ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত ইলোরা গুহার (Ellora Caves) ১৬ নম্বর গুহা, যা কৈলাস মন্দির নামেই বিশ্ববিখ্যাত, শুধু একটি পূজার স্থান নয়, এটি প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের এক জীবন্ত বিস্ময়। কিংবদন্তি অনুসারে, এই অবিশ্বাস্য কাঠামোটি নাকি দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার হাতে নির্মিত, যদিও ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ দেয় যে এটি অষ্টম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের প্রথম কৃষ্ণের (King Krishna I) আদেশে তৈরি হয়েছিল। এর বিশালতা এবং নির্মাণশৈলী এতটাই ঐশ্বরিক যে সাধারণ মানুষের পক্ষে একে ‘মানুষের তৈরি’ বলে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, তাই বিশ্বকর্মার নামটি এর সাথে জড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব, যিনি তাঁর শাসনামলে অনেক মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি এই মন্দিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় তিন বছর ধরে হাজার হাজার শ্রমিক চেষ্টা করেও মন্দিরটির সামান্য ক্ষতিই করতে পেরেছিল। এই মন্দিরটি কেন এত অদ্ভূত, কীভাবে এটি তৈরি করা হয়েছিল এবং কেন এটি আজও অজেয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা আজও গবেষক, ঐতিহাসিক এবং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এক চূড়ান্ত বিস্ময়ের বিষয়।
কৈলাস মন্দির: এক পাথরের মহাকাব্য
যখন আমরা ‘মন্দির’ শব্দটি শুনি, তখন আমাদের মনে ইট, সিমেন্ট বা পাথর একে একে সাজিয়ে তৈরি করা একটি কাঠামোর ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু ইলোরার কৈলাস মন্দির সেভাবে তৈরিই হয়নি। এটি কোনো স্থাপত্য (Architecture) নয়, এটি ভাস্কর্য (Sculpture)। একটি সম্পূর্ণ পাহাড়কে কেটে, খোদাই করে এই মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ‘মনোলিথিক’ (Monolithic) কাঠামো, অর্থাৎ একটিমাত্র আস্ত পাথর খোদাই করে নির্মিত।
ইলোরার পটভূমি: যেখানে তিন ধর্মের মিলন
মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের কাছে অবস্থিত ইলোরা গুহাগুলি কেবল একটি মন্দিরের জন্য বিখ্যাত নয়। এটি আসলে ৩৪টি গুহার একটি বিশাল কমপ্লেক্স, যা সহ্যাদ্রি পর্বতমালার চরণন্দ্রী পাহাড়ের ব্যাসল্ট ক্লিফ থেকে খোদাই করা হয়েছে। এই গুহাগুলি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন—এই তিন প্রধান ধর্মের সহাবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন।
- বৌদ্ধ গুহা (গুহা ১-১২): এগুলি প্রায় ৫০০ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত।
- হিন্দু গুহা (গুহা ১৩-২৯): এগুলি ৬০০ থেকে ৮৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত। এর মধ্যে ১৬ নম্বর গুহাই হলো কৈলাস মন্দির।
- জৈন গুহা (গুহা ৩০-৩৪): এগুলি প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত।
এই ধর্মীয় বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে সেই যুগে ভারতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর সহনশীলতা এবং শৈল্পিক আদান-প্রদান ছিল। ইউনেস্কো (UNESCO) ১৯৮৩ সালে ইলোরা গুহাকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে, যা এর বিশ্বব্যাপী গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়। ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজা (Durga Puja in West Bengal) আজ ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে, তেমনই ইলোরা বহু শতাব্দী ধরে ভারতের বাস্তব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের ১০টি বিখ্যাত শিব মন্দির, যেখানে আপনি অবশ্যই যাবেন
১৬ নম্বর গুহার বিশেষত্ব: কৈলাস
যদিও ইলোরায় ৩৪টি গুহা রয়েছে, তবে কৈলাস মন্দির (গুহা ১৬) একাই এই স্থানের সমস্ত আকর্ষণ কেড়ে নেয়। এটি কেবল একটি গুহা নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ মন্দির কমপ্লেক্স, যা গ্রিসের এথেন্সের পার্থেনন মন্দিরের চেয়ে দ্বিগুণ বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় দেড় গুণ উঁচু। এর বিশালতা এবং জটিল খোদাইকার্য একে বাকি সব গুহা থেকে আলাদা করে তোলে।
নির্মাণের ইতিহাস: কে, কবে এবং কেন?
