্ন প্রহরে (সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা বা রাত্রি) সম্পন্ন হয়। পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর এবং চন্দননগরে এই পূজার ঐতিহ্য সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, তবে এর নিয়মাবলী ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি অত্যন্ত গভীর। এই নিবন্ধে, আমরা জগদ্ধাত্রী পূজার প্রতিটি নিয়ম—তার পৌরাণিক উৎস, প্রতিমার তাৎপর্য, তিন প্রহরের পূজার বিধি এবং আধুনিক রীতিনীতি—সম্পর্কে বিস্তারিত ও তথ্যনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করব। এই পূজার মূল ভিত্তি উপনিষদ এবং তন্ত্রশাস্ত্রের গভীরে প্রোথিত, যা একে দুর্গাপূজার থেকে স্বতন্ত্র এক মাত্রা প্রদান করে।
জগদ্ধাত্রী পূজার উৎস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যেকোনো পূজার নিয়মাবলী বোঝার আগে তার উৎস জানা প্রয়োজন। জগদ্ধাত্রী পূজার ধারণাটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর উল্লেখ পাওয়া যায় উপনিষদে। পরবর্তীকালে, বাংলার তন্ত্রসাধক এবং রাজবংশীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই পূজা এক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।
পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি: কেন উপনিষদ
দেবী জগদ্ধাত্রীর যে রূপের আমরা পূজা করি, তার প্রথম আভাস মেলে ‘কেন উপনিষদ’-এ। উপনিষদের এক আখ্যানে বলা হয়েছে, দেবতারা অসুরদের পরাজিত করার পর অহংকারী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ভাবতে শুরু করেন যে, এই বিজয় তাঁদের নিজেদের শক্তিতেই অর্জিত হয়েছে। তাঁদের এই অহংকার দূর করার জন্য পরব্রহ্ম এক ‘যক্ষ’-এর রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হন। অগ্নিদেব ও বায়ুদেব সেই যক্ষের সামান্য তৃণখণ্ডও দহন বা সঞ্চালন করতে ব্যর্থ হন। তখন দেবরাজ ইন্দ্র অহংকার ত্যাগ করে সেই শক্তির স্বরূপ জানতে অগ্রসর হলে, সেই শক্তি অন্তর্হিত হন এবং আকাশে আবির্ভূতা হন এক স্বর্ণবর্ণা দেবী—’উমা হৈমবতী’।
এই উমা হৈমবতীই দেবতাদের ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করেন এবং জানান যে, তাঁরা যে শক্তির বলে বলীয়ান, তা ব্রহ্মেরই শক্তি। এই হৈমবতী রূপই দেবী জগদ্ধাত্রীর পৌরাণিক ভিত্তি। তিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন এবং তিনিই সমস্ত শক্তির উৎস। তন্ত্রমতে, তিনি দেবীর সাত্ত্বিক রূপ, যিনি জগতের পালনকর্ত্রী।
ঐতিহাসিক সূচনা: কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র
বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন নিয়ে দুটি প্রধান মত প্রচলিত আছে। প্রথম মত অনুসারে, নদীয়ার কৃষ্ণনগরের প্রখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ (যিনি বাংলায় কালীপূজার প্রসারেও মূল ভূমিকা নেন) স্বপ্নাদেশ পেয়ে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তন করেন। তাঁর ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থে এই পূজার বিস্তারিত বিধি ও ধ্যানমন্ত্র উল্লেখ আছে।
