কিডনি আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিয়ে আমাদের সুস্থ রাখে। কিন্তু এই নীরব ঘাতক যখন অসুস্থ হতে শুরু করে, তখন প্রাথমিক অবস্থায় খুব একটা লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে জানেন কি, আপনার প্রস্রাবের ধরণ, রঙ এবং কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা কিডনির জটিল সমস্যাগুলি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে পারে? প্রস্রাবের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করানোই হতে পারে কিডনি ফেইলিওর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। ল্যানসেট (The Lancet)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ১৩.৮ কোটি মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজে (CKD) আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । তাই অবহেলা না করে জেনে নিন কোন লক্ষণের জন্য কোন পরীক্ষাটি জরুরি।
প্রস্রাব কেন কিডনি স্বাস্থ্যের আয়না?
কিডনির প্রধান কাজ হলো রক্ত পরিশোধন করা এবং প্রস্রাব তৈরি করা। তাই কিডনির কার্যকারিতায় কোনো ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রথম প্রভাব পড়ে প্রস্রাবের ওপর। প্রস্রাবের রঙ, ফেনা, বা দুর্গন্ধ—এসবই কিডনির ভেতরের অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। মায়ো ক্লিনিকের মতে, প্রস্রাব বিশ্লেষণ (Urinalysis) বা পরীক্ষা কিডনি ফেইলিওরের কারণ এবং পর্যায় নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান: একটি সতর্কবার্তা
কিডনি রোগ এখন একটি বৈশ্বিক মহামারীর রূপ নিচ্ছে। পরিসংখ্যানগুলো বেশ উদ্বেগজনক:
-
ভারতে প্রকোপ: ২০২৩ সালের হিসেবে ভারতে প্রায় ১৬% মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। গ্রামীণ এলাকায় এই হার প্রায় ১৫.৩৪%, যা শহরের (১০.৬৫%) তুলনায় বেশি ।
-
মৃত্যুর কারণ: ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ কিডনি রোগে মারা গেছেন। এটি বর্তমানে মৃত্যুর ৯ম প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে ।
-
এশিয়ায় অবস্থা: বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব ১০% থেকে ২০% এর মধ্যে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ।
কিডনি সমস্যা শনাক্তকরণে জরুরি ৫টি প্রস্রাব পরীক্ষা
কিডনির সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকরা সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করিয়ে থাকেন। কোন সমস্যার জন্য কোন পরীক্ষাটি দরকার, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ইউরিনালাইসিস (Urinalysis) বা রুটিন প্রস্রাব পরীক্ষা
এটি সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক পরীক্ষা। একটি ডিপস্টিক (রাসায়নিক স্ট্রিপ) প্রস্রাবে ডুবিয়ে এটি করা হয়।
-
কি দেখা হয়: প্রস্রাবে প্রোটিন, রক্ত, পুঁজ, বা গ্লুকোজ আছে কিনা।
-
কেন করা হয়: এটি প্রস্রাবের সংক্রমণ (UTI), কিডনি পাথর, এবং ডায়াবেটিসের মতো প্রাথমিক সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে ।
২. ইউরিন অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন রেশিও (uACR)
এটি কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের জন্য “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড” বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।
-
কি দেখা হয়: এই পরীক্ষায় প্রস্রাবে ‘অ্যালবুমিন’ নামক প্রোটিনের সাথে ‘ক্রিয়েটিনিন’-এর অনুপাত মাপা হয়।
-
কেন করা হয়: সুস্থ কিডনি রক্ত থেকে অ্যালবুমিন প্রস্রাবে যেতে দেয় না। যদি uACR পরীক্ষায় অ্যালবুমিন পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে কিডনি তার ছাঁকনির কাজ ঠিকমতো করতে পারছে না। এটি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগের আগাম বার্তা দেয় ।
৩. ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব সংগ্রহ (24-Hour Urine Collection)
যখন আরও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন হয়, তখন ডাক্তাররা এই পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
-
কি দেখা হয়: সারাদিনে শরীর কতটা প্রস্রাব তৈরি করছে এবং তাতে কতটা প্রোটিন, ক্রিয়েটিনিন বা অন্যান্য খনিজ পদার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।
-
কেন করা হয়: এটি কিডনির সামগ্রিক কার্যকারিতা (Kidney Function) এবং প্রোটিন লিকেজের সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কিডনি ফেইলিওরের পর্যায়ে এটি অত্যন্ত জরুরি ।
৪. প্রস্রাবের কালচার ও সেনসিটিভিটি (Urine Culture)
-
কি দেখা হয়: প্রস্রাবে কোনো ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু আছে কিনা।
-
কেন করা হয়: যদি সাধারণ পরীক্ষায় সংক্রমণের লক্ষণ পাওয়া যায়, তবে ঠিক কোন জীবাণু দায়ী এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে, তা জানার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। এটি কিডনি ইনফেকশন (Pyelonephritis) প্রতিরোধে সহায়ক ।
৫. মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা (Microscopic Exam)
-
কি দেখা হয়: অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে প্রস্রাবের তলানি পরীক্ষা করে লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC), বা কাস্ট (Casts) দেখা হয়।
-
কেন করা হয়: এটি কিডনির প্রদাহ (Glomerulonephritis) বা টিউমার এবং কিডনি পাথরের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে ।
প্রস্রাবের রঙ ও লক্ষণ: কখন সতর্ক হবেন?
পরীক্ষা করার আগেও আপনি নিজে কিছু লক্ষণ দেখে সতর্ক হতে পারেন। ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যানুযায়ী প্রস্রাবের ধরণ অনেক কথা বলে:
| প্রস্রাবের ধরণ | সম্ভাব্য কারণ |
|---|---|
| ফেনা বা ফ্রোথি (Foamy) | এটি প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন বা প্রোটিনুরিয়ার লক্ষণ। এটি কিডনি ড্যামেজের অন্যতম প্রধান এবং প্রাথমিক লক্ষণ |
| । | |
| লাল বা গোলাপি (Red/Pink) | প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria) থাকা। এটি কিডনি পাথর, ইনফেকশন, এমনকি ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে |
| । | |
| গাঢ় হলুদ বা বাদামী (Dark Brown/Tea-colored) | এটি তীব্র পানিশূন্যতা বা লিভারের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এটি পেশী ভেঙে যাওয়া (Rhabdomyolysis) বা অ্যাডভান্সড কিডনি রোগের লক্ষণও হতে পারে |
| । | |
| ঘোলাটে (Cloudy) | সাধারণত এটি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) বা কিডনি পাথরের কারণে খনিজ জমে থাকার ইঙ্গিত দেয় |
| । | |
| স্বচ্ছ বা ফ্যাকাশে হলুদ | এটি সুস্থতা এবং সঠিক হাইড্রেশনের লক্ষণ |
কিডনি ভালো রাখতে করণীয় (Prevention & Management)
শুধুমাত্র পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, কিডনি সুস্থ রাখতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে:
-
পর্যাপ্ত পানি পান: শরীর হাইড্রেটেড থাকলে কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ সহজে বের করে দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত পানি পান করাও কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই তৃষ্ণা অনুযায়ী পানি পান করুন।
-
ডায়াবেটিস ও প্রেশার নিয়ন্ত্রণ: কিডনি নষ্ট হওয়ার প্রধান দুটি কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন ।
-
লবণ কম খাওয়া: অতিরিক্ত সোডিয়াম কিডনির ওপর চাপ ফেলে এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
-
ওষুধ সেবনে সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক (Painkillers) খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এগুলো কিডনির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে।
কিডনি রোগ একটি নীরব ঘাতক হলেও, প্রস্রাবের সামান্য পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে রুটিন পরীক্ষা আপনাকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। প্রস্রাবে ফেনা, রঙের পরিবর্তন বা জ্বালাপোড়া অনুভব করলে কখনোই অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের বছরে অন্তত একবার uACR এবং সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করানো উচিত। মনে রাখবেন, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে কিডনি রোগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সুস্থ থাকতে আজই সচেতন হোন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।











