SCO সম্মেলনে নাম না করেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে মোদী, শাহবাজের সামনেই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কঠোর বার্তা

চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও,…

Avatar

 

চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও, মোদী স্পষ্ট করে দেন যে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে আর কোনো ধরনের নীরবতা বা দোটানা নীতি মেনে নেওয়া হবে না। গত ২২ এপ্রিল পহলগামে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই হামলা শুধু ভারতের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানবতায় বিশ্বাসী প্রতিটি দেশ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক খোলা চ্যালেঞ্জ।

সোমবার সন্ধ্যায় SCO নেতাদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী মোদী তার বক্তব্যে গত চার দশক ধরে ভারতের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভারত গত চার দশক ধরে সন্ত্রাসবাদের আঘাত সহ্য করে আসছে। সম্প্রতি পহলগামে আমরা সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ রূপ দেখেছি। দুঃখের এই মুহূর্তে যে বন্ধু দেশগুলো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।” মোদী স্পষ্ট করে বলেন যে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে কোনো ধরনের দ্বিমুখী নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।

পহলগাম হামলার বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে মোদী জানান, ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহলগামে সন্ত্রাসীরা ২৬ নিরীহ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। এই হামলায় মূলত হিন্দু পর্যটকরা লক্ষ্যবস্তু হলেও একজন খ্রিস্টান পর্যটক ও একজন স্থানীয় মুসলিম পনি চালকও নিহত হন। সন্ত্রাসীরা M4 কার্বাইন ও AK-47 অস্ত্র নিয়ে বাইসারান উপত্যকা এলাকায় হামলা চালায়। লস্কর-ই-তাইয়েবার সহযোগী সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (TRF) প্রথমে এই হামলার দায় স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে।

এই সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ভারতের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে জইশ-ই-মোহাম্মদ ও লস্কর-ই-তাইয়েবার নয়টি সন্ত্রাসী ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়। এই অভিযানে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয় এবং SCALP ক্ষেপণাস্ত্র ও HAMMER বোমা দিয়ে নির্ভুল আক্রমণ চালানো হয়। পাকিস্তান এর প্রতিশোধ নিতে ‘অপারেশন বুনিয়ান-উন-মারসুস’ নামে পাল্টা আক্রমণ চালায়। দুই দেশের মধ্যে চার দিনের এই সামরিক সংঘাতের পর ১০ মে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।

তিয়ানজিনের SCO সম্মেলনে দৃশ্যমান হয় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা। বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী মোদী ও শাহবাজ শরিফ একে অপরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। গ্রুপ ফটো সেশনে দু’জনকে দূরত্বে রাখা হয়েছিল। একটি ছবিতে মোদী কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত, আর শাহবাজ শরিফ পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায় মোদী ও পুতিন একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন, আর শাহবাজ শরিফ পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে দেখছেন।

সম্মেলনে মোদী তার বক্তব্যে SCO-র অর্থ ব্যাখ্যা করে বলেন, “ভারতের SCO নীতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। S মানে নিরাপত্তা (Security), C মানে সংযোগ (Connectivity) এবং O মানে সুযোগ (Opportunity)।” তিনি উল্লেখ করেন যে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জাতিভেদ বর্তমান বিশ্বের তিনটি প্রধান সমস্যা। মোদী জোর দিয়ে বলেন, “যতদিন পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার মতো হুমকি বিদ্যমান থাকবে, ততদিন কোনো দেশ বা সমাজ নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারবে না।”

সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকার কথা তুলে ধরে মোদী বলেন, “ভারত সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। আমাদের সর্বসম্মতভাবে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করতে হবে।” তিনি আল-কায়েদা ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ভারতের নেতৃত্বে পরিচালিত যৌথ তথ্য অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন। SCO-র আঞ্চলিক সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর (RATS) অধীনে ভারত অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বলে জানান তিনি।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোসহ অন্যান্য সদস্য দেশের নেতারা। এবারের সম্মেলনটি SCO-র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্মেলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে ২০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই সম্মেলনে যোগ দেন।

চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মোদী সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেন এবং চীনের সঙ্গে ভারতের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উত্থাপন করেন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। মোদী ও শি জিনপিং একমত হন যে ভারত ও চীন “উন্নয়ন সহযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়”। তারা সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু করতেও সম্মত হন।

পুতিনের সঙ্গে উষ্ণ সাক্ষাতে মোদী বলেন, “প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দেখা করা সবসময়ই আনন্দদায়ক!” দুই নেতার মধ্যে আলিঙ্গন ও কথোপকথনের ছবি ব্যাপক আলোচনায় আসে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন বলে জানা যায়।

এই সম্মেলনে মোদীর বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে ভারত আর সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে কোনো ধরনের আপসকারী নীতি মানবে না। পহলগাম হামলা ও তার পরিণতিতে অপারেশন সিঁদুর ভারতের নতুন কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অপারেশন ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে যেখানে সংযম ও দৃঢ়তার সমন্বয় ঘটেছে। শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে মোদীর এই দৃঢ় বার্তা ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে দেয় যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনো নীরবতা বা নিরপেক্ষতা আর গ্রহণযোগ্য নয়।

About Author
Avatar

আমাদের স্টাফ রিপোর্টারগণ সর্বদা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আপনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে পারেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতি আমাদের ওয়েবসাইটকে একটি বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তারা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ে বিশ্বাসী, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে সক্ষম

আরও পড়ুন