আমাদের শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে হাইপোনাট্রেমিয়া (Hyponatremia) বলা হয়, এটি একটি গুরুতর এবং সম্ভাব্য জীবন-হুমকির পরিস্থিতি। এটি তখন ঘটে যখন আপনার রক্তের প্রতি লিটারে সোডিয়ামের ঘনত্ব ১৩৫ মিলিমোল (mmol/L)-এর নিচে নেমে যায়, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত ১৩৫ থেকে ১৪৫ mmol/L-এর মধ্যে থাকে। অনেকেই ভাবেন এটি কেবল কম লবণ খাওয়ার ফল, কিন্তু আদতে এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরে অতিরিক্ত জল জমে সোডিয়াম পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণগুলি, যেমন – বমি ভাব, মাথাব্যথা বা ক্লান্তি, খুব সাধারণ মনে হতে পারে, তবে সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি মস্তিষ্কের কোষ ফুলিয়ে (Cerebral Edema) খিঁচুনি, কোমা বা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। মায়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic) এবং মারক ম্যানুয়াল (MSD Manuals) এর মতো উচ্চ-কর্তৃত্বসম্পন্ন চিকিৎসা সংস্থাগুলি এই অবস্থাকে সবচেয়ে সাধারণ ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হিসাবে চিহ্নিত করেছে, বিশেষ করে বয়স্ক এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে।
হাইপোনাট্রেমিয়া: একটি নীরব ঘাতক
সোডিয়ামকে আমরা সাধারণত ‘লবণ’ হিসেবেই চিনি এবং উচ্চ রক্তচাপের ভয়ে একে এড়িয়ে চলতে চাই। কিন্তু এই সোডিয়াম আমাদের শরীরের জন্য একটি অপরিহার্য খনিজ বা ইলেক্ট্রোলাইট। এটি শুধু শরীরের জলের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, বরং পেশী সংকোচন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও এর ভূমিকা অপরিসীম।
যখন রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, তখন হাইপোনাট্রেমিয়া দেখা দেয়। এই অবস্থাটি প্রায়শই “জল বিষক্রিয়া” (Water Intoxication) বা অতিরিক্ত জল পানের সাথে সম্পর্কিত। শরীরের কোষের ভিতরে এবং বাইরের জলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য সোডিয়াম একটি চুম্বকের মতো কাজ করে। যখন রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যায় (অর্থাৎ রক্ত পাতলা হয়ে যায়), তখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। অতিরিক্ত জল কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে শুরু করে, যার ফলে কোষগুলি ফুলতে শুরু করে। শরীরের অন্যান্য কোষ এই ফোলা কিছুটা সামাল দিতে পারলেও, মস্তিষ্কের কোষগুলি তা পারে না, কারণ মাথার খুলি একটি শক্ত আবরণ। ফলে মস্তিষ্কের কোষ ফুলতে শুরু করলে (যাকে সেরিব্রাল এডিমা বা Cerebral Edema বলা হয়), তা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা জল খেলে হতে পারে মারাত্মক – বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন
হাইপোনাট্রেমিয়া কতটা সাধারণ?
হাইপোনাট্রেমিয়া হলো হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত ইলেক্ট্রোলাইট ডিসঅর্ডার।
- পরিসংখ্যান বলছে: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত হাইপোনাট্রেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
- সাম্প্রতিক গবেষণা (২০২৪): অ্যানালস অফ সৌদি মেডিসিন (Annals of Saudi Medicine)-এ প্রকাশিত একটি ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫১.২% এর ভর্তির সময় হাইপোনাট্রেমিয়া ছিল এবং হাসপাতালে থাকাকালীন এই সংখ্যা বেড়ে ৭৬.৩৫% এ দাঁড়িয়েছে। এই গবেষণাটি হাইপোনাট্রেমিয়ার সাথে হাসপাতালে বেশি দিন থাকা, ৯০-দিনের মধ্যে পুনরায় ভর্তি এবং উচ্চ মৃত্যুহারের মতো খারাপ পরিণতির সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে।
- আইসিইউ (ICU) পরিসংখ্যান: আরেকটি ২০২৪ সালের গবেষণায় (যা রিসার্চগেট-এ প্রকাশিত) দেখা গেছে, আইসিইউ-তে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৪১.৪১% হাইপোনাট্রেমিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন, যা এই অবস্থার তীব্রতা এবং ব্যাপকতা তুলে ধরে।
লো সোডিয়ামের লক্ষণ: কখন সতর্ক হবেন?
হাইপোনাট্রেমিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলি খুবই সাধারণ। এই লক্ষণগুলি কত দ্রুত সোডিয়ামের মাত্রা কমেছে তার উপর নির্ভর করে।
১. তীব্র হাইপোনাট্রেমিয়া (Acute Hyponatremia)
যখন সোডিয়ামের মাত্রা ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হঠাৎ করে কমে যায়, তখন তাকে অ্যাকিউট বা তীব্র হাইপোনাট্রেমিয়া বলে। এটি একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি। এর লক্ষণগুলি মারাত্মক হয় কারণ মস্তিষ্ক এই আকস্মিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় পায় না।
গুরুতর এবং জীবন-হুমকির লক্ষণ:
- তীব্র মাথাব্যথা: সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র।
- বিভ্রান্তি এবং অস্থিরতা: হঠাৎ করে স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে বোধ হারিয়ে ফেলা।
- বমি বমি ভাব এবং তীব্র বমি: ক্রমাগত বমি হওয়া।
- তন্দ্রাচ্ছন্নতা: অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া বা জাগিয়ে রাখতে অসুবিধা হওয়া।
- পেশীর খিঁচুনি (Seizures): পুরো শরীর কাঁপুনি দিয়ে জ্ঞান হারানো।
- কোমা (Coma): সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়া।
মেডলাইনপ্লাস (MedlinePlus) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন, কারণ এটি দ্রুত সেরিব্রাল এডিমা এবং ব্রেইন হার্নিয়েশনের (Brain Herniation) দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা মৃত্যুর কারণ হয়।
২. দীর্ঘস্থায়ী হাইপোনাট্রেমিয়া (Chronic Hyponatremia)
যখন সোডিয়ামের মাত্রা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে কমে, তখন তাকে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হাইপোনাট্রেমিয়া বলে। এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক কিছুটা খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় পায়, তাই লক্ষণগুলি তুলনামূলকভাবে কম তীব্র হয়, তবে তা কম বিপজ্জনক নয়।
মৃদু থেকে মাঝারি লক্ষণ:
- বমি বমি ভাব (Nausea): এটি প্রায়শই প্রথম লক্ষণগুলির মধ্যে একটি।
- সাধারণ ক্লান্তি এবং শক্তির অভাব: কোনো কাজ ছাড়াই দুর্বল লাগা।
- মাথাব্যথা: একটি ভোঁতা, ধ্রুবক মাথাব্যথা।
- পেশী দুর্বলতা, খিঁচুনি বা ক্র্যাম্প: বিশেষ করে পায়ে বা কাঁধে টান ধরা।
- মনোযোগের অভাব: কাজে বা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে না পারা।
- খিটখিটে মেজাজ: অকারণে রেগে যাওয়া বা বিরক্তিবোধ করা।
শুরু করুন স্বাস্থ্যকর দিন: ৭টি Daily Morning Drinks যা কিডনি ও লিভারকে ডিটক্স করে
দীর্ঘস্থায়ী লো সোডিয়ামের লুকানো বিপদ
অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী হাইপোনাট্রেমিয়ার এই মৃদু লক্ষণগুলিকে বার্ধক্যজনিত সমস্যা বা কাজের চাপ বলে উপেক্ষা করেন। কিন্তু এর পরিণতিও মারাত্মক হতে পারে।
- সাম্যাবস্থা হারানো এবং পড়ে যাওয়া: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক (Cleveland Clinic) এর মতে, বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মৃদু দীর্ঘস্থায়ী হাইপোনাট্রেমিয়া হাঁটার সময় ভারসাম্যহীনতা (Gait disturbance) এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে। একটি সামান্য পতন থেকেই বয়স্কদের হাড় ভাঙতে পারে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
- অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis): এটি একটি আশ্চর্যজনক কিন্তু প্রমাণিত সত্য। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কম থাকলে তা হাড়ের ঘনত্ব কমিয়ে দেয় এবং অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পর্যালোচিত গবেষণায় দেখা গেছে, মৃদু হাইপোনাট্রেমিয়া আছে এমন ব্যক্তিদের অস্টিওপোরোসিস হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিক সোডিয়ামযুক্ত ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
হাইপোনাট্রেমিয়ার মূল কারণ: কেন সোডিয়াম কমে যায়?
লো সোডিয়ামের কারণ প্রায়শই জটিল এবং এটি কেবল “কম লবণ খাওয়া” নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি শরীরের জল এবং সোডিয়ামের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঘটে। কারণগুলিকে মূলত তিনটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
১. ইউভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (Euvolemic Hyponatremia)
এই অবস্থায় শরীরে সোডিয়ামের মোট পরিমাণ ঠিক থাকে, কিন্তু জলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সোডিয়াম পাতলা হয়ে যায়।
- SIADH (Syndrome of Inappropriate Antidiuretic Hormone): এটি অন্যতম প্রধান কারণ। এই রোগে, অ্যান্টিডিউরেটিক হরমোন (ADH) নামক একটি হরমোন অতিরিক্ত নিঃসৃত হয়, যা কিডনিকে জল ধরে রাখতে বাধ্য করে। ফলে শরীর থেকে জল বের হতে পারে না এবং রক্ত পাতলা হয়ে সোডিয়াম কমে যায়। বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে, যেমন – ফুসফুসের সংক্রমণ (নিউমোনিয়া), নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সার বা মস্তিষ্কের রোগ।
- অতিরিক্ত জল পান (Psychogenic Polydipsia): কিছু মানসিক রোগের কারণে বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অতিরিক্ত জল পান করলে (যেমন দিনে ৮-১০ লিটার) কিডনির পক্ষে সেই অতিরিক্ত জল দ্রুত বের করা সম্ভব হয় না।
- ‘বিয়ার পোটোমেনিয়া’ (Beer Potomania): যারা দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত বিয়ার পান করেন এবং খুব কম সুষম খাবার (বিশেষত প্রোটিন) খান, তাদের এই অবস্থা হতে পারে। বিয়ারে জল বেশি এবং সোডিয়াম কম থাকে, ফলে শরীরে সোডিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়।
- কিছু ওষুধ: নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (SSRI) বা ব্যথানাশক ওষুধ SIADH-এর মতো প্রভাব ফেলে হাইপোনাট্রেমিয়া করতে পারে।
২. হাইপারভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (Hypervolemic Hyponatremia)
এই অবস্থায়, শরীরে সোডিয়াম এবং জল উভয়ই অতিরিক্ত পরিমাণে থাকে, কিন্তু জলের পরিমাণ সোডিয়ামের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরে জল জমে এবং পা ফুলে যায় (Edema)।
- কনজেসটিভ হার্ট ফেইলিওর (Congestive Heart Failure): হার্ট যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এটি কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। ফলে কিডনিতে রক্ত প্রবাহ কমে যায় এবং শরীর জল ও সোডিয়াম ধরে রাখতে শুরু করে।
- লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis): লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটি অ্যালবুমিন নামক প্রোটিন তৈরি করতে পারে না এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে শরীরে, বিশেষ করে পেটে জল জমে (Ascites) এবং রক্তে সোডিয়াম কমে যায়।
- কিডনি ফেইলিওর (Kidney Failure): কিডনি যখন শরীর থেকে বর্জ্য এবং অতিরিক্ত জল ফিল্টার করতে ব্যর্থ হয়, তখন হাইপারভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া দেখা দিতে পারে।
৩. হাইপোভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (Hypovolemic Hyponatremia)
এই অবস্থায়, শরীর থেকে জল এবং সোডিয়াম উভয়ই হারিয়ে যায়, তবে সোডিয়ামের ঘাটতি জলের চেয়ে বেশি হয়।
- গুরুতর বমি বা ডায়রিয়া: এর মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল এবং ইলেক্ট্রোলাইট (সোডিয়াম সহ) বেরিয়ে যায়।
- অতিরিক্ত ঘাম: ম্যারাথন দৌড়বিদ বা তীব্র গরমে কাজ করা শ্রমিকদের মতো যারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর ঘামেন এবং সেই ঘাটতি পূরণের জন্য কেবল সাধারণ জল পান করেন (ইলেক্ট্রোলাইট-যুক্ত পানীয় নয়), তাদের এই ঝুঁকি থাকে।
- কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধ (Diuretics): বিশেষ করে থায়াজাইড ডায়ুরেটিকস (Thiazide diuretics), যা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, তা কিডনিকে সোডিয়াম ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হাইপোনাট্রেমিয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ।
- অ্যাডিসন ডিজিজ (Addison’s Disease): এটি একটি বিরল রোগ যেখানে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না, যা শরীরের সোডিয়াম এবং পটাসিয়ামের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ঝুঁকির মধ্যে কারা আছেন? একটি সারণি
| ঝুঁকির কারণ | কেন তারা ঝুঁকিপূর্ণ |
| বয়স্ক ব্যক্তি | বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়, হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তারা প্রায়শই একাধিক ওষুধ (বিশেষ করে ডায়ুরেটিকস) গ্রহণ করেন যা হাইপোনাট্রেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। |
| কিছু ওষুধ সেবনকারী | থায়াজাইড ডায়ুরেটিকস, এসএসআরআই (কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট), কার্বামাজেপিন (খিঁচুনির ওষুধ) এবং কিছু ব্যথানাশক ওষুধ। |
| দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত | হার্ট ফেইলিওর, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস এবং হাইপোথাইরয়েডিজম। |
| তীব্র ব্যায়ামকারী | ম্যারাথন, ট্রায়াথলন বা আল্ট্রা-ম্যারাথন দৌড়বিদরা, যারা প্রচুর ঘামেন এবং শুধুমাত্র জল পান করেন। |
| অতিরিক্ত মদ্যপানকারী | বিশেষ করে যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন না (বিয়ার পোটোমেনিয়া)। |
| MDMA (Ecstasy) ব্যবহারকারী | এই মাদকটি ADH হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণা তৈরি করে, যা হাইপোনাট্রেমিয়ার একটি মারাত্মক কারণ হতে পারে। |
রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা: একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য
হাইপোনাট্রেমিয়ার চিকিৎসা এর কারণ, তীব্রতা এবং সময়কালের উপর নির্ভর করে। ভুল চিকিৎসা বা খুব দ্রুত চিকিৎসা করাও বিপজ্জনক হতে পারে।
রোগ নির্ণয়
চিকিৎসকরা সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে হাইপোনাট্রেমিয়া এবং এর কারণ নির্ণয় করেন:
- রক্ত পরীক্ষা (Comprehensive Metabolic Panel): এটি রক্তে সোডিয়ামের সঠিক মাত্রা দেখায়।
- ইউরিন টেস্ট (Urine Tests): প্রস্রাবে সোডিয়াম এবং অসমোল্যালিটি (ঘনত্ব) পরিমাপ করে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন যে শরীর কি অতিরিক্ত জল ধরে রাখছে (যেমন SIADH-এ), নাকি সোডিয়াম বের করে দিচ্ছে (যেমন ডায়ুরেটিকস ব্যবহারে)।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা নিরাপদে বৃদ্ধি করা এবং অন্তর্নিহিত কারণটির সমাধান করা।
- জল সীমাবদ্ধতা (Fluid Restriction): যদি অতিরিক্ত জলের কারণে (যেমন SIADH বা হার্ট ফেইলিওর) হাইপোনাট্রেমিয়া হয়, তবে চিকিৎসকরা প্রতিদিনের জল পানের পরিমাণ সীমাবদ্ধ করার পরামর্শ দেন (যেমন দিনে ১ থেকে ১.৫ লিটারের কম)।
- ওষুধ সামঞ্জস্য করা: যদি কোনো ওষুধের কারণে এটি হয়, তবে ডাক্তার সেই ওষুধ বন্ধ করতে পারেন বা পরিবর্তন করতে পারেন।
- ইন্ট্রাভেনাস (IV) ফ্লুইড:
- আইসোটোনিক স্যালাইন (Isotonic Saline): যদি বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে সোডিয়াম এবং জল উভয়ই কমে যায় (Hypovolemic), তবে শিরায় সাধারণ স্যালাইন (0.9% Saline) দেওয়া হয়।
- হাইপারটোনিক স্যালাইন (Hypertonic Saline): এটি একটি উচ্চ-ঘনত্বের লবণ দ্রবণ (যেমন 3% Saline)। এটি কেবল তীব্র এবং গুরুতর লক্ষণযুক্ত (যেমন খিঁচুনি বা কোমা) রোগীদের জন্য হাসপাতালের আইসিইউ-তে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা হয়। এটি দ্রুত সোডিয়ামের মাত্রা সামান্য বাড়িয়ে মস্তিষ্কের ফোলা কমাতে সাহায্য করে।
চিকিৎসার মারাত্মক ঝুঁকি: ODS (Osmotic Demyelination Syndrome)
হাইপোনাট্রেমিয়ার চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সোডিয়ামের মাত্রা খুব দ্রুত বৃদ্ধি না করা। যদি দীর্ঘস্থায়ী হাইপোনাট্রেমিয়ার রোগীকে খুব দ্রুত স্যালাইন দিয়ে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ানো হয়, তবে এটি অসমোটিক ডিমাইলিনেশন সিন্ড্রোম (ODS) বা সেন্ট্রাল পন্টাইন মায়েলিনোলাইসিস (CPM) নামক একটি বিধ্বংসী এবং অপরিবর্তনীয় (irreversible) স্নায়বিক রোগের কারণ হতে পারে।
এই অবস্থায়, মস্তিষ্কের কোষগুলি (বিশেষ করে ব্রেইনস্টেমের পনস অঞ্চলে) থেকে প্রতিরক্ষামূলক মায়েলিন আবরণ খসে পড়ে। এর ফলে কথা বলায় অসুবিধা, গিলতে না পারা, পক্ষাঘাত বা এমনকি “লকড-ইন সিন্ড্রোম” (যেখানে রোগী সচেতন কিন্তু কথা বলতে বা নড়াচড়া করতে পারে না) দেখা দিতে পারে।
এই কারণেই, আমেরিকান ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান (AAFP) এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, সোডিয়ামের মাত্রা প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৮ থেকে ১০ mmol/L এর বেশি বাড়ানো উচিত নয়।
প্রতিরোধ: ঝুঁকি কমানোর উপায়
সম্পূর্ণরূপে হাইপোনাট্রেমিয়া প্রতিরোধ করা কঠিন, বিশেষ করে যদি আপনার কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকে। তবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে:
১. সচেতনভাবে জল পান করুন: আপনার তৃষ্ণা পেলেই জল পান করুন। অকারণে অতিরিক্ত জল পান করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার যদি কিডনি বা হার্টের সমস্যা থাকে, তবে দিনে কতটুকু জল পান করা নিরাপদ তা আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন।
২. তীব্র ব্যায়ামের সময় সতর্ক থাকুন: আপনি যদি ম্যারাথন বা দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র ব্যায়াম করেন, তবে সাধারণ জলের পরিবর্তে ইলেক্ট্রোলাইট-যুক্ত স্পোর্টস ড্রিংকস পান করুন, যা আপনার ঘামের সাথে হারিয়ে যাওয়া সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করবে।
৩. আপনার ওষুধ সম্পর্কে জানুন: আপনি যদি ডায়ুরেটিকস, এসএসআরআই বা অন্য কোনো ওষুধ খান যা হাইপোনাট্রেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, তবে এর লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করান।
৪. অন্তর্নিহিত রোগের চিকিৎসা: হার্ট, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকলে তার সঠিক চিকিৎসা করান এবং ডাক্তারের নির্দেশাবলী কঠোরভাবে মেনে চলুন।
শেষ কথা
লো সোডিয়াম বা হাইপোনাট্রেমিয়া একটি জটিল শারীরিক অবস্থা যা প্রায়শই ভুল বোঝা হয়। এটি কেবল ‘লবণ কম’ খাওয়ার মতো সহজ বিষয় নয়, বরং এটি শরীরের জল-লবণের ভারসাম্যের একটি গুরুতর ব্যাঘাত। ক্লান্তি, বমি ভাব বা মাথাব্যথার মতো সাধারণ লক্ষণগুলিকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়, বিশেষ করে যদি আপনি বয়স্ক হন, কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগেন বা নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ খান। যদি আপনার বা আপনার প্রিয়জনের মধ্যে বিভ্রান্তি, তীব্র মাথাব্যথা বা খিঁচুনির মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই একটি জীবন বাঁচাতে পারে।











