নেতাই তর্পণ: ১৫ বছর পরেও বেদনায় আচ্ছন্ন জঙ্গলমহল

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নেতাই গ্রামে এক নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল, যাতে ৭-৯ জন নিরীহ গ্রামবাসী প্রাণ হারান এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হন…

Chanchal Sen

 

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নেতাই গ্রামে এক নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল, যাতে ৭-৯ জন নিরীহ গ্রামবাসী প্রাণ হারান এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হন । পনেরো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই কালো দিনের স্মৃতি এখনও জঙ্গলমহলের মানুষের মনে জ্বলজ্বল করছে। লালগড় আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড ছিল রাজনৈতিক সন্ত্রাসের এক ভয়াবহ উদাহরণ। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে – কতটা বদলেছে জঙ্গলমহল? ক্ষত শুকিয়েছে কি উন্নয়নের ছোঁয়ায়?

নেতাই হত্যাকাণ্ড: সেই কালো অধ্যায়

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার লালগড় ব্লকের নেতাই গ্রামে ঘটে যায় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড । স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতা রথীন দণ্ডপতের বাড়ির কাছে স্থাপিত একটি ক্যাম্পে অবস্থান করছিল সশস্ত্র হরমদ বাহিনী। গ্রামবাসীরা যখন এই অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরে তাদের সন্তানদের পাঠাতে অস্বীকার করেন এবং প্রতিবাদ জানাতে সমবেত হন, তখনই শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ ।

ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব জি.ডি. গৌতম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে এই ঘটনায় মাওবাদীদের কোনো সংযোগ ছিল না, বরং এটি ছিল সিপিআই(এম) এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলাফল । প্রায় ২৫০ জনের একটি জনতার উপর, যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মহিলা, প্রায় ৩০০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল । এই হত্যাকাণ্ডে শম্ভুনাথ ঘড়ুই, ধীরেন সেন, কাবুল পাট্রো, ফুলকুমারী মাইতি, সৌরভ ঘড়ুই, ধ্রুবু গোস্বামী এবং অনুপ সেন সহ ৭-৯ জন নিহত হন ।

পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (PUDR) এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (APDR) এর তথ্যানুসন্ধান দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিশ্চিত করে যে নিহতদের মৃতদেহগুলি রথীন দণ্ডপতের বাড়ি থেকে ৩০-৪০ মিটার দূরে পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে গ্রামবাসীরা তার বাড়ি ঘেরাও করেননি । গুলিবর্ষণ দেড় ঘণ্টা ধরে চলেছিল এবং লালগড় থানা মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে পৌঁছায় ।

রাজনৈতিক পটভূমি ও সালওয়া জুড়ুমের ছায়া

নেতাই হত্যাকাণ্ড ঘটার মাত্র কয়েক দিন আগে, ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সচিবালয় সদস্য ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক দীপক সরকার লালগড়ে একটি সভা করে “গ্রাম সুরক্ষা দল” (Village Protection Groups – VPGs) গঠনের ঘোষণা করেছিলেন । স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতারা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গ্রামবাসীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই শিবির স্থাপন করেছিলেন।

অনেক বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে ছত্তিসগড়ের “সালওয়া জুড়ুম” আন্দোলনের সাথে তুলনা করেছিলেন, যেখানে রাজ্য পুলিশ দাঁতেওয়াড়ার গ্রামবাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মাওবাদীদের মোকাবিলা করতে । তবে ছত্তিসগড় সরকারকে এই পদক্ষেপের জন্য ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। নেতাইয়ে ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে স্থানীয় নেতারা সশস্ত্র শিবির স্থাপন করে গ্রামবাসীদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

ICC Trophy History: বিরাট কোহলির অসাধারণ রেকর্ড: ক্রিকেট বিশ্বে নতুন কীর্তি গড়লেন রান মেশিন!

মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও আইনি প্রক্রিয়া

নেতাই হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম জানিয়েছিলেন যে ৮ জন মারা গেছেন এবং ২০ জন আহত হয়েছেন । অন্যান্য সূত্র অনুসারে, ৭ থেকে ৯ জনের মধ্যে প্রাণহানি ঘটেছিল । আহতদের মধ্যে ৮ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

২০১৪ সালে নেতাই হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল । যদিও ঘটনার পরবর্তী বছরগুলিতে বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তার হয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া এক দীর্ঘ এবং বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জঙ্গলমহলের পরিচয় ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

জঙ্গলমহল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত একটি বৃহৎ ভূখণ্ড যা পাঁচটি জেলা জুড়ে বিস্তৃত – পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং পশ্চিম বর্ধমানের কিছু অংশ । এই অঞ্চলটি পাহাড়, টিলা এবং ঘূর্ণায়মান ভূমির সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে ছোটনাগপুর মালভূমির নিম্ন পর্বতশ্রেণী দিগন্তরেখায় দৃশ্যমান ।

ঐতিহাসিকভাবে, জঙ্গলমহল বামপন্থী চরমপন্থা (Left Wing Extremism – LWE) দ্বারা প্রভাবিত একটি অঞ্চল ছিল। ২০১১ সালের আগে এই এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। নেতাই গ্রাম নিজেই ঝাড়গ্রাম মহকুমার বিনপুর-১ কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ব্লকে অবস্থিত।

২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, নেতাই গ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল ১,৯৪৬ জন, যার মধ্যে ৯৮৭ জন (৫০%) পুরুষ এবং ৯৫৯ জন (৪৯%) মহিলা । ৬ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যার মধ্যে শিক্ষিতের হার ছিল ৬৯.৪২%, যা সেই সময়ের গ্রামীণ মানদণ্ড অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত ছিল। ১৯৮১ সালে জঙ্গলমহলের মাত্র ৮% জনসংখ্যা শহুরে এলাকায় বাস করত, যা ২০১১ সালে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১১% হয়েছে । এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে এই অঞ্চলটি মূলত গ্রামীণ এবং শহরায়নের প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল।

২০১১-২০১৫: উন্নয়নের প্রথম পর্যায়

তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গলমহল অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দেয়। এই লক্ষ্যে “পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিষয়ক দপ্তর” (Paschimanchal Unnayan Affairs Department) তৈরি করা হয় । এই বিভাগ দক্ষিণবঙ্গের পাঁচটি জেলা জুড়ে ৭৪টি অনুন্নত ব্লকে উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে ২৩টি বামপন্থী চরমপন্থা (LWE)-প্রভাবিত ব্লক রয়েছে।

বাজেট বরাদ্দে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি

২০১১-২০১৫ সময়কালে এই অঞ্চলে মোট ৬০৮.৬৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা ২০০৭-২০১১ সময়কালের ১৬০.৩৭ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি । এই উল্লেখযোগ্য বাজেট বৃদ্ধি সরকারের জঙ্গলমহল উন্নয়নের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদর্শন করে।

পরিকাঠামো উন্নয়ন

সড়ক যোগাযোগ

  • রামপুরহাট থেকে ডুমকা

  • সুরি থেকে মহম্মদ বাজার

  • খাগড়া থেকে জয়দেব

  • বলপুর থেকে ইলামবাজার

  • সুরি থেকে রাজনগর

এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগ শক্তিশালী করা হয়েছে ।

  • পুরুলিয়ার পুরুলিয়া-বরাকর সড়কে ঝাড়ুখামরে আরসিসি (রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট) সেতু নির্মাণ, আনুমানিক খরচ ২.৫৩ কোটি টাকা

  • পশ্চিম মেদিনীপুরের ১১টি LWE ব্লকে পানীয় জল প্রকল্প

  • বীরভূম জেলার বলপুর ব্লকে কানা আজয় নদীর উপর মিনি ব্যারাজ

শিক্ষা

  • বাঁকুড়া জেলার সারেঙ্গায় একটি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং একটি পুরুষ হোস্টেল নির্মাণ, এলাকার দরিদ্র মানুষদের জন্য

  • পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় সিলদা চন্দ্রশেখর কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়ন, খরচ ২.৩৭ কোটি টাকা

স্বাস্থ্য

  • বাঁকুড়া জেলার রায়পুর ব্লকে রায়পুর গ্রামীণ হাসপাতাল আপগ্রেড করা, আনুমানিক খরচ ৩.৮৪ কোটি টাকা

  • পুরুলিয়া জেলার বারি, বান্দোয়ান এবং সিরকাবাদ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে (BPHC) তিনটি পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র (NRC)

  • দেবেন মহাতো সদর হাসপাতালে অসুস্থ নবজাতক যত্ন ইউনিট (SNCU) এবং গাইনোকলজি ও মাতৃত্ব ওয়ার্ড সম্প্রসারণ

  • পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়া জেলায় নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার পরিকল্পনা

  • বাঁকুড়া জেলার খাত্রা এসডি হাসপাতাল কমপ্লেক্সে রক্তের ব্যাংক নির্মাণ, খরচ ৭৫.৮৭ লক্ষ টাকা

  • পশ্চিম মেদিনীপুরে বিভিন্ন BPHC/RH-তে ৯টি জল পরিশোধন কেন্দ্র, আনুমানিক খরচ ২,৪৮,১০,৯৩৯ টাকা

জঙ্গল সুন্দরী কর্মনগরী: উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পায়নের স্বার্থে “জঙ্গল সুন্দরী প্রকল্প” গ্রহণ করেন । এটি জঙ্গলমহল অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, যা বিশেষভাবে পুরুলিয়া জেলায় কেন্দ্রীভূত।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

পশ্চিমবঙ্গ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (WBIDC) শিল্প, বাণিজ্য ও এন্টারপ্রাইজ বিভাগের তত্ত্বাবধানে “জঙ্গল সুন্দরী কর্মনগরী” উন্নয়ন করছে । এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে:

প্রকল্পের বিবরণ পরিমাণ
মোট প্রকল্প খরচ ১,০০০ কোটি টাকা
প্রত্যাশিত বিনিয়োগ ৬৩,০০০ কোটি টাকা
সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ১.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ
প্রকল্প এলাকা ৩,৪৪৮.৭৯ একর

২০২৫ সালের নভেম্বরে বঙ্গ গ্লোবাল বিজনেস সামিট (BGBS)-এর জন্য জঙ্গলমহল অঞ্চলে ৫,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রাপ্ত হয়েছে । নিবেশের বড় অংশ পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়া জেলায় কেন্দ্রীভূত হবে – বাঁকুড়ায় ৪,৫৯০ কোটি টাকা, পূর্ব বর্ধমানে ৫৯০ কোটি টাকা, পশ্চিম বর্ধমানে ৩৫০ কোটি টাকা এবং পুরুলিয়ায় ৯০ কোটি টাকা । আধিকারিকরা আশা করছেন যে আগামী দেড় বছরে এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।

পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন

জঙ্গল সুন্দরী কর্মনগরী প্রকল্পে পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে:

  • শক্তি দক্ষ সিস্টেম

  • সবুজ ভবন ধারণা

  • জলাশয়ের সংরক্ষণ

  • বৃষ্টির জল সংগ্রহ সিস্টেম উন্নয়ন

  • পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃব্যবহার ধারণা বিবেচনা করা হচ্ছে

পথশ্রী-৩ প্রকল্প

জঙ্গলমহলে মূলত জনসংযোগ উন্নয়নের উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে “পথশ্রী-৩” প্রকল্প । এই প্রকল্প শিল্পের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দিচ্ছে। বনাঞ্চলে বিদ্যুৎ থেকে পানীয় জল, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ভিত্তি শক্ত করা থেকে সার্বিক উন্নয়নের বুনিয়াদ তৈরি হচ্ছে ।

রাজনৈতিক পরিবর্তন: সন্ত্রাস থেকে শান্তির পথে

নেতাই হত্যাকাণ্ড এবং লালগড় আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলি ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো এবং জঙ্গলমহলে শান্তি প্রতিষ্ঠা নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। বামপন্থী চরমপন্থা দ্বারা প্রভাবিত ২৩টি ব্লকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকার মাওবাদী কার্যকলাপ কমাতে এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করে।

সামাজিক পরিবর্তন: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

শিক্ষার বিস্তার

জঙ্গলমহল অঞ্চলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০১১ সালে নেতাই গ্রামে শিক্ষার হার ছিল ৬৯.৪২% । নতুন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কলেজ পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং হোস্টেল নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি

স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। হাসপাতাল আপগ্রেড, নবজাতক যত্ন ইউনিট স্থাপন, পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্র, নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প এবং রক্তের ব্যাংক নির্মাণ – এসব উদ্যোগ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করেছে।

নারী ক্ষমতায়ন

নেতাই হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন নারী, যা সেই সময় নারীদের সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয় । বর্তমানে জঙ্গলমহলে নারী ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প চালু রয়েছে, যা নারীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

অর্থনৈতিক রূপান্তর: কৃষি থেকে শিল্পায়ন

জঙ্গলমহল ঐতিহাসিকভাবে একটি কৃষিনির্ভর অঞ্চল ছিল, যেখানে শিল্পের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কিন্তু জঙ্গল সুন্দরী প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলে শিল্পায়নের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

শিল্প সেক্টর

পুরুলিয়ায় ৬৩,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রকল্প বিভিন্ন শিল্প সেক্টরকে আকৃষ্ট করছে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সেবা এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক শিল্প। এই বিনিয়োগ লক্ষাধিক মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি বিশাল প্রভাব ফেলবে ।

পর্যটন উন্নয়ন

জঙ্গলমহলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পর্যটন উন্নয়নের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনা প্রদান করে। সরকার এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে।

কৃষি আধুনিকীকরণ

ঐতিহ্যবাহী কৃষির পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চলছে। বারাজ নির্মাণ এবং জল সরবরাহ প্রকল্পগুলি কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করছে ।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

যদিও গত ১৫ বছরে জঙ্গলমহল অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:

শহরায়নের ধীর গতি

জঙ্গলমহল এখনও মূলত একটি গ্রামীণ অঞ্চল, যেখানে মাত্র ১১% জনসংখ্যা শহুরে এলাকায় বাস করে । শহরায়নের ধীর গতি অর্থনৈতিক সুযোগ এবং পরিষেবাগুলিতে অ্যাক্সেস সীমিত করে

সূচক ২০১১ ২০২৬
বিকাশ বাজেট (৪ বছর) ১৬০.৩৭ কোটি টাকা (২০০৭-১১) ৬০৮.৬৯ কোটি টাকা (২০১১-১৫)
শিল্প বিনিয়োগ নগণ্য ৬৩,০০০ কোটি টাকা (জঙ্গল সুন্দরী)
সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রস্তাব ৫,৫০০ কোটি টাকা (২০২৫)
প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান ১.৫ লক্ষেরও বেশি
রাজনৈতিক সহিংসতা উচ্চ (মাওবাদী কার্যকলাপ, হরমদ আক্রমণ) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস
পরিকাঠামো দুর্বল উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন (সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)

অতীতের ক্ষত

নেতাই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলির মানসিক প্রভাব এখনও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুভূত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া।

অবকাঠামোগত ব্যবধান

যদিও বহু পরিকাঠামো প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, তবুও সড়ক, বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ এবং ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রে আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।

কর্মসংস্থানের সুযোগ

শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, স্থানীয় যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। জঙ্গল সুন্দরী প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ২০১১ বনাম ২০২৬

সূচক ২০১১ ২০২৬
বিকাশ বাজেট (৪ বছর) ১৬০.৩৭ কোটি টাকা (২০০৭-১১) ৬০৮.৬৯ কোটি টাকা (২০১১-১৫)
শিল্প বিনিয়োগ নগণ্য ৬৩,০০০ কোটি টাকা (জঙ্গল সুন্দরী)
সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রস্তাব ৫,৫০০ কোটি টাকা (২০২৫)
প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান ১.৫ লক্ষেরও বেশি
রাজনৈতিক সহিংসতা উচ্চ (মাওবাদী কার্যকলাপ, হরমদ আক্রমণ) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস
পরিকাঠামো দুর্বল উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন (সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)

২০২৫ সালে Career Development: আপনার পেশাগত উন্নয়নের চারটি মূল চাবিকাঠি

নেতাই স্মৃতি: প্রতিবছরের শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি নেতাই গ্রামে শহিদদের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এবং রাজনৈতিক নেতারা শহিদ বেদীতে ফুল অর্পণ করেন এবং প্রয়াত ব্যক্তিদের স্মরণ করেন। এই বার্ষিক অনুষ্ঠান শুধুমাত্র শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনই নয়, বরং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তাও প্রেরণ করে।

২০২৬ সালে ১৫তম বার্ষিকীতে এই অনুষ্ঠানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। দেড় দশক পরে, জঙ্গলমহল যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, তা শহিদদের আত্মত্যাগের উপযুক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি কিনা – এই প্রশ্ন অনেকের মনে রয়েছে।

মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার

নেতাই হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি গুরুতর ঘটনা ছিল। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (APDR) এবং পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (PUDR) তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের উপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের নিন্দা করেছিল ।

এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ করার জন্য, সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

জঙ্গলমহলের ভবিষ্যৎ: আশা ও প্রত্যাশা

জঙ্গলমহল আজ একটি রূপান্তরের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জঙ্গল সুন্দরী প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন এই অঞ্চলকে পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রধান শিল্প কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। ৬৩,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং ১.৫ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করে তুলছে ।

তবে, এই উন্নয়ন টেকসই হতে হবে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রকৃত উপকার করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতির সম্মান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে স্থানীয় যুবকরা নতুন শিল্প সুযোগের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। ডিজিটাল সংযোগ উন্নয়ন জঙ্গলমহলকে বৃহত্তর অর্থনীতি এবং তথ্য প্রবাহের সাথে সংযুক্ত করবে।

স্বাস্থ্য পরিষেবা, জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। পর্যটন উন্নয়ন অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং অঞ্চলটির সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারে।

শেষ কথা

নেতাই হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্তি শুধুমাত্র একটি ট্র্যাজিক ঘটনার স্মৃতিচারণ নয়, বরং জঙ্গলমহল অঞ্চলের দীর্ঘ যাত্রার একটি মাইলফলক। সহিংসতা এবং অবহেলার অন্ধকার দিন থেকে শুরু করে উন্নয়ন ও আশার নতুন যুগে প্রবেশ – এই রূপান্তর সহজ ছিল না। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্থিতিস্থাপকতা এবং সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টা একসাথে জঙ্গলমহলের এই নতুন অধ্যায় রচনা করেছে ।

২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত, উন্নয়ন বাজেটে চারগুণ বৃদ্ধি, ৬৩,০০০ কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ প্রকল্প এবং ১.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা জঙ্গলমহলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করছে । পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস অঞ্চলটির সামাজিক ফ্যাব্রিককে শক্তিশালী করেছে। তবে, চ্যালেঞ্জগুলি রয়ে গেছে – শহরায়নের ধীর গতি, অতীতের আঘাতের মানসিক প্রভাব এবং সমস্ত নাগরিকদের জন্য উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত করা। নেতাইয়ের শহিদদের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচার রক্ষা করা একটি চলমান দায়িত্ব, এবং প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ যখন তা মানবিক মর্যাদা এবং অধিকারের উপর প্রতিষ্ঠিত। জঙ্গলমহলের আগামীর পথ এখন উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, তবে এই আলো টিকিয়ে রাখতে হলে ক্রমাগত প্রচেষ্টা, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য ।

About Author
Chanchal Sen

চঞ্চল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। তিনি একজন অভিজ্ঞ লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি পলিটিক্স নিয়ে লেখালিখিতে পারদর্শী। চঞ্চলের লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক ঘটনাবলীর সঠিক উপস্থাপন পাঠকদের মুগ্ধ করে। তার নিবন্ধ এবং মতামতমূলক লেখা বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণধর্মিতার কারণে পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। চঞ্চল সেনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর গবেষণা তাকে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান প্রদান করেছে। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে পাঠকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আরও পড়ুন