তবে, এই পূজাকে জনপ্রিয় ও সর্বজনীন করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় নদীয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে (শাসনকাল ১৭২৮-১৭৮২)। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছে রাজস্ব বাকি পড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদের কারাগারে বন্দী হন। দুর্গাপূজার সময় তিনি মুক্তি পান না। কারামুক্তির পর যখন তিনি নৌকায় কৃষ্ণনগর ফিরছিলেন, তখন শুক্লা নবমীর রাতে তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে পরবর্তী শুক্লা নবমীতে পূজা করার নির্দেশ দেন। সেই আদেশ শিরোধার্য করে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র আনুমানিক ১৭৫৪ সাল থেকে কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন, যা ‘রাজবাড়ীর পূজা’ নামে খ্যাত হয়। এই পূজাই পরবর্তীকালে প্রথমে কৃষ্ণনগর ও পরে ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরে ছড়িয়ে পড়ে।
জগদ্ধাত্রী পূজার মূল নিয়মাবলী ও বিধি
জগদ্ধাত্রী পূজা মূলত তন্ত্রমতে এবং বৈষ্ণবীয় ভক্তিবাদের মিশ্রণে অনুষ্ঠিত হয়। এর নিয়মাবলী দুর্গাপূজার থেকে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আলাদা, বিশেষত একদিনে তিনবার পূজার বিধানে।
পূজার সময় ও তিথি (২০২৫ সালের নির্ঘণ্ট)
জগদ্ধাত্রী পূজা কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিটিই পূজার মূল দিন। কিছু কিছু স্থানে সপ্তমী ও অষ্টমী তিথিতেও ঘট স্থাপন ও প্রাথমিক পূজা করা হয়, কিন্তু মূল ‘নবমী পূজা’ নবমী তিথিতেই সম্পন্ন হয়।
২০২৫ সালের জগদ্ধাত্রী পূজার নির্ঘণ্ট (তথ্যসূত্র: Drik Panchang):
- নবমী তিথি শুরু: ৮ই নভেম্বর, ২০২৫ (শনিবার) সকাল ০৬:৩৯ মিনিট।
- নবমী তিথি শেষ: ৯ই নভেম্বর, ২০২৫ (রবিবার) সকাল ০৭:৫৭ মিনিট।
যেহেতু পূজাটি মূলত নবমী তিথিতেই হয়, তাই ৮ই নভেম্বর, ২০২৫ তারিখেই মূল পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিমার বিশেষত্ব ও তাৎপর্য
জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়মের একটি বড় অংশ হলো প্রতিমার শাস্ত্রীয় রূপ।
- সিংহারূঢ়া: দেবী সিংহপৃষ্ঠে আসীনা। এই সিংহ এক করী (হাতি)-এর মস্তকের উপর দণ্ডায়মান।
- করীন্দ্রাসুর বধ: ওই হাতিটি হলো ‘করীন্দ্রাসুর’-এর প্রতীক। এটি মানুষের ‘অহং’ বা ‘ইগো’-এর প্রতীক। দেবী জগদ্ধাত্রী মানুষের এই আসুরিক অহংকারকে দলন করে তার উপর অধিষ্ঠিতা।
- চতুর্ভুজা: দেবী চতুর্ভুজা। তাঁর দুই বাম হস্তে শঙ্খ ও ধনু এবং দুই দক্ষিণ হস্তে চক্র ও পঞ্চবাণ। এই অস্ত্রগুলি বিভিন্ন শক্তির প্রতীক।
- নাগযজ্ঞোপবীত: দেবীর বক্ষে পৈতা বা যজ্ঞোপবীত রূপে সাপ জড়িয়ে থাকে। এটি তন্ত্রমতে তাঁর যোগিনী ও কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক।
- বর্ণ: দেবীর গাত্রবর্ণ উদীয়মান সূর্যের মতো (বালার্কসদৃশী), যা তাঁর সাত্ত্বিক প্রকাশ ও জ্ঞানের আলোকরূপকে বোঝায়।
এই প্রতিমা নির্মাণে শাস্ত্রীয় নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয়। কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা, যাঁরা তাঁদের সূক্ষ্ম কাজের জন্য ভৌগোলিক সূচক (GI) ট্যাগ (Application No. 332) পেয়েছেন, তাঁরা বংশপরম্পরায় এই বিশেষ রূপ নির্মাণ করে আসছেন।
পূজার প্রস্তুতি: ঘট স্থাপন ও সংকল্প
