হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ভগবান নারায়ণ হলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিপালক। তাঁর পূজা ও আরাধনা জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির চাবিকাঠি বলে বিবেচিত হয়। যে কোনও পূজার অন্যতম প্রধান এবং ভক্তিমূলক অংশ হলো ‘পুষ্পাঞ্জলি’ বা ফুল নিবেদন। নারায়ণ পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র হলো সেই পবিত্র ধ্বনিপুঞ্জ, যার মাধ্যমে ভক্ত তাঁর অন্তরের শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং সমর্পণের ভাব মূর্তির চরণে নিবেদন করেন। এই মন্ত্র কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিশ্বসৃষ্টির পালনকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর অসীম করুণা লাভের আকুতি। এই প্রবন্ধে আমরা নারায়ণ পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রের প্রতিটি দিক, তার সঠিক উচ্চারণ, গভীর অর্থ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত প্রামাণিক তথ্য বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব।
ভগবান নারায়ণ: স্বরূপ ও তাৎপর্য
হিন্দু ধর্মশাস্ত্র, বিশেষত পুরাণ ও বেদে, ভগবান নারায়ণকে পরম সত্তা বা ‘পরব্রহ্ম’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি ত্রিমূর্তি (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর) ধারণার মধ্যে ‘বিষ্ণু’ নামে পরিচিত, যিনি এই সৃষ্টিজগতের পালনকর্তা।
নারায়ণের শাস্ত্রীয় ধারণা
‘নারায়ণ’ নামটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সন্ধি: ‘নার’ (যার অর্থ জল বা মানব) এবং ‘অয়ন’ (যার অর্থ আশ্রয় বা আবাস)। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, সৃষ্টির প্রাক্কালে মহাজাগতিক কারণ-সমুদ্রে (গর্ভোদক) যিনি শয়ন করেন, তিনিই নারায়ণ। তাঁর নাভিপদ্ম থেকে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উৎপত্তি। এই ধারণাটি নারায়ণের সর্বব্যাপী এবং সৃষ্টির আদি কারণ হওয়ার তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠা করে।
তিনি বৈকুণ্ঠের অধিপতি, তাঁর চার হাতে শোভা পায় শঙ্খ (ধ্বনি, সৃষ্টির আহ্বান), চক্র (কাল, সুদর্শন), গদা (শক্তি, জ্ঞান) এবং পদ্ম (পবিত্রতা, ঐশ্বর্য)। তাঁর এই রূপ জগতের ভারসাম্য, ধর্ম এবং শৃঙ্খলার প্রতীক।
বিষ্ণু ও নারায়ণের সম্পর্ক
যদিও ‘নারায়ণ’ এবং ‘বিষ্ণু’ শব্দ দুটি প্রায়শই সমার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে সূক্ষ্ম দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে। নারায়ণ হলেন সেই পরম, নিরাকার সত্তা, আর বিষ্ণু হলেন তাঁর সাকার, কার্যনির্বাহী রূপ, যিনি ধর্মের গ্লানি হলে এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটলে বিভিন্ন ‘অবতার’ রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্র, নৃসিংহ, বরাহ—এঁরা সকলেই নারায়ণের দশাবতারের অংশ।
পুষ্পাঞ্জলি কী এবং এর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
পূজা পদ্ধতির একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলো পুষ্পাঞ্জলি। এটি ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি প্রতীকী অথচ গভীর প্রক্রিয়া।
‘পুষ্প’ ও ‘অঞ্জলি’-এর প্রতীকী অর্থ
- পুষ্প (ফুল): ফুল হলো পবিত্রতা, সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ নিবেদন। যখন একজন ভক্ত ফুল অর্পণ করেন, তখন তিনি প্রতীকীভাবে তাঁর অন্তরের শুদ্ধতম ভক্তি, তাঁর ‘চিত্ত-পুষ্প’ বা হৃদয়-কমলটি ভগবানের চরণে উৎসর্গ করেন।
- অঞ্জলি (জোড় হাত): দুই হাত জোড় করে অঞ্জলি গঠন করা হলো বিনয়, শ্রদ্ধা এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের (সমর্পণ) ভঙ্গি। এর মাধ্যমে ভক্ত তাঁর অহংকার (ego) ত্যাগ করে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে শূন্যপাত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
অতএব, পুষ্পাঞ্জলি নিছক একটি প্রথা নয়, এটি ভক্তের অহং-ত্যাগপূর্বক ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।
নারায়ণ পূজার মূল পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র
নারায়ণ পূজা, বিশেষত সত্যনারায়ণ পূজা বা যে কোনও পূর্ণিমা বা একাদশীর পূজায়, এই পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রটি সর্বাধিক প্রচলিত এবং শাস্ত্রীয়ভাবে স্বীকৃত। মন্ত্রটি সাধারণত তিনবার পাঠ করে অর্পণ করা হয়।
মন্ত্র (সংস্কৃত, বাংলা লিপিতে)
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।
নারায়ণং গুণাত্মানং সর্বভূতস্থিতং পরম্।
ভক্তানুগ্রহকারকং ত্বাং নমামি জনার্দনম্॥
(প্রথম অঞ্জলি)
ওঁ নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি।
তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ॥
এসঃ সচন্দনপুষ্পাঞ্জলিঃ ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ॥
(দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঞ্জলির জন্য মূল মন্ত্রটি পুনরায় পাঠ করা যেতে পারে অথবা সংক্ষিপ্ত মন্ত্র ব্যবহৃত হয়। তবে উপরের শ্লোকটিই প্রধান পুষ্পাঞ্জলি শ্লোক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত।)
মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ
মন্ত্রের শক্তি তার সঠিক উচ্চারণের (ধ্বনি তরঙ্গ বা vibration) উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
- নমো ভগবতে বাসুদেবায়: ‘নমো’ (নমঃ), ‘ভগবতে’ (ভ-গ-ব-তে), ‘বাসুদেবায়’ (বা-সু-দে-বা-য়)। ‘ব’ এবং ‘ভ’-এর উচ্চারণ স্পষ্ট হতে হবে।
- গুণাত্মানং: গুণ-আত্মানং (গুন্+আত্মানং)।
- সর্বভূতস্থিতং: সর্ব-ভূত-স্থিতং (সমস্ত প্রাণীর মধ্যে অবস্থিত)।
- ভক্তানুগ্রহকারকং: ভক্ত-অনুগ্রহ-কারকং।
- জনার্দনম্: জনার্দনম্ (ম-কারান্ত উচ্চারণ)।
পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রের গভীর তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ
এই মন্ত্রের প্রতিটি শব্দ অসীম দার্শনিক অর্থে পরিপূর্ণ। এটি কেবল একটি প্রার্থনা নয়, এটি নারায়ণের স্বরূপের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি।
বিশ্লেষণ: “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়”
এটি নারায়ণের দ্বাদশাক্ষরী (১২-অক্ষর) মহামন্ত্র এবং বৈষ্ণবধর্মের অন্যতম প্রধান মন্ত্র।
- ওঁ (Om): এটি ‘প্রণব’ বা আদি শব্দ। হিন্দু শাস্ত্র মতে, এই ধ্বনি থেকেই সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি। এটি পরব্রহ্মের নিরাকার রূপ।
- নমো (Namo): ‘নমঃ’ শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ প্রণাম, নতিস্বীকার বা আত্মসমর্পণ।
- ভগবতে (Bhagavate): ‘ভগবান’ শব্দের চতুর্থীর একবচন। ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ঐশ্বর্য। যিনি ষড়ৈশ্বর্য (জ্ঞান, বৈরাগ্য, যশ, শ্রী, বীর্য, ধর্ম) পূর্ণ, তিনিই ভগবান। অর্থাৎ, “সেই পরম ঐশ্বর্যশালীকে”।
- বাসুদেবায় (Vasudevaya): এই শব্দের দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে:
- বসুদেবের পুত্র: যিনি দ্বাপর যুগে বসুদেবের পুত্র হিসেবে (শ্রীকৃষ্ণ) অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
- সর্বভূতে বাস: ‘বস্’ ধাতু (বাস করা) থেকে আগত। যিনি ‘সর্বভূতে বাস করেন’ বা যাঁর মধ্যে ‘সর্বভূত বাস করে’, তিনিই বাসুদেব।
সুতরাং, এই মন্ত্রের অর্থ: “আমি সেই পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবকে প্রণাম করি, যিনি সর্বভূতে বিরাজমান এবং যিনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।”
বিশ্লেষণ: পুষ্পাঞ্জলি শ্লোক
“নারায়ণং গুণাত্মানং সর্বভূতস্থিতং পরম্।”
- নারায়ণং: হে নারায়ণ (আপনাকে)।
- গুণাত্মানং: আপনিই সমস্ত গুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) আত্মা বা উৎস। আপনি এই ত্রিগুণের অতীত (গুণাতীত) হয়েও এই গুণগুলিকে ধারণ করেন এবং জগতের পালনের জন্য ব্যবহার করেন।
- সর্বভূতস্থিতং: আপনি সমস্ত প্রাণীর মধ্যে ‘অন্তর্যামী’ রূপে বিরাজ করছেন।
- পরম্: আপনিই পরম সত্য, সর্বোচ্চ সত্তা।
“ভক্তানুগ্রহকারকং ত্বাং নমামি জনার্দনম্॥”
- ভক্তানুগ্রহকারকং: আপনি ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ বা কৃপা বর্ষণকারী।
- ত্বাং নমামি: আপনাকে (আমি) প্রণাম করি।
- জনার্দনম্: নারায়ণের আর এক নাম। এর অর্থ ‘যিনি জনগণের (জন) দুঃখ-কষ্ট হরণ (অর্দন) করেন’ অথবা ‘যিনি অশুভ শক্তিকে দমন করেন’।
সম্পূর্ণ শ্লোকের ভাবার্থ:
“হে নারায়ণ, আপনি সকল গুণের আধার, আপনি সকল প্রাণীর হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজমান। আপনিই সর্বোচ্চ সত্তা। হে জনার্দন (দুঃখহরণকারী), আপনি ভক্তদের প্রতি সর্বদা কৃপাশীল, আমি আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।”
বিশ্লেষণ: গায়ত্রী মন্ত্র (বিষ্ণু গায়ত্রী)
“ওঁ নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি। তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ॥”
- নারায়ণায় বিদ্মহে: আমরা নারায়ণকে জানতে প্রয়াসী হই।
- বাসুদেবায় ধীমহি: আমরা বাসুদেবের ধ্যান করি।
- তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ: সেই বিষ্ণু (যিনি সর্বব্যাপী) আমাদের সেই ধ্যানে বা জ্ঞানে প্রেরণা দান করুন।
এটি বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্রের বৈষ্ণব রূপ, যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভের জন্য প্রার্থনা।
নারায়ণ পূজার বিধি ও পুষ্পাঞ্জলির সঠিক নিয়ম
শাস্ত্রীয় মতে পূজা করলে তার পূর্ণ ফল লাভ হয়। পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
পূজার প্রস্তুতি (উপকরণ)
নারায়ণ পূজায় যে উপকরণগুলি অপরিহার্য:
- ভগবান নারায়ণের মূর্তি বা চিত্র (পট)।
- আসন, প্রদীপ, ধূপকাঠি, কর্পূর।
- জলপূর্ণ তাম্রপাত্র (কোশাকুশি)।
- তুলসী পাতা: এটি নারায়ণ পূজায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তুলসী ছাড়া নারায়ণের পূজা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়।
- ফুল: সাধারণত সাদা বা হলুদ ফুল (যেমন রজনীগন্ধা, গাঁদা, পদ্ম) ব্যবহৃত হয়।
- চন্দন, আতপ চাল, দূর্বা।
- নৈবেদ্য: ফল, মিষ্টান্ন এবং বিশেষত ‘সিন্নি’ বা শিরনি (সত্যনারায়ণ পূজার ক্ষেত্রে)।
পুষ্পাঞ্জলি প্রদানের পদ্ধতি
- শুদ্ধিকরণ: পূজার পূর্বে স্থান ও পূজারী উভয়েই স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করবেন।
- আসন: শুদ্ধ আসনে (সাধারণত কুশ বা উলের আসন) উত্তর বা পূর্বমুখী হয়ে বসতে হয়।
- আহ্বান: পূজার মূল মন্ত্র পাঠ করে ভগবান নারায়ণকে পূজাস্থানে আহ্বান করা হয়।
- পুষ্প গ্রহণ: ভক্তরা পূজারীর নির্দেশমতো উঠে দাঁড়াবেন। ডান হাতে (অথবা অঞ্জলি করে) ফুল, এক বা দুটি তুলসী পাতা, সামান্য আতপ চাল এবং চন্দন মিশ্রিত করে নেবেন।
- মন্ত্র পাঠ: পূজারী যখন ওপরের পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রগুলি পাঠ করবেন, ভক্তরাও সঙ্গে সঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণে তা পাঠ করবেন।
- অর্পণ: মন্ত্র পাঠ শেষে, ভক্তরা তাঁদের অঞ্জলি বদ্ধ হাত মূর্তির চরণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করবেন বা পূজারীর নির্দেশিত স্থানে রাখবেন।
- প্রণাম: পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের পর সাষ্টাঙ্গে বা পঞ্চাঙ্গে প্রণাম করে প্রার্থনা জানানো হয়। এই প্রক্রিয়া সাধারণত তিনবার করা হয়।
বৈষ্ণবধর্ম ও নারায়ণ উপাসনা: বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপট
নারায়ণ বা বিষ্ণুর উপাসনা হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম শাখাগুলির মধ্যে অন্যতম, যা ‘বৈষ্ণবধর্ম’ নামে পরিচিত।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও প্রভাব
যদিও নির্দিষ্টভাবে বৈষ্ণবদের সংখ্যা গণনা করা কঠিন, তবে হিন্দুধর্মের বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান এর ব্যাপকতা বুঝতে সাহায্য করে।
- বৈশ্বিক হিন্দু জনসংখ্যা: Pew Research Center-এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় ১.২ বিলিয়নের বেশি, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ১৫.৬%। ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা সর্বাধিক।
- বৈষ্ণব আন্দোলন: এই বিশাল জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ বৈষ্ণবধর্মের অনুসারী। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন (গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ) বাংলা ও উড়িষ্যা থেকে শুরু হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
- আন্তর্জাতিক বিস্তার: বিংশ শতাব্দীতে, ISKCON (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস)-এর মতো সংস্থাগুলি ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র (যা নারায়ণ বা কৃষ্ণেরই নাম) এবং ভগবদ্গীতা (নারায়ণের অবতার কৃষ্ণের বাণী) বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছে। আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই নারায়ণের মন্দির এবং উপাসক সম্প্রদায় দেখা যায়।
এই তথ্য প্রমাণ করে যে, নারায়ণ পূজার এই পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রটি কেবল বাংলার একটি ক্ষুদ্র প্রথা নয়, এটি একটি বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক আন্দোলনের অংশ।
নারায়ণ উপাসনার ঐতিহাসিক ভিত্তি
নারায়ণ উপাসনার মূল পাওয়া যায় প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে।
- বেদ: ঋগ্বেদে বিষ্ণুকে একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি তাঁর ‘তিন পদক্ষেপে’ (ত্রিবিক্রম) সমগ্র বিশ্ব পরিমাপ করেছিলেন।
- পুরাণ: বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ এবং পদ্ম পুরাণ-এর মতো গ্রন্থগুলি নারায়ণের মহিমা, তাঁর অবতার এবং উপাসনার পদ্ধতিকে বিস্তারিতভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: Britannica-এর মতে, ভগবদ্গীতা হলো হিন্দু দর্শনের অন্যতম সারসংক্ষেপ, যেখানে ভগবান নারায়ণ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ রূপে অর্জুনকে জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির পথ প্রদর্শন করেছেন। ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ মন্ত্রটির মাহাত্ম্য গীতা ও ভাগবতেই সর্বাধিক বর্ণিত হয়েছে।
সত্যনারায়ণ পূজা: নারায়ণের সর্বাধিক জনপ্রিয় রূপ
বাংলা এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, ‘নারায়ণ পূজা’ বলতে প্রায়শই ‘সত্যনারায়ণ পূজা’ বা ব্রতকথাকেই বোঝানো হয়।
সত্যনারায়ণ ব্রতের তাৎপর্য
সত্যনারায়ণ পূজা সাধারণত প্রতি পূর্ণিমা তিথিতে বা কোনও বিশেষ মনস্কামনা পূরণের জন্য আয়োজন করা হয়। এটি স্কন্দ পুরাণের রেবা খণ্ড থেকে নেওয়া হয়েছে। এই পূজার মূল বৈশিষ্ট্য হলো:
- সত্যের প্রতি ব্রত: ‘সত্যনারায়ণ’ নামের অর্থ ‘যিনি সত্যের রূপ’ বা ‘সত্যই যাঁর নারায়ণ রূপ’। এই পূজা ভক্তকে সত্যনিষ্ঠ হতে শেখায়।
- পাঁচালী বা কথা: পূজার প্রধান অঙ্গ হলো ব্রতকথা পাঠ ও শ্রবণ, যেখানে বিভিন্ন পৌরাণিক ও লৌকিক কাহিনীর মাধ্যমে সত্যের জয় এবং নারায়ণের কৃপার কথা বর্ণনা করা হয়।
- সিন্নি বা শিরনি: এই পূজার প্রসাদ (সাধারণত আটা, দুধ, কলা, চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
সত্যনারায়ণ পূজাতেও মূল পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র হিসেবে উপরে উল্লিখিত মন্ত্রটিই ব্যবহৃত হয়, যা এই পূজার শাস্ত্রীয় ভিত্তি মজবুত করে।
পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র পাঠের উপকারিতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
নারায়ণ পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এর নিয়মিত অনুশীলন ব্যক্তির মন ও জীবনে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১. আধ্যাত্মিক উন্নতি (Spiritual Benefits)
- ভক্তি ও সমর্পণ: মন্ত্রের অর্থ উপলব্ধি করে পাঠ করলে তা ভক্তের হৃদয়ে ভক্তিভাব (Devotion) এবং সমর্পণ (Surrender) বৃদ্ধি করে।
- ঐশ্বরিক সংযোগ: এটি ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করে। ভক্ত অনুভব করেন যে তিনি সরাসরি পালকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন।
- পাপমুক্তি ও মোক্ষ: শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নারায়ণের নামে পুষ্পাঞ্জলি দিলে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে করা পাপ থেকে মুক্তি মেলে এবং অন্তিমে মোক্ষ (Liberation) বা বৈকুণ্ঠ লাভের পথ প্রশস্ত হয়।
২. মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক শান্তি (Psychological Benefits)
- মানসিক চাপ হ্রাস: মন্ত্রের ছন্দময় উচ্চারণ এবং ফুলের স্নিগ্ধ স্পর্শ মস্তিষ্কে এক প্রশান্তিদায়ক (Calming) প্রভাব ফেলে। এটি আধুনিক ‘মাইন্ডফুলনেস’ (Mindfulness) অনুশীলনের মতোই কাজ করে।