কৈলাস মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে কিংবদন্তি এবং ইতিহাস একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রাষ্ট্রকূট রাজবংশের অবদান
ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং শিলালিপি অনুসারে, কৈলাস মন্দিরটি রাষ্ট্রকূট রাজবংশের রাজা প্রথম কৃষ্ণ (শাসনকাল প্রায় ৭৫৬-৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ) দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। রাষ্ট্রকূটরা ছিলেন দাক্ষিণাত্যের এক শক্তিশালী রাজবংশ, যারা চালুক্যদের পরাজিত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। এই বিশাল মন্দির নির্মাণ ছিল সম্ভবত শত্রুদের উপর নিজের বিজয় এবং নিজের সাম্রাজ্যের শক্তি, সম্পদ ও ধর্মীয় ভক্তি প্রদর্শনের একটি উপায়। এটি ছিল রাষ্ট্রকূট শক্তির এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক এবং শৈল্পিক বিবৃতি।
পৌরাণিক কাহিনী বনাম ঐতিহাসিক সত্য
মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয়, একবার এক স্থানীয় রানি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর স্বামী, এক রাজা, রানির আরোগ্যের জন্য ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে রানি সুস্থ হলে তিনি একটি অসামান্য শিব মন্দির নির্মাণ করবেন। রানি সুস্থ হয়ে উঠলে, রাজা মন্দির নির্মাণের কথা ভাবেন। কিন্তু তিনি এমন একটি মন্দির চেয়েছিলেন যা দ্রুত নির্মিত হবে। অনেক স্থপতি বললেও কেউ ভরসা দিচ্ছিলেন না। অবশেষে, ‘কোকাসা’ নামক এক স্থপতি জানান যে তিনি একটি সম্পূর্ণ পাহাড়কে উপর থেকে নিচে কেটে এক বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণ করতে পারবেন।
আরেকটি কিংবদন্তি মতে, এর নির্মাণশৈলী এতটাই নিখুঁত এবং জটিল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা তৈরি করা অসম্ভব। তাই মনে করা হয়, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা স্বয়ং এই মন্দির নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন, অথবা স্বর্গ থেকে এর নকশা পৃথিবীতে আনা হয়েছিল।
তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, এটি রাষ্ট্রকূটদের তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার কারিগর ও শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। যদিও বিশ্বকর্মার কিংবদন্তিটি মন্দিরের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য এবং অকল্পনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রতি মানুষের বিস্ময়কেই প্রকাশ করে।
স্থাপত্যের বিস্ময়: কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির?
কৈলাস মন্দিরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হল এর নির্মাণ কৌশল। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া সেই যুগে কীভাবে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল, তা ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এক গবেষণার বিষয়।
‘মনোলিথিক’ স্থাপত্য কী?