পূজার দিন সকালে (সপ্তমী বা নবমীতে) নির্দিষ্ট লগ্নে ‘ঘট স্থাপন’ করা হয়। গঙ্গাজল পূর্ণ ঘটে পল্লব, সিস ডাব, সিঁদুর ও স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে ঘট স্থাপন করা হয়। এটি দেবীর প্রতীকী আবাহন। এরপর পূজারী বা যজমান ‘সংকল্প’ গ্রহণ করেন। সংকল্প মন্ত্রের মাধ্যমে পূজার উদ্দেশ্য, সময়, স্থান এবং নিজের গোত্র ও নাম উচ্চারণ করে দেবীর কাছে পূজা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়।
তিন প্রহরের তিন রূপের বিশেষ পূজা
জগদ্ধাত্রী পূজার সবচেয়ে স্বতন্ত্র নিয়ম হলো একদিনে বা তিন দিনে দেবীর তিনটি ভিন্ন রূপের পূজা করা। এই তিনটি রূপ দেবীর তিনটি গুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) প্রতীক। নবমী তিথিতেই এই তিন পূজা সম্পন্ন করার নিয়ম সর্বাধিক প্রচলিত।
প্রথম প্রহরের পূজা (সাত্ত্বিক রূপ)
- সময়: সকালবেলা (প্রাতঃকাল)।
- রূপ: এই সময় দেবীকে তাঁর কুমারী বা সাত্ত্বিক রূপে পূজা করা হয়। তিনি ব্রহ্মারূপা, হংসারূঢ়া এবং শ্বেতবর্ণা।
- ধ্যানমন্ত্র: এই পূজায় দেবীর ধ্যানমন্ত্র ভিন্ন হয়। তাঁকে বিদ্যার দেবী রূপে কল্পনা করা হয়।
- নিয়ম: এই পূজা অপেক্ষাকৃত শান্তভাবে, সাত্ত্বিক উপাচারে (যেমন সাদা ফুল, ফল, মিষ্টান্ন) সম্পন্ন হয়। এই রূপটি জ্ঞানের প্রতীক।
দ্বিতীয় প্রহরের পূজা (রাজসিক রূপ)
- সময়: মধ্যাহ্ন (দুপুর)।
- রূপ: এই সময় দেবীকে রাজসিক রূপে পূজা করা হয়। তিনি বিষ্ণুরূপা, গরুড়াসনা এবং রক্তবর্ণা।
- ধ্যানমন্ত্র: এই পূজার ধ্যানমন্ত্র দেবীর পালনকর্ত্রী রূপের উপর আধারিত।
- নিয়ম: এই পূজায় রাজসিক উপাচার, যেমন অন্নভোগ, বিভিন্ন ব্যঞ্জন এবং জাঁকজমকপূর্ণ আরতির আয়োজন করা হয়। এই রূপ ঐশ্বর্য ও পালনের প্রতীক।
তৃতীয় প্রহরের পূজা (তামসিক রূপ)
- সময়: সন্ধ্যা বা রাত্রি।
- রূপ: এই সময় দেবীকে তামসিক (সংহারকারিনী) রূপে পূজা করা হয়। তিনি রুদ্ররূপা, বৃষভারূঢ়া এবং কৃষ্ণবর্ণা।
- ধ্যানমন্ত্র: এই পূজার ধ্যানমন্ত্রে দেবীর সংহাররূপী শক্তির বর্ণনা থাকে।
- নিয়ম: এই পূজায় বলিদান (বর্তমানে প্রতীকী বলি, যেমন কুমড়ো বা আখ) এবং তামসিক উপাচার (যেমন মাছ বা কারণবারি, স্থানবিশেষে) অর্পণের প্রথা ছিল। এই রূপ অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক।
বর্তমানে, অনেক স্থানেই তিনটি ভিন্ন রূপে পূজার বদলে, মূল জগদ্ধাত্রী রূপেই (সিংহবাহিনী) তিনবার পৃথকভাবে পূজা, ভোগ ও আরতি করা হয়। তবে শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারে, তিনটি ভিন্ন ধ্যানমন্ত্রে তিন গুণের আরাধনাই কর্তব্য।
পূজার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও উপাচার
পূজার মূল আরাধনা ছাড়াও আরও বেশ কিছু আনুষঙ্গিক নিয়ম রয়েছে যা জগদ্ধাত্রী পূজাকে পূর্ণতা দেয়।
পূজার উপাচার (উপাদান)
পূজার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তালিকা বেশ দীর্ঘ। এই উপাচারগুলি পূজার শাস্ত্রীয় বিধি পালনের জন্য অপরিহার্য।
| বিভাগের নাম | প্রয়োজনীয় সামগ্রী |
| স্নান সামগ্রী | গঙ্গাজল, পঞ্চগব্য (দুধ, দই, ঘি, গোমূত্র, গোবর), পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি), সুগন্ধি তেল, শঙ্খ, বিভিন্ন ভেষজ জল। |
| বস্ত্র ও আবরণ | দেবীর শাড়ি, গামছা, বরণডালা, ঘটের বস্ত্র। |
| পুষ্প ও পত্র | ১০৮টি পদ্ম (বাধ্যতামূলক), জবা, অপরাজিতা, বেলপাতা (বিল্বপত্র), তুলসী, দূর্বা, বিভিন্ন মরসুমী ফুল। |
