আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যেখানে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে. ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন. জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত এই ইশতেহারকে দলটি “জনতার ইশতেহার” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে. দেশ-বিদেশের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞের মতামত এবং প্রায় ৪০ হাজার নাগরিকের অংশগ্রহণে প্রস্তুত করা হয়েছে এই ইশতেহার.
জনতার ইশতেহার: গণঅংশগ্রহণে প্রণীত নির্বাচনী দলিল
জামায়াতে ইসলামীর এই নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে. দলটি “জনতার ইশতেহার” নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করলে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক সেখানে তাদের মতামত ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন. এসব মতামতকে ইশতেহারের বিভিন্ন দফায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা, সিনিয়র সাংবাদিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনেরা.
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “আমি শুধু জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি বাংলাদেশের ১৮ করোড় নাগরিকের বিজয় চাই”. তিনি আরও বলেন, “এই ইশতেহার শুধু একটি দলীয় কর্মসূচি নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে প্রস্তুত একটি জাতি গঠনের পরিকল্পনার জীবন্ত দলিল”.
ইশতেহারের মূল স্লোগান ও দর্শন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর মূল স্লোগান হলো “চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ” এবং “জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ”. ৯০ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে জামায়াত মোট ৪১টি খাতে তার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে. ইশতেহারটি সাজানো হয়েছে ২৬টি মূল অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে, যেখানে প্রথম অংশে জোর দেওয়া হয়েছে একটি ন্যায়সঙ্গত, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণে. পরবর্তী অংশে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, জ্বালানি খাত সংস্কার, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে.
১০টি মৌলিক অঙ্গীকার: ৫টি ‘হ্যাঁ’ ও ৫টি ‘না’
জামায়াতের ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে, যা ৫টি “হ্যাঁ” এবং ৫টি “না” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে. ৫টি “হ্যাঁ” এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান. অন্যদিকে, ৫টি “না” হলো দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান. এই মৌলিক অঙ্গীকারগুলো জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও জাতি গঠনের লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইশতেহারের মূল ভিত্তি
এই ইশতেহারের মাধ্যমে জামায়াত একটি নিরাপদ, মানবিক, ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, যেখানে সকল নাগরিক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান অধিকার ভোগ করবে. দলটির লক্ষ্য হলো একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুখী জীবন যাপন করতে পারবে।
২৬টি অগ্রাধিকার বিষয়: বিস্তারিত বিশ্লেষণ
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ যে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ:
জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব
প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে জামায়াত জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে. দলটি “জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ” এই জবানের আলোকে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের কথা বলেছে.
ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা. এটি জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার ও সুযোগ পাবে।
যুব উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে জামায়াত “Youth First” নীতি অনুসরণ করে যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে. দলটি বলেছে যে যুবকদের অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে এবং তাদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা
চতুর্থ অগ্রাধিকারে রয়েছে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র নিশ্চিত করা. জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা ক্ষমতায় গেলে মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নেবে.
আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা
পঞ্চম অগ্রাধিকার হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ. দলটি একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন
ষষ্ঠ অগ্রাধিকারে সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে. জামায়াত “Zero Corruption” নীতি অনুসরণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ
সপ্তম অগ্রাধিকার হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে. দলটি একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি
অষ্টম অগ্রাধিকারে প্রযুক্তি, উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে. জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে এবং সকল ধরনের বৈষম্য দূর করা হবে. বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে.
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংস্কার
নবম অগ্রাধিকারে আর্থিক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি স্বচ্ছ, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে. দলটি ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে.
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার
নির্বাচনী সংস্কার ও শক্তিশালী গণতন্ত্র
দশম অগ্রাধিকারে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে একটি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে. জামায়াত প্রপোর্শনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
মানবাধিকার ও বিচার
একাদশ অগ্রাধিকারে অতীতে রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটে যাওয়া হত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে. গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে.
জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ
দ্বাদশ অগ্রাধিকারে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে.
কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ
কৃষি বিপ্লব ও খাদ্য নিরাপত্তা
ত্রয়োদশ অগ্রাধিকারে প্রযুক্তি গ্রহণ এবং কৃষকদের জন্য উন্নত সহায়তার মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব সাধনের পরিকল্পনা রয়েছে. তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও উত্তরবঙ্গের কৃষি বিপ্লব ঘটানোর কথাও বলা হয়েছে.
ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা
চতুর্দশ অগ্রাধিকারে ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য-ভেজাল খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং “থ্রি জিরো ভিশন” বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে. এই ভিশনে রয়েছে শূন্য পরিবেশ ক্ষয়, শূন্য বর্জ্য এবং শূন্য বন্যা ঝুঁকি, যার মাধ্যমে একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া হবে.
