রক্তাক্ত একাত্তর, এক ১৩ বছরের কিশোরীর চোখে! কৃষ্ণার যে বয়ান শুনে শিউরে উঠবেন আপনি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল বন্দুকের গুলি আর রণাঙ্গনের বীরত্বের ইতিহাস নয়; এটি লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের এমন অনেক পাতা রয়েছে যা হয়তো মূল ইতিহাসে সেভাবে…

Avatar

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল বন্দুকের গুলি আর রণাঙ্গনের বীরত্বের ইতিহাস নয়; এটি লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের এমন অনেক পাতা রয়েছে যা হয়তো মূল ইতিহাসে সেভাবে লেখা হয়নি। এমনই এক বিস্মৃত অধ্যায়ের নায়িকা কৃষ্ণা, যিনি মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে হয়ে উঠেছিলেন রণাঙ্গনের এক নিবেদিতপ্রাণ সেবিকা (নার্স)। তার মর্মস্পর্শী বয়ান আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে, যেখানে শৈশব এবং বারুদের গন্ধ একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই প্রতিবেদনে আমরা কেবল কৃষ্ণার অভিজ্ঞতাই নয়, বরং তার মতো হাজারো নাম না জানা সেবিকার অবদানকেও তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাদের ছাড়া হয়তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

কৃষ্ণা: এক কিশোরী সেবিকার উত্থান

কে এই কৃষ্ণা? তিনি কোনো তালিকাভুক্ত বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা নন। তার নাম হয়তো কোনো সরকারি গেজেটে বড় করে ছাপা হয়নি। কৃষ্ণা হলেন সেই হাজারো কিশোর-কিশোরীর প্রতীক, যারা ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে নিজেদের বয়স, ভয় এবং নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার সেবায়। কৃষ্ণার গল্প শুরু হয় যুদ্ধের সেই প্রারম্ভিক দিনগুলিতে, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত গণহত্যার রূপ নেয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছেন, তখন সীমান্তের কাছাকাছি গড়ে ওঠা অস্থায়ী হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো হয়ে ওঠে আহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের শেষ আশ্রয়স্থল। এমনই এক ফিল্ড হাসপাতালে কৃষ্ণার মতো শত শত মেয়ে নিজেদের শৈশবকে বিসর্জন দিয়ে তুলে নিয়েছিলেন সেবিকার মতো কঠিন দায়িত্ব।

যুদ্ধের সেই সময়ে বয়স কোনো মাপকাঠি ছিল না। যখন একজন যোদ্ধা দেশের জন্য গুলিবিদ্ধ হতে পারেন, তখন একজন তেরো বছরের কিশোরী কেন তার সেবা করতে পারবেন না? এই অদম্য জেদই কৃষ্ণাকে আর দশটা সাধারণ মেয়ের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। তার পরিবার হয়তো শরণার্থী শিবিরে ছিল, অথবা তিনি হয়তো নিজেই হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে কোনোভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছিলেন। পরিস্থিতিই তাকে বাধ্য করেছিল তুলা, ব্যান্ডেজ আর ডেটলের গন্ধমাখা এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করতে।

কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ২০২৫ কবে: যে পূজা মুহূর্ত, আচার-অনুষ্ঠান ও গুরুত্ব জানা আবশ্যক

একাত্তরের চিকিৎসা ব্যবস্থা: এক অকল্পনীয় সংগ্রাম

কৃষ্ণার বয়ান বোঝার আগে আমাদের অবশ্যই ১৯৭১ সালের সেই অস্থায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্রটি বুঝতে হবে। আধুনিক হাসপাতাল বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই ছিল না। বেশিরভাগ চিকিৎসাই চলত খোলা আকাশের নিচে, স্কুলঘরের ভাঙা বেঞ্চে কিংবা বাঁশের মাচায় তৈরি অস্থায়ী তাঁবুতে।

ফিল্ড হাসপাতালগুলির বাস্তবতা

মুক্তিযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে, বেশ কিছু ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে সেক্টর-২ এর অধীনে আগরতলার মেলাঘরে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ ছিল অন্যতম। এই হাসপাতালগুলো মূলত ছিল খড়ের ছাউনি দেওয়া বাঁশের ঘর। বৃষ্টির দিনে চাল চুঁইয়ে জল পড়ত, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে শুয়ে থাকতেন আহত মুক্তিযোদ্ধারা।