‘মনোলিথিক’ (Monolithic) কথাটির অর্থ হল ‘একক পাথর’। কৈলাস মন্দিরটি ইট বা আলাদা পাথর জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়নি। একটি আস্ত ব্যাসল্ট পাহাড়কে (Deccan Trapp Basalt) উপর থেকে নিচের দিকে খোদাই করে এই মন্দির এবং এর মূর্তিগুলিকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। ভাবুন, একটি পাহাড়ের উপর থেকে শুরু করে, ধীরে ধীরে পাথর কেটে কেটে নিচের দিকে নামা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে মন্দিরের চূড়া (শিখর), ছাদ, স্তম্ভ, দেয়াল, মূর্তি এবং গর্ভগৃহ।
উপর থেকে নিচে: উল্টো ইঞ্জিনিয়ারিং (Reverse Engineering)
সাধারণত, যেকোনো নির্মাণকাজ নিচ থেকে অর্থাৎ ভিত্তি থেকে শুরু হয়ে উপরের দিকে ওঠে। কিন্তু কৈলাস মন্দিরের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা করা হয়েছিল। একে বলা হয় ‘উল্টো ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা ‘উল্লম্ব খনন’ (Vertical Excavation) পদ্ধতি।
- পরিকল্পনা: প্রথমে স্থপতিরা পাহাড়ের উপরে মন্দিরের সম্পূর্ণ নকশাটি আঁকেন।
- খনন: এরপর, পাহাড়ের উপর থেকে তিনটি বড় পরিখা বা খাদ কাটা শুরু হয়, যা মন্দিরটিকে চারপাশের পাহাড় থেকে আলাদা করে ফেলে।
- খোদাই: এরপর সেই আলাদা হয়ে যাওয়া বিশাল পাথরের খণ্ডটিকে (যা এখন মন্দিরের মূল কাঠামো) উপর থেকে নিচে খোদাই করা শুরু হয়। প্রথমে শিখর, তারপর ধীরে ধীরে নিচের অংশ এবং সবশেষে ভিত্তি।
এই পদ্ধতিতে নির্মাণ করলে ভারা বা স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding) বাঁধার কোনো প্রয়োজন হয় না। কারিগররা পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে কাজ করতে করতে নিচের দিকে নামতে পারতেন। তবে এই পদ্ধতির একটি বড় ঝুঁকি ছিল—একবার পাথর কেটে ফেললে তা আর জোড়া লাগানোর কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ, সামান্য একটি ভুলেও পুরো নকশাটি নষ্ট হয়ে যেতে পারতো। এই নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রাচীন ভারতীয় স্থপতিদের অবিশ্বাস্য দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
নির্মাণের পরিসংখ্যান
কৈলাস মন্দিরের নির্মাণ সম্পর্কিত কিছু তথ্য শুনলে অবাক হতে হয়। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এবং বিভিন্ন গবেষকদের মতে:
| বিষয় | আনুমানিক পরিসংখ্যান |
| অপসারিত পাথর | প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ টন (200,000 – 400,000 tonnes) |
| নির্মাণের সময়কাল | প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর (যদিও কিছু মতে ১০০ বছর পর্যন্ত লেগেছিল) |
| শ্রমিক সংখ্যা | হাজার হাজার শ্রমিক, কারিগর এবং ভাস্কর |
| মন্দিরের উচ্চতা | প্রায় ১০০ ফুট (৩০ মিটার) |
| এলাকা | প্রায় ৮৪,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত |
ভাবতে অবাক লাগে যে, এই লক্ষ লক্ষ টন পাথর কেবল হাতুড়ি, ছেনি এবং শাবলের মতো সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে কাটা হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ পাথর সরানোর জন্য যে লজিস্টিক্যাল পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা আধুনিক যুগের ব্যবস্থাপনার থেকেও কোনো অংশে কম নয়।
ভাস্কর্যের গ্যালারি: পাথরের বুকে খোদাই করা মহাকাব্য
কৈলাস মন্দির কেবল একটি কাঠামো নয়, এটি হিন্দু পুরাণের এক জীবন্ত গ্যালারি। মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি স্তম্ভ এবং প্রতিটি কোণ জটিল ভাস্কর্যে ভরা, যা রামায়ণ, মহাভারত এবং শিব পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনা করে।
মন্দিরের বিভিন্ন অংশ
মন্দির কমপ্লেক্সটি মূলত পাঁচটি ভাগে বিভক্ত:
১. প্রবেশদ্বার (গোপুরম): একটি বিশাল দোতলা প্রবেশদ্বার।
২. নন্দী মণ্ডপ: মূল মন্দিরের সামনে ভগবান শিবের বাহন নন্দীর জন্য একটি পৃথক মণ্ডপ।
৩. মূল শিব মন্দির (গর্ভগৃহ): যেখানে মূল শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠিত।
৪. সংযোগকারী সেতু: নন্দী মণ্ডপ এবং মূল মন্দিরকে সংযোগকারী একটি পাথরের সেতু।
৫. পার্শ্ববর্তী গ্যালারি: মন্দিরের তিন দিকে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বারান্দা, যেখানে অসংখ্য মূর্তি রয়েছে।
রামায়ণ ও মহাভারতের চিত্রণ
মন্দিরের দেয়াল জুড়ে প্যানেলে প্যানেলে রামায়ণ এবং মহাভারতের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি খোদাই করা আছে। লঙ্কা কান্ড, পঞ্চ পাণ্ডবদের কাহিনী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দৃশ্য—সবই পাথরের বুকে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই ভাস্কর্যগুলি কেবল ধর্মীয় কাহিনীই বলে না, তৎকালীন সমাজ, পোশাক এবং জীবনযাত্রারও এক মূল্যবান দলিল।
রাবণ এবং কৈলাস পর্বত (The Iconic Sculpture)
কৈলাস মন্দিরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে নাটকীয় ভাস্কর্যটি হলো ‘রাবণানুগ্রহ’ বা ‘রাবণ কর্তৃক কৈলাস উত্তোলন’। এই বিশাল ভাস্কর্যটি মন্দিরের ভিত্তির কাছে খোদাই করা হয়েছে।
- কাহিনী: লঙ্কার রাজা রাবণ, তাঁর অহংকারে মত্ত হয়ে, ভগবান শিবের বাসস্থান কৈলাস পর্বতকে সরাতে চেষ্টা করেছিলেন।
- ভাস্কর্য: এই ভাস্কর্যে দেখা যায়, দশানন রাবণ তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে পর্বতটিকে নাড়াচ্ছেন। পর্বতের উপরে ভগবান শিব শান্তভাবে বসে আছেন এবং তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুলের সামান্য চাপে রাবণের দর্প চূর্ণ করছেন। শিবের পাশে মা পার্বতীকেও কিছুটা ভীত অবস্থায় দেখা যায়।
- তাৎপর্য: এই ভাস্কর্যটি কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনীর চিত্রণ নয়, এটি একটি রূপক। এই ‘কৈলাস মন্দির’-কে যে রাবণ (অর্থাৎ ধ্বংসের প্রতীক) নাড়াতে পারবে না, তা যেন এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে স্থপতিরা আগেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।
এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী এবং এর রহস্যময়তা অনেকটা কেরালার পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের (Padmanabhaswamy Temple) মতো, যা তার অকল্পনীয় সম্পদ এবং রহস্যময় ভল্টের জন্য পরিচিত। দুটি মন্দিরই প্রাচীন ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিশ্বাসের চূড়ান্ত নিদর্শন।
ঔরঙ্গজেবের আক্রমণ এবং মন্দিরের অটুট রূপ
কৈলাস মন্দিরের অজেয় থাকার কাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের (শাসনকাল ১৬৫৮-১৭০৭) সাথে জড়িত। ঔরঙ্গজেব তাঁর ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং দাক্ষিণাত্য অভিযানের সময় অনেক মন্দির ধ্বংস করার নির্দেশের জন্য ইতিহাসে পরিচিত।
ধ্বংসের ব্যর্থ প্রচেষ্টা
ঐতিহাসিক নথি এবং স্থানীয় লোককাহিনী অনুসারে, প্রায় ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে, ঔরঙ্গজেব ইলোরার এই বিস্ময়কর মন্দিরটি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। বলা হয়, তাঁর আদেশে প্রায় ১০০০ থেকে ৩০০০ সৈন্য এবং শ্রমিককে এই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল কৈলাস মন্দিরকে সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া।
শ্রমিকরা প্রায় তিন বছর ধরে মন্দিরটি ভাঙার চেষ্টা চালায়। তারা মন্দিরের বিভিন্ন মূর্তি, স্তম্ভ এবং গম্বুজ ভাঙার জন্য হাতুড়ি, শাবল এবং অন্যান্য যন্ত্র ব্যবহার করে। কিন্তু তারা যা আশা করেছিল, তা ঘটেনি।
কেন ভাঙা সম্ভব হয়নি?
