মিসিং ডে: কেন ও কীভাবে পালন করবেন এই বিশেষ দিনটি?

ফেব্রুয়ারি মাস বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল গোলাপ, চকোলেট আর ভালোবাসার উদ্‌যাপন। ভ্যালেন্টাইনস উইকের এই রোমান্টিক আবহাওয়া শেষ হতেই শুরু হয় আরেক ধরনের উদ্‌যাপন, যার নাম অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক।…

Ishita Ganguly

 

ফেব্রুয়ারি মাস বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল গোলাপ, চকোলেট আর ভালোবাসার উদ্‌যাপন। ভ্যালেন্টাইনস উইকের এই রোমান্টিক আবহাওয়া শেষ হতেই শুরু হয় আরেক ধরনের উদ্‌যাপন, যার নাম অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক। এই অদ্ভুত অথচ বাস্তবমুখী সপ্তাহের অন্যতম আবেগপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিন হলো মিসিং ডে। প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয় । আপনি হয়তো ভাবছেন, কাউকে মিস করা বা মনে করার জন্য আবার আলাদা করে কোনো দিনের প্রয়োজন আছে কি? আধুনিক জীবনের চরম ব্যস্ততা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ভিড়ে আমরা অনেক সময়ই নিজেদের আসল অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে ভুলে যাই। এই দিনটি আমাদের থামতে শেখায় এবং ফেলে আসা স্মৃতিগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে সাহায্য করে।

মিসিং ডে কেবল প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে মনে করার দিন নয়। এটি এমন এক দিন, যেদিন আপনি আপনার দূরে থাকা বন্ধু, পরিবারের সদস্য, কিংবা এমন কাউকে স্মরণ করতে পারেন যিনি আর এই পৃথিবীতে নেই । এই দিনটি আমাদের শেখায় যে, কাউকে মনে করা বা তার শূন্যতা অনুভব করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি মানুষের এক স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবৃত্তি। এই বিস্তৃত গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা জানবো মিসিং ডে কেন পালিত হয়, এর পেছনের স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান কী, সামাজিক প্রেক্ষাপট কীভাবে কাজ করে এবং সর্বোপরি, কীভাবে আপনি দিনটিকে অর্থবহ করে তুলতে পারেন।

মিসিং ডে এবং অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকের ধারণা ও ইতিহাস

ভালোবাসার সপ্তাহ বা ভ্যালেন্টাইনস উইক শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক। এই সপ্তাহটি শেষ হয় ২১ ফেব্রুয়ারি ব্রেকআপ ডে-এর মাধ্যমে । আর ব্রেকআপ ডে-এর ঠিক আগের দিন, ২০ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় মিসিং ডে । এই দিনটি মূলত তাদের জন্য উৎসর্গীকৃত, যারা তাদের জীবনের বিশেষ কোনো মানুষের অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করেন। এটি কোনো হতাশার দিন নয়, বরং অনুভূতির প্রতি সৎ থাকার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকের ক্যালেন্ডার ও তাৎপর্য

অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক কোনোভাবেই ভালোবাসার বিরোধী নয়। বরং এটি বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এই সপ্তাহের প্রতিটি দিনেরই আলাদা মনস্তাত্ত্বিক অর্থ রয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি স্ল্যাপ ডে দিয়ে শুরু হয়ে নেতিবাচকতাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয় । ১৬ ফেব্রুয়ারি কিক ডে-তে জীবনের খারাপ স্মৃতি ও কষ্টকর অতীতকে মন থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়ার রূপক উদ্‌যাপন করা হয় । ১৭ ফেব্রুয়ারি পারফিউম ডে-তে নিজেকে নতুনভাবে সাজানো হয় এবং সেলফ-লাভ বা আত্মপ্রেমের সূচনা হয় । এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারি ফ্লার্ট ডে-তে মানুষ নতুন করে সামাজিকীকরণ শুরু করে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি কনফেশন ডে-তে মনের চাপা কথা প্রকাশ করে । এই ধারাবাহিক মানসিক প্রক্রিয়ার পর ২০ ফেব্রুয়ারি আসে মিসিং ডে, যেখানে মানুষ তার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা শূন্যতাকে স্বীকার করে নেয়

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তার কারণ

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভ্যালেন্টাইনস ডে অনেক সময় এক ধরনের মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করে । যাদের জীবনে এই মুহূর্তে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই, তারা একাকীত্বে ভুগতে পারেন। এই একঘেয়েমি বা চাপ থেকে বেরিয়ে আসতেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়েছে । এটি একটি ‘সফট রিবেলিয়ন’ বা নীরব প্রতিবাদ, যেখানে মানুষ নিখুঁত প্রেমের অভিনয়ের চেয়ে বাস্তব অনুভূতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। জেন-জি (Gen Z) এবং মিলেনিয়ালরা অবাস্তব সম্পর্কের মানদণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করে এই দিনগুলোকে মানসিক মুক্তির উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে

দিন তারিখ মনস্তাত্ত্বিক প্রতীকী অর্থ ও তাৎপর্য
স্ল্যাপ ডে (Slap Day) ১৫ ফেব্রুয়ারি

বিষাক্ত সম্পর্ক, প্রতারণা ও নেতিবাচকতাকে রূপক অর্থে বিদায় জানানো

কিক ডে (Kick Day) ১৬ ফেব্রুয়ারি

জীবনের খারাপ স্মৃতি, পুরনো চ্যাট ও কষ্টকর অতীতকে দূরে সরিয়ে দেওয়া

পারফিউম ডে (Perfume Day) ১৭ ফেব্রুয়ারি

নিজের যত্ন নেওয়া, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং নতুন সূচনার সুবাস ছড়ানো

ফ্লার্ট ডে (Flirt Day) ১৮ ফেব্রুয়ারি

নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও একাকীত্ব দূর করতে হালকা আড্ডা দেওয়া

কনফেশন ডে (Confession Day) ১৯ ফেব্রুয়ারি

মনের চাপা কথা, ভুলত্রুটি বা সত্যকে নির্দ্বিধায় অন্যের কাছে প্রকাশ করা

মিসিং ডে (Missing Day) ২০ ফেব্রুয়ারি

প্রিয়জনের শূন্যতা স্বীকার করে সুন্দর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করা

ব্রেকআপ ডে (Breakup Day) ২১ ফেব্রুয়ারি

অতীতের খারাপ সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া

মিসিং ডে পালনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

আমাদের বর্তমান সমাজে অনেক সময় আবেগ লুকিয়ে রাখাকে শক্তির লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। অনেকেই মনে করেন, কষ্ট পেলে তা প্রকাশ করা দুর্বলতা। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন। তাদের মতে, আবেগ চেপে রাখা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মিসিং ডে পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের অনুভূতির প্রতি সৎ থাকা এবং প্রিয়জনের স্মৃতিকে সম্মান জানানো।

অনুভূতির স্বীকৃতি এবং হিলিং প্রক্রিয়া

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) এবং মায়ো ক্লিনিকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শোক বা বিচ্ছেদের পর অনুভূতিগুলো গ্রহণ করা বা মেনে নেওয়া হিলিং (Healing) বা আরোগ্য প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ । যখন আমরা কাউকে মিস করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক এক ধরনের জটিল মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। আপনি যদি জোর করে সেই শূন্যতার অনুভূতিকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেন, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর কারণ হতে পারে । মিসিং ডে-তে মানুষ নিজের কষ্ট বা একাকীত্বকে খোলা মনে স্বীকার করে, যা মনের ওপর জমে থাকা অদৃশ্য পাথর সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। এই দিনে অনুভূতির স্বীকৃতি দিলে তা ভবিষ্যতের নতুন সম্পর্কগুলোর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর মানসিক ভিত্তি তৈরি করে।

নস্টালজিয়া এবং ডোপামিন রিলিজ

কাউকে মিস করা মানেই এই নয় যে আপনি তার কাছে ফিরে যেতে চান বা আপনি হতাশায় নিমজ্জিত। কখনো কখনো এটি কেবল পুরনো স্মৃতির প্রতি এক ধরনের স্বাভাবিক নস্টালজিয়া । বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই নস্টালজিয়া তাদের জীবনের একাকীত্ব দূর করতে এবং বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে দারুণভাবে সাহায্য করে । গবেষণায় দেখা গেছে, নস্টালজিয়া মানুষের মনে আশাবাদ বাড়ায়, জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সহায়তা করে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে । যখন আমরা সুন্দর অতীত স্মৃতি রোমন্থন করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয় । দূরত্বের কারণে যে সম্পর্কগুলো ফিকে হয়ে গেছে, মিসিং ডে সেগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

পালনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ বৈজ্ঞানিক প্রভাব ও ফলাফল
আবেগের স্বীকৃতি (Emotional Acknowledgment)

অনুভূতিগুলো স্বীকার করলে মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা কমে, যা হিলিং ত্বরান্বিত করে

নস্টালজিয়া বা স্মৃতিচারণ (Nostalgia)

অতীত স্মৃতি রোমন্থন মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ করে যা তাৎক্ষণিক আনন্দ ও প্রশান্তি দেয়

হিলিং বা আরোগ্য লাভ (Healing Process)

বিচ্ছেদের শোক কাটিয়ে ওঠার প্রাথমিক ধাপ হলো শূন্যতা মেনে নেওয়া

সামাজিক সংযোগ (Social Connection)

পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়, যা একাকীত্ব দূর করে

কীভাবে পালন করবেন মিসিং ডে? (বিভিন্ন সম্পর্কের ক্ষেত্রে)

মিসিং ডে পালন করার কোনো নির্দিষ্ট বা ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি কাকে মিস করছেন এবং আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থার ওপর। আপনি চাইলে দিনটি একান্তে কাটাতে পারেন, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে পারেন, অথবা দূরে থাকা প্রিয়জনকে সারপ্রাইজ দিতে পারেন। নিচে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বেশ কয়েকটি অর্থবহ উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

চিঠি লেখা ও এক্সপ্রেসিভ রাইটিং (Expressive Writing)

ডিজিটাল যুগে মেসেজ বা ইমেইলের ভিড়ে হাতে লেখা চিঠির আবেদন আজও অমলিন। আপনি যাকে মিস করছেন, তাকে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠাতে পারেন। চিঠিতে আপনার মনের কথা, সুন্দর স্মৃতি বা তাকে কেন মনে পড়ছে তা বিস্তারিত লিখতে পারেন । যদি চিঠিটি তাকে পাঠানো সম্ভব না হয় (যেমন প্রাক্তন সঙ্গী বা মৃত কোনো প্রিয়জন), তবে মনের কথাগুলো একটি ডায়রিতে লিখে রাখতে পারেন। মনোবিজ্ঞানে একে ‘এক্সপ্রেসিভ রাইটিং’ বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মনের না-বলা কথাগুলো কাগজে লিখে ফেললে তা মানসিক চাপ কমাতে জাদুর মতো কাজ করে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়

মাইন্ডফুলনেস এবং ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করা

যদি আপনি সদ্য কোনো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন এবং একাকীত্ব বোধ করেন, তবে মিসিং ডে-তে মাইন্ডফুলনেস (Mindfulness) চর্চা করতে পারেন। বর্তমান মুহূর্তে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই নিজের অনুভূতিগুলোকে মেঘের মতো ভেসে যেতে দেওয়া মানসিক শান্তি আনে । আরেকটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হলো একটি ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করা। আপনার মনের যত ক্ষোভ, কষ্ট বা না-বলা কথা আছে, তা রেকর্ডারে বলে ফেলুন । এই মেসেজটি কাউকে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। কেবল নিজের ভেতর থেকে কথাগুলো বের করে দেওয়াটাই এখানে মুখ্য বিষয়, যা আপনাকে মানসিকভাবে হালকা করবে।

বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ও রেডিও ডেডিকেশন

লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপে থাকা ব্যক্তিরা এই দিনে তাদের সঙ্গীর জন্য রেডিওতে গান ডেডিকেট করতে পারেন বা ভার্চুয়াল মুভি ডেটের আয়োজন করতে পারেন । অন্যদিকে, সিঙ্গেলদের জন্য মিসিং ডে উদযাপনের সেরা উপায় হলো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করুন, একসঙ্গে আড্ডা দিন বা কোথাও খেতে যান । অনেক সময় আমরা প্রেমের সম্পর্কের খাতিরে বন্ধুদের সময় দিতে ভুলে যাই। এই দিনটি সেই ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ।

কার জন্য পালন করছেন কীভাবে পালন করবেন (কার্যকরী উপায়)
লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ (দূরত্বের সম্পর্ক)

রেডিও বা সোশ্যাল মিডিয়ায় গান ডেডিকেট করা, সারপ্রাইজ গিফট পাঠানো, ভার্চুয়াল ডেট বা মুভি নাইট আয়োজন করা

প্রাক্তন সঙ্গীর ক্ষেত্রে (ব্রেকআপের পর)

ডায়রিতে মনের কথা লিখে ফেলা (না পাঠানো), ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করে ক্ষোভ বা কষ্টগুলো স্বীকার করা

দূরে থাকা বন্ধু বা পরিবারের সদস্য

সারপ্রাইজ ভিজিট করা, ফোন করে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করা, হাতে লেখা চিঠি পাঠানো

সিঙ্গেল ব্যক্তিদের জন্য (আত্ম-উন্নয়ন)

মাইন্ডফুলনেস চর্চা করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, নিজের যত্ন নেওয়া, নতুন শখ তৈরি করা

মিসিং ডে বনাম ব্রেকআপ ডে: মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় পার্থক্য

অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকে মিসিং ডে এবং ব্রেকআপ ডে পাশাপাশি অবস্থান করলেও এদের অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। অনেকেই এই দুটি দিনকে গুলিয়ে ফেলেন এবং মনে করেন দুটি দিনই হয়তো বিচ্ছেদের দুঃখ উদ্‌যাপন করার জন্য। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দিন দুটির আবেদন ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অনুভূতির সততা এবং হারানো স্মৃতি

