Neck Cracking Risks: অনেকেরই দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর বা আলসেমি কাটাতে ঘাড় মটকানোর (Neck Cracking) অভ্যাস আছে। আরামদায়ক মনে হলেও, এই সাধারণ অভ্যাসটি আপনার জীবনের জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ঘাড় মটকানোর সময় ভুলবশত ঘাড়ের ধমনি ছিঁড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে ‘স্ট্রোক’ বা প্যারালাইসিসের মতো ঘটনা ঘটতে পারে । আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হওয়া এই অভ্যাসটি কীভাবে ধীরে ধীরে বা মুহূর্তের মধ্যে আপনার মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তা নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদন।
ঘাড় মটকানোর বিজ্ঞান: শব্দটা আসলে কীসের?
ঘাড় মটকালে যে ‘কট’ করে শব্দ হয়, তা আসলে হাড় ভাঙার শব্দ নয়। আমাদের মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর সংযোগস্থলে বা জয়েন্টে এক ধরনের তরল পদার্থ থাকে, যাকে বলা হয় ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ (Synovial Fluid)। এই তরল হাড়ের ঘর্ষণ কমায় এবং নড়াচড়ায় সাহায্য করে। এই তরলের মধ্যে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস মিশে থাকে।
যখন আপনি ঘাড় মটকান, তখন জয়েন্টের ক্যাপসুল প্রসারিত হয় এবং ভেতরের গ্যাসের বুদবুদগুলো হঠাৎ ফেটে যায়। এই বুদবুদ ফাটার শব্দই আমরা শুনতে পাই। এই প্রক্রিয়ায় শরীরে সাময়িকভাবে ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphin) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের আরামের অনুভূতি দেয়। আর ঠিক এই কারণেই মানুষ বারবার ঘাড় মটকাতে চায়, যা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয় ।
কেন এই অভ্যাস বিপজ্জনক? লুকিয়ে থাকা মারণ ফাঁদ
ঘাড় মটকানো বা ‘নেক পপিং’ (Neck Popping) সাময়িক আরাম দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদী এবং তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত মারাত্মক।
১. ভার্টিব্রাল আর্টারি ডাইসেকশন (Vertebral Artery Dissection – VAD)
ঘাড়ের পেছনের দিকে দুটি প্রধান ধমনি বা রক্তনালি থাকে, যাদের বলা হয় ‘ভার্টিব্রাল আর্টারি’। এই ধমনিগুলো মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেয়। ঘাড় মটকানোর সময় হঠাৎ প্রবল চাপে বা মোচড়ে এই ধমনির ভেতরের দেয়ালে ফাটল ধরতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ভার্টিব্রাল আর্টারি ডাইসেকশন’ বা VAD।
এই ফাটল বা ছিঁড়ে যাওয়া স্থানে রক্ত জমাট বেঁধে (Blood Clot) তৈরি হতে পারে। সেই জমাট বাঁধা রক্ত যদি ছুটে গিয়ে মস্তিষ্কের সরু রক্তনালিতে আটকে যায়, তবে মস্তিষ্কের সেই অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঘটে ‘ইস্কেমিক স্ট্রোক’ (Ischemic Stroke)। এটি এতটাই দ্রুত ঘটতে পারে যে, রোগী কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারেন ।
২. স্নায়ুর ক্ষতি (Nerve Damage)
ঘাড়ের হাড়ের ভেতর দিয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু বা নার্ভ চলাচল করে। জোরে ঘাড় মটকালে এই স্নায়ুগুলোতে চাপ পড়তে পারে। নিয়মিত এমনটা করলে স্নায়ু দুর্বল হয়ে হাত বা কাঁধে ঝিনঝিন করা, অসাড়তা বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ঘাড়ের নড়াচড়ার ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে ।
৩. অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি (Risk of Osteoarthritis)
অনেকের ধারণা ঘাড় মটকালে সরাসরি আর্থ্রাইটিস হয় না, যা আংশিক সত্য। তবে দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাসের ফলে লিগামেন্টগুলো (যেগুলো হাড়কে ধরে রাখে) ঢিলা হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘লিগামেন্ট ল্যাক্সিটি’ (Ligament Laxity) বলা হয়। লিগামেন্ট ঢিলা হয়ে গেলে ঘাড়ের জয়েন্টগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় ।
পরিসংখ্যান কী বলছে? (Real-Time Data Analysis)
সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের বিভিন্ন মেডিকেল জার্নাল ও গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ঘাড় মটকানো এবং স্ট্রোকের সম্পর্ক বিরল হলেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
-
তরুণদের ঝুঁকি বেশি: ৪৫ বছরের কম বয়সী সুঠাম দেহের অধিকারীদের মধ্যে যারা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তাদের একটি বড় অংশের মূল কারণ হলো এই ‘ভার্টিব্রাল আর্টারি ডাইসেকশন’ (VAD)। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪৫ বছরের নিচে স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ এটি ।
-
ঘটনার হার: যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই হার ১ লাখে ১ জন হতে পারে, কিন্তু যারা নিয়মিত ঘাড় মটকান বা কাইরোপ্র্যাকটিক (Chiropractic) চিকিৎসার নামে জোরে ঘাড় মটকানোর থেরাপি নেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘাড়ের ম্যানিপুলেশনের কারণে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি প্রতি ১ লাখ থেকে ২০ লাখের মধ্যে ১টি হতে পারে, তবে ভুক্তভোগীর জন্য সেটি ১০০% ঝুঁকি ।
-
দেরিতে লক্ষণ প্রকাশ: অনেক সময় ধমনি ছিঁড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণ দেখা দেয় না। কয়েক দিন বা সপ্তাহ পরেও স্ট্রোক হতে পারে, যা রোগ নির্ণয়কে আরও জটিল করে তোলে ।
বিপদ সংকেত: কখন বুঝবেন আপনি ঝুঁকিতে?
ঘাড় মটকানোর পর নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করবেন না, দ্রুত হাসপাতালে যান।
| লক্ষণ (Symptoms) | সাধারণ অনুভূতি বনাম বিপদের লক্ষণ |
|---|---|
| মাথাব্যথা | সাধারণ মাথাব্যথা নয়, হঠাৎ করে বজ্রপাতের মতো তীব্র ব্যথা (Thunderclap Headache)। |
| ঘাড় ব্যথা | ঘাড়ের একপাশে তীব্র এবং নতুন ধরনের ব্যথা, যা আগে কখনো হয়নি। |
| দৃষ্টিশক্তি | হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা বা একটি জিনিসকে দুটি দেখা (Double Vision)। |
| কথা বলা | কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে কষ্ট হওয়া। |
| ভারসাম্য | হঠাৎ মাথা ঘোরা, হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাওয়া বা শরীরের একপাশ অবশ লাগা। |
| বমি ভাব | কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র বমি ভাব বা বমি হওয়া। |
এই লক্ষণগুলো FAST (Face, Arms, Speech, Time) স্ট্রোকের লক্ষণের মতোই। এই অবস্থায় ঘাড় ম্যাসাজ বা তেল মালিশ করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ, এতে জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে ।
অভ্যাস ত্যাগের উপায় ও নিরাপদ বিকল্প
ঘাড় মটকানোর অভ্যাস ত্যাগ করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। ঘাড়ের জড়তা কাটাতে নিচের নিরাপদ পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:
১. জেন্টল স্ট্রেচিং (Gentle Stretching)
ঘাড় জোরে না মটকিয়ে ধীরে ধীরে ডানে, বামে, সামনে এবং পেছনে ঝোঁকান। প্রতি দিকে ৫-১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। এতে পেশি রিল্যাক্স হবে কিন্তু ধমনিতে চাপ পড়বে না।
২. চিন টাকস (Chin Tucks)
সোজা হয়ে বসে চিবুক বা থুতনি পেছনের দিকে টেনে নিন, যেন আপনার ডাবল চিপ তৈরি হচ্ছে। এটি ঘাড়ের পেছনের পেশি শক্ত করতে সাহায্য করে এবং ঘাড়ের ব্যথা কমায়।
৩. গরম সেঁক বা হট শাওয়ার
ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে থাকলে গরম জলের সেঁক বা হট শাওয়ার নিন। এটি রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং পেশির টান কমায়, ফলে মটকানোর ইচ্ছা কমে যায় ।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ
যদি ঘাড় ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে নিজে ডাক্তারি না করে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বা অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ঘাড়ের ব্যথা কোনো বড় রোগের (যেমন স্পন্ডাইলোসিস বা ডিস্ক প্রলাপস) লক্ষণও হতে পারে।
ঘাড় মটকানো একটি সাধারণ অভ্যাস মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঝুঁকি। ২০২৫-২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের বারবার সতর্ক করছে যে, ঘাড়ের ধমনি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সামান্য আঘাতেই তা ছিঁড়ে যেতে পারে। সাময়িক আরামের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই আজই এই মারণ অভ্যাস ত্যাগ করুন। সুস্থ থাকতে হলে ঘাড়ের সঠিক ব্যায়াম ও নিয়মিত বিশ্রামের কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখবেন, একটি ছোট ভুল আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্না বয়ে আনতে পারে ।