শিল্প, শ্রমিক কল্যাণ ও প্রবাসী অধিকার
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান
পঞ্চদশ অগ্রাধিকারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণ, শিল্প বিকাশ, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে. আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের নীতি মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করবে না, বরং সমন্বয় ও বোঝাপড়া গড়ে তুলবে”.
শ্রমিক কল্যাণ
ষোড়শ অগ্রাধিকারে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বিশেষত নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে.
প্রবাসীদের অধিকার
সপ্তদশ অগ্রাধিকারে প্রবাসীদের ভোটাধিকার এবং অন্যান্য সকল অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতি গঠনে তাদের আনুপাতিক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে.
সামাজিক ন্যায়বিচার ও সেবা
সমান নাগরিক অধিকার
অষ্টাদশ অগ্রাধিকারে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে.
স্বাস্থ্যসেবা
ঊনবিংশ অগ্রাধিকারে আধুনিক, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে.
শিক্ষা সংস্কার
বিংশ অগ্রাধিকারে সমসাময়িক বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার এবং ধীরে ধীরে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে.
অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
একবিংশ অগ্রাধিকারে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে.
যোগাযোগ ব্যবস্থা
দ্বাবিংশ অগ্রাধিকারে পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে যাতায়াত সময় ২-৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ ও নগর পরিবহনে মৌলিক উন্নতি সাধনের পরিকল্পনা রয়েছে.
আবাসন
ত্রয়োবিংশ অগ্রাধিকারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে.
সংস্কার ও সুশাসন
ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান
চতুর্বিংশ অগ্রাধিকারে ফ্যাসিবাদী কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা, বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অব্যাহত রাখা এবং বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরুত্থান রোধ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে.
সামাজিক নিরাপত্তা
পঞ্চবিংশ অগ্রাধিকারে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং ধীরে ধীরে সকল নাগরিকের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে.
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
ষড়বিংশ তথা শেষ অগ্রাধিকারে সকল স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং একটি সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে.
ইশতেহার প্রণয়নে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি
জামায়াতে ইসলামীর এই নির্বাচনী ইশতেহারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনঅংশগ্রহণ। দেশ-বিদেশের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ এই ইশতেহার প্রণয়নে তাদের মতামত দিয়েছেন। এছাড়া “জনতার ইশতেহার” নামক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার সাধারণ নাগরিক তাদের প্রত্যাশা ও পরামর্শ জানিয়েছেন। এই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া ইশতেহারটিকে একটি জনমুখী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “তৃণমূল থেকে শহর পর্যায়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের সাথে তাদের অন্তর্দৃষ্টি ও পরামর্শ শেয়ার করেছেন। তাদের ধারণাগুলি এই ইশতেহারকে রূপ দিয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব এবং শৃঙ্খলাবান্ধব হবে।”
ইশতেহারের বাস্তবায়ন কৌশল
জামায়াত তাদের ইশতেহারে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখাও তুলে ধরেছে। দলটি জানিয়েছে যে এই ইশতেহার একটি জীবন্ত দলিল, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। ৪১ দফা কর্মসূচির প্রতিটিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দলটি একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান যে এই ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়রেখা এবং পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, আমরা দেখাচ্ছি কীভাবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা যাবে।”
অন্যান্য দলের ইশতেহারের সাথে তুলনা
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামি আন্দোলনসহ বড়-ছোটো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে। প্রতিটি দল ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে। জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপক জনঅংশগ্রহণ এবং ২৬টি সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের উল্লেখ।
ইশতেহার পিডিএফ ডাউনলোড
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ এর পিডিএফ সংস্করণ দলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট jamaat-e-islami.org এ পাওয়া যাচ্ছে। ৯০ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে ২৬টি অগ্রাধিকার এবং ৪১ দফা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছুক নাগরিকরা দলের ওয়েবসাইট থেকে সম্পূর্ণ ইশতেহারটি ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
জনপ্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ প্রকাশের পর থেকে বিভিন্ন মহলে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইশতেহারের অংশগ্রহণমূলক প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন যে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উৎস কী হবে।
অর্থনীতিবিদরা ইশতেহারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বিশেষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মানবাধিকার, গুম-খুনের বিচার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ একটি উচ্চাভিলাষী ও ব্যাপক দলিল, যা জুলাই বিপ্লবের চেতনা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা প্রদান করেছে। ২৬টি অগ্রাধিকার এবং ৪১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশ-বিদেশের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ এবং ৪০ হাজার নাগরিকের অংশগ্রহণে প্রণীত এই “জনতার ইশতেহার” একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উদাহরণ। “চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ” এবং “জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ” এই দুই মূল স্লোগানে দলটি একটি ঐক্যবদ্ধ, মানবিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই ইশতেহার কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং জনগণ কীভাবে এটি গ্রহণ করবে তা দেখার বিষয়। তবে নিঃসন্দেহে এই ইশতেহার বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এক নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।