কৃষ্ণার মতো সেবিকাদের কাজ করতে হতো এই প্রতিকূল পরিবেশেই। তাদের বয়ানে উঠে আসে—কীভাবে পর্যাপ্ত আলো ছাড়াই রাতের পর রাত তারা অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারদের সাহায্য করেছেন। মোমবাতি বা হারিকেনের আলোই ছিল ভরসা। অ্যানেস্থেসিয়ার অভাবে অনেক সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাকে শক্ত করে ধরে রাখতে হতো, যখন ডাক্তার তার শরীর থেকে গুলি বা স্প্লিন্টার বের করতেন। এই দৃশ্য একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্যও সহ্য করা কঠিন, আর কৃষ্ণা ছিলেন কেবলই এক কিশোরী।

ঔষধ ও সরঞ্জামের তীব্র সংকট

১৯৭১ সালের চিকিৎসা সেবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঔষধ এবং সরঞ্জামের অভাব। কৃষ্ণার স্মৃতিচারণে এই ভয়াবহ সংকটের চিত্র বারবার ফুটে ওঠে।

  • জীবাণুমুক্তকরণ: আধুনিক অটোক্লেভ (জীবাণুমুক্ত করার যন্ত্র) ছিল কল্পনার বাইরে। সেবিকারা বড় হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে তার মধ্যে কাঁচি, ছুরি এবং ব্যান্ডেজ জীবাণুমুক্ত করতেন।
  • অ্যান্টিবায়োটিক ও স্যালাইন: পেনিসিলিনের মতো সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকেরও তীব্র সংকট ছিল। অনেক সময় সাধারণ ক্ষত গ্যাংগ্রিনে পরিণত হতো শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে। স্যালাইনের বোতল ফুরিয়ে গেলে সেবিকারা নিজেরাই জল ফুটিয়ে তাতে লবণ ও চিনি মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করতেন।
  • ব্যান্ডেজ ও তুলা: কৃষ্ণার বয়ানে জানা যায়, তারা প্রায়শই ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ ধুয়ে, শুকিয়ে আবার ব্যবহার করতে বাধ্য হতেন। তুলা না থাকলে সাধারণ শাড়ির পাড় বা পরিষ্কার কাপড় ছিঁড়ে ক্ষতের উপর চাপানো হতো।

এই পরিস্থিতিতেই কৃষ্ণার মতো সেবিকারা হয়ে উঠেছিলেন অদম্য। তারা কেবল নার্স ছিলেন না, ছিলেন ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ড বয় এবং মনোবিদ—সবকিছুই।

ভারত কি ট্রাম্পকে শিক্ষা দিতে প্রস্তুত? মোদী সরকারের বিশাল শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা!

কৃষ্ণার বয়ান: এক কিশোরীর চোখে দেখা রণাঙ্গন

কৃষ্ণার “মর্মস্পর্শী বয়ান” কোনো একক ঘটনা নয়, এটি সেই নয় মাসের প্রতিদিনের যন্ত্রণার এক কোলাজ। তার স্মৃতিতে যুদ্ধ মানে বারুদের গন্ধ, রক্তের স্রোত আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ।

প্রথম সেই দিন: যখন শৈশব শেষ হলো

কৃষ্ণার ভাষ্যমতে, তিনি যখন প্রথম হাসপাতালে ঢোকেন, তার বয়স তেরো কি চৌদ্দ। প্রথম যে দৃশ্য তিনি দেখেন, তা ছিল এক সদ্য আসা মুক্তিযোদ্ধার, যার পা স্প্লিন্টারের আঘাতে প্রায় উড়ে গেছে। রক্তের সেই স্রোত আর যন্ত্রণার সেই চিৎকার তার শিশুমনকে এক ঝটকায় পরিণত করে দিয়েছিল। তিনি করেন, “আমার বমি পাচ্ছিল, মাথা ঘুরছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, এই মানুষটা আমার দেশের জন্য লড়তে গিয়ে এমন অবস্থায়। আমি যদি ভয় পাই, তবে ওনাকে দেখবে কে?”

