পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। নৈহাটির নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতনে রবিবারের নবম-দশম শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কালো পোশাকে বাউন্সার দেখা গিয়েছে। দীর্ঘ নয় বছর পর অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বেসরকারি নিরাপত্তা এজেন্সির বাউন্সারদের নিয়োগ করা হয়েছিল। এই বাউন্সারদের দায়িত্ব ছিল পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশকারীদের যাচাই এবং শারীরিক তল্লাশি নেওয়া।
পরীক্ষায় অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এসএসসির দুর্নীতির কালিমা মোচনে রাজ্য সরকার এবং কমিশন এবার পরীক্ষার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় রাজ্যজুড়ে মোট ৩ লক্ষ ১৯ হাজার ৯১৯ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। ৬৩৬টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় প্রতিটি কেন্দ্রে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসএসসি এবার একাধিক নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নজরদারি রাখা হয়েছে। মোবাইল, স্মার্টওয়াচ, ক্যালকুলেটর নিয়ে আসা নিষিধ ছিল।
মুখ্য সচিব শনিবার সব জেলার জেলাশাসকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে পরীক্ষার দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এক্স হ্যান্ডেলে পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানান।
নৈহাটির বিশেষ ঘটনা
নৈহাটি নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতনে পরীক্ষাকেন্দ্রে বাউন্সার দেখা গিয়েছিল। কালো পোশাকপরা এই বাউন্সারদের দাবি ছিল যে তারা পরীক্ষাকেন্দ্রে আগত পরীক্ষার্থীদের চেকিং করার দায়িত্বে রয়েছেন। তবে এই বাউন্সার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কারণ এটি সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে ছিল।
উল্লেখ্য, নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতন ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্কুলটির ঠিকানা ৪৪, জন মহম্মদ ঘাট রোড, নৈহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা।
দুর্নীতির পটভূমি ও নতুন পরীক্ষা
২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ওএমআর শিটে কারচুপি, নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া, প্যানেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও নিয়োগ অব্যাহত রাখাসহ নানা অনিয়মের কারণে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই দুর্নীতির তদন্তে সিবিআই এবং নাইসার প্রাক্তন কর্মচারী পঙ্কজ বনসলের বাড়ি থেকে হার্ডডিস্কে ওএমআর শিটের স্ক্যান কপি উদ্ধার করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট এপ্রিল মাসে ২০১৬ সালের পুরো নিয়োগ প্যানেল বাতিল করে দিয়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করেছিল। আদালত বলেছিল যোগ্য-অযোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করা সম্ভব নয় বলে পুরো প্যানেল বাতিল করা হচ্ছে।
গত ৩০ আগস্ট এসএসসি ১৮০৪ জন ‘অযোগ্য’ শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে এই তালিকায় শিক্ষকদের বিষয়, স্তর এবং দুর্নীতির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অনুপস্থিত রয়েছে।
চাকরিহারাদের প্রতিবাদ
আজকের পরীক্ষায় অনেক চাকরিহারা শিক্ষক কালো পোশাক পরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শিক্ষক আন্দোলনের নেতা মেহবুব মণ্ডল এবং চিন্ময় মণ্ডল কালো পোশাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। মেহবুব মণ্ডল বলেছেন, “কালো পোশাক পরে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অসাংবিধানিকভাবে আমাদের আজ পরীক্ষায় বসানো হলো। অপরাধীদের আড়াল করে নিরপরাধদের বলি দিতে এই ব্যবস্থা”।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য অতিরিক্ত পরিবহন ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং মেট্রো পরিষেবা সকাল ৯টা থেকে শুরু করা হয়েছে। গ্রিন লাইনে ১৫ মিনিট অন্তর মিলেছে পরিষেবা।
এছাড়া প্রশ্নপত্র নিরাপত্তার জন্য কলকাতায় ১৪টি গাড়িতে পুলিশ অফিসার-কনস্টেবলের সুরক্ষায় প্রশ্নপত্র পৌঁছানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এবারের পরীক্ষার পরে পরীক্ষার্থীদের ওএমআরের কার্বন কপি দেওয়া হবে এবং আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একাদশ-দ্বাদশে ১২ হাজার ৫১৪টি শূন্যপদের জন্য প্রতিযোগিতা হবে।
এসএসসির চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার জানিয়েছেন যে ‘দাগি’ প্রার্থীদের পরীক্ষায় বসানো নিয়ে আলোচনা ১৪ সেপ্টেম্বরের পর করা হবে। তিনি বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসবেন।
এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যেখানে স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।











