বাংলার লোকসাহিত্যের বিশাল, সমৃদ্ধ ভাণ্ডার প্রায় পুরোটাই ছিল মৌখিক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গান, কথা, ছড়া ও পালাগুলো মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে ছিল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন যে ক’জন মনীষী তা সংরক্ষণের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী (১৯০১-১৯৭৯) এক উজ্জ্বলতম নাম। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক, যিনি না থাকলে হয়তো ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ বা ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’-এর অনেক কালজয়ী পালা, যেমন ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’ বা ‘চন্দ্রাবতী’-এর মতো আখ্যানগুলো আমরা পেতাম না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেনের (Dinesh Chandra Sen) তত্ত্বাবধানে তিনি বাংলার গ্রামীণ অঞ্চল থেকে এই অমূল্য রত্নগুলো সংগ্রহ করে এনেছিলেন, যা আজ বাংলা সাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর এই সাধনার ফলেই বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বিরাট অধ্যায় লিখিতরূপে সংরক্ষিত হয়েছে, যা গবেষকদের কাছে আজও এক প্রধান আকরগ্রন্থ।
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী: এক বিস্মৃতপ্রায় সাধকের পরিচয়
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার লোকসংস্কৃতি যখন নাগরিক সভ্যতার প্রভাবে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল, তখন তার গুরুত্ব অনুধাবন করে যে ক’জন দূরদর্শী মানুষ তা সংগ্রহের কাজে আত্মনিয়োগ করেন, মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সংগৃহীত লোকগাথা, লোকগীতি, ছড়া, ও রূপকথাগুলোই বাংলা লোকসাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষার পটভূমি
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর জন্ম ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১৩০৮ সন) বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার কাসিমপুর গ্রামে। এক গ্রামীণ পরিমণ্ডলে তাঁর বেড়ে ওঠা। এই পরিবেশই তাঁকে বাংলার মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরা বিভিন্ন লোকগান, কিচ্ছা ও পালার প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর অগ্রসর না হলেও, তাঁর ছিল এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি অদম্য কৌতূহল। তিনি গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ময়মনসিংহের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তা শেষ করতে পারেননি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব তাঁর জ্ঞানার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তাঁর আসল শিক্ষা এসেছিল বাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে।
লোকসাহিত্যের জগতে প্রবেশ
কাসিমপুরীর লোকসাহিত্য সংগ্রহের শুরুটা হয়েছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে। তিনি গ্রামের গায়েন (লোকগায়ক) ও বয়াতীদের আসরে বসে মুগ্ধ হয়ে পালাগান শুনতেন এবং সেগুলো স্মৃতি থেকে খাতায় টুকে রাখতেন। এটি ছিল তাঁর নেশার মতো। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই মৌখিক ঐতিহ্য যদি লিখিতরূপে সংরক্ষণ করা না হয়, তবে তা অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেনের সান্নিধ্যে আসেন। দীনেশচন্দ্র সেন তখন বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় নিদর্শন সংগ্রহের এক বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলার আসল সাহিত্য লুকিয়ে আছে গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কাসিমপুরীর কাজের কথা জানতে পেরে দীনেশচন্দ্র সেন তাঁকে লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেন। এটি ছিল ১৯২০-এর দশকের ঘটনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তখন ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ (Mymensingh Gitika) ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ (Purbabanga Gitika) প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল।
