মোটরসাইকেলের মাইলেজ বাড়ানো শুধুমাত্র জ্বালানি খরচ কমানোর বিষয় নয়, বরং এটি সঠিক রাইডিং কৌশল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আপনার বাইকের কর্মক্ষমতা উন্নত করার একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি । ভারতীয় বাজারে জ্বালানি দক্ষতা মোটরসাইকেল ক্রেতাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে J.D. Power এর ২০২৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী জ্বালানি দক্ষতা ভারতীয় গ্রাহকদের সন্তুষ্টির একটি প্রধান নির্ধারক । সঠিক উপায়ে মোটরসাইকেল চালালে আপনি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত মাইলেজ বৃদ্ধি করতে পারেন । এই নিবন্ধে আমরা পাঁচটি প্রমাণিত এবং কার্যকরী পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব যা আপনার মোটরসাইকেলের জ্বালানি সাশ্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
সঠিক রাইডিং স্টাইল বজায় রাখা
মোটরসাইকেলের মাইলেজ বৃদ্ধিতে আপনার রাইডিং স্টাইল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । অনেক রাইডার মনে করেন যে শুধুমাত্র মেকানিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণই যথেষ্ট, কিন্তু বাস্তবে আপনার চালনার ধরন জ্বালানি খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং প্রায়শই এটি যান্ত্রিক কারণগুলির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।
ধীরে ধীরে গতি বৃদ্ধি করুন
হঠাৎ থ্রটল খোলা এবং দ্রুত গতি বৃদ্ধি মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি খরচ বাড়ায় । স্থির অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে ত্বরণ বাড়ানো উচিত এবং ইঞ্জিন তার সর্বোত্তম RPM রেঞ্জে থাকলেই গিয়ার পরিবর্তন করা উচিত । TVS Motor Company-র বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আপনি সব সময় Grand Prix রেসারের মতো চালান তবে এটি আপনার বাইকের মাইলেজের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে । স্মুথ এবং ধীরে ধীরে থ্রটল কন্ট্রোল অপ্রয়োজনীয় চাপ কমায়, RPM-কে সর্বোত্তম পরিসরে রাখে এবং মাইলেজ উন্নত করে ।
নির্দিষ্ট গতিসীমা বজায় রাখুন
বেশিরভাগ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড তাদের স্পিডোমিটারে “ইকোনমি স্পীড” উল্লেখ করে থাকে । ভারতীয় রাস্তার জন্য ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চালানো সবচেয়ে জ্বালানি-সাশ্রয়ী । যদি আপনি ৬০ কিমি/ঘন্টার বেশি গতিতে চালান, তবে টপ গিয়ার ব্যবহার করুন যা স্থিতিশীল এবং মসৃণ জ্বালানি খরচ নিশ্চিত করে । ডিফেন্সিভ বাইকিং কৌশল অনুসরণ করে ৪০ থেকে ৫৫ কিমি/ঘন্টার মধ্যে চালানো সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেয় ।
আকস্মিক ব্রেকিং এড়িয়ে চলুন
হঠাৎ ব্রেক করা এবং ঘন ঘন গতি পরিবর্তন ইঞ্জিনের কাজের চাপ বাড়ায় এবং বেশি জ্বালানি পোড়ায় । যখন আপনি সামনে লাল বাতি বা ধীরগতির ট্রাফিক দেখবেন, থ্রটল থেকে হাত সরিয়ে নিন এবং ইঞ্জিন ব্রেকিং ব্যবহার করে ধীরে ধীরে গতি কমান । ট্রাফিক প্যাটার্ন অনুমান করা এবং ক্রমাগত স্টপ-এন্ড-গো রাইডিং এড়ানো জ্বালানি সাশ্রয় করে । স্মুথ থ্রটল কন্ট্রোল এবং ধীরে ধীরে ব্রেকিং আয়ত্ত করা রাইডাররা মাইলেজ এবং সামগ্রিক রাইড কোয়ালিটিতে তাৎক্ষণিক উন্নতি লক্ষ্য করেন ।
সঠিক টায়ার প্রেসার বজায় রাখা