| ভোগ সামগ্রী | নৈবেদ্য (চাল, ফল, মিষ্টি), বিভিন্ন প্রকার ভাজা, খিচুড়ি, পোলাও, তরকারি, পায়েস, মালপোয়া, লুচি। |
| হোম সামগ্রী | যজ্ঞকুণ্ড, বালি, কাঠ, ঘি, বেলপাতা, হোমের নির্ধারিত কাষ্ঠ (যেমন বেল, অশ্বত্থ), ধূপ, ধুনা, কর্পূর। |
| অন্যান্য | ঘট, সিস ডাব, পল্লব, প্রদীপ, পঞ্চপ্রদীপ, ধূপদানি, কুশাসন, পূজার বাসনপত্র, সিঁদুর, আলতা, আয়না, চিরুনি। |
কুমারী পূজা
দুর্গাপূজার মতো জগদ্ধাত্রী পূজাতেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। নবমী তিথিতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এক বা একাধিক কুমারী বালিকাকে (সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে) দেবীর জীবন্ত প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাদের স্নান করিয়ে, নতুন বস্ত্র পরিয়ে, অলংকার দিয়ে সাজিয়ে ঠিক দেবীর মতোই মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়। এটি নারীশক্তির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক।
হোম (যজ্ঞ)
পূজার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলো ‘হোম’ বা ‘যজ্ঞ’। পূজার শেষে বা নবমী ও দশমীর সন্ধিক্ষণে এই যজ্ঞ করা হয়। অগ্নিতে ঘি, কাঠ, তিল এবং অন্যান্য নির্ধারিত সামগ্রী আহুতি দিয়ে দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, যজ্ঞের মাধ্যমে পূজার সমস্ত উপকরণ দেবীর কাছে সরাসরি পৌঁছে যায় এবং পরিবেশ শুদ্ধ হয়।
ভোগ ও প্রসাদ
জগদ্ধাত্রী পূজায় ভোগের নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয়। যেহেতু তিন প্রহরে তিনবার পূজা হয়, তাই অনেক স্থানেই তিনবার পৃথকভাবে ভোগ নিবেদন করা হয়।
- সকালের ভোগ: সাধারণত লুচি, মিষ্টি, ফল এবং সাদা রঙের কোনো মিষ্টান্ন (যেমন পায়েস বা ক্ষীর)।
- দুপুরের ভোগ (রাজসিক): এটিই মূল ভোগ। এতে খিচুড়ি, পোলাও, পাঁচ বা সাত প্রকার ভাজা, একাধিক তরকারি (যেমন লাবড়া, ছ্যাঁচড়া), চাটনি, দই এবং পায়েস থাকে।
- রাত্রির ভোগ: অনেক স্থানে রাতেও অন্নভোগ বা লুচি, তরকারি ও মিষ্টি ভোগ দেওয়া হয়।
কৃষ্ণনগরে ‘মালপোয়া’ ভোগ একটি বিশেষ ঐতিহ্য। অন্যদিকে চন্দননগরে ভোগের বৈচিত্র্য এবং পরিমাণ বিপুল হয়।
উপবাসের নিয়ম
যাঁরা পূজার সংকল্প করেন বা ব্রত রাখেন, তাঁদের নির্দিষ্ট উপবাসের নিয়ম পালন করতে হয়। সাধারণত সপ্তমী বা অষ্টমী থেকে উপবাস শুরু হয়, অথবা কেবল নবমীর দিন উপবাস রাখা হয়। পূজার দিন উপবাস রেখে, অঞ্জলি দেওয়ার পর অনেকে ফল ও মিষ্টান্ন গ্রহণ করেন। পূজার শেষে, বিশেষত হোমের পর, ‘ভোগ’ গ্রহণ করে উপবাস ভঙ্গ করা হয়।
চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরের পূজার স্বতন্ত্র প্রথা
যদিও মূল পূজা একই, স্থানভেদে জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়মে কিছু বৈচিত্র্য এসেছে, যা এই উৎসবকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ীর ঐতিহ্য ও ‘বুড়িমা’