মিসিং ডে হলো অনুভূতির প্রতি চূড়ান্ত সৎ থাকার দিন। এই দিনটি স্বীকার করে যে, সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও বা মানুষটি অনেক দূরে থাকলেও তার স্মৃতিগুলো মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি । আপনি হয়তো আপনার প্রাক্তন সঙ্গীর করা অপমান বা খারাপ ব্যবহার মিস করেন না, কিন্তু মানুষটার ভালো গুণগুলো বা একসঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো ঠিকই মনে করেন । এটি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক মানবিক প্রক্রিয়া। থেরাপিস্টদের মতে, এই দিনে মানুষ নস্টালজিক হয়, পুরোনো ছবি দেখে এবং স্বীকার করে যে নিরাময় বা হিলিং কোনো সরলরেখায় চলে না।

বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা

অন্যদিকে, ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হওয়া ব্রেকআপ ডে হলো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন। এই দিনটি বিষাক্ত বা ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসার প্রতীক । ব্রেকআপ ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যে সম্পর্ক আমাদের মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, তা থেকে সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই দিনে মানুষ পুরনো সম্পর্ককে পুরোপুরি ছিন্ন করে নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ায় । ব্রেকআপ ডে-তে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও আত্মমর্যাদাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

তুলনামূলক বিষয় মিসিং ডে (২০ ফেব্রুয়ারি) ব্রেকআপ ডে (২১ ফেব্রুয়ারি)
মূল ফোকাস

অতীত স্মৃতি, শূন্যতা এবং নস্টালজিয়াকে স্বীকার করা

নেতিবাচক ও বিষাক্ত সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করা

মানসিক অবস্থা

নস্টালজিক, কিছুটা মন খারাপ, তবে আবেগপূর্ণ ও সহনশীল

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, স্পষ্টবাদী এবং নিজেকে মুক্ত করার অনুভূতি

উদ্‌যাপনের ধরন

পুরোনো ছবি দেখা, ডায়েরি লেখা, স্মৃতি রোমন্থন করা

অতীতের সব যোগাযোগ মুছে ফেলা, নতুন জীবনের পরিকল্পনা করা

মনস্তাত্ত্বিক লক্ষ্য অনুভূতিগুলোর সঙ্গে আপস করা এবং হিলিং প্রক্রিয়া শুরু করা। অতীতকে পুরোপুরি পেছনে ফেলে আত্মমর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।

ভ্যালেন্টাইনস ডে-র মানসিক চাপ এবং মিসিং ডে-র প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান সময়ে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস একটি বিশাল বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সমাজে এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, যা অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক এবং মিসিং ডে-র প্রাসঙ্গিকতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মেন্টাল হেলথ এবং আর্থিক চাপ

গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যালেন্টাইনস ডে-র সময় অনেকেই তীব্র আর্থিক ও মানসিক চাপের সম্মুখীন হন। ‘আওয়ার রিচুয়াল’ (OurRitual)-এর একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, ৫৮% পুরুষ এবং ৪৫% নারী ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে ঘিরে আর্থিক চাপের কথা জানিয়েছেন । উপহার কেনা, দামি রেস্তোরাঁয় ডিনার করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিখুঁত প্রেমের ছবি পোস্ট করার এই প্রবল চাপ অনেককেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ৬৮% নারী জানিয়েছেন যে তারা এই সময়ে এক ধরনের মানসিক প্রত্যাশার চাপে ভোগেন । যারা সিঙ্গেল বা সদ্য সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তাদের জন্য এই দিনটি একাকীত্ব এবং বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়

ভ্যালেন্টাইনস ডে বয়কট করার পরিসংখ্যান

এই অবাস্তব প্রত্যাশা থেকে বাঁচতেই মানুষ অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকের দিকে ঝুঁকছে। পরিসংখ্যান বলছে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ভ্যালেন্টাইনস ডে এড়িয়ে চলেন। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেন-জি (Gen Z) দের মধ্যে ৩৮% এবং মিলেনিয়ালদের মধ্যে ৩৫% মানুষ ভ্যালেন্টাইনস ডে উদ্‌যাপন করেন না । এছাড়া সিঙ্গেল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৬২% এই দিনটিকে এড়িয়ে চলেন । এদের অনেকেই মনে করেন এই দিনটি অতিরিক্ত বাণিজ্যিক এবং এটি অবাস্তব সম্পর্কের মানদণ্ড তৈরি করে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্যই মিসিং ডে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আসে, যেখানে কোনো কিছু প্রমাণ করার চাপ থাকে না।

ডেমোগ্রাফিক গ্রুপ (বয়স/অবস্থা) ভ্যালেন্টাইনস ডে এড়িয়ে চলার হার এড়িয়ে চলার মূল কারণ
জেন-জি (Gen Z: ১৮-২৭ বছর) ৩৮%

বাণিজ্যিকীকরণের প্রতি সন্দেহ, সিঙ্গেল স্ট্যাটাস, মানসিক স্বাস্থ্যের সচেতনতা

মিলেনিয়ালস (২৮-৪৩ বছর) ৩৫%

আর্থিক চাপ, সম্পর্ক নিয়ে ক্লান্তি, সাধারণ উদ্‌যাপনের প্রতি ঝোঁক

জেন-এক্স (Gen X: ৪৪-৫৯ বছর) ২৬%

প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক, প্রতীকী দিনের প্রতি আগ্রহের অভাব

সিঙ্গেল প্রাপ্তবয়স্ক (Single Adults) ৬২%

উদ্‌যাপন করার মতো কেউ না থাকা, সামাজিক অস্বস্তি ও একাকীত্ব

সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড এবং মিসিং ডে (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ প্রেক্ষিত)

বর্তমান যুগে যেকোনো দিবস বা উৎসবের বড় অংশ জুড়ে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া। মিসিং ডে-ও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং মেসেঞ্জারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই দিনটিকে ঘিরে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ডেটা ও পরিসংখ্যান

২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩৩ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০.৭% । এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে সক্রিয়, যাদের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ । অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ । এই তরুণ সমাজ ভ্যালেন্টাইনস ডে-র বাণিজ্যিকীকরণের বিপরীতে অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে নিজেদের আবেগ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে

হ্যাশট্যাগ এবং কন্টেন্ট শেয়ারিং

মিসিং ডে-তে সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনগুলো ভরে ওঠে পুরনো ছবি, দুঃখের ক্যাপশন আর বিরহের গানে । অনেকেই নিজেদের জীবনের না-বলা কথাগুলো স্ট্যাটাস বা হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় #MissingDay, #AntiValentineWeek, #Heartbreak-এর মতো হ্যাশট্যাগগুলো ট্রেন্ডিং তালিকায় চলে আসে । বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ‘দুঃখের স্ট্যাটাস’ বা ‘কষ্টের ক্যাপশন’ অ্যাপগুলোর চাহিদাও এই সময়ে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় । মানুষ মিমস, রিলস এবং স্যাড কোটসের মাধ্যমে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করে, যা তাদের সমমনা মানুষের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল কমিউনিটি তৈরি করতে সাহায্য করে

প্ল্যাটফর্ম ২০২৬ সালের ব্যবহারকারী (বাংলাদেশ) মিসিং ডে-তে সাধারণ কার্যকলাপ ও ট্রেন্ড
ফেসবুক

৭ কোটি ৩৩ লাখ

পুরনো ছবি শেয়ার করা, দীর্ঘ বিরহের স্ট্যাটাস লেখা, মিমস শেয়ার করা

মেসেঞ্জার

৬ কোটি ৯৩ লাখ

বন্ধুদের সঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে ব্যক্তিগত মেসেজ বা স্যাড কোটস পাঠানো

ইনস্টাগ্রাম

১ কোটি ৩ লাখ

নান্দনিক রিলস তৈরি করা, ব্যাকগ্রাউন্ডে দুঃখের গান দিয়ে স্টোরি দেওয়া, হ্যাশট্যাগ ব্যবহার

ইউটিউব ডেটা পরিবর্তনশীল

বিরহের গান, বাউল গান বা স্যাড সং প্লেলিস্ট শোনা এবং কমেন্ট বক্সে নিজেদের গল্প শেয়ার করা

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগীতে বিরহ এবং মিসিং ডে-র প্রতিফলন

বাঙালি সংস্কৃতিতে ‘বিরহ’ বা কাউকে মিস করার আবেগ অত্যন্ত প্রাচীন ও গভীর। বাংলা সাহিত্য এবং সংগীতে বিরহের যে অপূর্ব ও মর্মস্পর্শী প্রকাশ দেখা যায়, তা মিসিং ডে-র মূল মনস্তাত্ত্বিক সুরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বিরহ ভাবনা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরহকে দেখেছেন এক ধরনের গভীর আত্মোপলব্ধি হিসেবে। তার একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, “যদি তুমি সূর্যকে হারিয়ে অশ্রুপাত করো, তবে তুমি নক্ষত্রদেরও হারাবে” (If you shed tears when you miss the sun, you also miss the stars) । এই কথার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন যে, কাউকে হারানোর কষ্টে ডুবে থাকলে জীবনের অন্যান্য সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না। মৃত্যু বা বিচ্ছেদকে তিনি জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবে দেখেছেন

