Mother Tongue in Globalization: একটি ভাষা কেবল মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের সাধারণ মাধ্যম নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মা, তার অন্তর্নিহিত সংস্কৃতি এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারক । পৃথিবীতে বর্তমানে আনুমানিক ৭,০০০-এর বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। তবে ইউনেস্কো (UNESCO)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভাষাই আজ চরম বিপন্নতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে । পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে গড়ে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিচয় । আধুনিক বিশ্বের এই দ্রুতগামী পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বিশ্বায়ন। মুক্ত বাজার অর্থনীতি, ইন্টারনেট প্রযুক্তির বিস্তার এবং ভিনদেশি সংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশ আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি স্থানীয় মাতৃভাষার অস্তিত্বের সামনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষার দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স চোখে পড়ে। প্রায় ২৮৪ মিলিয়ন ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে বাংলা বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম বহুল ব্যবহৃত ভাষা । ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে যে জাতি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, আজ সেই জাতিকেই বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতে নিজেদের ভাষার অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে । একদিকে যেমন ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের বৈশ্বিক স্বীকৃতি রয়েছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে, কর্পোরেট জগতে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োগ ক্রমশ কমছে । এই প্রবন্ধে আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব, বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এটি কি নিছকই একটি অবলুপ্তির পথ, নাকি নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এক আধুনিক রূপান্তরের সূচনা?
বিশ্বায়নের প্রভাবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির বহুমুখী সংকট
বিশ্বায়ন সমগ্র বিশ্বকে একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত করেছে, যেখানে ভৌগোলিক সীমানার গুরুত্ব অনেকটাই ম্লান। কিন্তু এই অবাধ যোগাযোগের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক ভাষার ব্যবহার, যা মূলত ইংরেজি । বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আঞ্চলিক ও স্থানীয় ভাষাগুলো আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। মাতৃভাষার এই সংকট কেবল শব্দভাণ্ডার হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ এবং ইংরেজির বৈশ্বিক আধিপত্য
বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ভাষাকে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রধান বাহন হিসেবে দেখা হয় । যখন কোনো আধিপত্য বিস্তারকারী দেশ বা সংস্কৃতি তাদের নিজস্ব ভাষাকে অন্য ভাষাভাষীর ওপর চাপিয়ে দেয় বা কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন তাকে ‘ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’ (Linguistic Imperialism) বলা হয় । ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ভারত উপমহাদেশে ইংরেজির যে ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল, বিশ্বায়নের যুগে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রসারের ফলে তা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে । বর্তমানে ইংরেজি জানা মানেই একটি নিরাপদ ও সচ্ছল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতো সংস্থাগুলো “Learn English to Change Life”-এর মতো স্লোগান দিয়ে মানুষকে ইংরেজি শিখতে উৎসাহিত করছে, যা স্থানীয়দের মনে মাতৃভাষার প্রতি এক ধরণের হীনম্মন্যতা তৈরি করছে ।
শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়ন
বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মতো বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে বর্তমানে এক চরম ‘সমাজ-ভাষাতাত্ত্বিক বৈষম্য’ (Sociolinguistic stratification) তৈরি হয়েছে । উচ্চশিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, সিভিল সার্ভিস এবং কর্পোরেট সেক্টরের মতো ‘এলিট’ ক্ষেত্রগুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহার ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে । প্রাইভেট সেক্টর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য এক ধরনের ‘শিক্ষাগত বর্ণপ্রথা’ (Educational apartheid) তৈরি করেছে । বাবা-মায়েদের মধ্যেও সন্তানদের ইংরেজি শেখানোর তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাতৃভাষার নিবিড় চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে । অনেকেই মনে করেন, বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা বা আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়, যা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ।
রাষ্ট্রীয় নীতিতে ভাষার প্রান্তিকীকরণ
ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে রাষ্ট্রীয় নীতির শিথিলতাও অনেকাংশে দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন (১৯৮৭)’ থাকা সত্ত্বেও নীতি বাস্তবায়নের ব্যর্থতার কারণে সরকারি ও বেসরকারি অনেক স্তরেই বাংলার প্রয়োগ ঐচ্ছিক হয়ে দাঁড়িয়েছে । সেনেগাল বা মরক্কোর মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও বিশ্বায়নের ঠিক একই প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, যেখানে ফরাসি বা ইংরেজির মতো গ্লোবাল ভাষাগুলো স্থানীয় ভাষার জায়গা দখল করে নিয়েছে ।
| সংকটের ক্ষেত্র | বিশ্বায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব | মাতৃভাষা ও সমাজের ওপর ফলাফল |
| শিক্ষাব্যবস্থা |
ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি অভিভাবক ও সমাজের প্রবল আকর্ষণ । |
মাতৃভাষার নিবিড় চর্চা কমে যাওয়া এবং সমাজে ‘শিক্ষাগত বর্ণপ্রথা’ তৈরি হওয়া । |
| কর্পোরেট জগৎ |
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে ইংরেজির একচেটিয়া আধিপত্য । |
পেশাগত ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও ব্যবহার হ্রাস পাওয়া । |
| সাংস্কৃতিক মাধ্যম |
ডাব করা বিদেশি সিনেমা, গান এবং ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের প্রসার । |
স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অনীহা এবং বিদেশি শব্দের অন্ধ অনুকরণ । |
| মনস্তত্ত্ব |
ইংরেজিকে সামাজিক মর্যাদা এবং বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি হিসেবে ধরা । |
মাতৃভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে হীনম্মন্যতা এবং আত্মপরিচয়ের সংকট । |
বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর?
ভাষার একটি নিজস্ব প্রাণশক্তি থাকে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাষা যদি নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারে, তবে তার মৃত্যু অনিবার্য। আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এই গভীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বাংলা ভাষা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তির পথে না হেঁটে একটি বিশাল এবং অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং নতুন প্রজন্মের জীবনযাত্রার গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বাংলা ভাষার যে নতুন রূপ তৈরি হয়েছে, তা অনেক ভাষাবিদের কাছেই চিন্তার বিষয় হলেও এটি ভাষার টিকে থাকার একটি বিকল্প কৌশল।
‘বাংলিশ’ (Banglish) এবং মিশ্র ভাষার উত্থান
প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছে, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘বাংলিশ’ (Bangla + English) বলা হয় । দৈনন্দিন কথোপকথন, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটে তরুণ প্রজন্ম পশ্চিমা উচ্চারণে বাংলা বলা এবং বাংলা বাক্যের মাঝে প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা শুরু করেছে । এমনকি বাংলা শব্দগুলোকে ইংরেজি হরফে লেখার (Romanization) প্রবণতাও মারাত্মকভাবে বেড়েছে । ভাষাবিদদের একাংশ একে মাতৃভাষার শুদ্ধতা এবং প্রমিত কাঠামোর প্রতি এক বিশাল হুমকি হিসেবে দেখেন । তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই হাইব্রিডাইজেশন বিশ্বায়নের একটি স্বাভাবিক উপজাত, যেখানে গ্লোবাল মিডল ক্লাস দ্রুত যোগাযোগের জন্য ভাষার এই মিশ্র রূপটিকে বেশি সুবিধাজনক মনে করছে ।
সাহিত্য ও ডিজিটাল কন্টেন্টের নবজাগরণ