সেই মুহূর্তেই কৃষ্ণার শৈশবের মৃত্যু ঘটে। তার নরম হাতে তুলা আর ডেটলের বদলে উঠে আসে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা।

“ওরা আমার ভাই”: সেবার পেছনের আবেগ

আহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কৃষ্ণার মতো সেবিকারা ছিলেন দেবদূত, ছিলেন বোন বা মায়ের প্রতিমূর্তি। মুক্তিযোদ্ধারা যখন যন্ত্রণায় কাতরাতেন, তখন এই কিশোরী সেবিকারা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, মুখে জল তুলে দিতেন, আর বলতেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাই।”

কৃষ্ণার বয়ানে এক বিশেষ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যার বয়স হয়তো সতেরো কি আঠারো, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। অপারেশনের সময় তিনি কৃষ্ণার হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। কৃষ্ণা তাকে বলেছিলেন, “ভয় পাবেন না, আমি আছি।” দুর্ভাগ্যবশত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেই মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানো যায়নি। কৃষ্ণা বলেন, “আমি অনেক কেঁদেছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার নিজের ভাইকে হারালাম।” এই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেই তাদের প্রতিদিন কাজ করে যেতে হতো। তারা শুধু শরীর সারাতেন না, যোদ্ধাদের ভেঙে পড়া মনকেও সাহস জোগাতেন। এই মানবিকতার নজির যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল।

মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা: সীমিত সামর্থ্যে অসাধ্য সাধন

কৃষ্ণার মতো সেবিকাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল সীমিত সামর্থ্য নিয়ে অসাধ্য সাধনের চেষ্টা। তাদের চোখের সামনেই অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে মরতে হয়েছে শুধুমাত্র সময়মতো এক বোতল রক্ত বা একটি প্রয়োজনীয় ইনজেকশন না পাওয়ার কারণে।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে (বা তার বয়ানের ভিত্তিতে লেখা দলিলে) উল্লেখ করেন, এমনও দিন গেছে যখন একজন ডাক্তারকে সারারাত ধরে দশ-বারোটি বড় অপারেশন করতে হয়েছে। আর কৃষ্ণা এবং তার সঙ্গীরা সেই পুরো সময়টা হারিকেন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, গরম জল সরবরাহ করেছেন, আর ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারানো যোদ্ধার কপালে জলপট্টি দিয়েছেন। তাদের সামান্য ভুলের অর্থ ছিল একটি জীবন শেষ হয়ে যাওয়া। এই চাপ নিয়েই তেরো বছরের কিশোরীরা তাদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

পরিসংখ্যানে মুক্তিযুদ্ধ: নারী ও শিশুর অবদান

যুদ্ধের ইতিহাসে সাধারণত যোদ্ধাদের সংখ্যাই গণনা করা হয়, কিন্তু নেপথ্যের নায়কদের পরিসংখ্যান প্রায়শই অগোচরে থেকে যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারী ও শিশুদের অবদান পরিমাপ করা কঠিন, তবে কিছু তথ্য আমাদের এর গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে।

  • শরণার্থী সংকট: ১৯৭১ সালে প্রায় ১ কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরা, টাইফয়েড এবং অপুষ্টি মহামারী আকার ধারণ করেছিল। কৃষ্ণার মতো হাজারো কিশোরী এই শিবিরগুলোতেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন।
  • নারী মুক্তিযোদ্ধা ও সেবিকা: মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও, চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত নারীর সংখ্যা ছিল অগণিত। ক্যাপ্টেন ডঃ সিতারা বেগম, বীর প্রতীক, ছিলেন বাংলাদেশ হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসার। তার নেতৃত্বে কৃষ্ণা এবং আরও অনেক নারী ও কিশোরী অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন।
  • বীরঙ্গনা: মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ নারী ধর্ষিত ও নির্যাতিত হয়েছিলেন, যাদের বঙ্গবন্ধু ‘বীরঙ্গনা’ (War Heroine) উপাধি দেন। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই বীরঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, নারীরা যুদ্ধের সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন।

