বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুত আমেরিকার! Strategic Oil Reserves-এ ভারত কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতিতে তেলের ভূমিকা সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইজরায়েল-ইরান সংঘাত থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—আন্তর্জাতিক স্তরে যে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেই তার सीधा প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর। আর…

Avatar

বিশ্ব রাজনীতিতে তেলের ভূমিকা সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইজরায়েল-ইরান সংঘাত থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—আন্তর্জাতিক স্তরে যে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেই তার सीधा প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর। আর এই কারণেই বিশ্বের ক্ষমতাশালী দেশগুলো আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য বিশাল পরিমাণ কাঁচা তেল বা ক্রুড অয়েল মজুত করে রাখে। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আপৎকালীন তেল মজুত করে রেখেছে আমেরিকা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই বিশাল Strategic Oil Reserves-এর তালিকায় আমাদের দেশ ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ, যার দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় । তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে এই মজুত ভাণ্ডারই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব কেন দেশগুলো জরুরি অবস্থার জন্য তেল মজুত করে, আমেরিকার কাছে ঠিক কতটা মজুত রয়েছে এবং ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী।​

Strategic Oil Reserves কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

কোনো দেশের আপৎকালীন বা ইমার্জেন্সি তেলের ভাণ্ডারকেই মূলত Strategic Oil Reserves বলা হয়। যখন কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে তেলের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে, তখন এই জমানো তেল দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সাহায্য করে। এই মজুত ভাণ্ডারগুলো সাধারণত মাটির গভীরের বিশাল গুহায় (লবণ গুহা বা সল্ট ক্যাভার্ন) তৈরি করা হয়, যাতে দীর্ঘদিন নিরাপদে তেল ধরে রাখা যায়। এর প্রধান উদ্দেশ্য শুধুমাত্র তেল বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং বৈশ্বিক তেলের বাজারের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাধারণ মানুষের ওপর পেট্রোল-ডিজেলের দামের সরাসরি আঘাত আটকানো।

জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা

যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনী, ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম এবং শিল্প কারখানাগুলো তেলের ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো কারণে মধ্যপ্রাচ্য বা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। ঠিক এই বিপদের সময় Strategic Oil Reserves একটি বাফারের মতো কাজ করে। এটি নিশ্চিত করে যে, বাইরের দুনিয়ায় যাই ঘটুক না কেন, দেশের ভেতরের হাসপাতাল, রেলওয়ে, বিমান পরিষেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন অন্তত কয়েক মাস স্বাভাবিকভাবে চলবে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ

শুধু জরুরি অবস্থা নয়, তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেলেও এই রিজার্ভ কাজে লাগানো হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সরকার এই মজুত থেকে তেল বের করে বাজারে ছাড়ে। এর ফলে বাজারে তেলের জোগান বাড়ে এবং দাম কিছুটা হলেও কমে আসে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যবৃদ্ধি আটকাতেও এর একটি বিশাল অর্থনৈতিক ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল মজুত: আমেরিকার Strategic Oil Reserves

আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ এবং তারা নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করে না। ১৯৭৩ সালের ভয়ংকর তেল সংকটের পর আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা আর কখনোই বিদেশি তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকবে না। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তাদের বিশাল Strategic Oil Reserves, যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আপৎকালীন তেল মজুত প্রকল্প। টেক্সাস এবং লুসিয়ানার মাটির গভীরে থাকা বিশাল লবণ গুহাগুলোতে এই বিপুল পরিমাণ কাঁচা তেল সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়।

আমেরিকার তেল মজুতের বর্তমান অবস্থা

আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছালেও, বর্তমানে তাদের হাতে প্রায় ৪০৯ থেকে ৪১৯ মিলিয়ন ব্যারেলে তেল মজুত রয়েছে । ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে আমেরিকা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই মজুত থেকে বাজারে ছেড়েছিল । এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কম থাকায়, মার্কিন সরকার তাদের এই খালি হয়ে যাওয়া ভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড অয়েল কিনছে ।

আমেরিকা কেন এত বিপুল তেল মজুত রাখে?

আমেরিকার এই বিপুল পরিমাণ মজুত রাখার প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও আমেরিকা এই মজুতের মাধ্যমেই ধরে রাখে। এছাড়া শক্তিশালী সামরিক কাঠামো সচল রাখতে এবং যে কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে (যেমন হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ে রিফাইনারি বন্ধ হলে) দেশের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতেই এই বিশাল পরিমাণ ক্রুড অয়েল মজুত করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ তেল মজুতকারী দেশ

আমেরিকা ছাড়াও বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশ জ্বালানি সুরক্ষার খাতিরে বিশাল তেলের ভাণ্ডার তৈরি করেছে। বিশেষ করে যে দেশগুলো তেল আমদানির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই আপৎকালীন মজুত রাখাটা বাধ্যতামূলক। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-এর নিয়ম অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোকে অন্তত ৯০ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ তেল মজুত রাখতে হয় । আসুন দেখে নিই বিশ্বের অন্যান্য কোন কোন দেশ এই তালিকায় উপরের দিকে রয়েছে।​

চীনের বিশাল এনার্জি ভাণ্ডার

আমেরিকার পরেই আপৎকালীন তেল মজুতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নাম হলো চীন। যদিও চীন সরকারিভাবে তাদের মজুতের সঠিক তথ্য খুব একটা প্রকাশ করে না, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের কাছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো তেল মজুত করার ক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীনের কলকারখানাগুলো সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়। তাই ভবিষ্যতের যেকোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক সংঘাতের কথা মাথায় রেখে চীন দ্রুতগতিতে তাদের রিজার্ভ বাড়িয়ে চলেছে।

জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তুতি

জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর নিজেদের কোনো উল্লেখযোগ্য তেলের খনি নেই। তাদের প্রায় ১০০ শতাংশ তেলই বিদেশ থেকে আসে। তাই এই দেশগুলো অত্যন্ত কড়া নিয়মে Strategic Oil Reserves মেইনটেইন করে। জাপানের কাছে সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৫০ দিনের বেশি সময়ের তেল মজুত থাকে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের ভূগর্ভস্থ রিজার্ভে বিপুল পরিমাণ ক্রুড অয়েল স্টোর করে রেখেছে, যা তাদের শক্তিশালী টেকনোলজি ও অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিকে সুরক্ষিত রাখে।

Strategic Oil Reserves-এর তালিকায় কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ক্রেতা হিসেবে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভারত প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া এবং আমেরিকা থেকে কেনে। যদি এক সপ্তাহের জন্যও এই সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে ভারতীয় অর্থনীতি চরম বিপদে পড়তে পারে। এই ঝুঁকি কমাতেই ভারত সরকার ‘ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড’ (ISPRL) গঠন করে আপৎকালীন তেল মজুতের কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে ভারত এই তালিকায় ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।

ভারতের বর্তমান তেল মজুতের ক্ষমতা

বর্তমানে ভারতের Strategic Oil Reserves-এ মোট ৫.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন (MMT) বা প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রাখার ক্ষমতা রয়েছে । এই মজুত দিয়ে দেশের প্রায় ৯.৫ দিনের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব। এর পাশাপাশি, ভারতের তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলোর নিজস্ব ট্যাঙ্কারে যে পরিমাণ তেল থাকে, তা দিয়ে আরও প্রায় ৬৫ দিনের চাহিদা মেটানো যায়। সব মিলিয়ে বর্তমানে ভারতের হাতে প্রায় ৭৪ থেকে ৭৫ দিনের আপৎকালীন জ্বালানি সুরক্ষিত রয়েছে ।​

ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের অবস্থান

ভারতের এই ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত মূলত দক্ষিণ ভারতের তিনটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পাথরের গুহায় (Rock Caverns) রাখা হয়েছে । এই তিনটি জায়গা হলো:​
১. বিশাখাপত্তনম (অন্ধ্রপ্রদেশ): এখানে ১.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল মজুত রাখা যায়।
২. মেঙ্গালুরু (কর্ণাটক): এর ধারণক্ষমতা প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ।​
৩. পাদুর (কর্ণাটক): এটি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় রিজার্ভ, যার ধারণক্ষমতা ২.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ।​

২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম তলানিতে ঠেকেছিল, তখন ভারত অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো সস্তায় তেল কিনে এই তিনটি ভাণ্ডার কানায় কানায় পূর্ণ করে ফেলেছিল। এর ফলে ভারত সরকারের প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয় ।​

একনজরে বিশ্বের শীর্ষ আপৎকালীন তেল মজুতের তথ্য

যেকোনো জটিল তথ্য সহজে বোঝার জন্য একটি টেবিলের সাহায্যে বিশ্বের শীর্ষ Strategic Oil Reserves-এর আনুমানিক ক্ষমতা নিচে তুলে ধরা হলো। মনে রাখবেন, এই তথ্যগুলো বিভিন্ন দেশের নীতি এবং বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।

দেশের নাম আপৎকালীন মজুতের আনুমানিক ক্ষমতা মজুতের ধরন ও বিশেষত্ব
আমেরিকা (USA) ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেল মূলত সল্ট ক্যাভার্নে সংরক্ষিত বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি মজুত ​।
চীন (China) ৯০০ মিলিয়ন ব্যারেল (আনুমানিক) সরকারি এবং বাণিজ্যিক মজুতের এক বিশাল মিশ্রণ।
জাপান (Japan) ৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রায়) আমদানি নির্ভরতা ১০০% হওয়ায় মজুতের ওপর কড়া জোর।
দক্ষিণ কোরিয়া ১৪৬ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রায়) শিল্প ও টেকনোলজি খাতের সুরক্ষার জন্য নির্মিত শক্তিশালী ভাণ্ডার।
ভারত (India) ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রাথমিক পর্যায়) ভূগর্ভস্থ রক ক্যাভার্নে ৫.৩৩ MMT তেল মজুত রয়েছে ​।


ভারতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুন রিজার্ভ প্রজেক্ট

বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার কথা মাথায় রেখে ভারত সরকার বুঝতে পেরেছে যে, শুধুমাত্র ৯ বা ১০ দিনের Strategic Oil Reserves দিয়ে ভবিষ্যতের বড় কোনো সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ভারতের অর্থনীতি যেভাবে দ্রুতগতিতে বাড়ছে, তাতে জ্বালানির চাহিদাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই IEA-এর নিয়মানুযায়ী ৯০ দিনের মজুত নিশ্চিত করতে ভারত সরকার ইতিমধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের (Phase-II) বিশাল কিছু প্রজেক্টের কাজে হাত দিয়েছে।

বিকানের এবং চণ্ডীখোল প্রজেক্ট

আগামী দিনে ভারতের তেল মজুত ক্ষমতাকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ওড়িশার চণ্ডীখোলে একটি নতুন ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন (MMT) ক্ষমতার রিজার্ভ তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে । এছাড়া রাজস্থানের বিকানেরে সল্ট ক্যাভার্ন বা লবণ গুহা প্রযুক্তির সাহায্যে ৫.২ থেকে ৫.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি বিশাল রিজার্ভ তৈরি করার পরিকল্পনা চলছে । মধ্যপ্রদেশের বিনাতেও একটি নতুন রিজার্ভ তৈরির কাজ শুরু হতে চলেছে । এই প্রজেক্টগুলো সফলভাবে শেষ হলে ভারতের আপৎকালীন মজুতের দিনসংখ্যা অনেকটাই বেড়ে যাবে।​

বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ

আমেনিকা, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করে ভারত এবার তাদের Strategic Oil Reserves-এ বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে জায়গা দেওয়ার কথা ভাবছে । এর মানে হলো, বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো ভারতের এই ভূগর্ভস্থ গুহাগুলো ভাড়া নিয়ে সেখানে তেল রাখতে পারবে এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তা বিক্রি করতে পারবে। এর ফলে সরকারের ওপর একতরফা আর্থিক চাপ যেমন কমবে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরে সবসময় বিশাল পরিমাণ তেলের উপস্থিতি নিশ্চিত হবে।​

ভারত কেন তার Strategic Oil Reserves দ্রুত বাড়াতে চাইছে?

ভারত বর্তমানে উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে এনার্জি বা জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান থাকাটা বাধ্যতামূলক। সামান্য তেলের দাম বাড়লেই দেশের বাজারে শাকসবজি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তাই পেট্রোল-ডিজেলের দামের এই অহেতুক ওঠানামা আটকাতে ভারত মরিয়া হয়ে নিজেদের Strategic Oil Reserves সম্প্রসারণ করতে চাইছে।

আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো

ভারত তার মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি বাইরে থেকে কেনে । এর মধ্যে একটা বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এখন লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণ বা ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধের কারণে যেকোনো দিন তেলের জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন একটি ভয়ংকর পরিস্থিতিতে দেশের ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা যাতে পুরোপুরি থমকে না যায়, তার জন্যই ভারত দ্রুত এই মজুত বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।​

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-এর নিয়ম

ভারত বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) সহযোগী সদস্য এবং অদূর ভবিষ্যতে পূর্ণ সদস্য হওয়ার দৌড়ে রয়েছে। IEA-এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, প্রতিটি সদস্য দেশকে তাদের নেট আমদানির অন্তত ৯০ দিনের সমপরিমাণ তেল মজুত রাখতে হবে । ভারত বর্তমানে রিফাইনারিগুলোর মজুত মিলিয়ে ৭৫ দিনের জায়গায় রয়েছে । এই ঘাটতি পূরণ করতে এবং গ্লোবাল এনার্জি সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্মে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতেই ভারত নতুন নতুন স্টোরেজ তৈরি করছে।​

 শেষ কথা

বিশ্ব রাজনীতি বর্তমানে যে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে শক্তির স্বাধীনতা বা এনার্জি ইনডিপেন্ডেন্স ছাড়া কোনো দেশের পক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানো মুশকিল। আমেরিকা বহু আগে থেকেই তাদের বিশাল Strategic Oil Reserves তৈরি করে বিশ্বের সামনে একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করেছে। চীন, জাপানের মতো দেশগুলোও চুপ করে বসে নেই। তবে আশার কথা হলো, ভারতও তার জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব বুঝতে পেরে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশাখাপত্তনম থেকে শুরু করে বিকানেরের নতুন প্রজেক্টগুলো প্রমাণ করে যে, আগামী দিনে যেকোনো বৈশ্বিক বিপর্যয়ে ভারত আর অসহায় হয়ে বসে থাকবে না। শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষকে তেলের দামের হঠাৎ আঘাত থেকে বাঁচাতে এই মজুত ভাণ্ডারগুলোই আগামী দিনে ভারতের সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে উঠবে।

 

About Author
Avatar

আন্তর্জাতিক খবরের সর্বশেষ আপডেট, গভীর বিশ্লেষণ এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ঘটনাবলীর বিস্তারিত প্রতিবেদন পেতে আমাদের International Desk-এ আসুন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, রাজনৈতিক গতিবিধি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে জানতে এই পাতাটি আপনার একমাত্র গন্তব্য।