ফরিদপুরে জেমসের কনসার্টে হামলা: ‘আউটসাইডার’দের ইটপাটকেল, আহত অন্তত ২৫; শেষ মুহূর্তে স্থগিত শো

ফরিদপুর, ২৭ ডিসেম্বর—বাংলা গান-সংস্কৃতিকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার আবহে এবার সহিংসতার আঁচ লাগল বাংলাদেশের রক-আইকন নগর বাউল জেমস–এর কনসার্টে। ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার শেষ রাতের কনসার্ট…

Avatar

 

ফরিদপুর, ২৭ ডিসেম্বর—বাংলা গান-সংস্কৃতিকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার আবহে এবার সহিংসতার আঁচ লাগল বাংলাদেশের রক-আইকন নগর বাউল জেমস–এর কনসার্টে। ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার শেষ রাতের কনসার্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগে ভেন্যুতে ইট-পাথর নিক্ষেপ, বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় কনসার্ট বাতিল ঘোষণা করা হয়, আর শিল্পীকে নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত ভেন্যু থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

১৮৫ বর্ষপূর্তির উৎসবে ‘হাই ভোল্টেজ’ অপেক্ষা, শেষ মুহূর্তে বদলে গেল দৃশ্য

ফরিদপুর জিলা স্কুল—১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি—দুই দিনব্যাপী ১৮৫ বর্ষ উদযাপন ও পুনর্মিলনী আয়োজন করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী দ্বিতীয় দিনের রাতে র‍্যাফেল ড্র, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং নির্ধারিত ব্যান্ড-তারকা জেমসের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু উৎসবের শেষ রাতটি রূপ নেয় আতঙ্কের রাতে। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশাধিকার, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা—যা পরে সংঘর্ষে গড়ায়।

কীভাবে শুরু হলো হামলা—‘রেজিস্টার্ড’ বনাম ‘আউটসাইডার’ ভিড়

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আয়োজন মূলত বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য নিবন্ধনভিত্তিক ছিল। কিন্তু জেমসের পারফর্ম করার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্কুলের বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পরে যখন অনিবন্ধিত লোকজনকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়, তখনই একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে দেয়াল টপকে ঢোকার চেষ্টা করে এবং ভেতরের দর্শক ও মঞ্চ লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছোড়া শুরু হয়।
কিছু প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে—আয়োজকরা বাইরে থাকা মানুষদের অনুষ্ঠান দেখানোর জন্য প্রজেক্টর বসালেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি; বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

“মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল”—ছাত্রদের প্রতিরোধ, আহতের সংখ্যা অন্তত ২৫

বাংলাদেশের একাধিক সংবাদসূত্রের বরাতে জানা যায়, আক্রমণকারীরা শুধু ইট-পাথর ছোড়েনি—তারা মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও চেষ্টা করে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে হামলাকারীরা একপর্যায়ে পিছু হটে।
আহতদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সামান্য তারতম্য আছে। দ্য ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত খবরে অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়; আহতদের বড় অংশ শিক্ষার্থী।  টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া আহতের সংখ্যা ২৫–৩০ বলেও উল্লেখ করেছে।

কখন, কীভাবে বাতিল হলো কনসার্ট—ডিসির নির্দেশে ঘোষণা

দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনসার্টটি রাত ৯:৩০টার দিকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামলার পর পরিস্থিতি ‘ভোলাটাইল’ হয়ে ওঠায় রাত ১০টার দিকে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক/কনভেনর ড. মোস্তাফিজুর রহমান শামীম মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন যে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে কনসার্ট বাতিল করা হলো।
এদিকে পুলিশও ভিড়ের আকারের দিকে ইঙ্গিত করে জানায়—ভেন্যুর সক্ষমতার বাইরে লোক জমায়েত হওয়ায় ‘আউটসাইডার’দের আটকে দিলে গোলযোগ বাধে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্কুলের বাইরে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষ জমায়েত হয়।

‘বাংলা-দ্বেষ’ নাকি টিকিট/প্রবেশাধিকারের সংঘাত—মোটিভ নিয়ে প্রশ্ন, নিশ্চিত নয়

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এটিকে বাংলা গান-সংস্কৃতিবিরোধী সহিংসতার ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছেন। কিছু মন্তব্যে “চরমপন্থা/উগ্রবাদ”–এর প্রসঙ্গও আসছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে সব প্রাথমিক প্রত্যক্ষ/স্থানীয় বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে হামলার প্রধান ট্রিগার হিসেবে উঠে এসেছে প্রবেশাধিকার নিয়ে সংঘাত এবং ‘আউটসাইডার’দের জোর করে ঢোকার চেষ্টা।
এ ছাড়া, কিছু রাজনৈতিক/মতামতভিত্তিক পোস্টে উদ্দেশ্য নিয়ে জোরালো দাবি করা হলেও—মিডিয়াগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বলছে, ভাইরাল ভিডিও/ফুটেজ তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।ফলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত “বাংলা-দ্বেষ” বা নির্দিষ্ট মতাদর্শগত হামলা—কোনোটাই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হামলার উদ্বেগ, নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেমসের কনসার্টে হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একাধিক হামলার খবর সামনে এসেছে—যা লেখক-শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই বাস্তবতায় বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠানে সিকিউরিটি প্ল্যানিং, টিকিটিং/প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা, ক্রাউড কন্ট্রোল, জরুরি প্রস্থান (ইমার্জেন্সি এক্সিট) এবং পুলিশ-আয়োজক সমন্বয়—সবই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সামনে কী—তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ ও ‘সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা’ দাবিতে চাপ

ঘটনার পর আয়োজক পক্ষ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—কারা, কেন হামলা চালাল, তা জানার প্রশ্নই এখন মূল।সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী, এবং ভেন্যুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি—সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়। সংস্কৃতিকর্মীদের একটি অংশ চাইছেন, এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা হোক; একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ কনসার্ট/উৎসব যেন নিরাপদ থাকে, সে জন্য জেলা প্রশাসন ও আয়োজকদের সমন্বিত নিরাপত্তা নীতিমালা জোরদার করা হোক।

বাংলা গান ও সংস্কৃতি এই অঞ্চলের পরিচয়—সেই পরিচয়ের ভেতরেই জেমসের মতো শিল্পীর কণ্ঠ বহু প্রজন্মের আবেগ। তাই এমন সহিংসতা শুধু একটি কনসার্ট স্থগিতের ঘটনা নয়; এটি জনসমাগমের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সহনশীলতার বড় পরীক্ষাও। এখন দেখার বিষয়—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন কত দ্রুত ঘটনার দায় নির্ধারণ করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে

About Author
Avatar

বাংলাদেশ প্রতিনিধি থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য খবর পেতে আমাদের সংবাদ ওয়েবসাইট দেখুন। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত জানুন।

আরও পড়ুন