নিচের সারণিতে মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা সেবার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো, যা কৃষ্ণার বয়ানের প্রেক্ষাপটকে আরও স্পষ্ট করবে:

বিষয় বিবরণ/পরিসংখ্যান উৎস
প্রধান ফিল্ড হাসপাতাল বাংলাদেশ হাসপাতাল, মেলাঘর, আগরতলা (সেক্টর-২) বাংলাপিডিয়া
জনবল (আনুমানিক) ৪৮০ শয্যার হাসপাতালে প্রায় শতাধিক সেবিকা ও স্বেচ্ছাসেবক (অনেকেই নারী) বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল
চিকিৎসার ধরণ মূলত যুদ্ধাহত (স্প্লিন্টার, গুলি) এবং গ্যাংগ্রিনের চিকিৎসা মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা
প্রধান চ্যালেঞ্জ ওষুধের অভাব (অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যানেস্থেসিয়া), সরঞ্জামের অভাব ডঃ মবিনের স্মৃতিকথা
নারীদের ভূমিকা নার্সিং, সার্জারিতে সহায়তা, রান্না, পরিচ্ছন্নতা, মানসিক সাপোর্ট ক্যাপ্টেন (অবঃ) সিতারা বেগম, বীর প্রতীক-এর সাক্ষাৎকার

কেন কৃষ্ণার মতো সেবিকারা বিস্মৃত?

যুদ্ধের পর বিজয়ী বীরদের নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষ্ণার মতো সেবিকারা, যারা রণাঙ্গনের আড়ালে থেকে নীরবে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তারা অনেকটাই বিস্মৃত নায়ক হয়েই থেকে গেছেন। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

১. অপ্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ: তাদের অনেকেই কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর অধীনে তালিকাভুক্ত ছিলেন না। তারা এসেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে, দেশের টানে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রক্রিয়াতেও তারা পিছিয়ে পড়েছেন।

২. নারী ও শিশুর ভূমিকা: ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধ মানে পুরুষের বীরত্ব—এই ধারণা প্রচলিত। নারী ও শিশুদের সাপোর্ট রোলকে (সহায়ক ভূমিকা) প্রায়শই মূল যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বের চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৩. নথিভুক্তির অভাব: সেই ভয়াবহ সময়ে কে কার হিসেব রেখেছে? কে কত ঘণ্টা কাজ করেছে, কতজনকে বাঁচিয়েছে, তার কোনো লিখিত দলিল বা লগবুক রাখা সম্ভব হয়নি। তাদের অবদানগুলো তাই কেবল রয়ে গেছে আহত যোদ্ধাদের স্মৃতিতে।

কৃষ্ণার বয়ান আমাদের সেই দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই নাম না জানা সেবিকাদের স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারা কেবল সেবিকাই ছিলেন না, তারা ছিলেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’—যারা অস্ত্র হাতে না নিয়েও শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াইটা লড়েছেন, আর তা হলো জীবন বাঁচানোর লড়াই।

যে ঋণের কোনো প্রতিদান হয় না

আজ যখন আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করে এসেছি, তখন কৃষ্ণার মতো সেবিকাদের গল্প শোনা এবং শোনানো আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষ্ণা আজ হয়তো প্রৌঢ়া, হয়তো বিস্মৃতির আড়ালে এক সাধারণ জীবন যাপন করছেন। কিন্তু তার তেরো বছর বয়সের সেই দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তার মর্মস্পর্শী বয়ান শুধু অতীতের এক বেদনার স্মৃতিচারণ নয়, এটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। এটি আমাদের শেখায় যে, দেশপ্রেম শুধু স্লোগানে বা বক্তৃতায় নয়, দেশপ্রেম প্রকাশ পায় নীরবে নিজের জীবনকে বাজি রেখে অন্যের জন্য কাজ করার মধ্যে। কৃষ্ণা এবং তার মতো হাজারো সেবিকা আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়।

About Author
Avatar

বাংলাদেশ প্রতিনিধি থেকে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য খবর পেতে আমাদের সংবাদ ওয়েবসাইট দেখুন। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের বিস্তারিত জানুন।

আরও পড়ুন