ডিজাইটাল যুগে বাংলা সাহিত্যেরও ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। একসময়কার মুদ্রিত বইয়ের জায়গা দ্রুত দখল করে নিচ্ছে ই-বুক, অডিওবুক এবং ওয়াটপ্যাড (Wattpad), টোয়াইন (Twine)-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে বইয়ের ডিজিটাল প্রকাশনা এবং অনুবাদের ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ নতুন প্রজন্ম এখন ল্যাপটপ বা ট্যাবে বই পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে । আধুনিক সাহিত্যে প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে ক্লাইমেট ফিকশন, ইন্টারেক্টিভ স্টোরিটেলিং এবং মাইক্রো-ফিকশনের মতো নতুন ঘরানার উদ্ভব হয়েছে, যা পাঠককে প্যাসিভ শ্রোতা থেকে অ্যাকটিভ অংশগ্রহণকারীতে পরিণত করছে । কবিতার ক্ষেত্রেও আধুনিকতাবাদ এবং পরাবাস্তববাদের মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে, যা সমসাময়িক সমাজের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধকে তুলে ধরছে ।
সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
বিশ্বায়নের ফলে ভিনদেশি সংস্কৃতির যে অবাধ প্রবাহ শুরু হয়েছে, তা মানুষের চিন্তাধারায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা এবং প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতির (যেমন- হিন্দি ও ইংরেজি) অনুপ্রবেশ ঘটছে । মানুষ এখন প্রমিত বাংলায় চিন্তা করার পরিবর্তে অন্য ভাষায় চিন্তা করে তা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘কারণ’ বলার পরিবর্তে হিন্দির অনুকরণে ‘কেনো কি’ (Kyun ki) বলা হচ্ছে, অথবা ‘দৈনন্দিন জীবনে’ না বলে ‘ডেলি লাইফে’ বলা হচ্ছে । এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন স্থানীয় মানুষের নিজস্ব স্বকীয়তা নষ্ট করে একটি বৈশ্বিক সমজাতীয় সংস্কৃতি (Cultural homogenization) চাপিয়ে দিচ্ছে, যা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে ব্যাহত করছে ।
| ভাষার মাধ্যম | প্রমিত বাংলা রূপ (Standard) | রূপান্তরিত বা মিশ্র রূপ (Banglish/Hybrid) |
| দৈনন্দিন কথোপকথন | আমার আজ খুব মন খারাপ। |
আমার আজ খুব স্যাড লাগছে। |
| সোশ্যাল মিডিয়া | আমি এই ছবিটি পছন্দ করেছি। |
আমি এই পিকচারটাতে লাইক দিয়েছি। |
| ডিজিটাল মেসেজিং | তুমি কেমন আছো? |
Tumi kemon acho? (রোমান হরফে বাংলা) |
| কর্পোরেট যোগাযোগ | আমরা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছি। |
আমরা প্রপোজালটা রিভিউ করে দেখছি। |
সীমান্ত অঞ্চল এবং আঞ্চলিক ভাষার বিবর্তন: টাকি ও ইছামতীর প্রেক্ষাপট
বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শহুরে গণ্ডির বাইরে সীমান্ত অঞ্চলগুলোর দিকে তাকাতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ অনেক সময় দেশের সীমানা দ্বারা ভাষাকে ভাগ করতে চাইলেও, সাংস্কৃতিক শিকড় এবং আঞ্চলিক ভাষার শক্তিশালী বন্ধন সেই কৃত্রিম বিভাজনকে মানে না। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে কান পাতলে এই ভাষাগত মেলবন্ধনের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। সীমানার কাঁটাতার রাজনৈতিক মানচিত্রকে দ্বিখণ্ডিত করলেও মানুষের মুখের ভাষা ও সংস্কৃতির বহমান স্রোতকে আটকে রাখতে পারেনি।
টাকি সীমান্তে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন
কলকাতার অদূরে ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি ছোট কিন্তু ঐতিহাসিক শহর হলো টাকি । এই ইছামতী নদীই ভারত এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সীমানা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রতি বছর দুর্গাপূজার দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের সময় এই নদীর বুকেই দুই বাংলার মানুষের এক অভাবনীয় মিলনমেলা ঘটে । প্রখ্যাত পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’ চলচ্চিত্রেও এই ঐতিহ্যের নিপুণ চিত্রায়ণ দেখা যায় । হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দুই দেশের মানুষ নৌকায় করে একে অপরের কাছাকাছি আসে, কুশল বিনিময় করে এবং মিষ্টিমুখ করে । এই উৎসব প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সীমানার ঊর্ধ্বে গিয়ে একই ভাষা এবং সংস্কৃতি মানুষকে কীভাবে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারে এবং বিশ্বায়নের যুগেও শেকড়ের টান কতটা প্রবল হতে পারে।
পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের উপভাষার মিথস্ক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গের প্রমিত বাংলা (Standard Bengali) এবং পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশের) আঞ্চলিক ভাষার (যাকে অনেক সময় ‘বঙ্গালী’ বা ‘বাঙাল ভাষা’ বলা হয়) মধ্যে উচ্চারণ, শব্দচয়ন এবং ব্যাকরণগত গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে । যেমন, প্রমিত বাংলায় যেখানে “আমি খেয়েছি” বা “আমি গিয়েছি” ব্যবহৃত হয়, সেখানে ইস্টার্ন বেঙ্গলি ডায়ালেক্টে “আমি খাইছি” বা “গেছি” ব্যবহৃত হয় । তবে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মানুষের আচরণ, সন্তান ধারণের হার (Fertility rates) এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ক্রমশ একটি গভীর মিল তৈরি হয়েছে । বিশ্বায়নের প্রভাবে যখন সর্বত্র একটি সমজাতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন এই সীমান্ত অঞ্চলগুলো তাদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং ভাষাগত নৈকট্য ধরে রেখে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ।
আঞ্চলিক ভাষার প্রান্তিকীকরণ ও ‘ল্যাঙ্গুয়েজিজম’ (Linguicism)
বিশ্বায়ন এবং প্রমিত ভাষার দাপটে সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক নিজস্ব উপভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে। গণমাধ্যম, ইন্টারনেট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল প্রমিত বাংলার চর্চা হওয়ায়, স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষার শব্দগুলো ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছে । পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া বা পুরুলিয়ার মতো অঞ্চলের ভাষাকে অনেক সময় সমাজের উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত শ্রেণী ‘অমার্জিত’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করে রাখে । ভাষার ওপর ভিত্তি করে মানুষের প্রতি এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজিজম’ বা ভাষাগত বৈষম্য (Linguistic Discrimination) বলা হয় । এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের আদি উপভাষা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়।
| তুলনামূলক দিক | পশ্চিমবঙ্গ (প্রধানত রাঢ়ী ও প্রমিত উপভাষা) | বাংলাদেশ (প্রধানত বঙ্গালী/বাঙাল উপভাষা) |
| ব্যাকরণগত গঠন |
আমি খেয়েছি / আমি গিয়েছি । |
আমি খাইছি / আমি গেছি । |
| সাংস্কৃতিক ও শব্দের প্রভাব |
হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষণীয় । |
নিজস্ব লোকজ শব্দ এবং আরবি-ফারসি শব্দের ঐতিহাসিক মিশ্রণ বেশি । |
| সীমান্ত এলাকার মিথস্ক্রিয়া |
ইছামতী নদীর তীরে টাকি অঞ্চলে দুই বাংলার ভাষার অদ্ভুত মিশ্রণ শোনা যায় । |
সাতক্ষীরা বা যশোর সীমান্তে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক প্রভাব ও প্রমিতকরণের চাপ লক্ষ্য করা যায়। |
| ভাষাগত চ্যালেঞ্জ |
আঞ্চলিক শব্দগুলো প্রমিতকরণের চাপে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে । |
কর্পোরেট আগ্রাসনে গ্রামীণ উপভাষাগুলো শহুরে হাইব্রিড রূপান্তরের শিকার হচ্ছে । |
ডিজিটাল যুগে মাতৃভাষা রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অভাবনীয় ভূমিকা
একুশ শতকের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ইন্টারনেটের শুরুর দিকে বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নেতিবাচক ছিল, কারণ তখন সাইবার জগতে ইংরেজি এবং গুটিকয়েক ইউরোপীয় ভাষার একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে এআই, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) এবং মেশিন লার্নিং (ML) প্রযুক্তির কল্যাণে মাতৃভাষার ডিজিটাল রূপান্তরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে এআই আজ সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
এআই (AI) টুলস এবং বাংলা ভাষার ডিজিটাল বিকাশ
মাতৃভাষা সংরক্ষণে এবং ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে ভারত সরকার ‘ভাষিণী’ (Bhashini) এবং ‘ভারতজেন’ (BharatGen)-এর মতো প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যা ভারতের ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও উন্নত এআই সহায়তা প্রদান করছে । টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট তাদের ‘প্রজেক্ট ইলোরা’ (Project Ellora)-এর মাধ্যমে মুন্ডারি (Mundari)-এর মতো বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছে, যা ভাষার টিকে থাকার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মডেল । অন্যদিকে, ‘Bengali.AI’-এর মতো ওপেন-সোর্স উদ্যোগগুলো বাংলা ভাষার স্পিচ রিকগনিশন (Speech recognition), টেক্সট অ্যানালাইসিস এবং অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (OCR) মডেল তৈরির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে বিশাল ভূমিকা রাখছে । এই উদ্যোগগুলোর ফলে সাধারণ মানুষ এখন ভয়েস কমান্ড দিয়ে বাংলায় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন।
লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) এবং সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস
আধুনিক এআই মডেলগুলো এখন আর কেবল অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, LLaMA 3, GPT-3.5 Turbo এবং Gemini 1.5 Pro-এর মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) ব্যবহার করে বর্তমানে বাংলায় হেট স্পিচ (Hate speech) বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্য অত্যন্ত সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে । ‘জিরো-শট’ (Zero-Shot) এবং ‘ফিউ-শট লার্নিং’ (Few-Shot Learning) পদ্ধতি ব্যবহার করে এই মডেলগুলো খুব কম ট্রেনিং ডেটা নিয়েও বাংলা টেক্সটের গভীর অর্থ বুঝতে পারে । এছাড়া ‘BanglaBERT’ মডেল ব্যবহার করে বাংলা এবং বাংলিশ মিশ্রিত ডেটাসেটে ৭১.৩০% সফলতার সাথে মানুষের আবেগ (Emotion Detection) শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে । সংবাদপত্রের টেক্সট ক্লাসিফিকেশনের ক্ষেত্রেও LLaMA 3.1-8B এবং Qwen 2.5 7B মডেলগুলো অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে ।
প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং ডেটাসেটের সীমাবদ্ধতা
এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। বিশ্বের জনপ্রিয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর (LLM) ট্রেনিং ডেটার প্রায় ৯০ শতাংশই হলো ইংরেজি ভাষার । মেটার (Meta) LLaMA 3 মডেলে ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য বৈশ্বিক ভাষার ডেটা রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ । এআই গবেষকরা দেখেছেন, মডেলগুলোতে বাংলা বা অন্য কোনো স্বল্প-সম্পদযুক্ত (Low-resource) ভাষার দক্ষতা বাড়াতে গেলে অনেক সময় মডেলের ইংরেজির সঠিক আউটপুট ব্যাহত হয় । ফলে বড় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক ভাষার উন্নয়নে খুব বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। এছাড়া, ‘বাংলিশ’-এর মতো অনানুষ্ঠানিক (Informal) মিশ্র ভাষার কারণে এআই-এর কাছে সঠিক অনুবাদ বা প্রসঙ্গ বোঝা এখনো একটি অত্যন্ত জটিল কাজ । প্রমিত বাংলার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষাকে সংরক্ষণের জন্য ‘BanglaDial’ নামক একটি কর্পাস তৈরি করা হয়েছে, যেখানে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুরসহ ১১টি আঞ্চলিক উপভাষার ৬০,৭২৯টি বাক্য সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা এআই মডেলগুলোকে মাতৃভাষার বৈচিত্র্য বুঝতে সাহায্য করছে ।
| এআই প্রয়োগের ক্ষেত্র | মাতৃভাষার জন্য ইতিবাচক দিক (সুযোগ) | প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ |
| লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) |
LLaMA 3, GPT-3.5 ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ এবং জটিল টেক্সট জেনারেশন । |
এআই মডেলের ট্রেনিং ডেটায় বাংলার পরিমাণ ৫ শতাংশেরও কম থাকা । |
| সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস |
BanglaBERT ব্যবহার করে ৭১.৩০% সফলতায় অনলাইনে মানুষের আবেগ শনাক্ত করা । |
‘বাংলিশ’ বা ব্যাকরণহীন মিশ্র ভাষার ক্ষেত্রে এআই অনেক সময় বিভ্রান্ত হয় । |
| স্পিচ রিকগনিশন |
ভয়েস টাইপিং এবং ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে নিরক্ষর মানুষেরও ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার । |
আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং বিভিন্ন উপভাষা সঠিকভাবে বুঝতে এআই-এর প্রবল সীমাবদ্ধতা । |
| ডিজিটাল আর্কাইভ |
বিলুপ্তপ্রায় ভাষা এবং উপভাষাগুলোর তথ্যভাণ্ডার (Corpus) ডিজিটালভাবে তৈরি করা । |
গ্লোবাল টেক জায়ান্টদের মাতৃভাষা উন্নয়নে বাণিজ্যিক অনাগ্রহ এবং ডেটা বায়াস । |
বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ডিজিটাল বাজার
একটি ভাষা কেবল আবেগের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। ভাষার টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি বা ‘Economic value of language’ । বিশ্বায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে মনে করা হতো, কর্পোরেট জগতে বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সফল হতে হলে কেবল ইংরেজি জানাই যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয়করণ বা লোকালাইজেশনের (Localization) যুগে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের যুগে মাতৃভাষার ব্যবহার আজ ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক আকর্ষণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং আঞ্চলিক ভাষার অভূতপূর্ব চাহিদা
ভারতের ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (IAMAI) এবং কান্টার (KANTAR)-এর ‘ইন্টারনেট ইন ইন্ডিয়া ২০২৪’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে । এই বিশাল বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো গ্রামীণ ভারত, যেখানে সক্রিয় ব্যবহারকারী ৪৮৮ মিলিয়ন । সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯৮% মানুষ তামিল, তেলেগু, মালয়ালম বা বাংলার মতো আঞ্চলিক বা ইন্ডিক (Indic) ভাষায় কন্টেন্ট দেখতে পছন্দ করেন । এমনকি শহুরে ব্যবহারকারীদের মধ্যেও ৫৭% মানুষ আঞ্চলিক ভাষার কন্টেন্ট খোঁজেন । অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দেশের ৯৮% মানুষ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলায় কথা বলেন । ফলে ব্র্যান্ডগুলোর প্রচার ও প্রসারের জন্য ‘বাংলা কন্টেন্ট’ তৈরি করা এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং গভীর আবেগীয় সংযোগ তৈরির জন্য এটি একটি ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তা ।
ডিজিটাল মার্কেটিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বুম
ভারতের ডিজিটাল অ্যাডভার্টাইজিং মার্কেট দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে তা প্রায় ৬৯,৮৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে । এই বিশাল বাজারের সবচেয়ে বড় রূপান্তর ঘটছে ‘ভার্নাকুলার কন্টেন্ট’ বা আঞ্চলিক ভাষার কন্টেন্টের মাধ্যমে। বর্তমানে ৭৩% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আঞ্চলিক ভাষায় কন্টেন্ট গ্রহণ করছেন, যা প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলারের (৪.৫ লক্ষ কোটি টাকা) একটি বিশাল মার্কেট তৈরি করেছে । ইউটিউব, ফেসবুক এবং ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মগুলোতে মাতৃভাষায় ভিডিও তৈরি, ব্লগিং এবং ভয়েসওভার আর্টিস্টদের জন্য বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে । মানুষ এখন স্থানীয় ভাষায় পণ্য কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, যার ফলে ই-কমার্স সাইটগুলোও বাধ্য হয়ে মাতৃভাষায় তাদের ইন্টারফেস তৈরি করছে ।
রাষ্ট্রীয় নীতি এবং কর্মক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োগ
মাতৃভাষার এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি পর্যায়েও বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC) নির্দেশ দিয়েছে যে, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শহরের সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সাইনবোর্ড এবং হোর্ডিংয়ের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে । এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ‘স্টেট এডুকেশন পলিসি ২০২৩’ প্রণয়ন করেছে, যেখানে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে । পেশাগত ক্ষেত্রেও, সরকারি চাকরি এবং পাবলিক সেক্টরে বাংলা ভাষার দক্ষতা কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ার উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা প্রমাণ করে যে ইংরেজি ছাড়াও মাতৃভাষার শক্তিশালী অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে ।
| অর্থনৈতিক খাত | বিশ্বায়নের প্রভাবে সৃষ্ট সুযোগ | মাতৃভাষার ভূমিকা ও অর্থনৈতিক প্রভাব |
| ই-কমার্স ও ব্যবসা |
আন্তর্জাতিক পণ্য খুব সহজে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার সুযোগ । |
সাইট লোকালাইজেশন এবং স্থানীয় ভাষায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি বহুগুণ বৃদ্ধি । |
| ডিজিটাল মিডিয়া |
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এবং গ্লোবাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন । |
আঞ্চলিক ভাষায় ভিডিও ও ব্লগ তৈরির মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের মার্কেট ধরা । |
| আইটি ও প্রযুক্তি |
এআই মডেল এবং ভাষা-ভিত্তিক আধুনিক সফটওয়্যার তৈরি । |
বাংলা টেক্সট, স্পিচ রিকগনিশন এবং উন্নত ট্রান্সলেশন টুলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান । |
| সরকারি উদ্যোগ |
আইনি, দাপ্তরিক এবং প্রশাসনিক কাজ স্থানীয় মানুষের বোধগম্য করা । |
সাইনবোর্ডে এবং দাপ্তরিক কাজে বাধ্যতামূলক মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা । |
মাতৃভাষা সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও নীতিগত পদক্ষেপ
বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষাকে কেবল একটি জাদুঘরের প্রদর্শনী বস্তুতে পরিণত হতে না দিয়ে, একে একটি জীবন্ত ও গতিশীল মাধ্যম হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ। ভাষা সংরক্ষণের এই প্রক্রিয়ায় সরকারি, বেসরকারি, প্রযুক্তিবিদ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। ইউনেস্কো (UNESCO) ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের থিম নির্ধারণ করেছিল, “বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মগত শিখনের একটি স্তম্ভ” (Multilingual education is a pillar of intergenerational learning) । অর্থাৎ, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান হস্তান্তরের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো মাতৃভাষা।
ভবিষ্যতে মাতৃভাষাকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। মাতৃভাষাকে কেবল প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে আটকে না রেখে উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বাংলা ভাষায় নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তৈরি করতে হবে, যাতে ইংরেজি শব্দের ওপর নির্ভরতা কমে । দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ট্রেনিং ডেটাসেটে বাংলা এবং এর বিভিন্ন উপভাষার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। ‘BanglaDial’-এর মতো উদ্যোগগুলোকে আরও প্রসারিত করে ভাষার ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করতে হবে । সর্বোপরি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাতৃভাষায় কথা বলাকে হীনম্মন্যতার চোখে না দেখে, একে আত্মপরিচয়ের অহংকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
চূড়ান্ত ভাবনা
আমাদের আজকের এই সুদীর্ঘ ও গবেষণাধর্মী আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল: বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? ওপরের বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি একপাক্ষিক বা হতাশাজনক ‘টিকে থাকার লড়াই’ হিসেবে আখ্যায়িত করা ভুল হবে। বিশ্বায়নের প্রবল ঢেউয়ে ভাষা তার আদি ও অকৃত্রিম রূপ কিছুটা হারালেও, সে প্রতিনিয়ত যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে নিচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এই বিতর্কে ইংরেজি বা অন্যান্য গ্লোবাল ভাষার আধিপত্য, শিক্ষাক্ষেত্রে অবহেলা এবং কর্পোরেট আগ্রাসনের কারণে মাতৃভাষা যে গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই । কিন্তু একই সঙ্গে ‘বাংলিশ’-এর মতো হাইব্রিড ভাষার উদ্ভব, সাহিত্যের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাষার নতুন প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, স্রোতের প্রতিকূলেও মাতৃভাষা তার নিজস্ব গতিপথ খুঁজে নিতে সক্ষম ।
ডিজিটাল বিশ্বে এআই প্রযুক্তি, মেশিন লার্নিং এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং-এর মতো আধুনিক হাতিয়ারগুলো আজ আমাদের মাতৃভাষাকে বৈশ্বিক ডিজিটাল বৈষম্য কাটিয়ে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে । ভাষার স্থানীয়করণের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্সে যে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তা মাতৃভাষার ভবিষ্যৎকে আরও সুরক্ষিত করবে । তবে ভাষার এই রূপান্তরকে ইতিবাচক দিকে পরিচালিত করতে হলে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা ও শক্তিশালী ভাষানীতির প্রয়োজন । আইন করে কেবল সাইনবোর্ডে বাংলা লিখলেই ভাষার সম্মান রক্ষা পাবে না, ভাষার প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং পেশাগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে । পরিশেষে, বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা: টিকে থাকার লড়াই নাকি রূপান্তর? এই প্রশ্নের সবচেয়ে যৌক্তিক ও আশাব্যঞ্জক উত্তর হলো, এটি অস্তিত্ব রক্ষার একটি অনিবার্য রূপান্তর। শেকড়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে পারলেই আমাদের মাতৃভাষা এই রূপান্তরের পথ ধরে যুগ যুগ ধরে স্বমহিমায় টিকে থাকবে।