টায়ার প্রেসার মোটরসাইকেলের জ্বালানি দক্ষতায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত ফ্যাক্টর । সঠিক টায়ার প্রেসার টায়ার এবং রাস্তার পৃষ্ঠের মধ্যে সর্বোত্তম যোগাযোগ নিশ্চিত করে, যা জ্বালানি খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলে ।
কম প্রেসারের প্রভাব
U.S. Department of Energy-র গবেষণা অনুযায়ী, চারটি টায়ারে প্রতি ১ PSI প্রেসার কমলে গ্যাস মাইলেজ ০.২ শতাংশ কমে যায় । যদি একটি মোটরসাইকেলের টায়ার ১০ PSI কম ফোলানো থাকে, তাহলে জ্বালানি সাশ্রয়ে ২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে । Oak Ridge National Laboratory-র একটি বিস্তারিত গবেষণায় দেখা গেছে যে সুপারিশকৃত প্রেসারের ৭৫ শতাংশে চললে বিভিন্ন গতিতে জ্বালানি সাশ্রয় প্রায় ২-৩ শতাংশ কমে যায় । যখন টায়ার সুপারিশকৃত প্রেসারের ৫০ শতাংশে থাকে, তখন ৪০ মাইল প্রতি ঘণ্টায় জ্বালানি সাশ্রয় প্রায় ১০ শতাংশ এবং ৮০ মাইল প্রতি ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কম হয় ।
কম টায়ার প্রেসারের অন্যান্য সমস্যা
টায়ার প্রেসার কম থাকলে রোলিং রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পায় যার ফলে ইঞ্জিনকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হয় । এটি অসম ট্রেড ওয়্যার সৃষ্টি করে, যেখানে টায়ারের কিনারাগুলো দ্রুত ক্ষয় হয় । ব্রেকিং পারফরম্যান্স খারাপ হয় এবং রোলিং রেজিস্ট্যান্সের কারণে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পায় । National Highway Traffic Safety Administration (NHTSA) এর গবেষণায় দেখা গেছে যে টায়ার প্রেসারে প্রতি ১ শতাংশ হ্রাস জ্বালানি সাশ্রয়ে ০.৩ শতাংশ হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত ।
নিয়মিত প্রেসার পরীক্ষা
কম বায়ুচাপ মানে রাস্তার সাথে আরও বেশি ঘর্ষণ, যা ইঞ্জিনকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে । প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার টায়ার প্রেসার পরীক্ষা করা উচিত এবং ম্যানুফ্যাকচারার-সুপারিশকৃত প্রেসার বজায় রাখা উচিত । সঠিক টায়ার সাইজ ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক স্পোর্টস বাইক মালিক চওড়া টায়ার লাগান যা ইঞ্জিনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে ।
নিয়মিত সার্ভিসিং এবং রক্ষণাবেক্ষণ
মোটরসাইকেলের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ শুধুমাত্র দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করে না, বরং জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখতেও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে । একটি সুস্থ ইঞ্জিন আরও ভালো মাইলেজ প্রদান করে এবং মেশিনের ক্ষতির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় ।
এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার রাখা
এয়ার ফিল্টার মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে প্রবেশকারী বাতাস পরিষ্কার করে এবং ময়লা প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে রোধ করে । যদি এয়ার ফিল্টারে কোনও সমস্যা থাকে, তবে ইঞ্জিনে পরিষ্কার বাতাস প্রবেশ করতে পারে না, যার ফলে ইঞ্জিনের কাজ করতে অসুবিধা হয় এবং মাইলেজ কমে যায় । নিয়মিত এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করা জ্বালানি দক্ষতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন
নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল খারাপ পারফরম্যান্স দেয় এবং বাইকের সামগ্রিক মাইলেজ হ্রাস করে । এই কারণে শুধুমাত্র স্ট্যান্ডার্ড মানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত । ম্যানুফ্যাকচারার দ্বারা নির্দিষ্ট করা ইঞ্জিন অয়েল গ্রেড সর্বদা ব্যবহার করুন সর্বোত্তম পারফরম্যান্স এবং সুরক্ষার জন্য । রাইডিং অভ্যাস এবং অয়েলের ধরন অনুযায়ী সঠিক অয়েল পরিবর্তনের ব্যবধান বেছে নিন ।
স্পার্ক প্লাগ পরীক্ষা
স্পার্ক প্লাগের অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত কারণ এটি দহন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ত্রুটিপূর্ণ বা পুরানো স্পার্ক প্লাগ অসম্পূর্ণ দহন ঘটায় যা জ্বালানি অপচয় করে। কার্বুরেটর বা ফুয়েল ইনজেক্টর পরিদর্শন করা এবং প্রয়োজনে পুনর্নির্ধারণ করা মাইলেজ উন্নতিতে সাহায্য করে । সময়মতো বাইক সার্ভিস করালে মেশিনের ক্ষতির সম্ভাবনা ন্যূনতম পর্যায়ে আসে ।
অয়েল ফিল্টার
কখনও কখনও বিভিন্ন কারণে ইঞ্জিনে ময়লা পৌঁছে যায় । এমন পরিস্থিতিতে যদি আপনার মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে লাগানো অয়েল ফিল্টার ঠিক থাকে, তবে ইঞ্জিনে ময়লা প্রবেশ রোধ করা যায় । এই ফিল্টার কিছু সময়ে খারাপ হয়ে যায়, তাই এটি প্রতিস্থাপন করা উচিত ।
সঠিক গিয়ার ব্যবহার এবং RPM ম্যানেজমেন্ট
ভুল গিয়ারে চালানো ইঞ্জিনে চাপ সৃষ্টি করে এবং জ্বালানি অপচয় করে । সঠিক গিয়ার নির্বাচন এবং RPM ম্যানেজমেন্ট জ্বালানি দক্ষতা সর্বাধিক করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গিয়ারে চালান
প্রয়োজনের চেয়ে কম গিয়ারে চালানো বা উচ্চ গিয়ারে ইঞ্জিনকে টেনে নিয়ে যাওয়া ইঞ্জিনে চাপ দেয় এবং জ্বালানি নষ্ট করে । সর্বদা ইঞ্জিনকে চাপ না দিয়ে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গিয়ারে চালানোর চেষ্টা করুন । বেশিরভাগ কমিউটার বাইক টপ গিয়ারে ৪০-৬০ কিমি/ঘন্টার মধ্যে সর্বোত্তমভাবে পারফর্ম করে ।
ইঞ্জিনের শব্দ শুনুন
আপনার ইঞ্জিনের শব্দ শুনুন – যদি মনে হয় এটি সংগ্রাম করছে বা খুব বেশি রেভ করছে, তাহলে আপনি ভুল গিয়ারে আছেন । ত্বরণ করতে ডাউনশিফ্ট করুন, ক্রুজ করতে আপশিফ্ট করুন । আক্রমণাত্মক ডাউনশিফটিং সামগ্রিক মাইলেজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে । খুব তাড়াতাড়ি আপশিফ্ট করলে আপনি ইঞ্জিন লাগিং করবেন, যা ভিতরের সমস্ত উপাদানের জন্য ক্ষতিকর ।
সর্বোত্তম RPM রেঞ্জ
মাইলেজের জন্য সেরা RPM বাইক অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, তবে সাধারণত ইঞ্জিনকে লাগিং না করে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গিয়ারে কম RPM বজায় রাখা সবচেয়ে দক্ষ । বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের জন্য একটি নিরাপদ RPM সাধারণত স্বাভাবিক অপারেশনের সময় ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ RPM-এর মধ্যে থাকে । কম RPM বজায় রাখা মাইলেজ বাড়াতে পারে কারণ এটি ইঞ্জিনের চাপ এবং জ্বালানি খরচ কমায়, বিশেষত হাইওয়ে রাইডিংয়ের সময়।
গিয়ার শিফটিং এড়িয়ে চলুন
ক্রমাগত গিয়ার পরিবর্তন ক্লাচে অনেক চাপ দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মাইলেজ প্রভাবিত হয় । ভারী গিয়ার শিফটিংয়ের মধ্যে রয়েছে উচ্চ RPM-এ গিয়ার শিফটিং, দ্রুত গিয়ার শিফট এবং এমনকি কম গিয়ার ড্রাইভিং । এই সমস্ত জিনিস ক্লাচ পেড এবং ইঞ্জিনকে প্রভাবিত করে, যার ফলে খারাপ মাইলেজ হয় ।
চেইন লুব্রিকেশন এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ
মোটরসাইকেলের চেইন লুব্রিকেশন একটি প্রায়শই উপেক্ষিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ কাজ যা সরাসরি জ্বালানি দক্ষতাকে প্রভাবিত করে । একটি সঠিকভাবে লুব্রিকেটেড এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ চেইন ইঞ্জিনের কাজের চাপ কমায় এবং মাইলেজ উন্নত করে।
নিয়মিত চেইন লুব্রিকেশন
যদি আপনি এমন কোনও রাস্তা ব্যবহার করেন যা অত্যধিক ধুলো, বালি এবং ময়লায় আচ্ছাদিত, তবে আপনাকে ঘন ঘন চেইন লুব্রিকেট করতে হবে । লুব্রিকেশনের অভাবের কারণে ইঞ্জিন চেইন ঘোরানোর জন্য আরও শক্তি খরচ করে, এইভাবে বর্ধিত পরিমাণে পেট্রোল শোষণ করে । একটি ভালভাবে লুব্রিকেটেড চেইন মসৃণভাবে চলে এবং ইঞ্জিন থেকে পিছনের চাকায় শক্তি স্থানান্তরে ন্যূনতম প্রতিরোধ তৈরি করে ।
চেইন টেনশন পরীক্ষা
সঠিক চেইন টেনশন বজায় রাখা অপরিহার্য কারণ একটি খুব আঁটসাঁট বা খুব ঢিলা চেইন ইঞ্জিনে অতিরিক্ত লোড তৈরি করে । চেইন টেনশন নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং ম্যানুফ্যাকচারারের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সামঞ্জস্য করুন। একটি সঠিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ চেইন শক্তি হারানো কমায় এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করে।
অতিরিক্ত লোড এড়িয়ে চলুন
আপনার বাইকে অতিরিক্ত লোড করা ইঞ্জিনে অপ্রয়োজনীয় চাপ দেয় এবং জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে । শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করুন এবং ম্যানুফ্যাকচারার-সুপারিশকৃত ওজন সীমা মেনে চলুন। ভারী লাগেজ বা অতিরিক্ত আনুষাঙ্গিক সরান যা অ্যারোডাইনামিক ড্র্যাগ বাড়ায় এবং মাইলেজ কমায় ।
অতিরিক্ত আইডলিং এড়িয়ে চলুন
ট্রাফিক স্টপে ইঞ্জিন চালু রাখা অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ করে । যদি থামার সময় ৩০ সেকেন্ডের বেশি হয়, তবে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া উচিত । অতিরিক্ত আইডলিং এড়ানো শুধুমাত্র জ্বালানি সাশ্রয় করে না বরং ইঞ্জিনের অপ্রয়োজনীয় পরিধান কমায় ।
অতিরিক্ত টিপস এবং সেরা অনুশীলন
মানসম্পন্ন জ্বালানি ব্যবহার
ভালো মানের জ্বালানি ব্যবহার করা নিম্নমানের জ্বালানির তুলনায় ভালো মাইলেজ দেয় এবং ইঞ্জিনকে সুস্থ রাখে । নামী পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি ভরা নিশ্চিত করুন এবং অজানা বা সন্দেহজনক উৎস এড়িয়ে চলুন । জ্বালানির মান দহন দক্ষতা এবং সামগ্রিক ইঞ্জিন পারফরম্যান্সকে সরাসরি প্রভাবিত করে ।
রুট পরিকল্পনা করুন
ভারী ট্রাফিক সহ রাস্তা এড়িয়ে চলুন কারণ ক্রমাগত ধীর গতিতে ছোট গিয়ারে চালানো খারাপ মাইলেজ দেয় । আপনার রুট স্মার্টভাবে পরিকল্পনা করুন এবং যেখানে সম্ভব মসৃণ ট্রাফিক ফ্লো সহ রাস্তা বেছে নিন । ট্রাফিক পিক আওয়ার এড়ানো এবং কম ভিড়ের রুট ব্যবহার করা জ্বালানি সাশ্রয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
ব্রেক ড্র্যাগ পরীক্ষা করুন
ব্রেক প্যাড যদি সামান্যভাবেও চাকার সাথে স্পর্শ করে থাকে, এটি ক্রমাগত প্রতিরোধ তৈরি করে যা ইঞ্জিনকে আরও কঠিন পরিশ্রম করতে বাধ্য করে । নিয়মিত ব্রেক সিস্টেম পরিদর্শন করুন এবং নিশ্চিত করুন যে ব্রেক প্যাডগুলি ঠিকমতো কাজ করছে এবং অপ্রয়োজনীয় ড্র্যাগ তৈরি করছে না ।
সরাসরি সূর্যালোকের নিচে পার্কিং এড়িয়ে চলুন
সরাসরি সূর্যালোকের নিচে মোটরসাইকেল পার্ক করা পেট্রোলের বাষ্পীভবন ঘটায় যা জ্বালানি অপচয় করে । যেখানে সম্ভব ছায়াযুক্ত এলাকায় পার্ক করুন বা বাইক কভার ব্যবহার করুন যা জ্বালানি ট্যাঙ্ককে সরাসরি সূর্যালোক থেকে রক্ষা করে।
পেশাদার টিউন-আপ
রুটিন পেশাদার টিউন-আপ নিশ্চিত করে যে সমস্ত সিস্টেম সর্বোত্তমভাবে কাজ করছে । একজন প্রশিক্ষিত মেকানিক এমন সমস্যাগুলি সনাক্ত করতে পারে যা আপনি লক্ষ্য নাও করতে পারেন এবং ইঞ্জিন, কার্বুরেটর এবং অন্যান্য উপাদানগুলিকে সর্বোচ্চ দক্ষতার জন্য ফাইন-টিউন করতে পারে ।
মাইলেজ উন্নতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| পদ্ধতি | সম্ভাব্য মাইলেজ উন্নতি | প্রয়োগের সহজতা |
|---|---|---|
| সঠিক রাইডিং স্টাইল | ১০-১৫% | সহজ |
| সঠিক টায়ার প্রেসার | ২-৮% | অত্যন্ত সহজ |
| নিয়মিত সার্ভিসিং | ৫-১০% | মাঝারি |
| সঠিক গিয়ার ব্যবহার | ৮-১২% | সহজ |
| চেইন লুব্রিকেশন | ৩-৫% | সহজ |
ভারতীয় বাজারে মাইলেজের গুরুত্ব
ভারতীয় মোটরসাইকেল বাজার প্রতিবছর ৩.১৮ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রদর্শন করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে । দুই চাকার গাড়ির জনপ্রিয়তার এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি মূলত জ্বালানি দক্ষতার কারণে যা দুই চাকার গাড়ি প্রদান করে । ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ভারতে পেট্রোল মোটরসাইকেলের বিক্রয় ১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮,৬০২,৯২৫ ইউনিটে পৌঁছেছে ।
J.D. Power-র ২০২৫ সালের ইন্ডিয়া টু-হুইলার APEAL স্টাডি অনুযায়ী, জ্বালানি দক্ষতা ভারতীয় অটোমোটিভ বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর । মোটরসাইকেল ইকোনমি সেগমেন্টে Honda ৮৭৩ স্কোর নিয়ে সর্বোচ্চ র্যাঙ্ক করেছে, যা জ্বালানি দক্ষতা গ্রাহক সন্তুষ্টিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রমাণ করে ।
ভারতে সর্বোচ্চ মাইলেজ প্রদানকারী মোটরসাইকেলগুলির মধ্যে Hero Splendor Plus XTEC ৮৩.২ কিমি/লিটার মাইলেজ এবং TVS Sport ৭০ কিমি/লিটার মাইলেজ প্রদান করে । Honda CB125F আন্তর্জাতিকভাবে ৬৫ কিমি/লিটার পর্যন্ত অফিসিয়াল মাইলেজ দেয়, যেখানে বাস্তব-বিশ্বের রিপোর্ট ১১৫-১২৩ mpg দেখায় ।
সাধারণ ভুল যা এড়িয়ে চলা উচিত
চালানোর সময় ক্লাচ লিভার চাপা
চালানোর সময় ক্লাচ লিভার চাপা রাখবেন না কারণ এটি ক্লাচ পরিধান বাড়ায় এবং পাওয়ার ট্রান্সমিশনে হস্তক্ষেপ করে । এই অভ্যাস শুধুমাত্র জ্বালানি দক্ষতা কমায় না বরং ক্লাচ উপাদানের ক্ষতিও করে।
দীর্ঘ সময় ধরে কম গিয়ারে চালানো
দীর্ঘ সময়ের জন্য কম গিয়ারে ইঞ্জিন চালাবেন না কারণ এটি উচ্চ RPM-এ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইঞ্জিন চালায় এবং জ্বালানি অপচয় করে । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উচ্চ গিয়ারে শিফট করুন যাতে ইঞ্জিনকে চাপ না দেওয়া হয়।
চালানোর সময় ব্রেক প্যাডেল চাপা
