Srijita Chattopadhay
২৭ মার্চ ২০২৫, ৮:৫৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যের মহাকবির স্মৃতি রক্ষায় যুদ্ধে নামল কলকাতা পুরসভা: হাইকোর্টে আবেদন

খিদিরপুরের কার্ল মার্কস সরণিতে অবস্থিত বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মাইকেল মধুসূদন দত্তের বসতবাড়ি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এই ঐতিহাসিক স্মৃতিধন্য বাড়িটি বাঁচাতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে খোদ কলকাতা পুরসভা। বাড়িটি ভেঙে বহুতল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইতিমধ্যেই ২০বি কার্ল মার্কস সরণিতে অবস্থিত দোতলা বাড়িটির একাংশ ভাঙা হয়েছে। বর্তমানে পিছনের অংশ ভাঙার কাজ চলছে। এই ঐতিহাসিক ভবনটি কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও হাইকোর্টে সেই তথ্য গ্রাহ্য হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পুরসভা ডিভিশন বেঞ্চে যাওয়ার পূর্বে মেয়র পারিষদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কলকাতা পুরসভার কমিশনার ধবল জৈন1

অমৃতাক্ষর ছন্দের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাঙালির হৃদয়ে এক অবিচ্ছেদ্য স্থান দখল করে আছেন। “আমি কি ডরাই সখী ভিখারি রাঘবে” থেকে শুরু করে কর্ণকে মহান চরিত্রে উন্নীত করা তাঁর লেখনীর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল। ভিলেনকে হিরোতে রূপান্তরিত করার অনন্য কারিগর হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু হয়। কলকাতা পুরসভা গঠিত হয় ১৮৭৬ সালে, তার পরেই। পুরসভার রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে যেটি ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড, সেটিই একসময় গার্ডেনরিচ এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালের বিবর্তনে ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১৪৪টি ওয়ার্ড রয়েছে কলকাতা পুরসভার অধীনে।

সমস্যা হল, দুই শতাব্দী পরে এমন কোনও পর্যাপ্ত নথি পুরসভার কাছে নেই যা প্রমাণ করে যে ২০বি কার্ল মার্কস সরণির এই দোতলা বাড়িতেই জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটিয়েছিলেন মধুকবি। তবে এই বাড়িটি ভেঙে বহুতল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মধুকবির সমস্ত স্মৃতি মুছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই এই ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার্থে কলকাতা পুরসভা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।

ইতিমধ্যে কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ বিভাগ আপিল করার জন্য জোরালো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে। এই বিষয়ে কলকাতার ইতিহাস গবেষক ডা. শঙ্কর নাথ জানিয়েছেন, “মাইকেল মধূসূদন দত্ত প্রথম ভারতীয় পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছিলেন, কারণ তিনি খ্রিস্টান ছিলেন। ১৮৩৬-৩৭ সালের দিকে কাশীপ্রসাদ ঘোষের পরিবারের কাছ থেকে এই বাড়ি কিনেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরিবার। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পরে ইউরোপ থেকে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি এই বাড়িতেই বাস করতেন বলে শোনা যায়”।

আজও বেহালা ও খিদিরপুরের মধ্যবর্তী পথে হেঁটে গেলে মধুকবির বাড়িটি চোখে পড়ে। এটি শুধু একটি ভবন নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল ইতিহাস। বলা হয়, জীবনের শেষ কিছু বছর এই বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন মহাকবি। এখন সেই ইতিহাসের সাক্ষী একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে ধ্বংসের মুখে।

কলকাতা পুরসভার কমিশনার ধবল জৈন এ বিষয়ে জানিয়েছেন, “কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ তালিকায় ওই বাড়ি ঐতিহ্যশালী ভবন হিসাবে চিহ্নিত রয়েছে। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টে সেই তথ্য গ্রাহ্য হয়নি। তবে ডিভিশন বেঞ্চে যাওয়ার আগে মেয়র পারিষদ বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে”।

আশ্চর্যের বিষয় হল, বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য স্মৃতিস্তম্ভ বাঁচাতে সরকারি সংস্থাকেই আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। শহরের বুকে এমন একটি ঐতিহাসিক স্থান বাঁচানোর দায়িত্ব শুধু পুরসভার নয়, সাহিত্যপ্রেমী সকল বাঙালির। বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্মৃতিচিহ্ন বাঁচাতে কলকাতা পুরসভার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত শুধু কবি নন, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের অন্যতম পথপ্রদর্শক। বাংলা সাহিত্যে অমৃতাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক এই সাহিত্যিকের বসতবাড়ি বাঁচানোর ক্ষেত্রে সাহিত্যপ্রেমী সকল বাঙালি এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোনো জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ তার উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আশা করা যায়, আদালতের সিদ্ধান্ত এই ঐতিহাসিক স্থাপনার পক্ষে যাবে এবং বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য সম্পদটি বাঁচানো সম্ভব হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দাঁড়িয়ে জল পান: অজানা স্বাস্থ্য ঝুঁকি যা আপনার দৈনন্দিন জীবনে লুকিয়ে আছে!

চিনি ও শিশুদের চঞ্চলতা: বৈজ্ঞানিক গবেষণা জনপ্রিয় বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে

অশোক ষষ্ঠী ২০২৫: মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদ পাওয়ার শুভলগ্ন জেনে নিন সম্পূর্ণ পূজাবিধি

Xiaomi 15 Ultra কেনার ৪টি কারণ ও এড়িয়ে যাওয়ার ২টি কারণ – আপনার জন্য কী সঠিক?

সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের অনন্য দৃশ্য: জয়পুরে ঈদ উদযাপনে হিন্দুদের হাতে মুসলিমদের উপর পুষ্পবৃষ্টি

Income Tax Return 2025: সঠিক নথিপত্র প্রস্তুত রেখে রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া করুন সহজ

হাসি-ঠাট্টার দিন: এপ্রিল ফুল-এর রহস্যময় ইতিহাস ও বিশ্বব্যাপী উদযাপন

বিশ্বের ৭টি সবচেয়ে সুন্দর ফুল: যেখানে প্রকৃতি সৌন্দর্যের চরম রূপ ধারণ করেছে

ভোডাফোন আইডিয়ার ৩৬,৯৫০ কোটি টাকার ঋণ শেয়ারে রূপান্তর করছে কেন্দ্র

গ্রীষ্মের দাবদাহে: নারিকেল জল বনাম লেবু জল – কোনটি আপনাকে বেশি হাইড্রেটেড রাখবে?

১০

আইপিএল ধারাভাষ্যকারদের অবিশ্বাস্য আয়: কে পান সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক?

১১

২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে; গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরীক্ষার সম্পূর্ণ সময়সূচি

১২

ঝিঙ্গে: স্বাস্থ্যের অমূল্য খনি, জেনে নিন এর উপকারিতা ও অপকারিতা

১৩

রাজা ফিরে আসুন, দেশ বাঁচান: গণতন্ত্রের ১৭ বছর পর রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য উত্তাল নেপাল

১৪

মায়ানমারে শতাব্দীর ভয়াবহ ভূমিকম্প: মৃত্যুসংখ্যা ২০০০ ছাড়িয়েছে, সামরিক জুন্টা ঘোষণা করেছে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় শোক

১৫

১ এপ্রিল থেকে মূল্যবৃদ্ধির ঝড়! ৯০০+ অপরিহার্য ওষুধের দাম বাড়ছে, তালিকায় ডায়াবেটিস থেকে ক্যানসার

১৬

চীনের “বিস্তারের” জন্য ইউনুসের আহ্বান: ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য

১৭

প্রধানমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্র বারাণসীর মেয়ে নিধি তেওয়ারি বনলেন মোদীর নতুন ব্যক্তিগত সচিব

১৮

আইপিএল অভিষেকেই ঝড়! মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের অশ্বিনী কুমার গড়লেন ইতিহাস, ভারতীয় প্রথম

১৯

অনন্ত অম্বানির অবিশ্বাস্য রূপান্তরের নায়ক বিনোদ চান্না: ওজন কমানোর ৪টি অমোঘ উপায়

২০
close