অন্যদিকে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বিরহের সুর আরও তীব্র, বিদ্রোহী এবং যন্ত্রণাদায়ক। নজরুলের জীবনে প্রিয়জনের বিদায় বা হারানোর ঘটনা বারবার এসেছে, যার প্রভাব তার সাহিত্যকর্মে অত্যন্ত স্পষ্ট । তার প্রথম প্রেমিকা নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদ তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তার গান ও কবিতায় প্রিয়তমাকে হারানোর যে করুণ আর্তি ফুটে উঠেছে, তা বাঙালির বিরহ চেতনার এক অনবদ্য দলিল । মিসিং ডে-তে অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে মনে করে এই বিখ্যাত সাহিত্যিকদের উক্তি বা কবিতাগুলো শেয়ার করে মনের সান্ত্বনা খোঁজেন।

বিরহের সেরা বাংলা গান ও প্লেলিস্ট

বাঙালির বিরহ উদযাপন কখনোই গান ছাড়া অসম্পূর্ণ। ইউটিউব এবং অন্যান্য স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে মিসিং ডে উপলক্ষে দুঃখের বা বিরহের গানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকে। মানুষ তার মনের কষ্টকে গানের সুরের সঙ্গে মিলিয়ে এক ধরনের ‘ক্যাথারসিস’ বা মানসিক পরিশুদ্ধি লাভ করে। এই সময়ে ইউটিউবে “কলিজা কাপানো কষ্টের গান”, “বুক ফাটা কষ্টের গান” বা “বেস্ট অব স্যাড সং” লিখে সার্চ করার প্রবণতা ব্যাপক বেড়ে যায়

গানের ধরন/শিল্পী মিসিং ডে-তে জনপ্রিয়তার মূল কারণ
আধুনিক বাংলা স্যাড সং (যেমন- কেশব দে)

তরুণ প্রজন্মের আধুনিক বিচ্ছেদ, ডিপ্রেশন এবং প্রেমের কষ্টকে সমসাময়িক সুরে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে

বাউল ও লোকগীতি (যেমন- সুকুমার বাউল)

বাংলার মাটির সুরের মাধ্যমে মনের গভীরের কষ্ট এবং আধ্যাত্মিক বিরহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রকাশ পায়

ক্লাসিক বাংলা গান (মান্না দে, সনু নিগম)

চিরসবুজ সুর যা সব বয়সের মানুষের নস্টালজিয়াকে জাগিয়ে তোলে এবং পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে

অডিও জুকবক্স বা মিক্স প্লেলিস্ট

দীর্ঘ সময় ধরে স্যাড মুড উপভোগ করার জন্য টানা গানের প্লেলিস্ট, যা একাকী রাতে শোনার জন্য আদর্শ

রোমান্টিক সম্পর্কের বাইরে মিসিং ডে: পরিবার, বন্ধু ও সেলফ-কেয়ার

ভ্যালেন্টাইনস ডে এবং অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইক নিয়ে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, এগুলো কেবল রোমান্টিক বা প্রেমের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ভালোবাসার পরিধি অনেক বিস্তৃত। মিসিং ডে কেবল প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে মনে করার জন্য নয়। এই দিনটি সেই সমস্ত মানুষদের স্মরণ করার জন্য, যারা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন কিন্তু আজ নানা কারণে দূরে আছেন।

দূরত্বের মাঝে ভালোবাসার সেতু

জীবনের তাগিদে, পড়াশোনা বা চাকরির কারণে অনেকেই পরিবার ও পুরনো বন্ধুদের থেকে দূরে থাকেন। মিসিং ডে হলো সেই দূরে থাকা বাবা-মা, ভাই-বোন বা ছোটবেলার বন্ধুদের মিস করার দিন । একটি সাধারণ ফোন কল, একটি পুরনো ছবি শেয়ার করা বা ছোট একটি মেসেজ এই দিনটিকে বিশেষ করে তুলতে পারে। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং একাকীত্ব দূর করে। যারা তাদের প্রিয়জনকে চিরতরে হারিয়েছেন (মৃত্যুর কারণে), তাদের জন্যও এই দিনটি স্মৃতিচারণের একটি নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে।

সেলফ-কেয়ার এবং নিজেকে সময় দেওয়া

যে ব্যক্তি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ একা, তার জন্য মিসিং ডে হতে পারে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার দিন। অনেক সময় আমরা অন্যদের ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকে মিস করতে শুরু করি—নিজের পুরনো হাসি, আত্মবিশ্বাস বা শখগুলোকে হারিয়ে ফেলি । এই দিনে সেলফ-কেয়ার বা নিজের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নিজের জন্য একটি ‘গ্র্যাটিটিউড লিস্ট’ (Gratitude list) তৈরি করা, নিজের পছন্দের কাজগুলো করা বা এক কাপ কফি নিয়ে নিজের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী

সম্পর্ক বা ক্ষেত্র কীভাবে উদ্‌যাপন করবেন (রোমান্টিকতার বাইরে)
পরিবারের সদস্য (বাবা, মা, ভাই, বোন)