সংগ্রহের পদ্ধতি: এক অসামান্য ফিল্ডওয়ার্ক
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর লোকসাহিত্য সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল এককথায় অসামান্য। তিনি কেবল একজন সংগ্রাহক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ফিল্ড ওয়ার্কার, যিনি উৎসের কাছে পৌঁছানোর জন্য যেকোনো কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন।
গ্রামে গ্রামে পরিভ্রমণ
দীনেশচন্দ্র সেনের অনুপ্রেরণা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য আর্থিক সহায়তায় কাসিমপুরী বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণ শুরু করেন। সেই যুগে আজকের মতো সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। তাঁকে পায়ে হেঁটে, নৌকায় বা গরুর গাড়িতে করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হতো। তিনি গ্রামের কৃষকদের বাড়িতে, নদীর ঘাটে, বা বাজারের পাশে বসে থাকা গায়েনদের খুঁজে বের করতেন।
গায়েনদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন
তাঁর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গায়েন বা পালাকারদের সাথে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই লোকশিল্পীরা প্রায়শই নিরক্ষর ছিলেন এবং তাঁদের একমাত্র সম্বল ছিল স্মৃতি। কাসিমপুরী তাঁদের সাথে মিশে যেতেন, তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন এবং তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করতেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই শিল্পীরা কেবল গান গাইছেন না, তাঁরা তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরছেন। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কখনও রাতের পর রাত জেগে এই গায়েনদের মুখে পালাগান শুনতেন।
নিখুঁত শ্রুতি লিখন
কাসিমপুরীর প্রধান কৃতিত্ব হলো এই মৌখিক পালাগানগুলোকে প্রায় অবিকৃতভাবে লিপিবদ্ধ করা। তিনি গায়েনের মুখের ভাষাকে, তাঁর আঞ্চলিক উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গিকে সম্মান করতেন। তিনি দ্রুত শ্রুতি লিখন (Dictation) নিতে পারতেন। গায়েন যখন গভীর আবেগ ও নির্দিষ্ট সুরে গান গাইতেন, কাসিমপুরী তখন তা সযত্নে খাতায় টুকে নিতেন। পরে তিনি তা একাধিকবার গায়েনকে দিয়ে গাইয়ে মিলিয়ে নিতেন, যাতে কোনো শব্দ বা পংক্তি বাদ না পড়ে বা পরিবর্তিত না হয়। এই পদ্ধতিতেই তিনি ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘দেওয়ানা মদিনা’, ‘চন্দ্রাবতী’-এর মতো কালজয়ী পালাগানগুলো উদ্ধার করেন।
‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’: তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর নাম বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে মূলত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ এবং ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’-এর অন্যতম প্রধান সংগ্রাহক হিসেবে। যদিও দীনেশচন্দ্র সেন এই গীতিকাগুলো সম্পাদনা করে এবং ইংরেজি অনুবাদ (‘Eastern Bengal Ballads’) করে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়েছিলেন, কিন্তু এর পেছনের মূল কাজটি করেছিলেন কাসিমপুরীর মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রাহকরা।
গীতিকা কী?
গীতিকা বা পালাগান হলো এক ধরনের আখ্যানমূলক লোকগীতি (Narrative Folk Ballad)। এতে একটি দীর্ঘ কাহিনী সুর করে গাওয়া হয়। এই পালাগানগুলোতে সাধারণত গ্রামীণ জীবনের প্রেম, বিরহ, সংঘাত, সামাজিক অবিচার এবং মানবিকতার এক অসামান্য চিত্র ফুটে ওঠে।
‘ময়মনসিংহ গীতিকা’-এ কাসিমপুরীর অবদান
১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন তা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফরাসি মনীষী রোম্যাঁ রোলাঁ (Romain Rolland) এই গীতিকা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই সংকলনের বেশ কয়েকটি অমূল্য পালা, বিশেষ করে ‘মহুয়া পালা’ এবং ‘চন্দ্রাবতী’ সংগ্রহ করেছিলেন মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী।
- মহুয়া পালা: এটি এক বেদিয়া (Gypsy) তরুণী মহুয়ার সাথে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ যুবক নদের চাঁদের প্রেমের করুণ আখ্যান। এই পালায় তৎকালীন সমাজের জাতিভেদ প্রথা, সংঘাত এবং দুই তরুণ-তরুণীর প্রেমের জন্য আত্মত্যাগের এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে। কাসিমপুরী এই পালাটি ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উদ্ধার করেন।
- চন্দ্রাবতী: এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি হিসেবে পরিচিত চন্দ্রাবতীর (কবি দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা) জীবনের ট্র্যাজিক কাহিনী। এই পালায় তাঁর প্রেম, প্রত্যাখ্যান এবং কাব্য রচনার এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা কাসিমপুরী সংগ্রহ করেছিলেন।
‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’-এ তাঁর ভূমিকা
‘ময়মনসিংহ গীতিকা’-এর সাফল্যের পর, দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পালাগানগুলো নিয়ে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ (১৯২৩-১৯৩২) নামে চার খণ্ডে প্রকাশ করেন। এই সংকলনেও কাসিমপুরীর অবদান ছিল সর্বাধিক।
- মলুয়া পালা: এই পালায় মলুয়া নামের এক সতীসাধ্বী নারীর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যে তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গিয়ে নানা সামাজিক অত্যাচার ও প্রলোভনের শিকার হয়। এটি নারী চরিত্রের দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
- দেওয়ানা মদিনা: এই পালায় আলাল ও দুলালের নামক দুই ভাইয়ের প্রতি মদিনা নামের এক নারীর গভীর ভালোবাসার করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
- ভেলুয়া সুন্দরী: চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সংগৃহীত এই পালায় এক সওদাগরের কন্যা ভেলুয়ার সাথে এক রাজপুত্রের প্রেমের আখ্যান স্থান পেয়েছে।
কাসিমপুরীর কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি কেবল এই পালাগুলো সংগ্রহ করেননি, তিনি এর সামাজিক পটভূমিও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই গানগুলো নিছক বিনোদন নয়, এগুলো গ্রামীণ বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখায় অবদান
যদিও গীতিকা সংগ্রহই তাঁর প্রধান পরিচয়, তবে মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর আগ্রহ ছিল লোকসাহিত্যের প্রায় সকল শাখাতেই। তিনি বাংলার গ্রাম-গঞ্জ থেকে অসংখ্য ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, রূপকথা এবং লোকগীতি সংগ্রহ করেছিলেন।
ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচন
শিশুদের ঘুম পাড়ানোর গান, খেলার ছড়া থেকে শুরু করে সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কিত প্রবাদ-প্রবচন – তিনি যা কিছু পেয়েছেন, তাই যত্ন সহকারে সংগ্রহ করেছেন। এই সংগ্রহগুলো বাংলার গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাঁদের বিশ্বাস, সংস্কার ও রসবোধকে ধারণ করে আছে।
রূপকথা ও লোককাহিনী
তিনি প্রায় পঁয়ষট্টিটি (৬৫) লোককাহিনী বা রূপকথা সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এই কাহিনীগুলোতে রাজা-রানী, দৈত্য-দানো, পশুপাখির কথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনা ও নৈতিকতার শিক্ষা ফুটে উঠেছে।
লোকগীতি সংগ্রহ
পালাগান ছাড়াও তিনি বাউল গান, মুর্শিদি গান, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বিয়ের গান ও মেয়েলি গীত সংগ্রহ করেন। বাংলা একাডেমির (Bangla Academy) তথ্যমতে, তাঁর সংগৃহীত লোকগীতির সংখ্যা প্রায় তিন সহস্রাধিক (৩০০০+), যা এক অকল্পনীয় পরিশ্রমের ফসল।
প্রকাশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী কেবল একজন মাঠপর্যায়ের সংগ্রাহকই ছিলেন না, তিনি তাঁর সংগৃহীত উপাদান নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধও রচনা করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