- অহংকার হ্রাস: ‘নমো’ (আমি সমর্পণ করছি) শব্দটি বারবার উচ্চারণ করলে তা ব্যক্তির অহংবোধ (Ego) হ্রাস করতে সাহায্য করে।
- ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার: ‘ভক্তানুগ্রহকারকং’ (তিনি ভক্তকে অনুগ্রহ করেন) – এই বিশ্বাস মনে আশা এবং ইতিবাচক শক্তির (Positive Energy) সঞ্চার করে।
- মনোযোগ বৃদ্ধি: মন্ত্রের শব্দ এবং উচ্চারণের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ফলে তা মানসিক একাগ্রতা (Concentration) বাড়াতে সাহায্য করে।
৩. জাগতিক ও পারিবারিক মঙ্গল (Material and Familial Benefits)
- শান্তি ও সমৃদ্ধি: নারায়ণ হলেন ‘পালনকর্তা’ এবং তাঁর পত্নী লক্ষ্মী হলেন ‘ঐশ্বর্যের দেবী’। নারায়ণের পূজায় দেবী লক্ষ্মীও সন্তুষ্ট হন। তাই এই পূজার মাধ্যমে পরিবারে শান্তি (Peace) এবং সমৃদ্ধি (Prosperity) আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।
- বাস্তু দোষ নাশ: নারায়ণ পূজার মন্ত্রধ্বনি গৃহের নেতিবাচক শক্তি বা বাস্তু দোষ দূর করে একটি পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে।
পূজার মন্ত্রে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শব্দাবলীর সারণি
নারায়ণ পূজার মন্ত্রগুলি বুঝতে হলে কিছু নির্দিষ্ট শব্দের অর্থ জানা প্রয়োজন।
| সংস্কৃত শব্দ | বাংলা অর্থ | তাৎপর্য |
| বাসুদেব | (১) বসুদেবের পুত্র (কৃষ্ণ) (২) যিনি সর্বভূতে বাস করেন | এটি নারায়ণের সর্বব্যাপী ও সাকার রূপের প্রতীক। |
| জনার্দন | (১) যিনি জনগণের দুঃখ হরণ করেন (২) যিনি অশুভকে দমন করেন | ভগবানের ভক্ত-রক্ষাকারী এবং দুঃখ-নিবারণকারী রূপ। |
| গুণাত্মা | গুণের আত্মা বা উৎস | তিনি সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—এই ত্রিগুণের ঊর্ধ্বে থেকেও এগুলির নিয়ন্ত্রক। |
| সর্বভূতস্থিত | সকল প্রাণীর মধ্যে অবস্থিত | ঈশ্বরের ‘অন্তর্যামী’ রূপ, যিনি প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বাস করেন। |
| বিদ্মহে | আমরা জানতে প্রয়াসী | জ্ঞানমার্গের প্রতীক, ঈশ্বরের স্বরূপ জানার আকাঙ্ক্ষা। |
| ধীমহি | আমরা ধ্যান করি | ভক্তিমার্গ ও ধ্যানমার্গের প্রতীক, ঈশ্বরের রূপে মনকে স্থির করা। |
| প্রচোদয়াৎ | প্রেরণা দান করুন | ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, যেন তিনি আমাদের শুদ্ধ বুদ্ধি বা জ্ঞানে উদ্বুদ্ধ করেন। |
মন্ত্রের শ্বাশ্বত আবেদন
নারায়ণ পূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র হলো হিন্দু আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য রত্ন। এটি শুধু একটি পূজার মন্ত্র নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ দর্শন। এই মন্ত্র আমাদের শেখায় যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তা কেবল দূর বৈকুণ্ঠেই নন, তিনি ‘সর্বভূতস্থিতং’—প্রতিটি প্রাণীর হৃদয়েই বিরাজমান।
যখন আমরা ভক্তিভরে ফুল হাতে নিয়ে “ত্বাং নমামি জনার্দনম্” (হে দুঃখহরণকারী, আপনাকে প্রণাম করি) বলি, তখন আমরা আমাদের জীবনের সমস্ত ভার, সমস্ত উদ্বেগ সেই পরম পালকের হাতে তুলে দিই। এই সমর্পণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের প্রকৃত শান্তি ও নির্ভয়। এই মন্ত্রের নিয়মিত অনুশীলন ও তার অর্থের অনুধাবন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও শুদ্ধ, শান্তিময় এবং অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে।











