শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন বসন্তের সাজে সজ্জিত হয়, তখন প্রতিটি আম বাগানে চোখ জুড়ানো মুকুলের সমারোহ দেখা যায়। আমের মুকুলের এই মিষ্টি সুবাস শুধু মনকেই আনন্দিত করে না, বরং কৃষকের চোখে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্নও বুনে দেয়। কিন্তু আমের মুকুল আসার পর থেকে যা করতে হবে, সেই সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে এই স্বপ্ন খুব দ্রুতই হতাশায় পরিণত হতে পারে। প্রথম অনুচ্ছেদেই বলে রাখা ভালো, মুকুল আসা মানেই গাছে প্রচুর আম ধরা নয়; বরং মুকুল আসার পর থেকে গুটি বাঁধা এবং আম পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর তথ্যমতে, মুকুল আসার পর সঠিক সেচ, পরিমিত সার ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো বালাইনাশক প্রয়োগের অভাবে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মুকুল ও আমের গুটি ঝরে পড়তে পারে। তাই একটি পরিষ্কার ও বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশিকা অনুসরণ করা প্রত্যেক আমচাষি ও ছাদবাগানির জন্য অপরিহার্য। এই আর্টিকেলে আমরা নির্ভরযোগ্য এবং যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আমের মুকুল আসার পর থেকে ফলন ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনার বাগানের ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
আমের মুকুল আসার পর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও বাগান পরিচ্ছন্নতা
আমের মুকুল আসার পর বাগানের সামগ্রিক পরিবেশ কেমন আছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মুকুল বের হওয়ার সাথে সাথেই গাছে সরাসরি কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করার আগে বাগানের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। গাছের নিচে পড়ে থাকা মরা পাতা, আগাছা এবং ভাঙা ডালপালা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। এগুলো বাগানে থাকলে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ছত্রাকের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিচ্ছন্ন বাগান রোগবালাইয়ের আক্রমণ প্রাকৃতিকভাবেই ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। গাছের যেসব ডালপালা মরে গেছে বা আগে থেকেই রোগাক্রান্ত, সেগুলো সাবধানে ছেঁটে ফেলতে হবে। ছাঁটাই করা অংশে বর্দোপেস্ট (Bordeaux paste) বা যেকোনো ভালো মানের ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিতে হবে, যাতে কাটা অংশ দিয়ে নতুন করে কোনো জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে। এ ছাড়া, বাগানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত ঘন ডালপালা থাকলে তা মুকুল আসার আগেই হালকা করে দেওয়া উচিত, তবে মুকুল আসার পর খুব বেশি ডালপালা ছাঁটাই করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমের মুকুল ও গুটি ঝরে পড়ার প্রাকৃতিক কারণ
আমের ভালো ফলন পেতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কেন মুকুল বা গুটি ঝরে পড়ে। এটি একটি সাধারণ সমস্যা, তবে এর পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে।
আবহাওয়া ও জলবায়ুগত প্রভাব
আমের মুকুলের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো প্রতিকূল আবহাওয়া। মুকুল আসার পর যদি অতিরিক্ত কুয়াশা পড়ে, তবে মুকুল ভিজে যায় এবং সেখানে পাউডারি মিলডিউ নামক ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে। আবার, হঠাৎ করে ভারী বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি বা কালবৈশাখী ঝড়ও মুকুল ও কচি গুটি ঝরিয়ে দেয়। দিনের বেলায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং রাতে তীব্র শীত—এই ধরনের তাপমাত্রার ওঠানামাও মুকুলের জন্য ক্ষতিকর।
মাটিতে রসের অভাব বা সেচ বিভ্রাট
গাছে যখন ফুল থেকে ফল তৈরির প্রক্রিয়া চলে, তখন প্রচুর পরিমাণে শক্তির প্রয়োজন হয়। এই সময়ে মাটিতে যদি পর্যাপ্ত রস বা আর্দ্রতা না থাকে, তবে গাছ তার মুকুল ও কচি গুটি টিকিয়ে রাখতে পারে না। পানির অভাবে গাছের কোষে পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত হয়, ফলে গুটি হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে।