ঔরঙ্গজেবের সৈন্যরা মন্দিরটি ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছিল তার প্রধান কারণ হলো এর ‘মনোলিথিক’ নির্মাণশৈলী।
১. এটি কোনো ‘বিল্ডিং’ ছিল না: সাধারণ মন্দির বা ইমারত ইট বা পাথর দিয়ে গাঁথা থাকে। সেগুলির জোড় বা ভিত্তি দুর্বল করে দিলে বা স্তম্ভ ভেঙে ফেললে পুরো কাঠামোটি ভেঙে পড়ে। কিন্তু কৈলাস মন্দির ছিল একটি আস্ত পাহাড়। একে ভাঙার অর্থ হলো একটি আস্ত পাহাড়কে গুঁড়িয়ে ফেলা।
২. ব্যাসল্ট রকের কাঠিন্য: মন্দিরটি যে ডেকান ট্র্যাপের ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে তৈরি, তা অত্যন্ত শক্ত এবং টেকসই। সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে এই পাথর কাটা বা ভাঙা প্রায় অসাধ্য ছিল।
৩. বিশালতা: মন্দিরের দেয়ালগুলি এত পুরু এবং কাঠামোটি এত বিশাল ছিল যে, সেটিকে আঘাত করে ভাঙা ছিল সময়ের অপচয় মাত্র।
তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, ঔরঙ্গজেবের বাহিনী বুঝতে পারে যে এই মন্দির ধ্বংস করা তাদের সাধ্যের বাইরে। তারা মন্দিরের কিছু ভাস্কর্য বিকৃত করতে, কিছু মূর্তির মুখ ভেঙে দিতে এবং মন্দিরের গায়ে সামান্য ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিল মাত্র। কিন্তু মন্দিরের মূল কাঠামো বা এর ভিত্তি এক চুলও নড়ানো সম্ভব হয়নি।
ঔরঙ্গজেবের এই ব্যর্থতা কৈলাস মন্দিরের কিংবদন্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের তৈরি এই কাঠামোটি প্রকৃতির মতোই শক্তিশালী এবং প্রায় অবিনশ্বর। এই ঘটনাটিই সেই বিখ্যাত প্রবাদের জন্ম দেয়—”ঔরঙ্গজেবও এই মন্দির ভাঙতে পারেননি।”
বৈজ্ঞানিক এবং ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ
আধুনিক বিজ্ঞানীরাও কৈলাস মন্দিরের নির্মাণ নিয়ে বিস্মিত। ভূতাত্ত্বিক এবং ইঞ্জিনিয়াররা এর স্থায়িত্বের পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
ব্যাসল্ট রকের কাঠিন্য
ইলোরা যে অঞ্চলে অবস্থিত, তা ডেকান ট্র্যাপস (Deccan Traps) নামক এক বিশাল আগ্নেয়গিরিজাত মালভূমির অংশ। লক্ষ লক্ষ বছর আগে লাভা জমে এই কঠিন ব্যাসল্ট শিলার সৃষ্টি হয়েছিল। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Geological Survey of India) অনুসারে, এই ব্যাসল্ট শিলা অত্যন্ত ঘন এবং ক্ষয়-প্রতিরোধী। রাষ্ট্রকূট স্থপতিরা সচেতনভাবেই এই শক্ত পাথরটিকে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে তাদের সৃষ্টি হাজার হাজার বছর ধরে অক্ষত থাকে। এই পাথরের কাঠিন্যই ঔরঙ্গজেবের বাহিনীকে প্রতিহত করেছিল।
প্রাচীন প্রযুক্তি: হাতুড়ি এবং ছেনি
এটা ভাবা ভুল যে প্রাচীনকালে উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। কৈলাস মন্দির প্রমাণ করে যে তাঁদের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত উন্নত, যদিও তা আধুনিক যন্ত্রপাতির উপর নির্ভরশীল ছিল না।
- ধাতুবিদ্যা: লক্ষ লক্ষ টন ব্যাসল্ট কাটার জন্য যে ছেনি এবং হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলি অবশ্যই উচ্চমানের লোহা বা ইস্পাত দিয়ে তৈরি ছিল।
- পরিকল্পনা: জ্যামিতি এবং ত্রিমাত্রিক (3D) মডেলিং-এর এক অবিশ্বাস্য জ্ঞান ছাড়া উপর থেকে নিচে খোদাই করে এমন নিখুঁত কাঠামো তৈরি সম্ভব নয়। স্থপতিদের মনে পুরো মন্দিরের একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র ছিল।
ঢাকেশ্বরী মন্দির (Dhakeshwari Temple) ঢাকা: দর্শন সময়, ছুটির দিন এবং আরও অনেক কিছু
জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা (Water Drainage System)
মন্দিরটি যেহেতু একটি পাহাড় কেটে তৈরি, তাই বর্ষার সময় জল জমে মন্দিরের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু নির্মাতারা এরও সমাধান করেছিলেন। মন্দিরের ছাদ, প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন স্তরে এমনভাবে নালী এবং চ্যানেল খোদাই করা হয়েছে যে, বৃষ্টির জল সহজে মন্দির থেকে বেরিয়ে যায় এবং কাঠামোর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এই উন্নত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা আজও কার্যকর।
কৈলাস মন্দির: বিশ্ব ঐতিহ্য এবং বর্তমান তাৎপর্য
কৈলাস মন্দির কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো ইলোরা গুহাকে (কৈলাস মন্দির সহ) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। ইউনেস্কোর মতে, “ইলোরার এই গুহাগুলি প্রাচীন ভারতের সহনশীলতার চরিত্র এবং অসাধারণ শৈল্পিক সৃষ্টির এক অনন্য উদাহরণ।” এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভারতের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থান, যেমন সুন্দরবন (Sundarbans), এর মতোই গুরুত্বপূর্ণ, যা ভারতের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে।
পর্যটন এবং সংরক্ষণ
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী কৈলাস মন্দিরের এই বিস্ময় দেখতে আসেন। ভারতের পর্যটন মন্ত্রক (Ministry of Tourism, India) এবং মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন কর্পোরেশন (MTDC) ইলোরাকে ভারতের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে প্রচার করে।
এই বিপুল পর্যটকের চাপ এবং প্রাকৃতিক ক্ষয় (বায়ু, জল) থেকে মন্দিরটিকে রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এই অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে মন্দিরের কাঠামো পরিষ্কার করা, রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ (Chemical Preservation) এবং ভাঙা অংশগুলি পুনরুদ্ধারের কাজ করে থাকে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই মহাকাব্যটি চাক্ষুষ করতে পারে।
কৈলাস মন্দির কোনো মানুষের তৈরি সাধারণ ইমারত নয়। এটি একটি বিশ্বাস, একটি স্বপ্ন এবং সহস্রাব্দ প্রাচীন এক সভ্যতার প্রযুক্তিগত দক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন, যা একটি আস্ত পাহাড়ের হৃদপিণ্ড থেকে খোদাই করে বের করা হয়েছে। কিংবদন্তি অনুযায়ী দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশীর্বাদধন্য এই মন্দিরটি যেমন প্রকৃতির রোষ থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছে, তেমনই ঐতিহাসিক বিপর্যয়, বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টা থেকেও অজেয় প্রমাণিত হয়েছে। এটি আজও সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রকূটদের শৌর্য, প্রাচীন ভারতীয় শিল্পীদের ধৈর্য এবং সনাতন সংস্কৃতির স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক হিসেবে। কৈলাস মন্দির আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দৃঢ় সংকল্প এবং অবিশ্বাস্য ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা থাকলে, মানুষ তার কল্পনার থেকেও বড় কিছু তৈরি করতে পারে—এমন কিছু, যা সময়কেও হার মানায়।