তাঁর সংগৃহীত লোকসাহিত্য নিয়ে কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
- “লোকসাহিত্য সংগ্রহ” (১৯৬২): এটি তাঁর অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ, যেখানে তিনি তাঁর সংগৃহীত বিভিন্ন ধরনের লোকসাহিত্য সংকলন করেছেন।
- “বাংলাদেশের লোকসাহিত্য” (১৯৬৯): এই গ্রন্থে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য তুলে ধরেন।
- “বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচয়” (১৯৭৩): এই গ্রন্থে তিনি বাংলার বিভিন্ন প্রকার লোকসংগীতের উদ্ভব, বিকাশ ও গায়নরীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলনের অন্যতম প্রধান সংগ্রাহক ও লেখক ছিলেন।
সম্মাননা ও পুরস্কার
সারাজীবনের এই নীরব সাধনার জন্য মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেন।
| পুরস্কার/সম্মাননা | প্রদানকারী সংস্থা | সাল | অবদানের ক্ষেত্র |
| বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার | বাংলা একাডেমী, ঢাকা | ১৯৭৫ | লোকসাহিত্য (গবেষণা) |
| নজরুল স্মৃতি পুরস্কার | নজরুল একাডেমী | ১৯৭৬ | লোকসাহিত্য সংগ্রহ |
এই পুরস্কারগুলো ছিল তাঁর আজীবনের নিরলস পরিশ্রমের প্রতি জাতির সম্মান প্রদর্শন। যদিও তাঁর অবদানের তুলনায় এই স্বীকৃতি হয়তো যথেষ্ট নয়, তবুও এটি তাঁর কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যে কাসিমপুরীর গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর অবদান কেবল কিছু লোকগান সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর কাজের গুরুত্ব আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও জাতিসত্তার সন্ধান
কাসিমপুরী সেই কাজটি করেছেন, যা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। তাঁর সংগৃহীত গীতিকাগুলোতে আমরা মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে ব্রিটিশ আমলের শুরু পর্যন্ত গ্রামীণ বাংলার যে সমাজচিত্র পাই, তা অন্য কোনো ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া সম্ভব নয়। বাংলাপিডিয়া (Banglapedia) তাঁকে বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তিনি না থাকলে বাংলা সাহিত্যের এই অমূল্য সম্পদগুলো হয়তো চিরতরে হারিয়ে যেত।
পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য ভিত্তি
আজ যাঁরা বাংলা লোকসাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের কাছে কাসিমপুরীর সংগৃহীত উপাদানগুলো (Primary Data) অপরিহার্য। তাঁর কাজ দীনেশচন্দ্র সেনের মতো সম্পাদককে যেমন উপাদান জুগিয়েছে, তেমনই পরবর্তীকালে জসীমউদ্দীন, আশুতোষ ভট্টাচার্য বা মযহারুল ইসলামের মতো লোকসাহিত্য গবেষকদের পথ প্রদর্শন করেছে।
আধুনিক সাহিত্যে প্রভাব
‘ময়মনসিংহ গীতিকা’-এর পালাগুলো কেবল গবেষণার বিষয় হয়ে থাকেনি, তা আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকেও নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। এই গীতিকার নাটকীয়তা, কাব্যময়তা এবং শক্তিশালী নারী চরিত্রগুলো পরবর্তীকালের কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারদের অনুপ্রাণিত করেছে।
এক নীরব সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা
১৯৭৯ সালের ৩রা মার্চ (বাংলা ১৩৮৫ সনের ১৮ই ফাল্গুন) এই মহান লোকসাহিত্য সাধক ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তাঁর জীবনে প্রচার বা খ্যাতির পেছনে ছোটেননি। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষকে। তাঁর জীবনের ব্রতই ছিল এই মাটির মানুষের সৃষ্টিকে রক্ষা করা। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের ‘ফিল্ড ওয়ার্কার’, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পদের তোয়াক্কা না করে কেবল নিষ্ঠার সাথে নিজের কাজ করে গেছেন। আজ যখন আমরা ‘মহুয়া’ বা ‘মলুয়া’-এর কাব্যরস আস্বাদন করি, তখন আমাদের অবশ্যই সেই মানুষটিকে স্মরণ করতে হবে, যিনি কর্দমাক্ত মেঠোপথ পেরিয়ে এই রত্নগুলো আমাদের জন্য আহরণ করে এনেছিলেন। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর নাম তাই চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।