কৃষ্ণনগরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রবর্তিত পূজা আজও রাজবাড়ীতে নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়। এখানকার প্রতিমা হয় ‘রাজবাড়ীর রূপ’ অনুযায়ী। কৃষ্ণনগরের একটি বিশেষত্ব হলো এখানকার ‘বুড়িমা’। এটি কৃষ্ণনগরের সবচেয়ে প্রাচীন বারোয়ারি পূজা বলে কথিত এবং এর প্রতিমার উচ্চতা ও সৌন্দর্য অসামান্য। কৃষ্ণনগরের পূজায় আভিজাত্য, ঐতিহ্য এবং মৃৎশিল্পের সূক্ষ্মতা (যা GI ট্যাগ দ্বারা স্বীকৃত) বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
চন্দননগরের আলোর শোভাযাত্রা ও UNESCO স্বীকৃতি
ফরাসি উপনিবেশ থাকাকালীন চন্দননগরে এই পূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে। চন্দননগরের মূল আকর্ষণ হলো এর আলোকসজ্জা এবং ‘শোভাযাত্রা’। পূজার পর প্রতিমাগুলিকে ট্রাকে বা লরিতে চাপিয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত আলোর গেট ও প্যান্ডেল বিশ্বখ্যাত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, চন্দননগরের এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও আলোকশিল্পকে স্বীকৃতি দিতে ভারত সরকার এটিকে UNESCO-এর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (Intangible Cultural Heritage) বা অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাময়িক (Tentative) তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছে (২০২৩ সালে জমা দেওয়া হয়েছে)। এটি এই পূজার বৈশ্বিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে।
শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা ও জগদ্ধাত্রী পূজা
আধুনিক যুগে জগদ্ধাত্রী পূজার পুনরুজ্জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ও মা সারদা দেবীর এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুরে তাঁর পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে এই পূজায় গভীরভাবে অংশগ্রহণ করতেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে মা সারদা দেবীর জীবনে। কথিত আছে, জয়রামবাটীতে থাকাকালীন মা সারদা দেবী একবার এক বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি স্বয়ং জগদ্ধাত্রী পূজা করবেন। সেই থেকে বেলুড় মঠ এবং রামকৃষ্ণ মিশনের বিভিন্ন শাখায় জগদ্ধাত্রী পূজা এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহে, অত্যন্ত সাত্ত্বিকভাবে ও নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়ে আসছে। মা সারদা এই পূজাকে ‘মায়ের পূজা’ (অর্থাৎ নিজের পূজা) হিসেবেই দেখতেন। রামকৃষ্ণ মঠের পূজা শাস্ত্রীয় বিধি এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অনন্য মিশ্রণ।
জগদ্ধাত্রী পূজা কেবল এক বা তিন দিনের ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি উপনিষদের গভীর ব্রহ্মজ্ঞান থেকে শুরু করে তন্ত্রের গুহ্য সাধনা এবং বাংলার লৌকিক ভক্তির এক সম্মিলিত প্রকাশ। এর নিয়মাবলী—প্রতিমার রূপ থেকে শুরু করে তিন প্রহরের তিন ধরনের আরাধনা—সবকিছুর পেছনেই গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। দেবী জগদ্ধাত্রী হলেন সেই পরম সত্তা, যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন; তিনি জ্ঞানের আলোয় আমাদের অহংকার (করীন্দ্রাসুর) বিনাশ করেন এবং আমাদের সাত্ত্বিক পথে চালিত করেন। তাই এই পূজার প্রতিটি নিয়ম নিষ্ঠার সাথে পালন করা শুধুমাত্র একটি প্রথা নয়, তা এক আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ।