রোগ ও ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ
আমের মুকুল ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘হপার’ বা শোষক পোকা এবং ‘অ্যানথ্রাকনোজ’ নামক ছত্রাকের আক্রমণ। হপার পোকা মুকুলের রস শুষে খায়, যার ফলে মুকুল শুকিয়ে কালো হয়ে ঝরে যায়। অন্যদিকে, অ্যানথ্রাকনোজ ছত্রাকের কারণে মুকুলে কালো কালো দাগ পড়ে এবং ধীরে ধীরে পুরো মুকুল পচে যায়।
পুষ্টি উপাদান ও হরমোনের ঘাটতি
মাটিতে যদি নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামের পাশাপাশি জিংক ও বোরন এর মতো মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা অণুপুষ্টির অভাব থাকে, তবে মুকুল টিকতে পারে না। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে গাছে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলেও প্রচুর পরিমাণে আমের গুটি ঝরে যায়।
সেচ ব্যবস্থাপনা: আমের মুকুল টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি
আমের মুকুল আসার পর থেকে যা করতে হবে, তার মধ্যে সেচ ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। কখন পানি দেবেন এবং কখন দেবেন না—এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিতে হবে।
মুকুল যখন সবেমাত্র বের হচ্ছে বা ফুল ফুটতে শুরু করেছে, তখন গাছে কোনোভাবেই সেচ দেওয়া যাবে না। ফুল ফোটা অবস্থায় সেচ দিলে গাছের ভেজিটেটিভ গ্রোথ বা অঙ্গজ বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়, যার ফলে মুকুল ঝরে গিয়ে নতুন পাতা গজানোর প্রবণতা দেখা দেয়।
কখন সেচ দেবেন? যখন আমের গুটি মটরদানার মতো আকার ধারণ করবে, ঠিক তখন গাছের গোড়ায় প্রথম সেচ দিতে হবে। মটরদানা আকৃতি হওয়ার পর গাছের প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ দেওয়ার পর বৃষ্টিপাত না হলে মাটির ধরন অনুযায়ী প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর অন্তর সেচ দিতে হবে। এই সেচ প্রক্রিয়া আম মার্বেল আকার ধারণ করা পর্যন্ত এবং ফল বড় হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। সেচ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে। নালা বা রিং পদ্ধতিতে গাছের ক্যানোপি বা ডালপালার বিস্তৃতি বরাবর সেচ দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
সুষম সার ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
আমের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে সুষম সার প্রয়োগের বিকল্প নেই। তবে মুকুল আসার ঠিক পরপরই রাসায়নিক সার মাটিতে প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সার প্রয়োগের মূল কাজটি করতে হয় মুকুল আসার আগে এবং ফল মার্বেল আকৃতির হওয়ার পর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবার (BAMIS) সুপারিশ অনুযায়ী একটি পূর্ণবয়স্ক (১০-১৫ বছরের বেশি বয়সী) ফলন্ত আম গাছে বছরে যে পরিমাণ সার দেওয়া প্রয়োজন, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
মুকুল ও গুটি রক্ষায় ফলিয়ার স্প্রে (পাতায় প্রয়োগ)
মাটিতে সার দেওয়ার পাশাপাশি মুকুল ও গুটি রক্ষায় সরাসরি পাতায় বা গুটিতে কিছু পুষ্টি উপাদান স্প্রে করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
-
বোরনের ব্যবহার: আম গাছে মুকুল আসার পর এবং গুটি মটরদানার মতো হলে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৬ গ্রাম বোরিক এসিড মিশিয়ে স্প্রে করলে গুটি ঝরা অনেকাংশে কমে যায়। বোরন পরাগায়নে সাহায্য করে এবং ফলের আকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
-
ইউরিয়া স্প্রে: আমের গুটি যখন মার্বেলের মতো আকার ধারণ করে, তখন প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে স্প্রে করলে ফলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং ঝরে পড়া রোধ হয়।
-
গবেষণা তথ্য: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (KGF) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২% ইউরিয়া সল্যুশনের সাথে ২,৪-ডি (2,4-D) হরমোন স্প্রে করলে আমের ফলন ও গুণগত মান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন ও কীটনাশক প্রয়োগ
আমের মুকুল আসার পর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো পোকামাকড়ের আক্রমণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে আমের হপার বা শোষক পোকা।
আমের হপার বা শোষক পোকা দমন
হপার পোকাকে আমের প্রধান শত্রু বলা হয়। এরা মুকুলের কচি অংশ থেকে রস শুষে খায়। রস শোষণের পাশাপাশি এরা একধরনের আঠালো ও মিষ্টি রস (হানিডিউ) নিঃসরণ করে। এই মিষ্টি রসে আকৃষ্ট হয়ে পিঁপড়া আসে এবং সেখানে ‘সুটি মোল্ড’ (Sooty mold) নামক একধরনের কালো ছত্রাক জন্মায়। এর ফলে পুরো মুকুল কালো হয়ে যায় এবং সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে মুকুল ঝরে পড়ে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর তথ্যমতে, হপার পোকা দমনের জন্য সঠিক সময়ে মাত্র দুটি স্প্রে-ই যথেষ্ট, যা পোকার আক্রমণ ১০০% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে।
-
প্রথম স্প্রে: আমের মুকুল যখন ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয় (ফুল ফোটার আগে)।
-
দ্বিতীয় স্প্রে: যখন আমের গুটি মটরদানার মতো আকার ধারণ করে।
কীটনাশক হিসেবে সাইপারমেথ্রিন (Cypermethrin) গ্রুপের ওষুধ (যেমন- রিপকর্ড, সিমবুশ বা ফেনম ১০ ইসি) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি হারে মিশিয়ে পুরো গাছে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া ইমিডাক্লোরোপ্রিড (Imidacloprid) গ্রুপের কীটনাশকও হপার পোকা দমনে অত্যন্ত কার্যকর।
আমের ফল ছিদ্রকারী পোকা ও ফলের মাছি পোকা
আম যখন একটু বড় হয়, তখন মাছি পোকা (Fruit fly) আমের গায়ে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে লার্ভা বা কীড়া বের হয়ে আমের ভেতরটা খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। এই পোকা দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের চেয়ে ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদ’ এবং ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ প্রযুক্তি বেশি নিরাপদ ও কার্যকর।
রোগবালাই দমন ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার নিয়ম
পোকামাকড়ের পাশাপাশি আমের মুকুল বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগের শিকার হয়। এর মধ্যে পাউডারি মিলডিউ এবং অ্যানথ্রাকনোজ প্রধান।
অ্যানথ্রাকনোজ রোগ (Anthracnose)
অ্যানথ্রাকনোজ একটি ভয়ংকর ছত্রাকজনিত রোগ। এই রোগের আক্রমণে মুকুলে, কচি পাতায় এবং আমের গায়ে গাঢ় বাদামি বা কালো রঙের দাগ পড়ে। একপর্যায়ে পুরো মুকুল পচে যায়।
-
প্রতিকার: এই রোগ দমনের জন্য ম্যানকোজেব (Mancozeb) জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন- ডায়থেন এম-৪৫, ইন্ডোফিল এম-৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। মুকুল আসার পর এবং গুটি মটরদানা হলে কীটনাশকের সাথেই এই ছত্রাকনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা যায়।
পাউডারি মিলডিউ (Powdery Mildew)
মাঘ-ফাল্গুন মাসে যখন মুকুল আসে, তখন যদি কুয়াশা থাকে তবে পাউডারি মিলডিউ রোগের প্রকোপ বাড়ে। এই রোগে মুকুলের ওপর সাদা পাউডারের মতো আবরণ পড়ে এবং মুকুল নষ্ট হয়ে যায়।
-
প্রতিকার: এই রোগ দেখা দিলে সালফার বা গন্ধক জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন- কুমুলাস ডিএফ, থিওভিট) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
বালাইনাশক স্প্রে করার আদর্শ সময়সূচি ও সতর্কতা
আমের মুকুল আসার পর থেকে যা করতে হবে, তার মধ্যে স্প্রে করার সঠিক সময় নির্বাচন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সময়ে স্প্রে করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
-
ফুল ফোটা অবস্থায় স্প্রে সম্পূর্ণ নিষেধ: গাছে যখন মুকুল ফুটে ফুল হয়ে যায় (অর্থাৎ ৫০% এর বেশি ফুল ফুটে যায়), তখন কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রকার রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করা যাবে না। এই সময়ে বাগানে প্রচুর মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য উপকারী পোকা আসে, যারা পরাগায়নে (Pollination) সাহায্য করে। স্প্রে করলে এই উপকারী পোকাগুলো মারা যাবে, পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
-
