মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রাজ্ঞ আইনবিদ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করেন, যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় (বঙ্গভবন)-এর তথ্যমতে, তিনি তাঁর পূর্বসূরি আব্দুল হামিদের স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। একজন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার হিসেবে তাঁর পটভূমি রাষ্ট্রপতির চিরাচরিত রাজনৈতিক ভূমিকার বাইরে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন: প্রারম্ভিক জীবন ও সংগ্রামের সূচনা
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের জীবন আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁককে কেন্দ্র করে। তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন এবং যৌবনের সংগ্রাম তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরের জুবিলী ট্যাংকপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম চুপ্পু। তাঁর পিতা শরফুদ্দিন আনছারী এবং মাতা খায়রুন্নেসা। তিনি পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমী থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর তিনি পাবনার অ্যাডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এইচএসসি এবং ১৯৭১ সালে (অনুষ্ঠিত ১৯৭২) বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে এমএসসি এবং ১৯৭৫ সালে পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্র রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় ছাত্র অবস্থাতেই। তিনি ষাটের দশকের শেষ দিকে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ও নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তিনি পাবনা অঞ্চলে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তাঁর সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। যুদ্ধের পর তিনি ১৯৭২ সালে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কর্মজীবন আইন, বিচার এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের এক অনন্য মিশ্রণ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর ছাপ রেখেছেন, যা পরবর্তীকালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হতে সহায়তা করেছে।
আইন পেশা থেকে বিচার বিভাগ
এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার পাবনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতাও করেন। তবে তাঁর মূল আগ্রহ ছিল আইন ও বিচারে।
১৯৮২ সালে তিনি বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান করেন এবং বিচারক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করেন এবং ধাপে ধাপে পদোন্নতি লাভ করে জেলা ও দায়রা জজ পদে উন্নীত হন। একজন বিচারক হিসেবে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
বিচার বিভাগ থেকে অবসরের পর মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কর্মজীবনে এক নতুন মোড় আসে। ২০১১ সালের মার্চ মাসে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
দুদকে তাঁর মেয়াদকাল ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। এ সময় দুদক পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের মতো চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত করে। যদিও বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করে, দুদক চূড়ান্ত পর্যায়ে এই মামলায় পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে কাউকে অভিযুক্ত করতে পারেনি। কমিশনার হিসেবে সাহাবুদ্দিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাঁর আইনি অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক মনোনয়নে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা ও আওয়ামী লীগ
সরকারি চাকরি এবং দুদকের দায়িত্ব পালনের পর মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা বজায় রাখেন। ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন, যা দলের নীতি নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম।
এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো হামলা, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতির পদে আসীন
২০২৩ সাল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল।
মনোনয়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। এই মনোনয়ন অনেকের কাছেই কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল, কারণ তিনি সক্রিয় রাজনীতির প্রথম সারিতে সরাসরি দৃশ্যমান ছিলেন না। তবে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, বিচারক হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং দুদকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে работы করার ইতিহাস তাঁকে একজন ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল না করায় নির্বাচন কমিশন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে।
শপথ গ্রহণ ও দায়িত্বভার
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে শপথ পাঠ করান। অনুষ্ঠানে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ, সংসদ সদস্যগণ, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং দেশি-বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও, এটি মূলত একটি আনুষ্ঠানিক বা আলঙ্কারিক পদ। দেশের প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত।
সংবিধান কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন, তবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত। তাঁর প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা নিয়োগ: জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নেতাকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নিয়োগ দেন।
- আইন প্রণয়ন: জাতীয় সংসদে পাস হওয়া যেকোনো বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতি প্রয়োজন হয়। তিনি সম্মতি দিলে তা আইনে পরিণত হয়।
- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ: তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন।
- সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক: রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন, যদিও এর বাস্তবায়ন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে হয়।
- ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা: সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি যেকোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড হ্রাস, স্থগিত বা ক্ষমা করতে পারেন।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের স্বাতন্ত্র্য
যদিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত, মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পটভূমি তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। তাঁর দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকাকে আরও জোরালো করতে পারে। বিশেষত, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিলগুলোতে স্বাক্ষর করার আগে তাঁর আইনি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সমসাময়িক বাংলাদেশ: রাষ্ট্রপতির চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন যখন বাংলাদেশ একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও স্থিতিশীলতা
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাওয়া ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ।
- মূল্যস্ফীতি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর জুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছিল, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর తీవ్ర চাপ সৃষ্টি করে।
- রিজার্ভ ও ঋণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের সহায়তা নিতে হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত।
বিশ্বব্যাংকের “বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট” (অক্টোবর ২০২৪) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি মাঝারি প্রবৃদ্ধির পথে থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা মূলত সরকারকে নীতিগত সমর্থন দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় সহায়তা করা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্বের প্রথম বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুখোমুখি হয়, যা ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। রয়টার্স এবং আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই নির্বাচনকে “একতরফা” বলে অভিহিত করে।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ছিল সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। তিনি নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শপথ পাঠ করান। তাঁর বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো, এই বিভাজিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করা এবং সকল পক্ষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরিতে উৎসাহিত করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য
বাংলাদেশ একটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
- রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশ বহন করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর তথ্যমতে, এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়টি তুলে ধরছেন।
- ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশকে একই সাথে প্রতিবেশী ভারত, অর্থনৈতিক অংশীদার চীন এবং কৌশলগত মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং গভীর, অন্যদিকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, মানবাধিকার এবং শ্রম অধিকার নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর মতো সংস্থাগুলো প্রায়শই বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে রাষ্ট্রপতির কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দেশের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন: একটি মূল্যায়ন
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ এখনো চলমান। তবে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান ভূমিকা পর্যালোচনা করে কিছু মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
জনমনে ভাবমূর্তি
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের মনোনয়নকে আওয়ামী লীগের একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ত্যাগ এবং বিচারক হিসেবে অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তিনি তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত এবং একজন ‘ভদ্রলোক’ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি
সমালোচকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে, তিনি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখেন না। তাঁর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াকেও অনেকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা হিসেবে দেখেন, যা ফোর্বস-এর মতো আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনগুলোর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে। সমালোচকদের মতে, তাঁর মূল ভূমিকা হবে বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোকে অনুমোদন দেওয়া।
অভিজ্ঞতার আলোকে ভূমিকা
তবে, তাঁর দুদক এবং বিচার বিভাগের অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করা যায় না। রাষ্ট্রপতির কাছে যখন কোনো আইন স্বাক্ষরের জন্য যায়, তখন সংবিধানের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যতা বিচারে তাঁর আইনি জ্ঞান একটি বড় সম্পদ। এছাড়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা পরোক্ষভাবে হলেও অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।
নিম্নলিখিত সারণিতে তাঁর জীবনের প্রধান মাইলফলকগুলো তুলে ধরা হলো:
| সময়কাল | ঘটনা বা পদবী | গুরুত্ব |
| ১৯৪৯ | পাবনায় জন্মগ্রহণ | – |
| ১৯৭১ | মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ | পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক |
| ১৯৭৫ | এলএলবি ডিগ্রি অর্জন | আইন পেশার ভিত্তি |
| ১৯৮২ | বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান | বিচারক হিসেবে কর্মজীবন শুরু |
| ২০০৬ | জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর | দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতার সমাপ্তি |
| ২০১১-২০১৬ | কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) | পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত |
| ২০১৭ | সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ | সক্রিয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ |
| ২০২৩ (১৩ ফেব্রুয়ারি) | রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত | বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত |
| ২০২৩ (২৪ এপ্রিল) | শপথ গ্রহণ | রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ |
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের জীবন একজন মাঠের মুক্তিযোদ্ধা থেকে বিচারক, এবং পরিশেষে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরোহণের এক বর্ণাঢ্য উপাখ্যান। তিনি এমন এক সময়ে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হয়েছেন যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
যদিও সংবিধান তাঁকে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা দেয়নি, তবুও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা এবং দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনগুলোতে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন কীভাবে এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কতটা সফল হন, তা দেখার জন্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।











