শীতের বিদায় এবং বসন্তের আগমনের এই সন্ধিক্ষণে আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত খামখেয়ালিপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই শহরের আকাশ আংশিক মেঘলা। মাঝে মাঝেই রোদের দেখা মিললেও, বেলা গড়াতেই মুখ ভার করছে আকাশ। এই পরিস্থিতিতে আলিপুর আবহাওয়া দফতর এক নতুন আপডেটে জানিয়েছে যে, কলকাতায় টানা তিন দিন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। শুধু কলকাতাতেই নয়, সতর্কতা জারি করা হয়েছে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই।
হঠাৎ করে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের জেরে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগছে। কবে কোথায় বৃষ্টি হবে? বৃষ্টির পরিমাণ কেমন থাকবে? দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে এবং উত্তরবঙ্গের আকাশই বা কেমন থাকবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত আবহাওয়া প্রতিবেদন। আবহাওয়া দফতরের দেওয়া তথ্য, স্যাটেলাইট চিত্র এবং জলবায়ুর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আমরা আপনার জন্য সম্পূর্ণ আবহাওয়ার আপডেট তুলে ধরছি।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক আপডেট
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক বুলেটিন অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প রাজ্যে প্রবেশ করছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমী ঝঞ্ঝার একটি প্রভাবও কাজ করছে। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে আবহাওয়ায় বড়সড় রদবদল ঘটতে চলেছে।
কবে থেকে শুরু হবে বৃষ্টি?
হাওয়া অফিসের খবর অনুযায়ী, সোমবার থেকেই আবহাওয়ার এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হবে। সোমবার সকাল থেকে শহরের আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে এবং দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। আগামী বুধবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে বা সন্ধ্যার প্রাক্কালে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
টানা তিন দিনের এই বৃষ্টির ফলে দৈনন্দিন জনজীবনে ভালোই প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। স্কুল-কলেজ বা অফিস যাত্রীদের জন্য ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া কলকাতার বেশ কিছু নিচু এলাকায় জল জমার সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও টানা ভারী বৃষ্টির সতর্কতা নেই, তবুও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির ফলে যানজট এবং রাস্তায় জল জমার মতো সাধারণ ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে শহরবাসীকে।
কলকাতায় টানা তিন দিন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস: বিস্তারিত তথ্য
শহরের আবহাওয়া আপাতত শুষ্ক থাকার কোনও লক্ষণ নেই। আলিপুর হাওয়া অফিস স্পষ্ট জানিয়েছে, কলকাতায় টানা তিন দিন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। শনিবার বিকেলেও শহরের কিছু এলাকায় দু’এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে এবং রবিবার দিনভর আকাশ মেঘলা ছিল। এই পরিস্থিতি আগামী বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর কলকাতার তুলনায় দক্ষিণ কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বৃষ্টির সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। যাদবপুর, টালিগঞ্জ, বেহালা, গড়িয়া এবং অন্যদিকে বিধাননগর বা নিউ টাউনের মতো এলাকাগুলিতে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির স্থায়িত্ব খুব বেশি না হলেও, কয়েক পশলা তীব্র বর্ষণ রাস্তাঘাট ভিজিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিশেষত অফিস ছুটির সময়ে এই বৃষ্টি হলে বাড়ি ফেরার পথে মানুষের হয়রানি বাড়তে পারে।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন
বৃষ্টির কারণে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ভ্যাপসা গরম বা গুমোট আবহাওয়া অনুভূত হতে পারে। হাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই কয়েকদিন কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকবে ২৩ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে। আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে অস্বস্তিসূচক মাত্রা বৃদ্ধি পাবে।
সতর্কতা দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই! কোন কোন জেলায় বৃষ্টিপাত?
শুধুমাত্র কলকাতা নয়, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে। আবহাওয়া দফতর দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলার জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে মেঘের সৃষ্টি করছে, যার ফলে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে বৃষ্টির তীব্রতা সবথেকে বেশি থাকতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে দুই ২৪ পরগনা ও মেদিনীপুরে বৃষ্টির পাশাপাশি দমকা হাওয়া বইতে পারে। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এবং বীরভূমেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলিতে বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকায় স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ বা হলুদ সতর্কতা জারি করেছে। মূলত বজ্রপাতের আশঙ্কার কারণেই এই সতর্কতা। এই অসময়ের বৃষ্টি কৃষিকাজের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে মাঠে বোরো ধান এবং আলু চাষের কাজ চলছে। মাঠে জল জমে গেলে ফসল নষ্ট হওয়ার তীব্র আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকদের দ্রুত পাকা ফসল ঘরে তোলার এবং সেচের কাজ আপাতত বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কৃষি দফতরের তরফ থেকে।
কবে কোথায় বর্ষণ?
সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে এবং কৃষকদের আগাম প্রস্তুতির জন্য আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়ার একটি সম্ভাব্য সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো। এই তথ্য আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
কী হবে উত্তরবঙ্গে? উত্তরের জেলাগুলির আবহাওয়া
দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় যখন এত রদবদল, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি কী? আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া অনেকটাই আলাদা থাকবে। তবে দার্জিলিং এবং সংলগ্ন এলাকায় কিছুটা প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাহাড়ের দুই জেলা, দার্জিলিং এবং কালিম্পংয়ে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দার্জিলিংয়ের উঁচু এলাকাগুলিতে বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রার বেশ কিছুটা পতন লক্ষ্য করা যাবে। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি হলে পর্যটকদের কিছুটা অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। তবে ভারী বৃষ্টি বা ধস নামার মতো কোনও সতর্কতা হাওয়া অফিসের তরফ থেকে দেওয়া হয়নি। পাহাড়ের আকাশ মূলত মেঘলাই থাকবে।
উত্তরবঙ্গের সমতলের জেলাগুলি যেমন মালদহ, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। এই তিন জেলায় আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া মূলত শুষ্কই থাকবে। দিনের বেলায় চড়া রোদ ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সন্ধ্যার পর থেকে তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে বিক্ষিপ্তভাবে দুই-এক পশলা হালকা বৃষ্টি হতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বসন্তের শুরুতে এই অকাল বৃষ্টির কারণ কী?
শীতের শেষে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে এই ধরনের অকাল বৃষ্টি খুব একটা অস্বাভাবিক না হলেও, এবারের বৃষ্টির তীব্রতা ও স্থায়িত্ব কিছুটা হলেও ভাবাচ্ছে আবহাওয়াবিদদের। মূলত দুটি বড় প্রাকৃতিক কারণ এই আবহাওয়ার জন্য দায়ী।
প্রথমত, উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আসা একটি শক্তিশালী পশ্চিমী ঝঞ্ঝা রাজ্যের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয়ত, বঙ্গোপসাগরের উপর একটি নিম্নচাপ অক্ষরেখা বা ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে। এই ঘূর্ণাবর্তের টানে সমুদ্র থেকে হু হু করে প্রচুর জলীয় বাষ্প রাজ্যের পরিমণ্ডলে প্রবেশ করছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝার শীতল হাওয়া এবং বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ ও আর্দ্র হাওয়ার সংমিশ্রণের ফলেই এই বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে এবং দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে এই বৃষ্টিপাত ঘটছে।
বর্তমানে আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনার পিছনে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) একটি পরোক্ষ প্রভাবও দেখছেন অনেক পরিবেশবিদ। ঋতুচক্রের এই আকস্মিক পরিবর্তন, হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং তারপর আবার টানা বৃষ্টি—এসবই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফল বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তা আগামী দিনগুলিতে আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণ মানুষ ও যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা
আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বেরোন, তাদের জন্য এই সতর্কতাগুলি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
কলকাতায় টানা তিন দিন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকার কারণে শহরের বেশ কিছু রাস্তায় জল জমতে পারে। এমজি রোড, সেন্ট্রাল এভিনিউ, পার্ক স্ট্রিট, বা সায়েন্স সিটির মতো জায়গাগুলিতে বৃষ্টির জল দ্রুত না সরলে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। তাই গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য হাতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় নিয়ে বেরোনো উচিত। মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক থাকলেও সড়কপথে যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তি হতে পারে।
এই সময় হঠাৎ করে বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সর্দি, কাশি এবং জ্বরের মতো সিজনাল অসুখ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের সাবধানে রাখা প্রয়োজন। বজ্রপাতের সময় কোনোমতেই ফাঁকা মাঠে বা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। বিদ্যুৎ চমকানোর সময় নিরাপদ স্থানে, যেমন পাকা বাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়া সবথেকে ভালো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আগামী তিন দিন দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তির হতে চলেছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর স্পষ্টতই কলকাতায় টানা তিন দিন বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। একদিকে যেমন গরমের হাত থেকে কিছুটা সাময়িক স্বস্তি মিলবে, অন্যদিকে কৃষিকাজ এবং দৈনন্দিন জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়বে।
তাই বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অবশ্যই ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। আবহাওয়া দফতরের পরবর্তী আপডেটের দিকে নজর রাখুন এবং সতর্ক থাকুন। প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল রূপের সাথে মানিয়ে নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চালিয়ে যেতে হবে। উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের জন্য খুব একটা চিন্তার কারণ না থাকলেও, দক্ষিণবঙ্গের মানুষদের আগামী কয়েকদিন একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে।