স্প্রে করার উপযুক্ত সময়: যেকোনো বালাইনাশক স্প্রে করার সেরা সময় হলো পড়ন্ত বিকেল বা শেষ বিকেল। কড়া রোদে বা সকালে স্প্রে করলে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং কচি মুকুল রোদে পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
-
নিয়ম মেনে স্প্রে করা: ওষুধ স্প্রে করার সময় পাতার ওপর ও নিচ, মুকুল এবং গাছের ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
ভালো ফলন পেতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমান সময়ে আমের ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (KGF) একটি সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা (Integrated Crop Management – ICM) গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক মাত্রায় সার-সেচ ব্যবহারের ফলে আমের গুটি ঝরে পড়া গড়ে ৯.২% কমে যায় এবং ফলন প্রায় ৩১.৩% বৃদ্ধি পায়।
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি (Fruit Bagging)
আম যখন মার্বেল থেকে কিছুটা বড় হয় (প্রায় ৪০-৪৫ দিন বয়স), তখন ফ্রুট ব্যাগিং বা আম গাছে থাকা অবস্থাতেই বিশেষ ধরনের কাগজের ব্যাগে আম ঢেকে দেওয়া হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমের মাছি পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়। কেজিএফ (KGF)-এর তথ্যমতে, ব্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৮৮-৯৬ শতাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ ও দাগহীন আম ঘরে তোলা সম্ভব। ব্যাগিং করা আমে কোনো রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ থাকে না, ফলের রং আকর্ষণীয় হয় এবং বাজারে এর দামও অনেক বেশি পাওয়া যায়।
ছাদবাগানে টবের আম গাছের বিশেষ পরিচর্যা
বর্তমানে শহরাঞ্চলে ছাদবাগানে ড্রামে বা টবে বারোমাসি বা অন্যান্য জাতের আম চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। টবের মাটির পরিমাণ সীমিত থাকায় এর পরিচর্যা একটু ভিন্নভাবে করতে হয়: ১. মুকুল আসার পর টবের মাটি একেবারে শুকিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না, আবার কাদা কাদা করেও রাখা যাবে না। মাটি সবসময় হালকা আর্দ্র রাখতে হবে। ২. টবের গাছে মুকুল আসার পর তরল জৈব সার (যেমন- সরিষার খৈল পচা পানি অত্যন্ত হালকা করে) প্রয়োগ করা যেতে পারে, তবে ফুল ফোটা অবস্থায় রাসায়নিক সার এড়িয়ে চলাই ভালো। ৩. টবের গাছে মুকুল টিকিয়ে রাখতে মিরাকুলান বা পিজিআর (Plant Growth Regulator) ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে মুকুল আসার আগে এবং গুটি মটরদানা হলে স্প্রে করা যেতে পারে। ৪. ছাদবাগানে পোকা দমনে রাসায়নিকের পরিবর্তে নিমের তেল (Neem oil) ৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা একটি চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব সমাধান।
পরিশেষে বলা যায়, “আমের মুকুল আসার পর থেকে যা করতে হবে” তা কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন কাজ নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা থেকে শুরু করে সঠিক সময়ে পরিমিত সেচ, সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাই দমন—প্রতিটি পদক্ষেপই একটি সফল আম বাগানের জন্য সমানভাবে অপরিহার্য। কৃষক ভাইদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, মুকুল ফোটা অবস্থায় ক্ষতিকর স্প্রে থেকে বিরত থেকে উপকারী পোকাদের পরাগায়নের সুযোগ দিলেই গাছের সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যেমন- ফ্রুট ব্যাগিং এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) গ্রহণের মাধ্যমে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব, অন্যদিকে বিষমুক্ত ও শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদন করে দেশ ও বিদেশের বাজারে উচ্চমূল্য লাভ করা নিশ্চিত হয়। নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করুন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আমের যত্ন নিন, সফলতা আপনার হাতে ধরা দেবে।
মুকুল আসার পর আম গাছের পরিচর্যা ও স্প্রে করার নিয়ম এই ভিডিওটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কারণ এখানে আমের মুকুল আসার পর ঠিক কতবার এবং কখন স্প্রে করতে হবে, তার সম্পূর্ণ ব্যবহারিক নিয়মাবলি দেখানো হয়েছে যা মুকুল ও গুটি ঝরে পড়া রোধে সরাসরি সাহায্য করবে।