ভিডিও কল করা, ছোটবেলার অ্যালবামের ছবি দেখা, তাদের পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়া

পুরনো বন্ধু (স্কুল/কলেজ লাইফ)

পুরনো চ্যাট বা ছবি শেয়ার করা, হঠাৎ ফোন করে চমকে দেওয়া, একসঙ্গে আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা করা

মৃত প্রিয়জন

তাদের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা, তাদের পছন্দের জায়গায় সময় কাটানো

নিজের সত্তা (Self-Love)

নিজের জন্য একটি প্রেমের চিঠি বা ‘লাভ লেটার’ লেখা, স্পা করা, নিজের ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করা

কাউকে মিস করার স্নায়বিক বিজ্ঞান (Neuroscience) এবং আরোগ্য লাভ

কাউকে মিস করার অনুভূতি কেবল মনের নয়, এর সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র গভীরভাবে জড়িত। মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের (Neuroscience) গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন আমরা আমাদের প্রিয়জনকে মিস করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের গঠন এবং কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।

কমপ্লিকেটেড গ্রিফ এবং অ্যামিগডালার ভূমিকা

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক ড. মেরি-ফ্রান্সেস ও’কনরের মতে, যখন আমরা কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই মানুষের সঙ্গে এক ধরনের শক্তিশালী নিউরাল কানেকশন বা স্নায়বিক বন্ধন তৈরি করে । বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর কারণে সেই মানুষটি হঠাৎ হারিয়ে গেলে মস্তিষ্ক সহজে তা মেনে নিতে পারে না, কারণ মস্তিষ্কের ম্যাপে সেই মানুষটির অস্তিত্ব তখনও উজ্জ্বল থাকে। এটিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কমপ্লিকেটেড গ্রিফ’ (Complicated grief) বা জটিল শোক বলা হয় । গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে মিস করার সময় মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ (Amygdala)—যা ভয় এবং আবেগের কেন্দ্র—তার সক্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং ‘মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Medial prefrontal cortex)—যা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—তার সক্রিয়তা কমে যায় । এর ফলে মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।

অ্যাম্বিগিউয়াস লস (Ambiguous Loss) এবং এর প্রভাব

মনোবিজ্ঞানে আরেক ধরনের শূন্যতার কথা বলা হয়েছে, যাকে ‘অ্যাম্বিগিউয়াস লস’ (Ambiguous loss) বা অস্পষ্ট ক্ষতি বলা হয়। এটি এমন এক ধরনের শূন্যতা, যেখানে প্রিয় মানুষটি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত কিন্তু মানসিকভাবে উপস্থিত (যেমন নিখোঁজ ব্যক্তি বা লং ডিস্টেন্স সম্পর্ক), অথবা শারীরিকভাবে উপস্থিত কিন্তু মানসিকভাবে অনুপস্থিত (যেমন ডিমেনশিয়া রোগী বা বিচ্ছেদের পর প্রাক্তন সঙ্গী) । এই ধরনের শূন্যতা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে, কারণ এখানে কোনো চূড়ান্ত সমাধান বা ‘ক্লোজার’ (Closure) থাকে না । দীর্ঘমেয়াদী এই শূন্যতা মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে এবং এর ফলে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা পিটিএসডি (PTSD)-এর মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে

বৈজ্ঞানিক/মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষা সংজ্ঞা ও মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব
কমপ্লিকেটেড গ্রিফ (Complicated Grief)

দীর্ঘস্থায়ী শোক যা ৬ মাসের বেশি সময় ধরে দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত ঘটায় এবং মানিয়ে নিতে বাধা দেয়

অ্যামিগডালা সক্রিয়তা (Amygdala Activity)

ভয় ও আবেগের কেন্দ্র; বিচ্ছেদের সময় এর সক্রিয়তা বেড়ে যায় ফলে মানুষ আবেগপ্রবণ ও চিন্তিত হয়ে পড়ে

ডোপামিন রিলিজ (Dopamine Release)

সুন্দর অতীত স্মৃতি বা নস্টালজিয়া মস্তিষ্কে এই হরমোন নিঃসৃত করে, যা সাময়িক প্রশান্তি ও আনন্দ দেয়

অ্যাম্বিগিউয়াস লস (Ambiguous Loss)

এমন এক শূন্যতা যার কোনো নির্দিষ্ট ‘ক্লোজার’ বা সমাপ্তি নেই, যা তীব্র মানসিক চাপ এবং ক্লান্তি তৈরি করে

থেরাপিউটিক কৌশল: মিসিং ডে-তে শোক এবং একাকীত্ব মোকাবিলার বৈজ্ঞানিক উপায়

মিসিং ডে-র মতো দিনগুলোতে একাকীত্ব বা শোকের মাত্রা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই আবেগতাড়িত হয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে কিছু বৈজ্ঞানিক ও থেরাপিউটিক কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন, যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে।