চালানোর সময় ব্রেক প্যাডেল চাপা রাখবেন না কারণ এটি ক্রমাগত প্রতিরোধ তৈরি করে এবং ব্রেক প্যাড এবং ডিস্কের অপ্রয়োজনীয় পরিধান ঘটায় । এটি জ্বালানি দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
ট্রাফিক স্টপে ইঞ্জিন রেভ করা
ট্রাফিক হল্টের সময় ইঞ্জিন RPM বাড়াবেন না – যদি হল্ট ৩০ সেকেন্ডের বেশি হয় তবে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিন । অপ্রয়োজনীয় রেভিং শুধুমাত্র জ্বালানি পোড়ায় এবং কোনও উদ্দেশ্য পূরণ করে না।
পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা
উন্নত মোটরসাইকেল মাইলেজ শুধুমাত্র আপনার পকেটে টাকা বাঁচায় না বরং পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কম জ্বালানি খরচ মানে কম CO2 নির্গমন যা পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখে। ভারতের জন্য দুই চাকার বহরে জ্বালানি খরচের মান ২০২৫ সালের জন্য ২৫.৩ gCO2/km এবং ২০৩০ সালের জন্য ২০.৫ gCO2/km লক্ষ্য করা হয়েছে ।
এই মানগুলি অর্জনের জন্য ভারতীয় বাজারে ৩২ শতাংশ বৈদ্যুতিক দুই চাকার বহর অনুপ্রবেশ প্রয়োজন, যার মধ্যে ১৯ শতাংশ বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল এবং ১৩ শতাংশ বৈদ্যুতিক স্কুটার অন্তর্ভুক্ত । ২৫.৩ gCO2/km-এ বহরের গড় জ্বালানি খরচের মান নির্ধারণ করা INR ৯,৩০০ ম্যানুফ্যাকচারার কমপ্লায়েন্স খরচের সাথে প্রায় ৩২ শতাংশ বৈদ্যুতিক দুই চাকার বাজার অনুপ্রবেশ আনবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ভোক্তা পেব্যাক পিরিয়ড হবে ৬ বছর ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি আপনার মোটরসাইকেল বর্তমানে ৪০ কিমি/লিটার মাইলেজ দেয় এবং আপনি এই পদ্ধতিগুলি অনুসরণ করে এটি ২০ শতাংশ উন্নত করেন, তাহলে আপনার মাইলেজ ৪৮ কিমি/লিটার হবে। যদি আপনি প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার চালান, তাহলে প্রতি মাসে (৩০ দিন) আপনার প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮.৭৫ লিটারের পরিবর্তে ২২.৫ লিটার জ্বালানি – যা প্রতি মাসে প্রায় ৩.৭৫ লিটার সাশ্রয় যা উল্লেখযোগ্য।
উপসংহারে বলা যায়, মোটরসাইকেলের মাইলেজ বৃদ্ধি একটি বহুমুখী পদ্ধতি যা সচেতন রাইডিং অভ্যাস, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সচেতনতার সমন্বয় প্রয়োজন। সঠিক রাইডিং স্টাইল বজায় রেখে, টায়ার প্রেসার সঠিক রেখে, নিয়মিত সার্ভিসিং নিশ্চিত করে, সঠিক গিয়ার ব্যবহার করে এবং চেইন লুব্রিকেশন বজায় রেখে আপনি আপনার মোটরসাইকেলের জ্বালানি দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারেন। এই পাঁচটি মূল পদ্ধতি অনুসরণ করা শুধুমাত্র আপনার জ্বালানি খরচ কমাবে না, বরং আপনার মোটরসাইকেলের আয়ু বাড়াবে, পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনার অর্থ সাশ্রয় করবে। মনে রাখবেন, ছোট ছোট পরিবর্তন সময়ের সাথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং এই অভ্যাসগুলি আয়ত্ত করা আপনাকে একজন আরও দক্ষ এবং দায়িত্বশীল রাইডার হিসেবে তৈরি করবে। ভারতীয় মোটরসাইকেল বাজার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জ্বালানি দক্ষতার গুরুত্ব আগের চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে, তাই এই পদ্ধতিগুলি প্রয়োগ করে আপনি কেবল নিজের উপকার করবেন না, বরং একটি স্থায়িত্বশীল ভবিষ্যতের দিকে অবদান রাখবেন।











