পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার লেখা ওই চিঠিতে তিনি SIR আপাতত স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছেন। মমতার অভিযোগ, পরিকল্পনাহীনভাবে এবং জোর খাটিয়ে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, যার ফলে বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের ওপর অমানবিক চাপ পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “চলমান SIR প্রক্রিয়া বন্ধ করুন। কারও ওপর জবরদস্তি বন্ধ করুন। যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সহায়তা দিন।”
এই চিঠি আসার একদিন আগে জলপাইগুড়ির মাল এলাকায় এক মহিলা BLO শান্তিমুনি এক্কা SIR-এর কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। মমতা দাবি করেছেন, SIR শুরু হওয়ার পর থেকে রাজ্যে এমন মৃত্যুর সংখ্যা ২৮-এ পৌঁছেছে। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, আগে যে সংশোধন প্রক্রিয়া তিন বছর সময় নিত, তা এখন মাত্র তিন মাসে শেষ করার চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে BLO-রা অসহনীয় পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন এবং ভুল তথ্য আপলোডের ঝুঁকি বাড়ছে।
SIR-এ আপনার নাম কি বাদ পড়বে? নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট সতর্কতা – ভোটার অধিকার হারাবেন না!
পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া গত ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। এটি ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের একটি বিশেষ উদ্যোগ, যাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিলি, সংগ্রহ এবং ডিজিটাল আপলোড করতে হয় BLO-দের। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সমস্ত তথ্য আপলোড করতে হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়ে, পরিকাঠামো না গড়ে এবং কৃষিকাজের ব্যস্ত মরশুমে এই কাজ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে BLO-রা শো-কজ নোটিসের ভয়ে ভুল তথ্য জমা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা প্রকৃত ভোটারদের অধিকার কেড়ে নিতে পারে।
SIR নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক তরজা নতুন নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এটি বিজেপির নির্দেশে ‘ভোট লুঠের’ একটা চক্রান্ত। মমতা আগেও বলেছেন, SIR-এর আড়ালে NRC চালানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং বাংলা-ভাষীদের টার্গেট করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল বিজেপি দাবি করছে, SIR-এর ফলে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ পড়বে এবং তালিকা পরিষ্কার হবে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, মমতা এই ইস্যুতে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন কারণ তাঁর দলের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ ঝুঁকিতে পড়বে।
SIR ফর্ম হাতে পেয়েছেন? জমা না দিলে ভোটাধিকার চলে যেতে পারে – জানুন সবকিছু বিস্তারিত!
চিঠিতে মমতা আরও লিখেছেন, “এই সংকটময় সময়ে নির্বাচন কমিশনের আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।” তিনি কমিশনের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ, সময় বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে জানানো হয়েছে, কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তবে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে SIR একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। তৃণমূল ইতিমধ্যে ‘বাংলার ভোট রক্ষা’ অভিযান শুরু করেছে এবং ভোটারদের সাহায্য কেন্দ্র খুলেছে। বিজেপি বলছে, এটি নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য জরুরি পদক্ষেপ। SIR-এর ফলাফল কী হবে এবং কমিশন মমতার আবেদন মান্য করবে কি না, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। এই প্রক্রিয়া না থামলে ভোটার তালিকায় বড়সড় পরিবর্তন হতে পারে, যা আগামী নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।