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং থট রিপ্লেসমেন্ট

মনোবিজ্ঞানীরা একাকীত্ব দূর করতে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)-র কিছু বেসিক কৌশল ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘থট রিপ্লেসমেন্ট’ (Thought replacement) বা চিন্তা প্রতিস্থাপন । যখনই মনে হবে “আমি তাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না” বা “আমার জীবন অর্থহীন”, তখন এই নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে যৌক্তিক ও ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। যেমন, “আমি তাকে মিস করছি ঠিকই, কিন্তু আমি নিজের যত্ন নিতেও সক্ষম।” এই ধরনের সেলফ-টক (Self-talk) মস্তিষ্কের নিউরাল পাথওয়েকে পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে

প্রফেশনাল গাইডেন্স এবং সাপোর্ট গ্রুপের ভূমিকা

যদি প্রিয়জনকে মিস করার অনুভূতি এতটাই তীব্র হয় যে তা আপনার দৈনন্দিন কাজ, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তবে প্রফেশনাল থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া জরুরি। অনেক সময় আমরা একা এই মানসিক যন্ত্রণাগুলো মোকাবিলা করতে পারি না। রিচলিন্ক (ReachLink) বা অন্যান্য অনলাইন থেরাপি প্ল্যাটফর্মগুলো শোক বা গ্রিফ কাউন্সেলিংয়ের জন্য দারুণ সহায়ক হতে পারে । এছাড়া কোনো সাপোর্ট গ্রুপে যুক্ত হলে সমমনা মানুষদের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ পাওয়া যায়, যা একাকীত্বের অনুভূতি বহুলাংশে কমিয়ে দেয়

থেরাপিউটিক কৌশল প্রয়োগের পদ্ধতি ও উপকারিতা
থট রিপ্লেসমেন্ট (CBT কৌশল)

নেতিবাচক চিন্তাকে ইতিবাচক ও যৌক্তিক চিন্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, যা মানসিক স্থিতিশীলতা আনে

সেলফ-টক (Self-talk)

নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথা বলা, যা জটিল আবেগগুলো বুঝতে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে

সাপোর্ট গ্রুপে অংশগ্রহণ

সমমনা বা একই ধরনের শোকের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যা একাকীত্ব দূর করে

প্রফেশনাল থেরাপি গ্রহণ

দীর্ঘস্থায়ী শোক বা কমপ্লিকেটেড গ্রিফ মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, যা হিলিং ত্বরান্বিত করে

 মিসিং ডে নিয়ে আমাদের চূড়ান্ত ভাবনা

জীবনের প্রতিটি মানুষেরই নির্দিষ্ট কিছু অধ্যায় থাকে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছায়ার মতো সঙ্গে থাকে, আবার অনেকেই মাঝপথে হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো, তাদের হাসি, কথা বলা বা ছোট ছোট স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের নিউরাল ম্যাপে এবং মনের মণিকোঠায় সারাজীবন সযত্নে রয়ে যায়। অ্যান্টি-ভ্যালেন্টাইনস উইকের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন মিসিং ডে হলো সেইসব হারানো বা দূরে থাকা মানুষদের স্মৃতিকে সম্মান জানানোর দিন।

কারও শূন্যতা অনুভব করা বা কাউকে মিস করা কোনো দুর্বলতা বা অপরাধ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে আপনার একটি অত্যন্ত সুন্দর ও সংবেদনশীল মন আছে, যা গভীরভাবে ভালোবাসতে জানে। যদি আজ কাউকে খুব মনে পড়ে, তবে কোনো দ্বিধা না রেখে তাকে একটি মেসেজ দিয়ে দেখতে পারেন। আর যদি কোনো কারণে যোগাযোগ করা সম্ভব না হয়, তবে চোখ বন্ধ করে তার সুন্দর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করুন। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে সবকিছুর উপরে অগ্রাধিকার দিন, নিজেকে ভালোবাসুন। কারণ নিজেকে ভালো না বাসলে অন্যদের সত্যিকারের ভালোবাসা দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। এই বিশেষ দিনটিতে অতীতকে অস্বীকার না করে, তাকে সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যতের দিকে আরও সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিন।

About Author
Ishita Ganguly

ঈশিতা গাঙ্গুলী ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে স্নাতক। তিনি একজন উদ্যমী লেখক এবং সাংবাদিক, যিনি সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। ঈশিতার লেখার ধরন স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যবহুল, যা পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং পাঠকদের চিন্তা-চেতনার পরিসরকে বিস্তৃত করতে সহায়তা করেন। সাংবাদিকতার জগতে তার অটুট আগ্রহ ও নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন