পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্যোদয়: অকুতোভয় যোদ্ধা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অগ্নিশিখা, যার বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামরিক কৌশল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল । ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটকে জন্ম নেওয়া এই মহান…

Riddhi Datta

 

সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অগ্নিশিখা, যার বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামরিক কৌশল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল । ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটকে জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, দক্ষ সংগঠক এবং অসাধারণ বক্তা । তাঁর বিখ্যাত উক্তি “তুমি আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” আজও কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে প্রেরণা জোগায় । ভারত সরকার ২০২৬ সালে তাঁর ১২৯তম জন্মবার্ষিকী পালন করছে পরাক্রম দিবস হিসেবে, যা ২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জসহ দেশের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আয়োজিত হচ্ছে ।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাজীবন

সুভাষচন্দ্র বসু একটি সম্পন্ন এবং প্রতিষ্ঠিত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী একজন ধার্মিক ও সংস্কৃতিবান মহিলা । কটকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু ১৯১৬ সালে জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের জন্য তাঁকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয় । পরবর্তীতে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯১৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ।

তাঁর মেধা এবং প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের (ICS) প্রস্তুতির জন্য পাঠানো হয় । ১৯২০ সালে তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯২১ সালে এই লোভনীয় চাকরি ত্যাগ করে স্বদেশে ফিরে আসেন । এই সিদ্ধান্ত তাঁর দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের প্রথম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল।

রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ও কংগ্রেসে ভূমিকা

ভারতে ফিরে সুভাষচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন । গান্ধীজির পরামর্শে তিনি বাংলায় চিত্তরঞ্জন দাসের অধীনে কাজ শুরু করেন এবং সেখানে যুব শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বেঙ্গল কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । তাঁর এই কার্যকলাপের ফলে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় । ১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন, যেখানে চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন মেয়র ।

১৯৩৮ সালে সুভাষচন্দ্র ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একটি জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেন যা ব্যাপক শিল্পায়নের নীতি প্রণয়ন করে । ১৯৩৯ সালে তিনি পুনরায় কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন, যদিও এবার তিনি গান্ধীজির পছন্দের প্রার্থী পট্টাভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করেন । কিন্তু গান্ধীবাদী গোষ্ঠীর সাথে মতবিরোধ চরমে পৌঁছালে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ১৯৩৯ সালে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন ।

গান্ধীজির সাথে মতভেদ ও বিপ্লবী পথের নির্বাচন

সুভাষচন্দ্র এবং মহাত্মা গান্ধীর মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল গভীর । গান্ধীজি যেখানে অহিংস পথে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পক্ষপাতী ছিলেন, সেখানে সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস করতেন যে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন । তিনি গান্ধীজির অর্থনৈতিক চিন্তাধারাকেও রক্ষণশীল মনে করতেন, যা কুটির শিল্প এবং স্বনির্ভরতার উপর জোর দিত ।

এই মতভেদের কারণে ১৯৩০-এর দশকে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয় এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে । স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁকে ১৯৩৩-৩৪ এবং ১৯৩৬-৩৭ সালে ইউরোপে চিকিৎসার জন্য যেতে অনুমতি দেওয়া হয়, যেখানে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সামনে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন ।

ইউরোপে পলায়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি, কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও, সুভাষচন্দ্র মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন নামে এক আফগান পাঠানের ছদ্মবেশে কলকাতার তাঁর বাসভবন থেকে পালিয়ে যান । কাবুল এবং মস্কো হয়ে তিনি ১৯৪১ সালের এপ্রিলে জার্মানিতে পৌঁছান । নাৎসি জার্মানিতে তিনি ভারতের জন্য বিশেষ ব্যুরোর অধীনে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে জার্মান-পৃষ্ঠপোষকতায় আজাদ হিন্দ রেডিও থেকে নিয়মিত সম্প্রচার করতে থাকেন । এই সম্প্রচার ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, গুজরাটি এবং পশতু ভাষায় হতো ।

১৯৩৪ সালে ভিয়েনায় থাকাকালীন তিনি অস্ট্রিয়ান এমিলি শেঙ্কলের সাথে পরিচিত হন, যিনি তাঁর সচিব হয়ে ওঠেন । তাঁরা ১৯৩৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯৪২ সালে তাঁদের কন্যা অনিতার জন্ম হয় । এই ব্যক্তিগত জীবন তাঁর আন্তর্জাতিক মাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

আজাদ হিন্দ ফৌজ: স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম

জাপানের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আক্রমণের এক বছর পর, সুভাষচন্দ্র জার্মানি ত্যাগ করেন এবং জার্মান ও জাপানি সাবমেরিন এবং বিমানে যাত্রা করে ১৯৪৩ সালের মে মাসে টোকিও পৌঁছান । ১৯৪৩ সালের ৪ জুলাই তিনি পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং জাপানি সহায়তায় ৪০,০০০ সৈন্যবিশিষ্ট ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (INA) সংগঠিত করেন ।

আইএনএ-এর প্রকৃত শক্তি এবং গঠন আরও প্রভাবশালী ছিল । প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৪০,০০০ ভারতীয় যুদ্ধবন্দীর মধ্য থেকে প্রায় ১২,০০০ সৈন্য নিয়ে এটি গঠিত হয় । পরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায় থেকে স্বেচ্ছাসেবক যোগদানের মাধ্যমে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ (IIL)-এর সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩,৫০,০০০-এ পৌঁছায়, যেখানে প্রায় ১,০০,০০০ স্থানীয় ভারতীয় আইএনএ-তে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদান করে, এবং সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০,০০০-এ ।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে সুভাষচন্দ্র নারীদের সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণের প্রচার করেন এবং ঝাঁসির রাণী রেজিমেন্ট গঠন করেন । তিনি কোনো সামরিক পদবী গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, এবং আইএনএ-র সৈনিক এবং সাধারণ মানুষ তাঁকে “নেতাজি” (প্রিয় নেতা) সম্বোধন করতেন ।

অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকার প্রতিষ্ঠা

১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সুভাষচন্দ্র একটি অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকার ঘোষণা করেন । এই সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি বিদেশী শক্তি কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল । জাপানি সৈন্যদের সাথে আইএনএ বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াঙ্গুন) পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং তারপর স্থলপথে ভারতে প্রবেশ করে, ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে কোহিমা এবং ইম্ফলে পৌঁছায় ।

“দিল্লি চলো” স্লোগান ছিল আইএনএ সৈনিকদের যুদ্ধের ধ্বনি । একজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার শাহ নওয়াজ খানের মতে, যেসব যোদ্ধারা ভারতীয় ভূমিতে প্রবেশ করেছিল, তারা মাতৃভূমির পবিত্র মাটিতে শুয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে চুম্বন করেছিল । যদিও বায়ু সহায়তার অভাবে তারা পরাজিত হয় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়, তবুও আইএনএ-র প্রচেষ্টা সারা ভারতে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং ব্রিটিশদের ভারতের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে ।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান ও প্রভাব

সুভাষচন্দ্র বসুর অবদান ছিল বহুমাত্রিক । তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ১৯৪৪ সালের একটি রেডিও ভাষণে মহাত্মা গান্ধীকে “জাতির পিতা” হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন । তাঁর আদর্শ ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সকল ভারতীয়দের জন্য সাম্যতার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং সক্রিয় লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর কেন্দ্রীভূত ছিল ।

তাঁর নেতৃত্ব স্বাধীনতা আন্দোলনে আরও জঙ্গি দৃষ্টিভঙ্গি অনুপ্রাণিত করে এবং আন্দোলনের মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী আদর্শের ভারসাম্য আনে । তাঁর তাৎক্ষণিক এবং আপসহীন স্বাধীনতার পক্ষে ওকালতি তরুণ নেতা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দীপিত করে । যদিও আইএনএ-র সামরিক প্রচারণা ব্যর্থ হয়, তবুও তা উল্লেখযোগ্যভাবে ব্রিটিশ মনোবলকে দুর্বল করে দেয় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত প্রত্যাহারের পথ প্রশস্ত করে ।

রহস্যময় মৃত্যু ও বিতর্ক

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা করার কয়েক দিন পর, সুভাষচন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে পালিয়ে যান । প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় পোড়া আঘাতের ফলে তিনি বর্তমান তাইওয়ানের একটি জাপানি হাসপাতালে মারা যান । তাঁর ছাইভস্ম টোকিওর একটি বৌদ্ধ মন্দির রেনকোজিতে সংরক্ষিত আছে বলে বিশ্বাস করা হয় ।

তবে সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যুর পরিস্থিতি রহস্যে আচ্ছন্ন এবং অনেক বই, চলচ্চিত্র এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিষয় । ভারত সরকার তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে বেশ কয়েকটি তদন্ত শুরু করেছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন । তবে ২০০৫ সালে জাস্টিস মুখার্জি কমিশন অফ ইনকোয়ারি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, যদিও বসু মৃত, তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি এবং রেনকোজির ছাই বসুর নয় । সরকার কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

পরাক্রম দিবস: নেতাজির ১২৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন ২০২৬

ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শ্রী বিজয়পুরম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ‘পরাক্রম দিবস-২০২৬’ আয়োজন করছে । এই উৎসব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও উত্তরাধিকারের সাথে সম্পর্কিত দেশের অন্যান্য ১৩টি প্রতিষ্ঠিত স্থানেও পালিত হবে ।

এই অনুষ্ঠানটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৯তম জন্মবার্ষিকী চিহ্নিত করে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অতুলনীয় অবদান এবং সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্থায়ী উত্তরাধিকারকে সম্মানিত করার লক্ষ্যে । ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ নেতাজি স্টেডিয়াম, শ্রী বিজয়পুরমে মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যাডমিরাল ডি.কে. জোশি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ।

উৎসবে একটি দর্শনীয় ড্রোন শো এবং উস্তাদ আমজাদ আলি খান, শ্রী পাপন, শ্রী আমান আলি বাঙ্গাশ, শ্রী আয়ান আলি বাঙ্গাশ, শ্রীমতি মাংলি, শ্রী রঘু দীক্ষিত এবং অন্যান্য বিশিষ্ট শিল্পীদের পারফরম্যান্স অন্তর্ভুক্ত থাকবে । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও উত্তরাধিকারের প্রদর্শনী আয়োজিত হবে, যেখানে দুর্লভ দৃশ্য, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং তাঁর যাত্রার মূল মাইলফলক প্রদর্শিত হবে । ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ের (NSD) একটি নাট্য পরিবেশনাও নির্ধারিত আছে ।

আদর্শ ও দর্শন

সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ ছিল বহুমুখী এবং প্রগতিশীল । তিনি বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতকে সক্রিয় এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে । তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং বিপ্লবী কার্যকলাপকে মূল কৌশল হিসেবে সমর্থন করেছিলেন । শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের উপর মনোনিবেশকারী নেতাদের থেকে ভিন্ন, বসু মনে করতেন প্রত্যক্ষ কর্ম অপরিহার্য ।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি এবং সামাজিক সমতার স্বপ্ন দেখতেন । তিনি ভারতকে একটি শক্তিশালী, আধুনিক এবং শিল্পায়িত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন । তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লক বামপন্থী শক্তিগুলিকে একত্রিত করার এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য একটি রাজনৈতিক সত্তা ছিল ।

বিতর্ক ও সমালোচনা

যদিও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী নেতাদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচিত, তবে নাৎসি জার্মানি, বেনিটো মুসোলিনির ইটালি এবং সাম্রাজ্যবাদী জাপানের মতো প্রধান অক্ষশক্তির সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা বিতর্কিত রয়ে গেছে । তাঁর সমালোচকরা যুক্তি দেন যে এই শাসনগুলির সাথে অংশীদারিত্ব নৈতিকভাবে সমস্যাজনক ছিল ।

তবে তাঁর সমর্থকরা বিশ্বাস করেন যে তিনি যুদ্ধকালীন কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে এই জোট গঠন করেছিলেন । তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের পরাজিত করা এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করা, এবং তিনি যে কোনো উপলব্ধ সহায়তা ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন । যদিও জাপানি সেনাবাহিনীর অধীনে একটি অধীনস্থ হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল, বসু বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ থেকে ভারতকে মুক্ত করার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় ত্যাগ ছিল ।

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উত্তরাধিকার ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে অমূল্য । তাঁর সাহস, দৃঢ়তা এবং দেশের প্রতি অটুট ভালোবাসা আজও লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে অনুপ্রাণিত করে । তাঁর বিখ্যাত উক্তি “জয় হিন্দ” আজও ভারতের জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয় । প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি তাঁর জন্মবার্ষিকী সমগ্র ভারতে পরাক্রম দিবস (বীরত্ব দিবস) হিসেবে উদযাপিত হয় ।

তাঁর নেতৃত্বে গঠিত আইএনএ যদিও সামরিকভাবে ব্রিটিশদের পরাজিত করতে পারেনি, কিন্তু এটি ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল । আইএনএ-র বিচার ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ এবং সামগ্রিকভাবে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে তীব্রতর করতে সহায়তা করেছিল। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং অটল দেশপ্রেম এক পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল ।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন

সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মতোই আকর্ষণীয় ছিল । তাঁর বড় ভাই শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য, যিনি সক্রিয়ভাবে গান্ধী-নেতৃত্বাধীন অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন । শরৎচন্দ্র তাঁর ক্যারিয়ার জুড়ে সুভাষচন্দ্রকে আর্থিকভাবে সমর্থন করেছিলেন ।

১৯৩৭ সালে অস্ট্রিয়ান এমিলি শেঙ্কলের সাথে তাঁর বিবাহ এবং ১৯৪২ সালে কন্যা অনিতার জন্ম তাঁর জীবনে আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে । তবে দেশসেবার প্রতি তাঁর নিবেদন তাঁকে পরিবার থেকে দূরে রেখেছিল এবং তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে উৎসর্গ করেছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও তথ্য

বিবরণ তথ্য
জন্ম তারিখ ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭
জন্মস্থান কটক, উড়িষ্যা (বর্তমান ওড়িশা)
মৃত্যু তারিখ (অনুমিত) ১৮ আগস্ট ১৯৪৫
মৃত্যুর স্থান (অনুমিত) তাইওয়ান
বয়স (মৃত্যুকালে) ৪৮ বছর
আইএনএ সৈন্য সংখ্যা ৪০,০০০-৫০,০০০
আইআইএল সদস্য সংখ্যা ৩,৫০,০০০ (সর্বোচ্চ)
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে স্বেচ্ছাসেবক ১,০০,০০০ (প্রায়)
২০২৬ সালে জন্মবার্ষিকী ১২৯তম
পরাক্রম দিবস ২০২৬ ২৩-২৫ জানুয়ারি

শিক্ষা ও শিক্ষণ

সুভাষচন্দ্র বসু শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং একজন বিদ্বান এবং লেখকও ছিলেন। তাঁর লেখা এবং বক্তৃতাগুলি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অমূল্য দলিল। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যা তাঁকে ১৯২১ সালে ভারতে ফিরে আসার পর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল ।

তাঁর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং আইসিএস পরীক্ষায় কৃতিত্ব তাঁর অসাধারণ মেধার প্রমাণ । তবে দেশের স্বাধীনতার চেয়ে তাঁর কাছে কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য বড় ছিল না, যা তাঁর আত্মত্যাগের মনোভাব প্রকাশ করে।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নেতাজি

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন এবং কাজ অসংখ্য বই, চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারির বিষয় হয়ে উঠেছে । তাঁর রহস্যময় মৃত্যু এবং অদম্য সাহসের গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে চলেছে। ভারতীয় জনমানসে তিনি শুধু একজন নেতাই নন, বরং একজন কিংবদন্তি হিসেবে বেঁচে আছেন। তাঁর অবদান স্বীকার করে ভারত সরকার তাঁর নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, রাস্তা এবং বিমানবন্দরের নামকরণ করেছে।

বাংলায় তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিদের মধ্যে একজন হিসেবে গণ্য করা হয় । তাঁর জীবন কাহিনী সাহস, ত্যাগ, এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন এবং কর্ম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। পরাধীনতার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার আলোর দিকে যাত্রায় তিনি ছিলেন একজন অগ্রদূত এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি, সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। যদিও তাঁর জীবন রহস্যে ঘেরা, তবুও তাঁর আদর্শ এবং অবদান চিরকাল ভারতবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। ২০২৬ সালে তাঁর ১২৯তম জন্মবার্ষিকীতে পরাক্রম দিবস উদযাপনের মাধ্যমে আমরা তাঁর সাহস, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমকে স্মরণ করি এবং নতুন প্রজন্মকে তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে আহ্বান জানাই। নেতাজির স্বপ্নের ভারত গড়তে আমাদের সকলকে তাঁর দেখানো পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং জাতি গঠনে নিজেদের অবদান রাখতে হবে।

About Author
Riddhi Datta

ঋদ্ধি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন উদীয়মান বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, যিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলেন। তাঁর লেখায় রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমসাময়িক বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। ঋদ্ধি নিয়মিতভাবে এই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্রবন্ধ, গবেষণা সারসংক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন